টোনাকাহিনী( স্বাস্থ্য সচেতনতা )

চারিদিকে সহকর্মীদের হৃৎপিণ্ডের সাময়িক অকৃতকার্যতার প্রাদুর্ভাব দেখিয়া টোনা অকস্মাৎ স্বাস্থ্য-সচেতন হইয়া সান্ধ্য কালীন ভ্রমণ শুরু করিল। দিন কয়েকের মধ্যে যথারীতি আরও কয়েকজন বয়স্য হন্ঠন সহযোগী জুটিয়া গেল। ইহার ফাঁকে জনৈক পদচারী জানাইলেন, ‘ভাই টোনা আপনি তো নতুন আসিতেছেন। ওই যে দেখুন একজন সুশ্রী ভদ্রমহিলা হাঁটিয়া যাইতেছেন ; তিনি প্রত্যহ হাঁটিতে আসেন এবং খুব দ্রুতগতির সহিত হাঁটেন । আজ অবধি তিনি এক সন্ধ্যাও অনুপস্থিত হন নাই।’
ঘটনার ওইখানেই সমাপ্তি।

দিন দুয়েক পরের এক সন্ধ্যায়, কি মনে করিয়া টুনিও টোনার সহিত হাঁটিতে বাহির হইল। হা কপাল ! ওই মুহূর্তেই সেই সুশ্রী ভদ্রমহিলা সম্মুখ দিয়া হাঁটিয়া যাইতেছিলেন ! টোনা সরল মনে টুনিকে স্বাস্থ্য পরিচর্যায় উৎসাহিত করিবার নিমিত্তে কহিল, ‘ওই ভদ্রমহিলাকে দেখিতেছ ; উনি প্রত্যহ হাঁটিতে বাহির হন। আজ অবধি কেহ তাহাকে অনুপস্থিত হইতে দেখেন নাই!’

টুনি বাড়ি ফিরিয়া টোনাকে কহিল ‘ পুরুষ মাত্রই পুরুষ। তুমি এতো উৎসাহে প্রত্যহ সন্ধ্যায় কেন হাঁটিতে যাও তাহা আমার কাছে এখন জলের মতো পরিষ্কার। হাঁটিতে যাওয়া তোমার বাহানা মাত্র ; আসলে তুমি যাইতেছ সুন্দরী রমণী দর্শনে। আজ হইতে তোমার সান্ধ্য ভ্রমণ বন্ধ! যাইতে হইলে প্রত্যুষে বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের সহিত হাঁটিতে যাইবে!’

অতঃপর বিরসবদন টোনা গত কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া অতি প্রত্যূষে উঠিয়া প্রাতঃভ্রমণে বাহির হইতেছে!

পাদটীকা: জগতে অনেককিছুই ঘটিবে, সকল কিছু সরল বিশ্বাসে সহধর্মীনির কাছে প্রকাশ করিয়াছেন কি মরিয়াছেন। পুরুষদিগকে স্ত্রীলোকের নিকট আজন্ম অবিশ্বাসী ও অকৃতজ্ঞের কলঙ্ক-টীকা লইয়া বাঁচিয়া থাকিতে হয় ! ইহাই রীতি !

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৭

আহা জীবন!আহারে জীবন !!

গতকাল বিকেলে, প্রায় গোধূলি লগ্নে কিছুক্ষণের জন্য মহল্লার খোলা রাস্তায় হাঁটছিলাম। কয়েক সেকেন্ডের দেখা ; দুই লাজুক কিশোর কিশোরী আমার ঠিক বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসছিল। চারিদিকে চাইতে চাইতে ; সবার নজর বাঁচিয়ে একজনের কাঁধের সঙ্গে আরেকজনের কাঁধের মৃদু স্পর্শ হচ্ছিল। প্রতিটি অলৌকিক স্পর্শেই কেঁপে কেঁপে উঠছিল দুজনেই। অনুভূতির স্পর্শকাতরতা কতখানি বিস্ফোরক হলে ঐ কেঁপে ওঠা থাকে, তা আমি জানি। ঐ বয়স যে আমিও পার করে এসেছি !

‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে।
পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বাঁধে।।’

আহা জীবন ! আহারে জীবন !!

প্রকাশকালঃ ১৪ই ফেব্রুয়ারি,২০২০

বইপড়া, বইমেলা আর বইকেনা

২০১৫ সাল পর্যন্ত আমি আমার প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত রিক্রুটমেন্ট ইন্টারভিউয়ের বোর্ডে বসতাম। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ইউনিভার্সিটির সদ্য গ্র্যাজুয়েট তরতাজা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে ভালই লাগত। প্রাথমিক কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার পরে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিয়ে কথা বলার সময়ে দুটো প্রধান শ্রেণির মুখোমুখি হতাম। একদল ছিল, বিনয়ের সঙ্গে আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী যে স্যালারি স্ট্রাকচার আছে, সেটা জেনে দরকষাকষি করত। আরেকদল ছিলেন, যারা নিজেদেরকে বেশি মূল্যবান ভাবত অথবা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জন্য খুব বেশি বেতন চেয়ে বসত।

আমার মনে আছে, আমি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন করেছি, সেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে গেলাম। একজন আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, অন্য চাকুরিপ্রার্থীর চেয়ে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা , হেনতেন অনেক বেশি। আমার প্রতিষ্ঠানের অবশ্যই উচিৎ তাকে অন্যদের চেয়ে বেশি বেতন দেওয়া। আমি যে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, সেটা আমি তাকে প্রথমে বলিনি , সেও জানে না। তো , এক পর্যায়ে বললাম–আপনি দাঁড়িয়ে আছেন আপনার ১০ বছরের মাধ্যমিক আর ২ বছরের উচ্চমাধ্যমিকের ভালো ফলাফলের উপরে। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, গত ৪/৫ বছরে যতোখানি শেখার কথা ছিল গ্রাজুয়েশনে তার এক চতুর্থাংশও আপনি শেখেন নাই। আমাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর লেভেলের পড়াশোনা সম্পর্কে আমার মোটামুটি ভালো আইডিয়া আছে।

ক্যান্ডিডেট তখন গিয়ে বুঝতে পারল, আমার কথার যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো না। মূলত: স্নাতক লেভেলে সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাঁকির পরিমাণ সীমাহীন । সীমিত কয়েকজন ছাড়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থী সিনিয়রদের নোটের ফটোকপি আর নীলক্ষেতের বই ফটোকপির দোকানে দৌড়াদৌড়ি করে শিক্ষাজীবন শেষ করে।

বই পড়ার ব্যাপারে আমার হয়েছে তাই। আমি ক্লাস সিক্স থেকে শুরু করে ক্লাস টেন পর্যন্ত দস্যু বনহুর , সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা, ওয়েস্টার্ন, তিন গোয়েন্দা, কিশোর ক্লাসিকে ডুবে ছিলাম। এরপরে বন্ধুর বড়ভাইদের লাইব্রেরিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার,বুদ্ধদেব গুহ আর নিমাই ভট্টাচার্যের সঙ্গে পরিচয়। হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসগুলোর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো গোগ্রাসে গিলতাম। আমাদের বাসায় নিয়মিত ঈদসংখ্যা আর পশ্চিমবঙ্গের শারদীয় পূজা সংখ্যা রাখা হোত। সেই উপলক্ষে সমকালীন মোটামুটি সব লেখকদের লেখালেখির সঙ্গে পরিচয় হয় আমার।

