অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ।জীবনানন্দ দাশ।।

আশাবাদী বলেই কিনা জানিনা, অন্য সবার হাপিত্যেশে একমত পোষণ করতে পারছিনা । কেন আপনার মনে হচ্ছে এই অদ্ভুত আঁধার প্রথমবারের মতো এসেছে পৃথিবীতে ! এই আঁধার হাজারবছর আগেও ছিল, কয়েকশো বছর আগে তো ছিলই ; বছর পঞ্চাশেক আগেও জীবনানন্দ দেখেছিলেন।

“অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশী আজ চোখে দেখে তারা ;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া ।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজও মানুষের প্রতি,
এখনও যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয় ।”
অদ্ভুত আঁধার এক-জীবনানন্দ দাশ

স্বগতোক্তিঃ একেকটা মানুষ মানে একেকটা আলাদা আলাদা পৃথিবী!

আমার কাছে মনে হয় , একেকটা মানুষ মানে একেকটা আলাদা আলাদা পৃথিবী। একেকটা আলাদা ভুবন। আলাদা আলাদা সৌরজগতের মতোই বিশেষ কেউকেউ আবার আলো দিয়ে উজ্জ্বল করে রাখে চারপাশ। যে বয়সেরই হোক না কেন , পরিবারের কারো অকালমৃত্যুই সহ্যাতীত কষ্টের। কিন্তু, যখন পরিবারের মেরুদণ্ড উপার্জনক্ষম কারো মৃত্যু হয়। শুধু শারীরিক ও মানসিক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুরো পরিবারটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। অন্ধকার নেমে আসে ওই সৌরজগতে !
হ্যাঁ ,জীবন থেমে থাকে না। এই মুহূর্তে আমার অকাল-প্রস্থানেও কারো হয়তো কিছু যাবে আসবে না। আমি হয়তো এই পৃথিবীর কাছে কেউ নই, কিন্তু আমার প্রিয়জনের কাছে আমিই তাদের পৃথিবী।

“TO THE WORLD YOU MAY NOT BE SOMEONE; BUT TO SOMEONE YOU ARE THE WORLD! “
আমার কন্যারা হয়তো একটু অনাদর অবহেলায় বেড়ে উঠবে। হয়তো প্রথম প্রথম সপ্তাহে একবার , পরে দুই সপ্তাহে একবার খাবারের প্লেটে আমিষ পড়বে। হয়তো একটা ডিম চার ভাগ করে খেতে হবে। আমার প্রয়াণে আমার উপর নির্ভরশীল লোকগুলো কেউ না খেয়ে হয়তো মারা যাবে না– কিন্তু যে চিরস্থায়ী মানসিক অর্থনৈতিক বিকলাঙ্গতার অসহায় মুহূর্ত পার করতে থাকবে তারা , সেটা কল্পনা করতেও আমার সারা মস্তিষ্কে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে।
সাভারের একটা নির্মম হত্যাকাণ্ডে কতোগুলো আলাদা পৃথিবীর প্রস্থান, আলো নিভে গেল কতো পরিবারের, কতো আলাদা আলাদা সৌরজগতের ।

[ প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে এপ্রিল,২০১৩ ]

স্বগতোক্তিঃ নাছোড়বান্দা মাছির মতো চিন্তারাশি!

নাছোড়বান্দা মাছির মতো চিন্তারাশি বারবার ঘুরে ফিরে আসে ! নিজের তুচ্ছতার কথা ভাবি ; এই চিন্তারাশিকে লিপিবদ্ধ করে কী লাভ ! হ্যাঁ প্রকাশিত হওয়ার আনন্দ আছে বৈকি ! আবার ভাবি, মহাকালের কাছে আমি যতো অকিঞ্চিৎই হই না কেন, আমার সময়টুকুতে আমার এই যে বেঁচে থাকা, চারপাশের প্রবাহিত , যাপিত জীবন আমার কাছে কোনভাবেই তুচ্ছ হতে পারে না। আমার কাছে তার মূল্য আছে বলেই জীবন নিরর্থক নয় ; বেঁচে থাকাকে এখনো এতো ভালবাসি !

স্বগতোক্তিঃ দান, অনুদান

আমি বিশ্বাস করি  মানবিক কিছু গুণাবলী যেমন  দান, ক্ষমা ও পরিতৃপ্ত হওয়ার জন্য পরিমাণ নয় , মূলতঃ মানসিক যোগ্যতাই সবচেয়ে বড়ো ফ্যাক্টর ! নিকট অতীতে  নিতান্তই  পারিবারিক কিছু অম্লমধুর  অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার  । সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দেওয়ার পিছনে , খুব সহজ একটা  ব্যাখ্যা ছিল প্রত্যেকের । সহানুভূতির কয়েকটা কথার পরে, তাদের মূলকথা হতো —আমার  যদি অমুকের মতো টাকা থাকতো,  তাহলে আমি নিশ্চয়ই কিছু দান বা সহযোগিতা করতাম ! কিন্তু , যে দুর্মূল্যের বাজার, ইত্যাদি ইত্যাদি  ইত্যাদি!

