জীবনস্মৃতি । মৃত্যুশোক। রবীন্দ্র-রচনাবলী , খণ্ড ১৭ (বিশ্বভারতী , ১৩৫০)

ইতিমধ্যে বাড়িতে পরে পরে কয়েকটি মৃত্যুঘটনা ঘটিল। ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনোদিন প্রত্যক্ষ করি নাই। মা’র যখন মৃত্যু হয় আমার তখন বয়স অল্প। [{ সারদাদেবীর মৃত্যু, ১২৮১, ২৫ ফাল্গুন, [১৮৭৫, ৮ মার্চ]— র-কথা ]} অনেকদিন হইতে তিনি রোগে ভুগিতেছিলেন, কখন যে তাঁহার জীবনসংকট উপস্থিত হইয়াছিল তাহা জানিতেও পাই নাই। এতদিন পর্যন্ত যে-ঘরে আমরা শুইতাম সেই ঘরেই স্বতন্ত্র শয্যায় মা শুইতেন। কিন্তু তাঁহার রোগের সময় একবার কিছুদিন তাঁহাকে বোটে করিয়া গঙ্গায় বেড়াইতে লইয়া যাওয়া হয়— তাহার পরে বাড়িতে ফিরিয়া তিনি অন্তঃপুরের তেতালার ঘরে থাকিতেন। যে-রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতেছিলাম, তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, “ওরে তোদের কী সর্বনাশ হল রে!” তখনই বউঠাকুরানী [{ ↓কাদম্বরী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী↓]} তাড়াতাড়ি তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া ঘর হইতে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেলেন— পাছে গভীর রাত্রে আচমকা আমাদের মনে গুরুতর আঘাত লাগে এই আশঙ্কা তাঁহার ছিল। স্তিমিত প্রদীপে, অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না। প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপরে শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে-দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না;— সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না। কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর-দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন একেবারে এক-দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকরনার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না। বেলা হইল, শশ্মান হইতে ফিরিয়া আসিলাম; গলির মোড়ে আসিয়া তেতালায় পিতার ঘরের দিকে চাহিয়া দেখিলাম— তিনি তখনো তাঁহার ঘরের সম্মুখের বারান্দায় স্তব্ধ হইয়া উপাসনায় বসিয়া আছেন।

বাড়িতে যিনি কনিষ্ঠা বধূ [{ ↓কাদম্বরী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী↓]} ছিলেন তিনিই মাতৃহীন বালকদের ভার লইলেন। তিনিই আমাদিগকে খাওয়াইয়া পরাইয়া সর্বদা কাছে টানিয়া, আমাদের যে কোনো অভাব ঘটিয়াছে তাহা ভুলাইয়া রাখিবার জন্য দিনরাত্রি চেষ্টা করিলেন। যে-ক্ষতি পূরণ হইবে না, যে-বিচ্ছেদের প্রতিকার নাই, তাহাকে ভুলিবার শক্তি প্রাণশক্তির একটা প্রধান অঙ্গ;— শিশুকালে সেই প্রাণশক্তি নবীন ও প্রবল থাকে, তখন সে কোনো আঘাতকে গভীরভাবে গ্রহণ করে না, স্থায়ী রেখায় আঁকিয়া রাখে না। এইজন্য জীবনে প্রথম যে-মৃত্যু কালো ছায়া ফেলিয়া প্রবেশ করিল, তাহা আপনার কালিমাকে চিরন্তন না করিয়া ছায়ার মতোই একদিন নিঃশব্দপদে চলিয়া গেল। ইহার পরে বড়ো হইলে যখন বসন্তপ্রভাতে একমুঠা অনতিস্ফুট মোটা মোটা বেলফুল চাদরের প্রান্তে বাঁধিয়া খ্যাপার মতো বেড়াইতাম— তখন সেই কোমল চিক্কণ কুঁড়িগুলি ললাটের উপর বুলাইয়া প্রতিদিনই আমার মায়ের শুভ্র আঙুলগুলি মনে পড়িত;— আমি স্পষ্টই দেখিতে পাইতাম যে-স্পর্শ সেই সুন্দর আঙুলের আগায় ছিল সেই স্পর্শই প্রতিদিন এই বেলফুলগুলির মধ্যে নির্মল হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে; জগতে তাহার আর অন্ত নাই— তা আমরা ভুলিই আর মনে রাখি।