স্কুল জীবন পার হয়ে , বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে পরিচয় কলেজ কর্মসূচির মাধ্যমে ; ৯০ সালের শেষের দিকে। তখন কেন্দ্রের বাছাই করা বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের কাছে শুনে শুনে আরো কিছু ক্লাসিক পড়ে ফেললাম। কলেজ কর্মসূচির পরে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের পড়ার অভ্যাস চালিয়ে যাওয়ার জন্য মৌলিক উৎকর্ষ নামের একটা ছোট পাঠচক্র চালালেন। আগের পড়া লেখকদের কারো কারো রচনার বিস্তৃত পড়া হল। যতদূর মনে আছে, ঐ মৌলিক উৎকর্ষে আমরা কয়েকজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসসমগ্র পড়ে ফেললাম। ঐ বয়সে রবীন্দ্রসঙ্গীত, কবিতা আর ছোটগল্পের সঙ্গে আর সবার যতোটুকু পরিচয়, আমাদেরও ততোটুকু। তারপরেও ১৭/১৮ বছরের কয়জনই বা রবীন্দ্রনাথের সবগুলো উপন্যাস পড়ে ফেলে ! অন্যদের চেয়ে একটু বেশি পড়া নিয়ে আমাদের বিস্ময় ছিল, ভালোলাগা ছিল।

তবে স্যারের সামনে আমরা ম্রিয়মান হয়ে থাকতাম । আমাদের সবাই স্যারের কথা শুনে ভাবতাম একজীবনে একজন মানুষের পক্ষে এতো বই পড়া কীভাবে সম্ভব ! বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের এতো এতো বই সায়ীদ স্যার কীভাবে পড়েছেন আবার সেই সব পঠিত বইয়ের শ্রেষ্ঠ লাইনগুলো কীভাবে মনেও রেখেছেন ! আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতাম , যেহেতু পাকেচক্রে আমারও কিছু ক্লাসিক পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এই ব্যাপারটা আমাদের ব্যাচের বন্ধুদের ভিতরেও ছিল। বেশি পড়া নিয়ে কোনরকম আত্মশ্লাঘা বা কম পড়াদের ব্যাপারে তাচ্ছিল্য ছিল না।

তবে শুনেছি, আমাদের পরবর্তী ব্যাচগুলোতে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। বাগান বড় হলে , বাগানে ফুল গাছের সঙ্গে সঙ্গে আগাছাও বাড়ে। এদেরই কারো কারো উন্নাসিকতা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ব্যাপারে অন্যদের একটা ভুল মেসেজ দিয়ে বসে। যাই হোক, সেটা হতেই পারে।

তো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পড়া নিয়ে আমার একটা স্মৃতি আছে। টেক্সটাইলে আসার আগে আমি কয়েক মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রিতে পড়েছিলাম। তো, কী কারণে যেন কয়েকজন বিজ্ঞান অনুষদের বন্ধুরা আড্ডা মারতে গেছি মধুর ক্যান্টিন বা তার আশেপাশে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল । আমি বোধহয় মৃদু ভাষায় কিছু একটা বলেছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের কুলীন ছাত্র-ছাত্রীদের কয়েকজন এমন করে আমার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকালো –মনে হল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপরে তাদেরই একচ্ছত্র অধিকার। বিজ্ঞানের ছাত্র , চিকিৎসক বা প্রকৌশলীদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে কথা বলাটা সমীচীন না ! এই অভিজ্ঞতা আমার নিতান্তই আংশিক অভিজ্ঞতা হতে পারে। ধরে নিচ্ছি, ভুল করে আমি কিছু কলাভবনের কিছু উন্নাসিকের আড্ডার মাঝে গিয়ে পড়েছিলাম, যারা আমাকে ব্রাত্য ভেবেছিল ।

যাই হোক ৯০ সালের আশেপাশের কয়েকবছরে আমি যে পরিমাণ বই পড়েছি তার এক দশমাংশও আমি গত কুড়ি বছরে পড়ি নি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে গেলাম ; চাকরিতে আরো কাহিল অবস্থা। স্থির হয়ে বই পড়ার অবকাশ কোথায় ? আমার যতদূর মনে পড়ে আমি এই সময়ে প্রতিবছরে বড়জোর হাতে গুণে ৪ থেকে ৫ টির বেশি বই পড়তে পারিনি।

