কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন (দুর্বলের কাছে সাহায্য না চাওয়াই ভালো)

ছোটবেলা থেকে নানারকম ঈশপের গল্প শুনতে হয়েছে। কিছু মনে আছে , বেশীরভাগই এমনভাবে ভুলেছি, হয়তো গল্পটি মনে আছে- কিন্তু গল্পের মর্মার্থ বা মোরালটা কিছুতেই মনে করতে পারি না। এই গল্পটা কর্পোরেট লাইফের সঙ্গে যায়। স্মৃতি থেকে লিখছি। কেউ মূল গল্পটি পেলে ইনবক্স করলে কৃতজ্ঞ থাকব।

হয়েছে কি, একবার এক শেয়াল রাতের বেলা শিকারে বের হয়েছে। মহল্লা ও গৃহস্থবাড়ীগুলো ঘুরে ঘুরে খেয়েছে কুকুরের তাড়া। হাচরেপাচরে সে কোন একটা বাড়ীর উঁচু দেয়ালের উপর দিয়ে দৌড় দিয়ে পালাচ্ছিল। সেই সময়ে পা গেল পিছলে !

উঁচু দেয়াল থেকে পড়ে যাবার আগের মুহূর্তে সে দেয়ালের গায়ের ঝুলে থাকা লতাগাছকে জড়িয়ে ধরল। তাৎক্ষণিক বিপদমুক্তি ঘটলেও কিছুক্ষণের মধ্যে সে টের পেল যে লতাটা সে আশ্রয়ের জন্য জড়িয়ে ধরেছে সেটার গায়ে কাঁটা আর কাঁটা !

সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতে ঝরতে শেয়াল লতাগুল্মকে হতাশার সঙ্গে বলল, ‘আমি একটা বিপদে পড়ে তোমার সাহায্য নিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে সাহায্য করা তো দূরে থাক বরং আমার সারা গাঁয়ে কাঁটা বিঁধিয়ে রক্তাক্ত করে দিলে। এই কি মহানুভবতার নিদর্শন ?’

লতাগাছ দুঃখ প্রকাশ করে বলল, ‘আমি জানি তুমি আমার সাহায্য নিয়েছ দায়ে পড়ে। কিন্তু দয়া করে তোমার এই দুরবস্থার জন্য আমাকে দায়ী কোর না। আমার সাহায্য নেওয়ার আগে তোমার নিজের জানা উচিৎ ছিল যে, আমি নিজেই আশ্রয়ের জন্য দেয়ালের গায়ে ঝুলে আছি। আমি নিজেই যেখানে পরনির্ভরশীল সেখানে আমি কি করে তোমার সাহায্যে আসব ?’

মোরাল অভ দি স্টোরিঃ
আপনার কর্মক্ষেত্রে এমন কারো কাছে সাহায্য চাইবেন না , যিনি নিজেই পরনির্ভরশীল , দুর্বল কিংবা বিপদে আছেন । সাহায্য চাইতে হলে শক্তিশালী কারো কাছে চান। তাঁর পিছনে গিয়ে দাঁড়ান। এই ধরেন , আমার কাছে কেউ সাহায্য চাইতে আসলে আমি ঈশপ ভাইয়ের এই গল্পটা শুনিয়ে দিই। আর আপনি যদি আত্মশক্তিতে ভরপুর হয়ে থাকেন , তাহলে নিজেই একটা আলাদা লাইন তৈরী করুন। অমিতাভ বচ্চন আমার প্রিয় অভিনেতা। ‘কালিয়া’ ছবিতে একটা বিখ্যাত লাইন আমার খুব ভাল লাগে। “হাম জাহা পে খাড়ে হো যাতে হ্যাঁই, লাইন ওহি সে শুরু হোতি হ্যায় !” ( আমি যেখানে দাঁড়িয়ে পড়ি ; লাইন ওইখান থেকেই শুরু হয় ! )[ অমিতাভ বচ্চন; কালিয়া ]