কিন্তু আমার চব্বিশবছর বয়সের সময় মৃত্যুর [{ ↓কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু, ১২৯১, ৮ বৈশাখ [১৮৮৪, ১৯ এপ্রিল]— রবীন্দ্র-জীবনী ১, পৃ ১৫০↓]} সঙ্গে যে-পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়েসের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়— কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। তাই সেদিনকার সমস্ত দুঃসহ আঘাত বুক পাতিয়া লইতে হইয়াছিল।

জীবনের মধ্যে কোথাও যে কিছুমাত্র ফাঁক আছে, তাহা তখন জানিতাম না; সমস্তই হাসিকান্নায় একেবারে নিরেট করিয়া বোনা। তাহাকে অতিক্রম করিয়া আর-কিছুই দেখা যাইত না, তাই তাহাকে একেবারে চরম করিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলাম। এমনসময় কোথা হইতে মৃত্যু আসিয়া এই অত্যন্ত প্রত্যক্ষ জীবনটার একটা প্রান্ত যখন এক মুহূর্তের মধ্যে ফাঁক করিয়া দিল, তখন মনটার মধ্যে সে কী ধাঁধাই লাগিয়া গেল। চারিদিকে গাছপালা মাটিজল চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা তেমনি নিশ্চিত সত্যেরই মতো বিরাজ করিতেছে, অথচ তাহাদেরই মাঝখানে তাহাদেরই মতো যাহা নিশ্চিত সত্য ছিল— এমন-কি, দেহ প্রাণ হৃদয় মনের সহস্রবিধ স্পর্শের দ্বারা যাহাকে তাহাদের সকলের চেয়েই বেশি সত্য করিয়াই অনুভব করিতাম সেই নিকটের মানুষ যখন এত সহজে এক নিমিষে স্বপ্নের মতো মিলাইয়া গেল তখন সমস্ত জগতের দিকে চাহিয়া মনে হইতে লাগিল, এ কী অদ্ভুত আত্মখণ্ডন! যাহা আছে এবং যাহা রহিল না, এই উভয়ের মধ্যে কোনোমতে মিল করিব কেমন করিয়া! [{ ↓তুমি কোথায় (ভারতী, ১২৯১ পৌষ), কড়ি ও কোমল, রচনাবলী ২ ‘পুষ্পাঞ্জলি (ভারতী, ১২৯২ বৈশাখ) এবং ‘প্রথম শোক’ (‘কথিকা’, সবুজপত্র, ১৩২৬ আষাঢ়), লিপিকা↓]}

জীবনের এই রন্ধ্রটির ভিতর দিয়া যে একটা অতলস্পর্শ অন্ধকার প্রকাশিত হইয়া পড়িল, তাহাই আমাকে দিনরাত্রি আকর্ষণ করিতে লাগিল। আমি ঘুরিয়া ফিরিয়া কেবল সেইখানে আসিয়া দাঁড়াই, সেই অন্ধকারের দিকেই তাকাই এবং খুঁজিতে থাকি— যাহা গেল তাহার পরিবর্তে কী আছে। শূন্যতাকে মানুষ কোনোমতেই অন্তরের সঙ্গে বিশ্বাস করিতে পারে না। যাহা নাই তাহাই মিথ্যা, যাহা মিথ্যা তাহা নাই। এইজন্যই যাহা দেখিতেছি না তাহার মধ্যে দেখিবার চেষ্টা, যাহা পাইতেছি না তাহার মধ্যেই পাইবার সন্ধান কিছুতেই থামিতে চায় না। চারাগাছকে অন্ধকার বেড়ার মধ্যে ঘিরিয়া রাখিলে, তাহার সমস্ত চেষ্টা যেমন সেই অন্ধকারকে কোনোমতে ছাড়াইয়া আলোকে মাথা তুলিবার জন্য পদাঙ্গুলিতে ভর করিয়া যথাসম্ভব খাড়া হইয়া উঠিতে থাকে— তেমনি, মৃত্যু যখন মনের চারিদিকে হঠাৎ একটা ‘নাই’-অন্ধকারের বেড়া গাড়িয়া দিল, তখন সমস্ত মনপ্রাণ অহোরাত্র দুঃসাধ্য চেষ্টায় তাহারই ভিতর দিয়া কেবলই ‘আছে’-আলোকের মধ্যে বাহির হইতে চাহিল। কিন্তু সেই অন্ধকারকে অতিক্রম করিবার পথ অন্ধকারের মধ্যে যখন দেখা যায় না তখন তাহার মতো দুঃখ আর কী আছে।