শেষবারের মতো বাসা বদলেছি ২০১৫ সালের শুরুতে। ড্রয়িং রুমে নিজের মতো করে একটা বুকশেলফ করলাম। বইমেলায় গিয়ে নিজের পছন্দের বই কেনা শুরু করলাম। শুধু কেনাই হয়, পড়া হয় না কিছুই। দিন যায়, মাস যায় ; প্রতিবছর বইমেলা থেকে নতুন পুরনো লেখকদের বই কিনি। কন্যার জন্য লাইব্রেরিতে খাতা-কলম কিনতে গেলে হুট করে একটা দুইটা কিনি। বই কিনি , কিন্তু পড়ি না ! মূলত: আমার বইয়ের আলমিরায় বর্তমান বইগুলোর শতকরা ১০ভাগ বইও আমার পড়া হয়নি। আমার বইয়ের আলমিরা দেখে কারো যদি ধারণা হয় আমি এখনো অনেক পড়ি, তিনি ভুল ভাবছেন ; তার ভুল ধারণা ভেঙ্গে দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব।
২০২০ সালের এই বইমেলায় আমি বই কিনব কী কিনব না তাই নিয়ে দোলাচলে আছি। গত পাঁচ বছরের কেনা বইগুলোরই তো কিছু পড়া হয়নি।

২০১৬ সালের আগেও আমি মিরপুর থেকে উত্তরাতে আমার কর্মস্থলে আসতাম ৩০ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ বড়জোর ৬০ মিনিটে। মেট্রো রেলওয়ের কাজ শুরু হওয়ার পরে আমার জীবন হয়ে গেল বীভৎস ট্র্যাফিকময়। পুরো মিরপুর আর আমার চলাচলের পথে জায়গায় জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি । সপ্তাহের দুইএক দিন আগের মতোই হয়তো সময় মেনে যাওয়া আসা সম্ভব; বাকী চারদিন কখন , কোথায় এবং কেন কীভাবে আমাকে ঘণ্টাখানেক, ঘণ্টা দুয়েক জ্যামে বসে থাকতে হবে সেটার সদুত্তর দেওয়ার মতো কেউ এই ধরাধামে নাই !

এখন সারাদিন পরে ট্র্যাফিক ঠেলে ঠেলে রাতের খাবার ; কিছুটা সময় কন্যাদেরকে দেওয়ার পরে যখন একটা বই পড়া শুরু করি ; কয়েক পাতা পড়তে না পড়তেই ঘুমে ঢলে পড়ি । আবার নতুন ভোর আসে ; আবার সেই ট্র্যাফিক, অফিস আবার সেই রাত্রি করে বাড়ি ফেরা। বেসরকারি চাকরিতে সাপ্তাহিক ছুটি একদিন ; তাও আবার এরশাদের বদমাইশির জন্য রোববারে একার মতো একা। সেই একটা দিন নানা বাকী থাকা কাজ আর কন্যাদের স্কুল-কোচিং এ দৌড়াদৌড়ি করতে করতে কখন কেটে যায় বোঝা যায় না।

কেউ কেউ বলেছে, জ্যামে পড়লে বই খুলে বসতে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে গাড়ির ঝাঁকুনিতে আমি সামান্য দৈনিক পত্রিকাও পড়তে পারি না। কয়েক মিনিট পরেই মাথা ভোঁ ভোঁ করে। ঢাকা শহরের এই ট্র্যাফিকময় ব্যস্ত জীবনে বই পড়ার অবসর কোথায় সেটাই আমি বুঝে উঠতে পারছি না। সে ক্ষেত্রে শুধু শুধু অর্থের অপচয় করে বই কেনার দরকার কী সেটাই ভাবছি !

প্রকাশকালঃ ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( বস্ত্র-খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে কিছু কথা)

Sustainability, Sustainable Growth Rate, Organic Growth টেকসই বৃদ্ধি, টেকসই প্রযুক্তি কথাগুলো শুনছি ২০০৭-৮ এর বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে। তার আগে এই শব্দগুলো আমার কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি । আমার প্রাথমিক শিক্ষা বিজ্ঞান বিভাগে । পদার্থ , রসায়ন, গণিতের চক্র পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং। তারপরে ঘুরে ফিরে দেশের বৃহত্তম রপ্তানীমুখি বস্ত্রশিল্পের কেরানী !