প্রকাশকালঃ ২৫শে অক্টোবর, ২০১৬

কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন ( ঈশপের খরগোশ ও কচ্ছপের গল্প )

বছর তিনেক আগে দেশের বাইরে ট্রেডের এক বড়ভাইয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গ কিছু সময় কাটাচ্ছিলাম। ব্যবসায়ী হিসাবে তিনি ভালো করেছেন। উনি দীর্ঘদিন স্বতন্ত্র ব্যবসা করার পর হঠাৎ একটা বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে গিয়েছিলেন। যা , আমাকে ঐ সময়ে বেশ অবাক করেছিল। আড্ডার মুডে ছিলাম বলে সাহস করে জিজ্ঞেস করে ফেললাম,’ ভাই , ব্যাপারটা কি?’

উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি ঈশপের খরগোশ ও কচ্ছপের সেই বিখ্যাত দৌড়ের গল্পটা জানি কিনা ? আমি মৃদু হেসে বললাম, এটা বাংলাদেশের কেন বা তাবৎ পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পের একটি। ওই যে দৌড় শুরু হয়ার পরে খরগোশ গাছের তলায় বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ; আর ঐদিকে কচ্ছপ ধীরে ধীরে ঠিক পৌঁছে গেল ফিনিসিং লাইনে। উনি আবার জিজ্ঞেস করলেন আমি গল্পটার মোরালটা জানি কিনা ? আমি সায় দিয়ে বললাম জানি, ‘Slow and Steady wins the race !’

এবার উনি নড়েচড়ে বসে আমাকে বললেন, আমি এই রূপক গল্পের পরের এক্সটন্ডেড আধুনিক ভার্সনগুলো জানি কীনা।
এবার আমি মাথা নেড়ে স্বীকার করলাম, জানি না !

উনার ভাষায় বললে যা দাঁড়াচ্ছেঃ
প্রাথমিকভাবে ঈশপের গল্পের মোরালের গুরুত্বপূর্ন দিকটা আমরা মিস করি ! শুধু জয়পরাজয়ের ব্যাপারটা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। গল্পের আরেকটি অন্তঃর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বীকে কখনই আন্ডারএস্টিমেট করা উচিৎ নয় ! অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জন্যই ধীরগতির কচ্ছপের কাছে দ্রুতগতির খরগোশকে লজ্জাস্কর পরাজয় মেনে নিতে হয়েছিল।

এখন সেই প্রাচীন গল্পের পরের ভার্সনটা হচ্ছে। বনের সবার কাছে দুয়ো দুয়ো শুনতে শুনতে খরগোশ তিতবিরক্ত হয়ে আরেকবার সুযোগ চাইল দৌড় প্রতিযোগিতার। সে জানে, দৌড়ের ক্ষিপ্রতায় ও দক্ষতায় তার পরাজয়ের কোন কারন ছিল না। । সে যদি হেরে গিয়ে থাকে, সেটা তার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জন্য হেরেছে। আরেকবার সুযোগ পেলে সেই একই ভুল সে করবে না।

এবারও বনের সবাই মহোৎসাহে আরেকটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করল। এবার আর খরগোশের কোন ভুল হল না। স্বাভাবিকভাবে কচ্ছপকে কয়েক মাইলের ব্যবধানে সে হারালো।

মোরাল অভ দি স্টোরিঃ দ্রুতগতির এবং দক্ষ কর্মী আপনার প্রতিষ্ঠানে ভালো ফলাফল এনে দেবে। দুজন কর্মীর মধ্যে একজন বিশ্বস্ত কিন্তু ধীরগতির আরেকজন দ্রুত, দক্ষ কিন্তু বিশ্বস্ততা মোটামুটি। আপনি ধরেই নিতে পারেন—বিশ্বস্ত, ধৈর্যশীল কিন্তু ধীরগতির কর্মচারীর প্রয়োজন আছে আপনার প্রতিষ্ঠানে ; কিন্তু কর্পোরেট মই বেয়ে দ্বিতীয় লোকটিই অনেক উপরে চলে যাবে।

উঁহু গল্পের এইখানেই শেষ নয়!