তবু এই দুঃসহ দুঃখের ভিতর দিয়া আমার মনের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে একটা আকস্মিক আনন্দের হাওয়া বহিতে লাগিল, তাহাতে আমি নিজেই আশ্চর্য হইতাম। জীবন যে একেবারে অবিচলিত নিশ্চিত নহে, এই দুঃখের সংবাদেই মনের ভার লঘু হইয়া গেল। আমরা যে নিশ্চল সত্যের পাথরে-গাঁথা দেয়ালের মধ্যে চিরদিনের কয়েদি নহি, এই চিন্তায় আমি ভিতরে ভিতরে উল্লাস বোধ করিতে লাগিলাম। যাহাকে ধরিয়াছিলাম তাহাকে ছাড়িতেই হইল, এইটাকে ক্ষতির দিক দিয়া দেখিয়া যেমন বেদনা পাইলাম তেমনি সেইক্ষণেই ইহাকে মুক্তির দিক দিয়া দেখিয়া একটা উদার শান্তি বোধ করিলাম। সংসারের বিশ্বব্যাপী অতি বিপুল ভার জীবনমৃত্যুর হরণপূরণে আপনাকে আপনি সহজেই নিয়মিত করিয়া চারিদিকে কেবলই প্রবাহিত হইয়া চলিয়াছে, সে-ভার বদ্ধ হইয়া কাহাকেও কোনোখানে চাপিয়া রাখিয়া দিবে না— একেশ্বর জীবনের দৌরাত্ম্য কাহাকেও বহন করিতে হইবে না— এই কথাটা একটা আশ্চর্য নূতন সত্যের মতো আমি সেদিন যেন প্রথম উপলব্ধি করিয়াছিলাম।

সেই বৈরাগ্যের ভিতর দিয়া প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও গভীররূপে রমণীয় হইয়া উঠিয়াছিল। কিছুদিনের জন্য জীবনের প্রতি আমার অন্ধ আসক্তি একেবারেই চলিয়া গিয়াছিল বলিয়াই, চারিদিকে আলোকিত নীল আকাশের মধ্যে গাছপালার আন্দোলন আমার অশ্রুধৌত চক্ষে ভারি একটি মাধুরী বর্ষণ করিত। জগতকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্য যে-দূরত্বের প্রয়োজন মৃত্যু সেই দূরত্ব ঘটাইয়া দিয়াছিল। আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার উপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম তাহা বড়ো মনোহর।

সেই সময়ে আবার কিছুকালের জন্য আমার একটা সৃষ্টিছাড়া রকমের মনের ভাব ও বাহিরের আচরণ দেখা দিয়াছিল। সংসারের লোকলৌকিকতাকে নিরতিশয় সত্য পদার্থের মতো মনে করিয়া তাহাকে সদাসর্বদা মানিয়া চলিতে আমার হাসি পাইত। সে-সমস্ত যেন আমার গায়েই ঠেকিত না। কে আমাকে কী মনে করিবে, কিছুদিন এ-দায় আমার মনে একেবারেই ছিল না। ধুতির উপর গায়ে কেবল একটা মোটা চাদর এবং পায়ে একজোড়া চটি পরিয়া কতদিন থ্যাকারের [{১↓Thacker Spink & Co.↓]} বাড়িতে বই কিনিতে গিয়াছি। আহারের ব্যবস্থাটাও অনেক অংশে খাপছাড়া ছিল। কিছুকাল ধরিয়া আমার শয়ন ছিল বৃষ্টি বাদল শীতেও তেতালায় বাহিরের বারান্দায়; সেখানে আকাশের তারার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হইতে পারিত এবং ভোরের আলোর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের বিলম্ব হইত না।