টেকসই বৃদ্ধি কি , কেন , কিভাবে– সেটা একজন অর্থনীতিবিদের কাছ থেকে শোনার আকাঙ্ক্ষা আছে আমার। সে রকম কাউকে পাচ্ছি না আশে পাশে। কিন্তু আমি আমার অত্যল্প অভিজ্ঞতা দিয়ে , পরিপার্শ্ব দিয়ে, যেটুকু বুঝতে পারছি ,বোঝার চেষ্টা করছি– সেটা সবার সঙ্গে আলোচনা করতে দোষ কি !

আশা করছি এই আলোচনা চোখে পড়লে আমার বন্ধু তালিকার কেউ না কেউ বিষয়টিকে আরো জলবৎ তরল করে দিতে পারবেন।

ব্যবসায় টিকে থাকার অন্যতম প্রধানতম শর্ত হচ্ছে ব্যবসা-বৃদ্ধি। প্রতিবছর ব্যবসা বৃদ্ধির টার্গেট থাকতে হবে, সেটার অ্যাচিভমেন্ট থাকতে হবে। মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিবছর উৎপাদন বাড়তে হবে, কর্মচারীর বেতন সুবিধা বাড়াতে হবে ; পরিশেষে মালিকের মুনাফা বাড়তে হবে। এটি এতোই সহজবোধ্য একটা ব্যাপার, যে এই তত্ত্বের আর কোন বিকল্প থাকতে পারে, সেটা নিয়ে আমাদেরকে কেউ ভাবতে বলে নি। আমরা ভাবিও না ! শোনাকথা যেটুকু জানি, সাধারণত: ২০ থেকে ৩০ ভাগ ব্যবসা বৃদ্ধির টার্গেট থাকে মালিক-পক্ষের। তবে ১০ থেকে ১৫ ভাগ বৃদ্ধি হলেই বোঝা যায়, ব্যবসা লাভজনক রাস্তায় আছে। ব্যবসা বৃদ্ধির যথোপযুক্ত পন্থার সঙ্গে সঙ্গে গত কয়েকবছরে আরো কিছু শব্দের সঙ্গে আমি পরিচিতি হয়েছি। Breakeven , Depreciation Cost, Asset, Equity, Liability, Profit Margin, Business Expansion ইত্যাদি ইত্যাদি।

টেক্সটাইল ফ্যাক্টরী থেকে গার্মেন্টসে এসেছি প্রায় দেড়যুগ। গত আঠারো বছরে নানা মাপের গার্মেন্টস মালিকের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে। অনেকেই আমাকে তাঁদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সৌহার্দ্যের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অনেককে ছোট একটা কারখানা থেকে বৃহদায়তন কারখানায় উন্নীত হতে দেখেছি। গুটিকয়েক আছেন , যারা সুযোগ থাকা স্বত্বেও একটা নির্দিষ্ট আয়তনের বেশী উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ান নি।

দেড়যুগ আগেও গার্মেন্টস ব্যবসার লাভ চোখে পড়ার মতো ছিল। ১টি আমেরিকান ডলার বাংলাদেশের ব্যাংকে এসেই সেটা ৭০ গুন ৮০ গুণের টাকায় পরিণত হতে দেখে উদ্যোক্তার এগিয়ে এসেছেন। পর্যাপ্ত সস্তা শ্রম , গ্যাসের সাপ্লাই, জমি, পানির সহজলভ্যতা আমদের দেশে আছে বলেই নানাধরনের উদ্যোক্তারা তাঁদের পুঁজি ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই শিল্পে অংশ নিয়েছেন। বছর শেষের লাভের উদ্বৃত্ত টাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কারখানার মালিকরা তাঁদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছেন। বাড়াতে বাড়াতে কেউ কেউ এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন ; এখন তাঁরা না পারছেন সেটা গিলতে না পারছেন উগরাতে !