এবার কচ্ছপ নিজে নিজে অনেক চিন্তা করল হেরে যাওয়ার পরে। সে বুঝতে পারল, সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে , কিন্ত দৌড়ের জন্য যে রুট বা ট্র্যাক আছে সেখানে সে কোনভাবেই খরগোশের সঙ্গে দৌড়ে জিততে পারবে না । এবার সে আরেকটি প্রতিযোগিতার প্রস্তাব দিল খরগোশকে। কিন্তু এবারের রানিং ট্র্যাকে একটু ভিন্নতা আছে।

আবার মহোৎসাহে দৌড় শুরু হল। বনের সবাই অধীর আগ্রহে দর্শক সারিতে। দৌড় শুরু হওয়ার পরে খরগোশ দ্রুতগতিতে দৌড়ে এগিয়ে গেল। থমকে দাঁড়াতে হল, বিশাল একটা নদীর সামনে এসে। সে হতবাক হয়ে ভাবতে থাকল , এই নদী সে কিভাবে পার হবে ! ইতোমধ্যে ধীর গতিতে কচ্ছপ নদীর ধারে এসে হাজির হল। খরগোশ দাঁড়িয়েই রইল , সে অবলীলায় নদী সাঁতরে ওপাশে পৌঁছে গেল, নদীর পরে সামান্য মাইলখানেক দূরে ফিনিসিং লাইন । সবার করতালির মধ্যে কচ্ছপের বিজয় হল। আর অনেক অনেকক্ষণ পরে খরগোশ হাচঁড়েপাচঁড়ে ফিনিশিং লাইনে পৌছাল।

মোরাল অভ দি স্টোরিঃ আপনি প্রতিযোগী হলে আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি খুঁজে বের করুন। এবং যদি মনে হয়, খেলার মাঠ আপনার জেতার জন্য উপযুক্ত নয়, মাঠে আপনার সহায়তাকারী কিছু পরিবর্তন আনুন। আর আপনি যদি, কর্মকর্তা বা মালিক হন, লক্ষ্য করুন আপনার কর্মচারীটি কোথায় হোঁচট খাচ্ছেন। তার শক্তিমত্তা অনুযায়ী তাকে পরিবেশ তৈরী করে দিন, আশাতীত ভালো ফল পাবেন।

গল্পটি এখানে শেষ হলে ভাল হত। কিন্তু গল্পের এখনো বাকী আছে।

কয়েকবার প্রতিযোগিতার পরে কীভাবে কীভাবে যেন খরগোশ ও কচ্ছপের বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
তারা দুজনেই উপলব্ধি করল যে তাদের শেষ দৌড়টা আরেকটু ভালোভাবে শেষ হতে পারত।
এইবার তারা দুজনের সম্মতিক্রমে আরেকটি দৌড়ের আয়োজন করল সেই লাস্ট ট্র্যাকে।
দৌড় শুরুর কিছুক্ষণ পরে সবাই অবাক হয়ে দেখল , ডাঙার অংশটি খরগোশ কচ্ছপকে কাঁধে নিয়ে মুহুর্তেই নদীর ধারে পৌঁছে গেল। এইবার নদীর তীরে এসে কচ্ছপ খরগোশকে কাঁধে নিয়ে সাঁতরে নদী পার হয়ে গেল। নদীর ওইপাশে আবারো কচ্ছপকে কাঁধে নিয়ে খরগোশ ফিনিসিং লাইনে পৌঁছে গেল। দ্রুততার সঙ্গে দুজন একসঙ্গে জেতায় তাদের মন এক অনির্বচনীয় আনন্দে ভরে উঠল।