এ-সমস্ত যে বৈরাগ্যের কৃচ্ছ্রসাধন তাহা একেবারেই নহে। এ যেন আমার একটা ছুটির পালা, সংসারের বেত-হাতে গুরুমহাশয়কে যখন নিতান্ত একটা ফাঁকি বলিয়া মনে হইল তখন পাঠশালার প্রত্যেক ছোটো ছোটো শাসনও এড়াইয়া মুক্তির আস্বাদনে প্রবৃত্ত হইলাম। একদিন সকালে ঘুম হইতে জাগিয়াই যদি দেখি পৃথিবীর ভারাকর্ষণটা একেবারে অর্ধেক কমিয়া গিয়াছে, তাহা হইলে কি আর সরকারি রাস্তা বাহিয়া সাবধানে চলিতে ইচ্ছা করে। নিশ্চয়ই তাহা হইলে হ্যারিসন রোডের চারতলা-পাঁচতলা বাড়িগুলা বিনা কারণেই লাফ দিয়া ডিঙাইয়া চলি এবং ময়দানে হাওয়া খাইবার সময় যদি সামনে অক্টর্লনি মনুমেণ্ট্‌টা আসিয়া পড়ে তাহা হইলে ওইটুকুখানি পাশ কাটাইতেও প্রবৃত্তি হয় না, ধাঁ করিয়া তাহাকে লঙ্ঘন করিয়া পার হইয়া যাই। আমারও সেই দশা ঘটিয়াছিল— পায়ের নিচে হইতে জীবনের টান কমিয়া যাইতেই আমি বাঁধা রাস্তা একেবারে ছাড়িয়া দিবার জো করিয়াছিলাম।

বাড়ির ছাদে একলা গভীর অন্ধকারে মৃত্যুরাজ্যের কোনো-একটা চূড়ার উপরকার একটা ধ্বজপতাকা, তাহার কালো পাথরের তোরণদ্বারের উপরে আঁক-পাড়া কোনো-একটা অক্ষর কিংবা একটা চিহ্ন দেখিবার জন্য আমি যেন সমস্ত রাত্রিটার উপর অন্ধের মতো দুই হাত বুলাইয়া ফিরিতাম। আবার, সকালবেলায় যখন আমার সেই বাহিরের পাতা বিছানার উপরে ভোরের আলো আসিয়া পড়িত তখন চোখ মেলিয়াই দেখিতাম, আমার মনের চারিদিকের আবরণ যেন স্বচ্ছ হইয়া আসিয়াছে; কুয়াশা কাটিয়া গেলে পৃথিবীর নদী গিরি অরণ্য যেমন ঝলমল করিয়া ওঠে, জীবনলোকের প্রসারিত ছবিখানি আমার চোখে তেমনি শিশিরসিক্ত নবীন ও সুন্দর করিয়া দেখা দিয়াছে।

বাংলা প্রবাদ ও প্রবচন সম্পাদনাঃ সুবলচন্দ্র মিত্র

আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর কেন ।

আদা জাহাজে করিয়া বিদেশে রপ্তানী হয় না; স্থানীয় হাটে বাজারেই খরিদ বিক্রয় হয়। সেইজন্য আদা ব্যবসায়ীর জাহাজের খবর জানিবার কোন প্রয়োজন নাই। অনধিকারচর্চাস্থলে এই প্রবাদ প্রযুক্ত হয়। “ The Cobbler must stick to his last.” Or “ Let the Cobbler(মুচি) stick to his last.”

আহার নিদ্রা ভয়, যত বাড়াও তত হয়।

আহার , নিদ্রা ও ভয় ইহাদিগকে যত বাড়াইবে ততই বাড়িবে।

উড়ো খৈ গোবিন্দায় নমঃ ।

বাতাসে খৈ উড়িয়ে নিয়ে যাইতেছে, তাহা আর সংগ্রহ করিবার উপায় নাই দেখিয়া সেইগুলি গোবিন্দায় নমঃ বলিয়া দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করিয়া দিল। প্রতিকূল অবস্থায় পড়িইয়া বাধ্য হইয়া কোন সৎ কার্য করা। “ Making a virtue of necessity ”

উসকো মাটিতে বিড়াল হাগে।

নরম লোক পাইলে সকলেই তাহার উপর আধিপত্য প্রকাশ করে।

হিন্দিতে আছে, বিল্লি শাক্‌তি পার নেহি হাগ্‌তি।

এক যাত্রার পৃথক ফল।

একসঙ্গে একই কার্য আরম্ভ করিয়া একজনকে যদি পুরস্কৃত এবং অপরজন যদি তিরস্কৃত হয়, তাহা হইলে তাহাদের এক যাত্রায় পৃথক ফল বলা হয়।

এঙ যায়, ব্যাঙ যায়,

খোল্‌সে বলে আমিও যাই।

চ্যাং মাছ ও ব্যাঙকে লাফাইতে দেখিয়া খোল্‌সে মাছও সেইরূপ লাফ দিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু কৃতকার্য হইল না। যে যে কাজ করিতে অক্ষম, সমর্থ অপরের অনুকরণ করিতে গিয়া সে সকলের হাস্যভাজন হয়।