তাজরিন ফ্যাশানের ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ও রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি আমাদের পুরো গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিকে খোলনলচে বদলে দিয়েছে। ছোট মাপের যে কারখানাগুলো বিভিন্ন মার্কেটের শেয়ার বিল্ডিং এ ছিল, তা বন্ধ হয়ে গেছে ACCORD , ALLIANCE –এর ধাক্কায়। মাঝারি মাপের ( ৬ থেকে ১২ লাইনের) কারখানাগুলোকে অগ্নি নির্বাপণ, বিল্ডিং স্ট্রাকচার ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হয়েছে। এতে করে ছোটদের যদি ৭০ লক্ষ থেকে ১ কোটি বাড়তি খরচ লেগে থাকে বড়দের লেগেছে আরো অনেক অনেক বেশী।

ট্রাজেডি হচ্ছে, এতো কিছু করার পরেও ক্রেতাদের মনরক্ষা করা যাচ্ছে না। বৈশ্বিক চাহিদার পতন ( কয়েকবছরে বিশ্বজুড়ে টেক্সটাইল পণ্যের বিক্রয় প্রায় ৪% কমে গেছে) , ক্রেতাদের অন্তঃর্বতী প্রতিযোগিতা , বিশ্ব-মন্দা ; নানাবিধ কারণে ইউরোপ , আমেরিকায় গার্মেন্টস-এর খুচরা মূল্যের দরপতন হয়েছে। এবং সেটার মাশুল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে। জীবনযাত্রার মূল্য ও মান বৃদ্ধির ফলে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি আবশ্যকীয়। গার্মেন্টস-এর মূল উপাদান কাপড় ও অ্যাকসেসরিজ। বিশ্বব্যাপী গ্রিন আন্দোলনের ফলে চীন অনেক রঙ উৎপাদনের কারখানায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম গেছে বেড়ে। অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যেরও দাম বেড়েছে একই সঙ্গে। এর প্রভাবে উৎপাদিত কাপড় ও আমদানি করা কাপড়ের দাম ঊর্ধ্বমুখি । শেষের কয়েক সিজনে এতো মন্দ সংবাদের ভিতরে একমাত্র সুসংবাদ ছিল সুতার দামের স্থিতাবস্থা। সুতার সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা লম্ফঝম্প করতে পারছিলেন না ; কারণ বিশ্বব্যাপী তুলার দাম কমতির দিকে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে হুট করে কটন সুতার দাম ১০~ ১৫% বেড়ে গেছে। যার যুক্তিসঙ্গত কারণ কি ,সেটা কেউ বলতে পারছেন না !

মোদ্দা কথা গার্মেন্টস শিল্প প্রাথমিক বছরগুলোতে যে পরিমাণ লাভ করতে পেরেছে এখন তা করতে পারছে না ! কিন্তু আমাদের মালিকেরা এমনভাবে তাঁদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছেন ও করে চলেছেন যে তাঁদের বিশাল কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে খুব সস্তা দরের কাজ হলেও করতে হচ্ছে। খুচরা বিক্রয় মূল্যের সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে , প্রাইস কোটেশন কোনভাবেই মিলাতে পারছেন না কেউ। এখন আমাদের সবাইকে নজর দিতে বলা হচ্ছে , অপচয়ের পরিমাণ কমিয়ে, কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে, প্রোডাক্টিভিটি বাড়িয়ে নিজেদেরকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার চেষ্টা করতে।

আগের কথায় আসি ; যেহেতু আমাদের বস্ত্র-খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি আজকের আলোচ্য । গত তিন দশকে আমাদের বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা Sustainable Growth Rate-এ হয়েছে নাকি সেটা বা Organic Growth ছিল? এটা কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ। ১৫ বছর আগে যে মালিককে বলতে শুনেছি যে , তিনি ১২ লাইনের বেশী কারখানা বাড়াবেন না– পরে সেই মালিককেই দেখেছি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ১০০ লাইনের গার্মেন্টস করতে! আর উচ্চ-সুদে মুফতে পাওয়া মুদ্রার তারল্য নিয়ে বিপাকে পড়া ব্যাংকাররা আরো বেশী উচ্চ-সুদে মালিকদেরকে শিল্প ঋণ দিয়েছেন। মালিকরাও সহজলভ্য ঋণ পেয়ে নিজেদের Asset তো বাড়িয়েছেন, একই সঙ্গে বাড়িয়েছেন তাঁদের Liability !