 

 

আবার  এমন কিছু হৃদয়বান  দেখেছি যিনি  তাঁর সঞ্চিত অর্থের  পরিমাণের তোয়াক্কা করেননি। সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন  । গাণিতিক অনুপাতে  উদাহরণ দিই ।   ধরুন, আমার  যদি পকেটের  ১০০ টাকা থেকে  ১০ টাকা সহযোগিতা করার মানসিকতা না থাকে;  তাহলে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা থাকলেও আমি  কাউকে  ১০ হাজার টাকা সহযোগিতার চিন্তা করবো না !   যে হৃদয়বান   মাত্র ১০ হাজার  টাকার ১০% অবলীলায় দান করতে পারছেন ও করছেন  ; মূলতঃ  তাঁর মানসিকতা আছে বলেই করতে পারছেন ! আর ‘ দুর্মূল্যের বাজার’-এর  আমি , একই সমানুপাতে  ১০ লাখ টাকার ১০% , মানে  ১ লাখ টাকাতো  দূরে থাক,  ন্যূনতম  ১% হিসাবে ১০ হাজার টাকার চিন্তাও করতে পারছি না !

 

বহুদিন আগে, এক নেপালি সহপাঠী বলেছিল , আদমি রহিস (ধনী) রুপিয়াসে নেহি হোতি ; দিল্‌ সে হোতি  হ্যায় ! সহযোগিতার  জন্য  সঞ্চিত সম্পদের পরিমাণ নয় ;  হৃদয়ের আয়তন এবং  মানসিক যোগ্যতাই বড় ফ্যাক্টর !

 

 

[ প্রথম প্রকাশঃ ১০ই নভেম্বর, ২০১৫ ]

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( সত্যিকারের অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই ! )

সত্যিকারের অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই।

আমার এক সহকর্মী প্রায়শই বলেন, ‘ ভাইরে , ছাগল দিয়া হালচাষ করা গেলে কী আর মাইনষে টাকা দিয়ে বলদ কিনত!’

স্মৃতি থেকে লিখছি। উদাহরণের শেষাংশ হুমায়ূন আহমেদের ‘এলেবেলে’ থেকে নেওয়া। মূল লেখাটি কাছে পেলে ভালো হত!

১।                বছর তিরিশেক আগে আব্বার কাছ থেকে শোনা –যুদ্ধক্লান্ত, স্বদেশমুখী সমুদ্র-জাহাজের কাহিনী। । সাধারণ  সৈনিক-নাবিকদের ক্ষোভ,  এতো উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও কেন সেকেন্ড ইন কম্যান্ডের তুলনায় তারা সুবিধাবঞ্চিত। সেটা আচার-আচরণে ক্যাপ্টেনের গোচরেও এনেছে তারা। জাহাজে খাদ্য ও সুপেয় পানির তীব্র অভাব ; কোথাও নোঙর করা নিতান্তই অপরিহার্য ।  নানা বিপদসংকুল  সমুদ্রপথ পেরিয়ে  ডাঙ্গায় নামতে না পেরে সবাই মরিয়া হয়ে উঠেছে। দূরে একটা  দ্বীপ বা ডাঙা । নোঙর করা হবে কী হবে না, সেটা জাহাজের ক্যাপ্টেন যাচাই করছেন। ভোরের সৈকতে ঘনকুয়াশা। দূর থেকে আওয়াজ, হুঙ্কার বা বেশ একটা হট্টগোল শোনা যাচ্ছে, দূরবীন দিয়েও সঠিক কারণটি বোঝা যাচ্ছে না।

নিরাপদ দূরত্বের জাহাজ থেকে ছোট নৌকায় এক এক করে অধঃক্রম অনুসারে কয়েকটি  পর্যবেক্ষণকারী দল গেল।প্রথমে সৈনিকরা এসে রিপোর্ট করল, অসংখ্য হিংস্র প্রাণীতে সৈকত পূর্ণ। ঊর্ধ্বতন শ্রেণির লেফটেন্যান্টরা এসে বললো , বুনো কুকুরের দল, পরস্পর আক্রমণে ব্যস্ত। একে একে সবার পর গেলেন সেকেন্ড ইন কম্যান্ড। তিনি এসে রিপোর্ট করলেন, দ্বীপে নামা যাবে। কুয়াশা থাকলেও বেলাভূমি সমতল। একটা মা কুকুরের আটটি বাচ্চা । একসঙ্গে চারটি বা পাঁচটির বেশী দুধ খেতে পারছেনা। হুটোপুটিটা মূলতঃ সেইজন্য।

জাহাজের ক্যাপ্টেন , সৈনিকদের  দিকে তাকিয়ে বললেন, কেন ওকে বেশী বেতন ও সুবিধা দেওয়া হয় সম্ভবতঃ তোমরা বুঝতে পারছো !