 

[ প্রকাশকালঃ ৫ই জুন, ২০১৫ ]

ভার্চুয়াল জীবন ও চার আনার শিক্ষা

ছোট্ট দুইটা গল্প বছর ত্রিশেক আগে শোনা। স্মৃতি থেকে লিখছি। অনেকেরই মূল গল্পদু’টো হয়তো আরেকটু ভাল করে জানা আছে ।

গল্প ১ :

বহুদিন আগের কথা , সমাজে টোল ছিল , পাঠশালা ছিল, পণ্ডিতও ছিল। এবং নদী পার হওয়ার একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। এখন অনেক নদী ও খালই হেঁটে পার হওয়া যায় ।

তো একদিন এক পন্ডিত নৌকায় নদী পার হচ্ছিলেন । নিজের পান্ডিত্য জাহির করতে অক্ষরজ্ঞানহীন মাঝিকে জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন,

: মাঝি তুমি কি ত্রিকোণমিতি জানো?

: নাহ্‌।

:তবেতো তোমার জীবনের চার আনাই মিছে।

: তুমি মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু বলতে পারো?

: না তো।

: তবেতো তোমার জীবনের আট আনাই মিছে।

: তুমি কি পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন সম্পর্কে ধারণা আছে ?

: এগুলো কি খায় নাকি গায়ে মাখে বাবু সাব?

: তোমারতো দেখি জীবনের বারো আনাই বৃথা !

এমন সময় নদীতে ঝড় উঠলো । বড় বড় ঢেউ এসে নৌকায় আঘাত করা শুরু করলো। পন্ডিতও ডুবে মরার শঙ্কায় থরথর করে কাঁপতে লাগল।

দূরাবস্থা দেখে মাঝি বললো, বাবু সাব আপনি কি সাঁতার জানেন?

: না। সাঁতারতো জানিনা।

মাঝি হাসি দিয়ে বললেন, জনাব! আপনার দেখি জীবনের ষোল আনাই মিছে !

গল্প ২ :

খেয়া নৌকারও আগের কথা। নদী পার হওয়া নিশ্চয়ই আরো ঝক্কির ছিল। নির্দিষ্ট সময় ছাড়া জনমনিষ্যিহীন শূন্য ঘাট পড়ে থাকতো । নদীর পাশে কোন এক জনপদে একদল সন্ন্যাসী বাস করত। একজন সদগুরুও ছিলেন। অনেক শিষ্যের মাঝে একনিষ্ঠ এক শিষ্য সাধনায় গুরুকেও প্রায় হার মানিয়ে দিল।

দীর্ঘ একযুগের সাধনার পরে শিষ্য এসে গুরুকে বললো, গুরু আমি এখন সাধনার বলে পানির উপরে হাঁটতে পারি, হেঁটে নদী পার হতে পারি।

শিষ্য পরিবেষ্টিত গুরু উল্টো প্রশ্ন করলেন , নদী পার হতে কয় আনা লাগে রে ?

: চার আনা।

: বারো বৎসরের সাধনায় তুই মাত্র চার আনার শিক্ষা অর্জন করলি !

ফুটনোট : গুরু সৈয়দ মুজতবা আলী বলে গেছেন, হাতির দু’ই রকম দাঁত থাকে, একটা দেখানোর আরেকটা খাওয়ার ! অনেক গল্পের দ্বৈত অর্থ থাকে। উপরের গুলোরও হয়তো আছে, হয়তো নেই !

চর্যাপদ, নেপাল , বাংলাভাষা ও আমরা:

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে নেপালের রয়েল লাইব্রেরী থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি আধুনিক লিপিতে প্রকাশিত হয় ‘হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায়।

এর রচনাকাল সম্পর্কে মতভেদ আছে। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ৬৫০ খ্রীস্টাব্দে আর ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ৯৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এর পদগুলো রচিত হয়। সুকুমার সেন সহ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব পন্ডিতই ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সমর্থন করেন।

অনেকে বলেন , চর্যাপদের রচনাকাল সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী।তা না থাকলে দশম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে চর্যাপদের ভাষার নাম – সন্ধ্যা ভাষা বা আলো- আঁধারি ভাষা।