২০১৪-১৫ সালে শীতবস্ত্রের বড় একটা পরিমাণ বাংলাদেশ থেকে চীনে সরে যায়। আমাদের সোয়েটার কারখানার মালিকরা হতবাক ! ম্যানুয়াল মেশিনের সোয়েটারে আমরা বিনা প্রতিযোগিতায় বেসিক অর্ডারগুলো করছিলাম। একই সঙ্গে প্রায় শতকরা আশি ভাগ মালিক জার্মান , জাপানি ও চীনের জ্যাকার্ড মেশিন নিয়ে এসে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। এতো কিছুর পরেও দেখা গেল, চীনের কিছু কারখানা আমাদের চেয়েও ৩০% বা ৫০% কম সিএম( Cutting & Making) দিয়ে অর্ডার নিয়ে গেছে। বাজারের খোঁজ (Market Information) থেকে দেখা গেল, চীনের কিছু এলাকার মালিকরা হয়তো নিজের পুঁজি ও ব্যাঙ্কের ঋণ নিয়ে কারখানা করেছেন। সেটা একটা নির্দিষ্ট উৎপাদন ক্ষমতার । বছর তিনেকের ভিতরে তাঁদের নিজের পুঁজি ও ঋণ Breakeven-এ পৌঁছে গেছে। তাঁদের জ্যাকার্ড নিটিং মেশিনগুলোর Depreciation/ অবচয় এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সে যদি শুধুমাত্র শ্রমিকের খরচ ও বিদ্যুৎ খরচ হিসাব করে তাঁর সিএম মূল্য খুবই কম দাঁড়ায়। অন্যদিকে আমাদের মালিকের মাথার উপরে আছে ১২ থেকে ১৮% সুদের ব্যাংক ঋণ। আমাদের কস্টিং চীনের ওই সব কারখানার কাছে মার খাচ্ছে। এবং গত কয়েকবছরে আমাদের সোয়েটারের সিএম কস্টিং হু হু করে নীচে নামাতে বাধ্য হয়েছি আমরা।

ব্যাংকার বন্ধুর সাথে কথা বলে যা বোঝা গেল, তাঁরা উদ্যমী মালিকদের উৎসাহ দিয়ে থাকেন, কারখানার ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করার জন্য। একই সঙ্গে মালিকদের ও ব্যবসার নিজস্ব কতগুলো সীমাবদ্ধতা আছে, যেখানে কারখানার ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করা ছাড়া উপায় থাকে না।

প্রথমত: মুনাফার টাকার সঙ্গে ঋণের সহজলভ্যতা যোগ করে আমাদের মালিকদের পক্ষে হুট করে কারখানার ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা তেমন দুঃসাধ্য কিছু নয়। তাই, কারখানা Breakeven মূল্যে পৌঁছানোর আগেই তাঁরা আরো বেশী ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে বসেন। তা ছাড়া এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা গার্মেন্টস। দ্বিতীয় কোন বিকল্প শিল্প নেই , যেখানে তাঁরা নিশ্চিন্তে ইনভেস্ট করতে পারেন।

দ্বিতীয়ত: অনেক ক্রেতাই কারখানা মালিকদের আরো বেশী উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য যুক্তিসংগত ও অযৌক্তিক উৎসাহ দিয়ে থাকেন। কিছু ক্রেতা আছে, যারা বড় কারখানা ছাড়া কাজ দিতে চায় না। বেশী লাভের আশায় মালিকরা তাঁদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেন।

তৃতীয়ত: একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে, ম্যানেজমেন্টের Overhead Cost নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছে যায়। যে ধরণের মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট দিয়ে একটা ১২ লাইনের কারখানা চালানো যায় ; ঠিক সেই একই ম্যানেজমেন্ট দিয়ে ৩০ লাইনের কারখানা চালানো যায়। Overhead Cost একই রেখে শুধু মেশিন আর অপারেটর বাড়ালেই চলে। এই ব্যাপারটি অনেক মালিককে উদ্বুদ্ধ করে অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে।