মোরাল অভ দি স্টোরিঃ স্বতন্ত্র ভাবে আপনি মেধাবী হতে পারেন, জিততেও পারেন। কিন্তু আপনি যখন টিম মেম্বার হিসাবে কাজ করছেন ; সবার আলাদা আলাদা শক্তিমত্তাকে কাজে লাগালে আপনার ফলাফল ও প্রাপ্তি অন্য যে কোন প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক ভালো হবে। টিমওয়ার্ক আসলে সিচুয়েশনাল লিডারশীপের একটা বড় অংশ। অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন মাফিক সিদ্ধান্ত গ্রহন। টিমের খেলোয়ারদের শক্তিমত্তা অনুযায়ী খেলতে দেওয়া এবং সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করা।

এই গল্পগুলোর এক্সটেন্ডেড ভার্সন থেকে আরো কিছু মজার শিক্ষনীয় আছে।

দেখুন, খরগোশ কিংবা কচ্ছপ কেউ কিন্তু পরাজয়ে হাল ছাড়ে নি। খরগোশ পরাজয়ের পরে দ্বিতীয় দৌড়ে চেষ্টা করেছে আরো বেশী পরিশ্রম করে জিততে। সে আর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী না হয়ে দৌড়েছে। আবার কচ্ছপও তার সীমাবদ্ধতা জানে, সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও জেতার সম্ভাবনা না দেখে স্ট্রাটেজী বদলেছে।

জীবনে এরকম সময় আসে, যখন আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও আপনি সফল হতে পারছেন না । তখন আপনাকে খরগোশের মতো বেশী করে পরিশ্রম করতে হবে অথবা কচ্ছপের মত কর্মপন্থা বা কাজের ক্ষেত্র বদলে ফেলতে হবে। প্রায়শঃ দুইটিই একসঙ্গে করতে হতে পারে।

প্রকাশকালঃ ২৪শে অক্টোবর,২০১৬

টেবিলে অনেক বই ।। জীবনানন্দ দাশ

এইবার চিন্তা স্থির করবার অবসর এসেছে জীবনে
হৃদয় বয়স্ক হল ঢের ;
মোম জ্বলে নিভে যায় অনেক গভীর রাত হলে
অন্ধকারে একআধটা আবছা ইঁদুরের
আসা-যাওয়া টের পাই ঘরের মেঝেয়
হয়তোবা সিলিঙের ‘পরে
বাইরে শিশির ঝরে কুয়াশায়–শীতে
লক্ষীপেঁচার ডানা সজনের ডালে শব্দ করে।
টেবিলে অনেক বই ছড়িয়ে রয়েছে ;
চিন্তাগুলো যেন অনুলোম প্রতিলোম
পরস্পরের প্রতি—ঠাণ্ডা শাদা নারীর মতন
দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপে মোম—-
একটি গভীর সূত্রে প্রথিত কি হবে
বইয়ের সকল চিন্তা জীবনের সব অভিজ্ঞতা
সকল নক্ষত্র আর সময়ের অপার গতির
ইতিহাসবৃত্তান্তের আগাগোড়া কথা।
এ সব আশ্চর্য তত্ত্ব ভেবে তবু মন
অনুভব করে এই অন্ধকার ঘরে আজ কেউ
নেই, শুধু এক বিন্দু মূল্য নির্ণয়ের চেষ্টা ছাড়া।
কোনো এক দূর মহাসাগরের ঢেউ
এসে এই অন্ধকার বন্দর স্পর্শ করে চুপে
কোন্ এক দূর দিকে চলে যায়, তবে
সময়ের অন্তিম সঞ্চয়ে প্রেম করুণার বলয় রয়েছে ?
ব্যক্তির ও মানবের সফলতা হবে ?
হয়তো এই ব্রহ্মাণ্ডের অবিনাশ অন্ধকার ছাড়া
মানুষের ভবিষ্যতে কিছু নেই আর ;
সেবা ক্ষমা স্নিগ্ধতা যে আলোর মতন
মানুষের হাতে, তার বুজে –যাওয়া অন্ধ আধার
বারবার বড়ো এক পরিবর্তনীয়তার দিকে
যেতে চায়— সনাতন অন্ধকারে এ প্রয়াস ভালো ;
তবু এই পৃথিবীতে প্রেমের গভীর গল্প আছে
জীবনের রয়েছে তার ( অপরূপ ) প্রতিভাত আলো।
“অগ্রন্থিত কবিতা ।। জীবনানন্দ দাশ।”