যেহেতু , চর্যাপদের ভাষা অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য। সেই কারণে চর্যায় ব্যবহৃত ভাষাকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন ‘সন্ধ্যাভাষা ’। তাঁর মতে, “সহজিয়া ধর্মের সকল বই-ই সন্ধ্যা ভাষায় লেখা। সন্ধ্যা ভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিকটা বুঝা যায় না। অর্থাৎ, এই সকল উঁচু অঙ্গের ধর্মকথার ভিতরে একটা অন্য ভাবের কথাও আছে। সেটা খুলিয়া ব্যাখ্যা করিবার নয়। যাঁহারা সাধনভজন করেন তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই। ”

সুনীতিকুমার ১৯২৬ সালে ‘Origin and Development of the Bengali Language'(ODBL) গ্রন্থ রচনা করে চর্যাপদকে বাংলা সাহিত্যের বলে প্রমাণ করেন।

৩৩ নং পদে আবহমান বাঙালির চিরায়ত দারিদ্র্যের ছবি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। যেমনঃ

টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী

হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।।

আধুনিক বাংলায় : “লোক শূণ্য স্থানে প্রতিবেশীহীন আমার বাড়ি / হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রেমিক এসে ভিড় করে।”

চর্যার (তেত্রিশ নং) পদটির চরয়িতা মতভেদে ‘ঢেণ্ডণপা’ অথবা ‘ভুসুকুপা’ । ঢেণ্ডণপার জন্মস্থান অবন্তিনগরের উজ্জয়িনীতে। তার জীবৎকাল ৮৪৫ সালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তার আসল নাম হল ঢেণ্ঢস। খ্রিষ্ট্রীয় নবম শতকে তিনি বর্তমান ছিলেন। এক্ষেত্রে বলা যায় তিনি দেবপাল-বিগ্রহপালের সমকালে ছিলেন। ঢেণ্ডণপা মূলত তাঁতি এবং সিদ্ধা ছিলেন। তার পদে বাঙালি জীবনের চিরায়ত দারিদ্রের চিত্র পাওয়া যায়।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে উপরের পদটির রচয়িতা ছিলেন ‘ভুসুকপা’ । ভুসুকপা ছিলেন পূর্ববঙ্গের লোক। তাঁর রচিত ৪৯ নং পদে পদ্মা (পঁউআ) খালের নাম আছে, ‘বাঙ্গাল দেশ’ ও ‘বাঙ্গালী’র কথা আছে। তাঁর রচিত পদসমুহের মাঝে বাঙালি জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। ভুসুকপা রচিত অতিপরিচিত একটি পদঃ অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।।

[ প্রকাশকালঃ ১২ই মে, ২০১৫ ]

পুনশ্চঃ বস্ত্রকথা ( জুন,২০১৫)

বছর দশেক আগে ট্রেডের এক বড়োভাইয়ের সাথে তৈরী পোশাকশিল্পের আশা নিরাশা ও বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে কথা হচ্ছিল। উনি আমার মতোই সাংঘাতিক আশাবাদী মানুষ। বললেন, বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে যাচ্ছে জাহিদ।একটা উদাহরণ দিয়ে উনি বোঝালেন, ‘আশির দশকে আমরাতো সবাই ছাত্র ছিলাম। চিন্তা করেনতো , সেই সময় রাত দশটা-এগারোটার পরে ঢাকার রাস্তার চেহারা কেমন ছিল?’

আমি বললাম, ‘কেমন আর ছিল, অনেকটা মফঃস্বলের মতো বারোটা না বাজতেই সুনসান ঢাকার রাস্তা!’ উনি জিজ্ঞাস করলেন, ‘এখন কী রকম? অনেক পরিবর্তিত না ? আজ আপনি গভীর রাতে ঢাকার রাস্তায় বের হন, বাসে , ট্রাকে টেম্পোতে অনেক লোকের আনাগোনা দেখবেন। এবং এঁরা কোন না কোনভাবে তৈরী পোশাকশিল্পের সাথে জড়িত। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে ২৪ ঘণ্টা অনেক লোকের হাড় ভাঙা খাটুনি ! এই দেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে প্রতিযোগিতা করে পোশাকশিল্পকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছে ! যে দেশের লোকজন এইরকম পরিশ্রম করছে, সেই দেশ এগিয়ে যাবেই যাবে, দেইখেন আমাদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’