চতুর্থত: মালিক-পক্ষ চূড়ান্ত লাভক্ষতির হিসাব দূরে থাক ; নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে শুধুমাত্র উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে একটা লোভ কাজ করে। সামাজিক অবস্থানের একটা ব্যাপার স্যাপারও আছে, কে কতো বড় কারখানার মালিক ইত্যাদি ! অনেকাংশে দেখা যায়, মালিক যে দক্ষতার সঙ্গে ২০ লাইনের কারখানা চালাচ্ছেন। উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে গেলে , তিনি তাঁর মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে সেটা ম্যানেজ করতে হিমসিম খান। ফলশ্রুতিতে কারখানা অলাভজনক হয়ে যায় এবং সস্তা দরের কাজ করতে বাধ্য হন তিনি। অথবা ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে নিতান্তই আইনি ঝামেলা এড়াতে কারখানা চালিয়ে যান।

আমাদের শিল্পমন্ত্রী স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি-মুখী করার ব্যাপারে। আমাদের নিজেদের দক্ষতা, চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা, রাস্তা ঘাট, বিদ্যুৎ, গ্যাসের পর্যাপ্ততা আছে কিনা সেটা যাচাই-বাছাই করা জরুরী। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, যতোদিন যাবে আমরা বেশী মূল্যের গার্মেন্টস করব। আমাদের উচ্চমূল্যের / High End Garment Product তৈরি একটা বড় ভূমিকা রাখবে ৫০ বিলিয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে। তাছাড়া, সকল বড় কারখানার মালিকরাই, এখন অত্যাধুনিক মেশিন নিয়ে উৎপাদন বাড়াচ্ছেন। সকলেই অপচয় কমানোর দিকে নজর দিয়েছেন। ERP, Lean Method, Industrial Engineering প্রয়োগ করে সবাই কর্মদক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

সবকিছুর পরে, ২৭-২৮ বিলিয়নের রপ্তানি ১০~ ১৫% Organic Growth ধরে যদি ৪০ বিলিয়নেও পৌঁছায়, তাতেও আমাদের এই জনবহুল বাংলাদেশের আগামী কয়েক দশক বেশ ভালোই কাটবে।

শেষ করার আগে এই সেক্টরের এক বড়ভাইয়ের প্রয়োজনীয় রসিকতা মনে পড়ে গেল। সেই বড়ভাই আমাকে বলছিলেন, ‘শ্রমিকদের যে রকম নানা ধরণের ট্রেনিং দেওয়া হয়। সময় হয়েছে আমাদের কারখানার মালিকদেরকে বিশেষ ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা!’

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

তোতাকাহিনী।। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।
রাজা বলিলেন, “এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।”
মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, “পাখিটাকে শিক্ষা দাও।”

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।
পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।
সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি সে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।
রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, “শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।” কেহ বলে, “শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।”
স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।
পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, “অল্প পুঁথির কর্ম নয়।”
ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, “সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।”
লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।
অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করার ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, “উন্নতি হইতেছে।”
লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।
তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, “খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।”
কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, “ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।”
ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।”
জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।
দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্ফ। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।
ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!”
মহারাজ বলিলেন, “আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।”
ভাগিনা বলিল, “শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।”
রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমনসময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, “মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।”
রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, “ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।”
ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, “পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।”
দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।
এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।
কোতোয়াল বলিল, “এ কী বেয়াদবি।”
তখন শিক্ষামহলে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।
রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, “এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।”
তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।
কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়া রটাইল, “পাখি মরিয়াছে।”
ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, “ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।”
ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।”
রাজা শুধাইলেন, “ও কি আর লাফায়।”
ভাগিনা বলিল, “আরে রাম!”
“আর কি ওড়ে।”
“না।”
“আর কি গান গায়।”
“না।”
“দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।”
“না।”
রাজা বলিলেন, “একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।”
পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।
বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।