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( বন্ধুত্ব ও ব্যবসা )

বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি মুখী শিল্প হচ্ছে গার্মেন্টস সেক্টর। ঘুরে ফিরে সব পেশার ও বিষয়ের লোক এসে জড়ো হয়েছেন এখানে। বছর বিশেক আগেও বলতাম ডাক্তার – ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া সবাই আছে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে ! বছর দশেক পরে সেই কথা প্রত্যাহার করতে হল। কমপ্লাইয়েন্সের ধাক্কায় মোটামুটি সব কারখানায় সার্বক্ষণিক ডাক্তার ও নার্স আছে। কিছু গার্মেন্টসের তো নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসসহ ছোটখাটো ক্লিনিক কাম হাসপাতালও আছে।স্কুল-বন্ধুদের ভিতরে, ভেবেছিলাম মেরিন ইঞ্জিনিয়াররাই বোধহয় এই সেক্টরে আসবে না। মাস-ছয়েক আগে দেখি এক মেরিনার বন্ধু বিভিন্ন গার্মেন্টসে Fire Fighting বা অগ্নি প্রতিরোধ ট্রেনিং দিয়ে বেড়াচ্ছেন !

ব্যাংক থেকে শুরু করে ইনস্যুরেন্স, ট্রান্সপোর্ট, কৃষি, খাদ্য, মোবাইল কোম্পানি এমনকি প্রসাধন সামগ্রীর ব্যবসাও এই সেক্টরের জড়িতদের উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

গত দশ পনের বছরে সরকারি ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি ইন্সটিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেক্সটাইল , ফ্যাশন ও গার্মেন্টসের উপরে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী বের হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, চাকুরীর বাজার আগের মতো শক্তিশালী ও সহজলভ্য নেই। প্রায়শ: মুরব্বীদের বা ট্রেডের ভাইবেরাদরদের কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার বা চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার দাবী আসে। উঁচু-পদে চাকরি করছি, একটা ছোটখাটো চাকরি কী আমি দিতে পারি না ! আবার আমি যে প্রতিষ্ঠানে আছি, সেখানে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হচ্ছে! আমার পক্ষে সামান্য কিছু কাপড় বা অ্যাকসেসরিজ এর ব্যবসা দেওয়া কি এতোই কঠিন ?