মাঝে মাঝে গার্মেন্টস মালিকদের সাথে কথা হয়। অনেকেই বিকল্প কোন সেক্টরের কথা চিন্তা করতে বলেন বা জিজ্ঞাসা করেন , অন্যকোন ব্যবসা ক্ষেত্র আছে কীনা । ৯০ এর দশকের কোটা কেনাবেচার আমলে গার্মেন্টসের ব্যবসায় রমরমা লাভ ছিল, আজ বড়ো বড়ো সব গ্রুপগুলো কোটার ব্যবসা করে শত শত লাইনের আর ডজন ডজন বিল্ডিং এর মালিক। দুই ডলার যদি সিএম( কাটিং মেকিং কস্ট ) থাকতো, কোটা থেকে পেতেন কুড়ি ডলার । যারা সেই আমলের গার্মেন্টস ব্যবসা করেছেন তারা জানেন কী পরিমাণ লাভ তারা করেছে ! কিন্তু পরের যুগের গার্মেন্টস উদ্যোক্তারা যে কত রকম সীমাবদ্ধতার মাঝখান দিয়ে এই সেক্টরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন , সেটা আমরা কাছ থেকে অনেকেই দেখছি।

আমাদের আসলেই একটা বিকল্প ক্ষেত্র দরকার! এই একরৈখিক একমাত্রিক পরনির্ভরতা আমাদেরকে নীদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমা ক্রেতারা জানে, এই তৈরী পোশাক খাতে যারা বড়ো বড়ো বিনিয়োগ করে বসে আছেন তাঁদের অর্ডার দরকার। অনেকে শুধুমাত্র পেটেভাতে দাম মিললেও অর্ডার নিয়ে নেন। এইটাকে আমরা বলি ব্রেক ইভেন কস্ট( Break Even Cost) -এ অর্ডার নেওয়া । ফ্লোর বসিয়ে রাখলে যে ক্ষতি , সস্তার অর্ডার নিয়ে ফ্লোর চালালে অন্তঃত আর্থিক ক্ষতিটা কম । এ এক দুর্ভেদ্য দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে গেছেন তারা। আবার নতুন উদ্যোক্তারা। ১৮% সুদে ব্যাংক লোন নিয়ে, সস্তার কাজ নিয়ে ন্যূনতম লাভ তুলতে পারছেন না।

অঙ্কের হিসাব-নিকাশের বাইরে ক্রেতাদের সাথেও ক্যাজুয়াল কথা বার্তা হয় মাঝে সাঝে। যারা ফ্যাশন ক্রেতা(Fashion Retail) তারাও হুমকির মুখে আছে কিছু ডিসকাউন্টারের অতি মূল্যহ্রাসের দুষ্টচক্রে। যে ফ্যাশন ক্রেতা, সে হয়তো ৫০০০ টি-শার্ট নিবে। সে ২.৫ বা ৩ ইউএস ডলার এফওবি(FOB) দিয়ে কিনে ৯ বা দোকানভেদে ১৫ ইউরোতে বিক্রি করবে। তাঁদের প্রাথমিক লভ্যাংশ ৫৫ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ ভাগ থাকে। পরে সেল ও অফ সিজন ধরে দোকান খরচ দিয়ে পুষিয়ে যায় । কিন্তু, ডিসকাউন্টাররা ওই একই টি- শার্ট ৫ লক্ষ পিস নিবে। সে কিনতে চাবে , ১.৫০ ডলারে, এখন সে যদি চায় কম লাভ , তবে ওই একই টি-শার্ট রিটেল মার্কেটে সে ইচ্ছা করলেই দেড় থেকে দুই ইউরোতে বিক্রি করতে পারবে। সে কোন মার্কআপ রাখবে না। বড়ো বড়ো গ্রসারি ডিসকাউন্টার Wal-Mart, Primark, LIDL, TCHIBO, TESCO, ALDI এদের প্রধান পন্য কিন্তু পোশাক নয়, এরা মূলতঃ গৃহস্থালি পণ্য, শাক-সবজী, খাদ্যদ্রব্য, পানীয়ের ফাঁকে হাজারহাজার দোকানে সস্তার টি-শার্ট বিক্রি করছে নামমাত্র মূল্যে। এদের সাথে তাল মিলিয়ে INDITEX, H&M ক্রেতা আকর্ষন করতে ডলারে কিনে সমমূল্যের ইউরোতে পোশাক বিক্রি করছে। মানে, ২ ডলারে টি-শার্ট কিনে , ২ ইউরোতে বিক্রি করে ক্রেতা আকৃষ্ট করছে। মাঝখানে বিপদে পড়ে গেছে ওই মাঝারি মাপের ফ্যাশন রিটেলগুলো, যারা অনেক ডিজাইনার রেখে অনেক গবেষণা করে একটা টি শার্ট ৯ বা ১৫ ইউরোতে বিক্রি করতে চায়। দরিদ্র হিস্পানিক ও এশিয়ান ইমিগ্রান্টরা হন্যে হয়ে Wal-Mart, K-Mart, TESCO, PRIMARK এ ছুটে যাচ্ছে। Wal-Mart এরEveryday Low Price থিওরীর চক্করে পড়ে নাভিশ্বাস উঠছে আমাদের পোশাক প্রস্তুতকারীদের।