২।                এই গল্পটি সত্যিকারের এক নাবিক বন্ধুর (মেরিন ইঞ্জিনিয়ার) কাছে শোনা। সমুদ্রবন্দরে মূল পোর্টের আগে  সংযোগকারী ক্যানেলে  একটা জাহাজ বিকল হয়ে গেছে। পোর্ট মোটামুটি অচল। দীর্ঘক্ষণ ধরে নানাভাবে ইঞ্জিন চালানোর চেষ্টা করে সবাই ব্যর্থ ! এই ধরণের কাজে অভিজ্ঞ একজন ইঞ্জিনিয়ারকে তলব করা হোল। তিনি এলেন,  সবকিছু চেক করে, জাহাজের ইঞ্জিনের নির্দিষ্ট একটা স্থানে তার টুলবক্স থেকে  হাতুড়ী বের করে জোরে একটা  আঘাত করলেন। ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে বললেন, জাহাজ নড়ে উঠলো। পুরো ব্যাপারটিতে খুব সামান্য সময় লাগল। কোম্পনীর কাছে বিল আসলো দশ হাজার পাউন্ডের। বিপদ থেকে উদ্ধার পেলে যা হয় আর কী ! কোম্পানির  অডিট টিম চিঠি পাঠালো, কেন দশ হাজার পাউন্ড বিল হয়েছে, তার ব্রেক ডাউন বা ডিটেলস না দিলে  বিল পরিশোধ করা হবে না । ডিটেল বিল ছিল অনেকটা এরকম,  এক পাউন্ড বিল- হাতুড়ী দিয়ে আঘাত করার জন্য ; বাকী নয় হাজার নয় শত নিরানব্বই পাউন্ড বিল- ঠিক কোথায় আঘাতটা করতে হবে, সেটা জানার জন্য। (One Pound for the Tap   and Nine thousand Nine Hundred and Ninety Nine Pound  for knowing–exactly where to Tap  ! )

৩।                হুমায়ূন আহমেদ ‘উন্মাদ’ পত্রিকায় ‘এলেবেলে’ নামের কলাম লিখতেন; দুর্দান্ত স্যাটায়ার ! আমাদের স্কুলজীবনে আমরা  ‘উন্মাদ’-এর ব্যাপক ভক্ত ছিলাম। হুমায়ূন আহমেদের  গল্পটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথমদিকের।সম্ভবতঃ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তখন বাংলা ও সংস্কৃত  বিভাগের প্রধান। বৃটিশ উপাচার্য পি জে হার্টগ। বাংলা বিভাগে একজন রীডারের জন্য  হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবেদন করলেন। হার্টগ সাহেব একজন রীডার না নিয়ে ,ওই বেতনে দুজন লেকচারার নিতে বললেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী হার্টগ সাহেবকে একটা গল্প শোনালেন। এক ভয়ংকর অত্যাচারী নীলকর সাহেবের কুঅভ্যাস ছিল, প্রতি রাত্রে  নিত্যনতুন ষোড়শী সম্ভোগের। এরকম করতে করতে আশেপাশের  কয়েক গ্রামের সব ষোড়শী সম্ভোগিত । এক সন্ধ্যায় , সাহেবের লাঠিয়ালরা দীর্ঘ খোঁজাখুঁজি করেও কোন নতুন ষোড়শীর সন্ধানে ব্যর্থ ! সন্ধ্যা থেকে রাত, মাতাল সাহেব ধীরে ধীরে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন। প্রায় মধ্যরাত্রিতে , সাহেবের লাঠিয়ালরা দুইটি আট বছরের বালিকাকে নিয়ে হাজির ! সাহেবকে ভাঙা ইংরেজিতে বোঝানো হোল,– সাহেব, দুইজন ‘এইট ইয়ার গার্ল’  মানে ওয়ান  ‘ষোল ইয়ার’ !

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী  গল্প শেষে হার্টগ সাহেবকে বলেছিলেন, স্যার একজন ষোড়শীর কাছ থেকে আপনি যা পাবেন  , দুইজন আট বছরের বালিকা, তা আপনাকে  কখনই দিতে পারবে না !

গল্প শুনে, হার্টগ সাহেব নাকি রীডারের আবেদন মঞ্জুর করেছিলেন।

[ প্রথম প্রকাশঃ ২৪শে অক্টোবর, ২০১৫ ]