প্রথমত: আসি চাকরির বাজারের সার্বিক অবস্থা নিয়ে। হ্যাঁ, আমার স্বল্প-পরিসরের কর্মজীবনে ডিমান্ড-সাপ্লাই চেইনের প্রতিক্রিয়ায় অসংখ্য লোকের চাকরির ব্যবস্থা করতে পেরেছি। সে জন্য বাহাদুরির কিছু নেই। এখন পারছি না। কারণ, এখন যোগ্য লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ডিমান্ডের তুলনায় বাজারে সাপ্লাই বেশী। আগে ফোন তুলে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার পদের কাউকে বললেও এন্ট্রি লেভেলের একটা চাকরি দিয়ে দিত। এখন, মালিক পর্যায়ের কাউকে বললেও , ভদ্রতার খাতিরে হয় সে ব্যাপারটা এড়িয়ে যায় অথবা তাঁর অন্যকোন ম্যানেজারকে ধরিয়ে দেন। অনুরোধ রক্ষার দায়বদ্ধতা কমে গেছে নানা কারণে। কাউকে এখন অনুরোধ করতেও বিব্রত বোধ করি। সুতরাং চাকরির ব্যাপারে নবীন গ্রাজুয়েটদেরকে আমাদের চেয়ে অনেক বেশী যোগ্য হতে হবে, প্রস্তুত হতে হবে। মনে রাখতে হবে, যোগ্য-লোকের চাকরির অভাব হয় না।
আমাদের প্রজন্মের অনেককে একটা আপাত: সচ্ছল জীবনযাপন করতে দেখে, অনেকেই তাঁদের ছেলেমেয়েদেরকে টেক্সটাইল বা এই রিলেটেড অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন বা পড়াচ্ছেন। কিছুদিন আগেও একজন খুব স্মার্ট নবীন গ্রাজুয়েটের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তাঁকে বেশ হতাশ মনে হচ্ছিল । তাঁকে পজিটিভলি বুঝিয়ে বললাম, এই সেক্টর যতোই সংকুচিত হোক এখনো সুযোগ আছে যথেষ্ট।

লক্ষণীয় যে, আমাদের আগের প্রজন্মের অগ্রজেরা চাকরি শুরুর পাঁচ-সাত বছরের মাথায় জেনারেল ম্যানেজার , ইন-চার্জ বা এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হয়ে গেছেন ; ক্রমান্বয়ে উদ্যোগী মেধাবী কেউকেউ বড় শিল্পপতিও। আমাদের কি অবস্থা ? আমদের প্রজন্মে অগ্রজদের অবস্থানে– মানে জিএম বা ইডি পজিশনে যেতে লেগে যাচ্ছে ১০ থেকে ১৫ বছর। এখন যারা ঢুকছেন, কিছু ব্যতিক্রমী মেধাবী সৌভাগ্যবান ছাড়া মোটামুটি ধরে নেওয়া যায় আমাদের অবস্থায় তাঁদের আসতে ১৫ থেকে ২০ বছর লাগবে। দ্রুত উন্নতি হবেনা বলে, আমরা যেমন এই সেক্টর ছেড়ে দিইনি ; নবীনদেরকেও লেগে থাকতে হবে। হ্যাঁ , সময় বেশী লাগবে কিন্তু সম্ভব।

দ্বিতীয়ত: ফেব্রিক, অ্যাকসেসরিজ, স্ক্রিন প্রিন্টিং ইত্যাদির ব্যবসাও আগের চেয়ে অনেক প্রতিযোগিতামূলক হয়ে গেছে। সব বড় গার্মেন্টস কারখানাগুলোরই ইন-হাউজ নিজস্ব প্রিন্টিং , অ্যাম্ব্রয়ডারী, টুইল-টেপ, লেবেল ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট আছে। ঘুরে ফিরে তাই অনেকের কাছ থেকে অনুযোগ আসে, ‘জাহিদ ভাই, আপনি তো আমার কোন উপকার করতে পারলেন না!’ ভাইরে, এইটা আমার ব্যর্থতা সত্য, কিন্তু সময় যে বদলে গেছে, আমার নিয়ন্ত্রণে নেই কিছুই।

তৃতীয়ত: FOB গার্মেন্টসের ব্যবসাও মুষ্টিমেয় কিছু বড় গ্রুপের কাছে চলে যাচ্ছে। আমরা অর্ডার প্লেসমেন্ট নিয়ে হিমশিম খাই। ক্রেতার নানাবিধ রিকোয়ারমেন্টের মাঝে মূল হচ্ছে – কমপ্লাইয়েন্ট হতে হবে এবং দামও কম হতে হবে (মাগনা না হলেও পানির দর হলে ভাল !) এতকিছুর মাঝে অফিস খরচ, বেতনবৃদ্ধি , ব্যাংক চার্জ, সার্ভিস চার্জ ধরে ‘শ্যাম রাখি না কূল রাখি’ অবস্থা। অনেক খুঁজে আদর্শ পাত্রী পাওয়া গেলেও, সম্পর্ক পর্যন্ত গড়ায় না ! কারণ পাত্রী ( ফ্যাক্টরি) নিজেও আদর্শ পাত্র ছাড়া কাজ করে না !

