ঢাকা কলেজে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার , দুইজনই ছিলেন ঢাকা কলেজে আমাদের শিক্ষক।

সায়ীদ স্যার যতখানি হাস্যোজ্জ্বল, জনপ্রিয়, মিডিয়া-খ্যাত ; ইলিয়াস স্যার ছিলেন ঠিক ততখানিই অন্তর্মুখী , বিষণ্ণ , একা। শুনেছিলাম উনি চিলেকোঠার সেপাই এর লেখক। কী যেন পুরস্কারও পেয়েছেন ।
সাদা কালো চুলে, মোটা ফ্রেমের চশমা, একটু ধীরে ডান পা টেনে হাঁটতেন , মনে আছে !

স্মৃতি থেকে লিখছি ! সতীর্থ কারো মনে পড়বে হয়তো —শুনেছিলাম তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়েছিল সেই সময়েই । উনি আমাদের উচ্চ মাধ্যমিকে ‘ সমুদ্রের প্রতি রাবণ’ পড়িয়েছিলেন। বড়জোর তিন চারটা ক্লাস করেছিলাম। একটা মাইকেলীয় শব্দ লিখে বলেছিলেন– ‘প্রতিটি কাব্যে প্রকাশ হওয়ার পর ডিকশনারির লোকজন এসে নাকি বলতেন, ‘এই শব্দটা তো বাংলা শব্দকোষে নাই।’ মাইকেলের নাকি উত্তর হতো, ‘এখন থেকে থাকবে ! ‘ এই একটা কথা দিয়ে মাইকেলের স্পর্ধিত চেহারাটা ফুটিয়ে তুলতেন তিনি ।

৯০ই এর উত্তাল দিন !আমরা তখন নাসিম বানু ম্যাডাম , আজাদ স্যারের বাড়ি বাড়ি টিউশনিতে দৌড়াই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যার যে কতো বড়ো মাপের লেখক ছিলেন , মানুষ ছিলেন ; অতো কাছ থেকে দেখেও তা বোঝার মতো সামর্থ্য সেই নাবালক বয়সে যেমন ছিলনা , এখনও নেই !

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৩

দুই বন্ধুর পেয়ারা ভাগ অথবা ধোপার গাধার গপ্পো !

প্রথমটি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অগ্রজ ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম ভাইয়ের কাছে শোনা বছর তিরিশেক আগে।এর অনেকগুলো ভার্সন আছে। পেয়ারার জায়গায় ডিম, মাছ — বন্ধুর জায়গায় দুই ভাই , ইত্যাদি ইত্যাদি। উপাদানের পরিবর্তনে সমীকরণের মৌলিক কোন তফাৎ হয় না !

দুই ঢাকাইয়া হরিহর আত্মার দোস্ত, পল্টু আর বল্টু। দু’জনে সর্বদা সর্বত্র একসঙ্গে ওঠা-বসা-খাওয়াদাওয়া করে।
একদিন পল্টু একটা পেয়ারা নিয়ে এসে

বলল: দোস্ত এই ল সপরিআমটা ভাগ কর, দুইজন মিল্যা খাই।
বল্টু পেয়ারাটা হাতে নিয়ে ভাগ করে নিজে অর্ধেক রেখে, অর্ধেকটা পল্টুকে বাড়িয়ে
দিলো: এই লে দোস্ত , খা ।
পল্টু পেয়ারার টুকরোখানি হাতে নিয়ে অভিমানের সুরে বলল: দোস্ত, তোর কুনু ইনসাফ নাইক্যা …… ।
বল্টু বলল: ক্যালা দোস্ত, এই কথা কইলি ক্যান ?
পল্টু বলল: এই যে তুই আমটা ভাগ করলি, কমটা আমারে দিলি আর বেশিটা তুই নিলি ।
বল্টু বলল: আচ্ছা দোস্ত, তুই অইলে কি করতি ?
পল্টু বলল: ক্যান আমি কমটা লিতাম, তোরেই বেশিটি দিতাম।
বল্টু বলল: তাইতো করলাম, তয় এতো কথা কচ ক্যান্ ? খা বয়া বয়া !

ধোপার গাধার গপ্পো কবে, কখন , কার কাছে শুনেছিলাম মনে নেই। গল্পে কতো কিছুই তো হয়। “শিলা জলে ভাসি যায় বানরে সঙ্গীত গায় দেখিলেও না হয় প্রত্যয়॥” এই গল্পে গাধাও কথা বলে ; বিচার বিবেচনা আছে আর কী !

বহু বহুযুগ আগের কথা। এই বাংলার কোন এক গ্রামে ধোপা আছে, আছে তার গাধা।
ধোপা সারা গ্রামের কাপড় গাধাকে দিয়ে নদীর ঘাটে নেয়, কাচে শুকায়। নিজে ভাল খায়, কিন্তু গাধাটিকে কম খেতে দেয়। এদিক সেদিক করলে পিঠের উপর দুয়েক ঘা পড়ে।
তো, সেই গ্রামে একবার ডাকাত পড়ল। আর সবার মতো যৎসামান্য যা কিছু আছে তা নিয়ে নিয়ে ধোপা গাধার পিঠে করে পালাচ্ছে।
হাফাতে হাফাতে ক্লান্ত , পরিশ্রান্ত গাধা এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করল: মালিক আমরা দৌড়চ্ছি কেন ?
ধোপা: দৌড়াচ্ছি, কারণ ডাকাত পড়েছে, এরা আমাদের সবকিছু কেড়ে নেবে।
গাধা: আমার কি হবে?
ধোপা: তোকেও ওরা ধরে নিয়ে যাবে।
গাধা: তারপর?
ধোপা: তারপর তোকে দিয়ে সব ভারী ভারী কাজ করাবে। কাপড় কাচার জন্য ব্যবহার করবে। কম কম খেতে দেবে। এদিক সেদিক করলে পিঠের উপর দেবে কয়েক ঘা।
হাফাতে হাফাতে গাধা এক পর্যায়ে ব্রেক কষে বসল।
ধোপা: কি হলো রে , থামলি কেন ?
গাধা: আপনি ডাকাতের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালাচ্ছেন পালান, আমি পালাব না।
আপনি এখন আমাকে দিয়ে যা যা করাচ্ছেন, ডাকাতের হাতে পড়লে তো সেই একই দুরবস্থা, আমার কাছে দুইই সমান !