ওইদিকে আমেরিকা আর এইদিকে ইউরোপের মধ্যে জার্মানী আমাদের অন্যতম বৃহৎ তৈরী পোশাকক্রেতা দেশ। এদের বেশ কিছু নাম করা ডিসকাউন্টার আছে যাদের দোকানের সংখ্যা দশ হাজার, বারো হাজার মায় কুড়িহাজারপর্যন্ত আছে। পাড়ার মোড়ে মোড়ে এদের দোকান। বছরখানেক আগে , কী মনে করে আমেরিকা ও জার্মানী দুই দেশেরই কয়েকটা ডিসকাউন্টারের বড়ো বড়ো দোকান ঘুরে দেখার সুযোগ মিললো।

প্রথমে আসি , ওয়ালমার্টের কথায়। এদের কিছু সুপার শপ আছে। এইপাশ থেকে ওইপাশ দেখা যায় না। টয়লেট পেপার থেকে শুরু করে গাড়ীর চাকা পর্যন্ত বিক্রি করে। কতো সস্তায় এরা পণ্য বিক্রি করছে, উদাহরণ দিয়ে বুঝাই। বাইরে ৫০০ মিলির একই ব্রান্ডের এক বোতল পানি হয়তো দেড় দুই ডলার। কিন্তু , সুপারশপে আপনি যদি এক সঙ্গে ২৪ টার এক ক্রেট পানি কেনেন তবে ক্রেটের দাম ৫ ডলার মানে প্রতি পিস পড়ছে ২০ সেন্ট ! ক্যাম্নে কী !

এইবার আসেন জার্মানীতে, বাইরে এক বোতল ওয়াইনের দাম ১৫ ইউরো। কিন্তু, সুপার শপে ৬টা এক সাথে কিনলে, ৪০ ইউরো। দেখলাম , একটা গ্যাস লাইটারের বাইরে দাম ১ বা দেড় ইউরো , কিন্তু এরা ১২ টা একসাথে বিক্রি করছে ১.৭৫ ইউরোতে মানে একটার দাম ১৫ সেন্টের কাছাকাছি !

একটা গ্যাস লাইটারের উৎপাদন খরচ চীনে কতো হতে পারে, আর জার্মানী পর্যন্ত এনে কেমন করে এই দামে বিক্রি করছে, সেটা বড়ো কোন গবেষণার বিষয় না। আপনি নিজেই হিসাব করতে পারবেন। ধরেন ওই গ্যাস লাইটার চীন থেকে ৫০০০ পিস কিনলে আপনি যে দামে পেতেন, তার এক দশমাংশ দামে পাবেন , যদি আপনি পঞ্চাশ লক্ষ গ্যাস লাইটার কেনেন একসাথে । সেক্ষেত্রে একটি গ্যাস লাইটারের দাম ৩ বা ৪ সেন্ট করে পড়বে! সস্তায় ভোগপণ্য দেওয়ার প্রতিযোগিতায় এই ডিসকাউন্টারগুলো যে ভয়ংকর দুর্ভেদ্য দুষ্টচক্র তৈরি করেছে , সেটা ভাঙ্গার কোন লক্ষণ দেখছি না।

আর সাদা চামড়ার ওই সব খুচরা ক্রেতাদের কথা বলছেন, তারা সোফায় বসে টিভিতে বাংলাদেশের তাজরীন বা রানা প্লাজার কথা শুনে একটু উহু আহা করবে হয়তো। কিন্তু পরের দিন ভোরে উঠেই ছুটবে সেই সস্তার দোকানেই !