সেদিন এক বন্ধু তাঁর ব্যবসায় সহযোগিতা চাইল । সঙ্গতঃ কারণেই নামোল্লেখ করছি না।ব্যবসা চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে একটা চমৎকার উদাহরণ দিল। ধরেন, ওয়ালমার্টের CEO আপনার ছোটবেলার বন্ধু। এখনো তাঁর সঙ্গে আপনার যোগাযোগ আছে.( উল্লেখ্য ওয়ালমার্টের বাৎসরিক রেভিনিউ কমবেশি ৫০০++ বিলিয়ন ডলার !) কিন্তু আপনি যখন তাঁর কাছে ব্যবসা চাইবেন, তাঁর পক্ষে হয়তো আপনার জন্য তেমন কিছুই করা সম্ভব হবে না। কারণ, ঐ কোম্পানি তাঁর সোর্সিং সিস্টেম এমন করে রেখেছে, যে স্বজনপ্রীতির জায়গা অত্যল্প।

কর্পোরেট চাকরিতে আমাদের অসহায়ত্বের ব্যাপারটা কেউ কেউ বোঝেন , বেশীরভাগই বুঝতে চান না !

প্রকাশকালঃ ৭ই অক্টোবর,২০১৬

কর্পোরেট অবজার্ভেশন (বড়ক্রেতা, ছোটক্রেতা)

আমার শৈশব কেটেছে অবাঙ্গালি-বিহারী অধ্যুষিত মিরপুর ১১ নাম্বারের সোসাইটি ক্যাম্পের ঠিক সামনে। আমাদের গলির মাথায় আনিসের মনোহারি মুদি দোকান ছিল। পুরো মহল্লার বাঙালী সমাজের একমাত্র ভরসার জায়গা ছিল আনিসের দোকান। মেহমান এসেছে হুট করে , যা তো আনিসের দোকানে ! আব্বার মাস শেষে টাকা পয়সার ঘাটতি, আনিসই ভরসা।

কিছুদিন পরে মহল্লায় বড় মাপের কনফেকশনারী দোকান চলে আসল। ফ্রিজ আসল, সেই ফ্রিজে ঠাণ্ডা কোক-ফান্টা পাওয়া যেতে লাগল। আর অধুনা প্রতিটি মহল্লা আর রাস্তায় বড়বড় সুপার স্টোর এসে তো ঢাকাকেই ঢেকে ফেলেছে ! আনিসের দোকানের মতো ছোট পুঁজির, নিম্নমধ্যবিত্তের নগদ-বাকীর ভরসাস্থল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস দোকানগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ওর দোকানে কাঁচামরিচ, মাছ-মাংস ছাড়া- হেন জিনিষ নেই পাওয়া যেত না ! শুকনো বাজারের পুরোটাই ( চাল,ডাল,আলু,পিঁয়াজ,তেল-লবণ,ডিম, চিনি,গরমমসলা, ইত্যাদি) থাকত ওর কাছে।

দশ ফিট বাই দশ ফিট দোকানে এতো বিশাল ব্যাপ্তির প্রোডাক্ট রেঞ্জ সে কীভাবে গুছিয়ে রাখত , এবং চাহিবামাত্র সে কোন এক চিপার ভিতর থেকে গ্রাহকের চাহিদামত ইসবগুলের ভুষি বা রান্নার পাঁচফোড়ন বের করে দিত– সেটা আমার কাছে সেই সময়ে বিস্ময় ছিল, এখনো আছে !