প্রকাশকালঃ ২রা ফেব্রুয়ারি,২০২০

নানা দর্শনের দোলাচল

একেক সময় একেক দর্শনে প্রভাবিত বা আক্রান্ত হয়েছি। একটা সময় গেছে সারারাত এটা ভেবে যে , পৃথিবীতে আমার মতো একটা অপদার্থের আদৌ কি প্রয়োজন ! “এই জীবন লইয়া আমি কি করিব?” টাইপ বঙ্কিমীয় চিন্তা!

একটা সময় গেছে , বিস্মিত হওয়ার ; একটা সময় গেছে, কবিতা পড়ার, কবিতা লেখার চেষ্টায়(!!!) । শিল্প সাহিত্য ছাড়া কেমন করে চলবে? আশে পাশে শিশ্নোদরপরায়ণ স্থূল সারিবদ্ধ প্রাণীদের থেকে নিজেকে একটু ব্যতিক্রম দেখতে চাওয়ার অপচেষ্টায় !!!

একটা সময় গেল প্রেমে পড়ার। পিছন ফিরে কোন মেয়ে একবার তাকালেও সারারাত তার চিন্তায় কেটে যায় !
একটা সময় গেল, নানারকম বই পড়ে। কৈশোরোত্তীর্ন প্রবল আবেগে যখন ভেসে যাচ্ছি, কোন এক উপন্যসে পড়লাম জীবনের সমাধান — “দুঃখেষু অনুদ্বিগ্নমনা , সুখেষু বীতস্পৃহ ।” সকল দুঃখে অনুদ্বিগ্ন থাকো, সুখের আশা করিস নারে পাগল ! ভাবলাম ,হ্যাঁ হ্যাঁ –এইটাই! এইটাই তো জীবনের দর্শন হওয়া উচিৎ ।

তাহলে এতো দুঃখ বেদনা আমাকে পীড়া দেবে না, সুখে আমি বীতস্পৃহ থাকবো। মহাজাগতিক ব্যাপার -স্যাপার আর কি !

কঠোর বাস্তবতার ধাক্কায় এক সময় বিস্ময় বোধ এমন কমে গেলো; নিজেকে নিজে বললাম ,যদি হঠাৎ কোন এক সকালে দেখি একটা পা ছাড়া আমি বিছানায় শুয়ে — মোটেও অবাক হবো না ! যাহ বাপ! একদিন দেখি, সত্যি সত্যি পা ভেঙ্গে বিছানায়। তিন চার মাস গেল হাসপাতাল আর ডাক্তার নিয়ে ।শেষ চিকিৎসা আশাবাদী হওয়ার ! নানারকম “ডেল কার্নেগী” পড়ে হুলুস্থুল !

একটা সময় গেল, ক্যারিয়ার নিয়ে বিভ্রান্তিতে।
কেটে যাচ্ছে এই জীবনটা , নানা দর্শনের দোলাচলে !

প্রকাশকালঃ জানুয়ারি,২০১৩

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) রঙ্গ

এপ্রিলে অফিসিয়ালি সারা ভারতে EVM চালু হওয়ার পরে কোলকাতার এক বন্ধু পাঠিয়েছিল !
পোলিং বুথ থেকে বেরোনোর পর একজন জিজ্ঞাসা করলেন…
” ভিতরে ফেলে এলেন, দাদা…”
দাদা বললেন …
“দূর মশাই, আমাদের কি ঐ ভাগ্য আছে ?…
ভিতরে ফেলতেন আমার বাপ ঠাকুরদা…
আমি তো খালি টিপে এলাম..।।”

নির্বাচন ও হরতাল রঙ্গ

প্রমিত বাংলায় ‘ লেবু বেশি কচলালে তিতা হয় ’- এর পূর্ববঙ্গীয় ভার্সন আছে ! আমাদের পদ্মাপারের কুষ্টিয়া , যশোর অঞ্চলে আমরা সেটাকে বলি ‘তেশ মারা’ ! ঢাকাইয়া ভাষায় ‘সোগা মারা খাওয়া’ এর কাছাকাছি অর্থ প্রকাশ করে !

কোন একটা সর্ব গ্রহণযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকে যখন অধিক কচলাকচলিতে একেবারে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয় ; তখন আফসোসের সুরে বলা হয়, ‘অমুক’ জিনিষের তেশ মারা সারা !

গত কয়েক বছরে দেশের রাজনীতিবিদরা ‘হরতাল-আন্দোলন’ এবং ‘নির্বাচন’ নামের জন-গুরুত্বপূর্ণ দুইটি বিষয়ের তেশ মেরে দিয়েছেন !

প্রকাশকালঃ ১লা ফেব্রুয়ারি ২০২০