একটা ব্যাপার নিয়ে আমি প্রায়শ: বিরক্ত হতাম। বাকীতে নিই বা নগদে, আমি ছিলাম আনিসের বড় খরিদ্দারদের একজন। কোন বারই ৫০ বা ১০০ টাকার নীচে সদাই-পাতি করতাম না। অথচ দেখা যেত, আমাকে রেখে অবাঙ্গালী বিহারী খরিদ্দারকে সে আগে সার্ভিস দিচ্ছে। দেখা গেল কোন ছোট বিহারী বাচ্চা এসে আট আনা বা এক টাকার কিছু কিনছে, তাকে সে আগে বিদায় করত। একদিন আনিসকে জিজ্ঞাস করলাম। ‘মামা, কাহিনী কি এইটা তো ঠিক না। আমি আগে আসছি। আমার সদাই-পাতি বেশী , আমাকে আগে বিদায় কর!’ কেন সে ওঁদেরকে আগে সার্ভিস দেয় সেটা একদিন সে আমাকে হাতেকলমে দেখিয়ে দিল।

হয়েছে কী , একদিন আমি আনিসকে বাজারে ফর্দ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। একটা একটা করে ওজন করছে আনিস। ঠিক সেই সময় এক পিচ্চি বিহারী এসে, এক টাকার নোট খুব মুডের সাথে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ অ্যা মোদী, এক রুপাইয়াকে মুরালি দে !’ আনিস আমার মাল-পত্র গোছাচ্ছিল। এর ফাঁকেই কয়েক সেকেন্ডের মাথায় বেশ উত্তপ্ত গলায় ,’ এ মোদী ! কাব তাক খাড়া রাহুঙ্গা,এক রুপাইয়া কি মুরালি কে লিয়ে? ’ আনিস আমার জিনিসপত্র রেখে তাড়াহুড়ো করে ঐ পিচ্চিকে এক টাকার মুরালি কাগজে মুড়িয়ে বিদায় দিল।

আমার দিকে চেয়ে একটু হেসে বলল, ‘ মামা, আপনি আমার বড় গাহাক, আপনার সদাই-পাতি অনেক। আপনি জানেন, আপনার সময় লাগবে ; আপনি সেইটা বুইঝাই অপেক্ষা করবেন, তাড়াহুড়া করবেন না ! কিন্তু এই হালার খুচরা গাহাকগুলা–কিনব আটআনার জিনিষ, কিন্ত গরম দ্যাখলে মনে হইব লাখ টাকার সদাই করতে আইছে!’

ইদানীং নানা বিদেশী ক্রেতাদের মধ্যে বড়বড় ক্রেতাদের যথেষ্ট আস্থা আছে বাংলাদেশের উপরে। যেহেতু তারা তাঁদের সোর্সিং-এর বড় একটা অংশ চীন থেকে সরিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে বছর বিশেক হল; বাংলাদেশের যে কোন পরিস্থিতিতে এঁদের মাথা ঠাণ্ডা থাকে। অপেক্ষা করে অবস্থার উন্নতির জন্য । চিৎকার চেঁচামেচি মাথা গরম করে, খুচরা ক্রেতারা। দেড় টাকার টি-শার্ট কিনবে , তাও ১৫০০ পিসের MOQ( Minimum Order Quantity) – কিন্তু কমপ্লাইন্সের গরম আর নানাবিধ চাহিদার বহর দেখলে আমার সেই বিহারী পিচ্চির কথাই মনে পড়ে !
অনুসিদ্ধান্ত: ক্রেতার চাহিদা ও মেজাজ তাঁর ক্রয় ক্ষমতার ব্যস্তানুপাতিক। যতো ছোট
ক্রেতা-ততো বেশী মেজাজ !

[ প্রকাশকালঃ ৭ই অক্টোবর,২০১৬ ]