তারিণী মাঝি । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ।।

[ ১৯৯০ সালের কোন এক দুপুরে এই গল্পটি পড়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পের একটি । কলেজ কর্মসূচিতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার পড়তে দিয়েছিলেন। প্রাকৃতিক দুর্বিপাক ও দুর্যোগে মানুষের অসহায়ত্ব। ইন্টারনেট থেকে কপি করা, বানান ভুল থাকতে পারে ; ক্ষমার্হ। ]

তারিণী মাঝির অভ্যাস মাথা হেঁট করিয়া চলা। অস্বাভাবিক দীর্ঘ তারিণী ঘরের দরজায়,গাছের ডালে, সাধারণ চালাঘরে বহুবার মাথায় বহু ঘা খাইয়া ঠেকিয়া শিখিয়াছে। কিন্তু নদীতে যখন সে খেয়া দেয়,তখন সে খাড়া সোজা। তালগাছের ডোঙার উপর দাঁড়াইয়া সুদীর্ঘ লগির খোঁচা মারিয়া যাত্রী বোঝাই ডোঙাকে ওপার হইতে এপারে লইয়া আসিয়া সে থামে।
আষাঢ় মাস। অম্বুবাচী উপলক্ষ্যে ফেরত যাত্রীর ভিড়ে ময়ুরাক্ষীর গনুটিয়ার ঘাটে যেন হাট বসিয়া গিয়াছিল। পথশ্রমকাতর যাত্রীদলের সকলেই আগে পার হইয়া যাইতে চায়।
তারিণী তামাক খাইতে খাইতে হাঁক মারিয়া উঠিল,আর লয় গো ঠাকরুণরা,আর লয়। গঙ্গাচান করে পুণ্যির বোঝায় ভারী হয়ে আইছ সব।

একজন বৃদ্ধ বলিয়া উঠিল,আর একটি নোক বাবা,এই ছেলেটি।
ওদিক হইতে একজন ডাকিয়া উঠিল,ওলো ও সাবি,উঠে আয় লো,উঠে আয়। দোশমনের হাড়ের দাঁত মেলে আর হাসতে হবে না।
সাবি ওরফে সাবিত্রী তরুণী,সে তাহাদের পাশের গ্রামের কয়টি তরুণীর সহিত রহস্যালাপের কৌতুকে হাসিয়া যেন ভাঙিয়া পড়িতেছিল। সে বলিল,তোরা যা,আসছে খেপে আমরা সব একসঙ্গে যাব।
তারিণী বলিয়া উঠিল,না বাপু,তুমি এই খেপেই চাপ। তোমরা সব একসঙ্গে চাপলে ডোঙা ডুববেই। মুখরা সাবি বলিয়া উঠিল,ডোবে তো তোর ওই বুড়িদের খেপই ডুববে মাঝি। কেউ দশ বার,কেউ বিশ বার গঙ্গাচান করেছে ওরা। আমাদের সবে এই একবার।
তারিণী জোড়হাত করিয়া বলিল,আজ্ঞে মা,একবারেই যে আপনকারা গাঙের ডেউ মাথায় করে আইছেন সব। যাত্রীর দল কলরব করিয়া আসিয়া উঠিল। মাঝি লগি হাতে ডোঙার মাথায় লাফ দিয়া উঠিয়া পড়িল। তাহার সহকারী কালাচাঁদ পারের পয়সা সংগ্রহ করিতেছিল। সে হাকিয়া বলিল,পারের কড়ি ফাঁকি দাও নাই তো কেউ,দেখ,এখনও দেখ।–বলিয়া সে ডোঙাখানা ঠেলিয়া দিয়া ডোঙায় উঠিয়া পড়িল। লগির খোঁচা মারিয়া তারিণী বলিল,হরি হরি বল সব-হরিবোল। যাত্রীদল সমস্বরে হরিবোল দিয়া উঠিল-হরিবোল। দুই তীরের বনভূমিতে সে কলরোল প্রতিধ্বনিত হইয়া ফিরিতেছিল। নিম্নে খরস্রোতা ময়ূরাক্ষী নিম্নস্বরে ক্রুর হাস্য করিয়া বহিয়া চলিয়াছে। তারিণী এবার হাসিয়া বলিল,আমার নাম করলেও পার,আমিই তো পার করছি।
এক বৃদ্ধা বলিল,তা তো বটেই বাবা। তারিণী নইলে কে তরাবে বল?
একটা ঝাঁকি দিয়া লগিটা টানিয়া তুলিয়া তারিণী বিরক্তিভরে বলিয়া উঠিল,এই শালা কেলে,-এঁটে ধর্ দাঁড়, হ্যাঁ-সেঙাত,আমার ভাত খায় না গো! টান দেখছিস না?
সত্য কথা,ময়ূরাক্ষীর এই খরস্রোতই বিশেষত্ব। বারো মাসের মধ্যে সাত-আট মাস ময়ূরাক্ষী মরুভূমি,এক মাইল দেড় মাইল প্রশস্ত বালুকারাশি ধূ-ধূ করে। কিন্তু বর্ষার প্রারম্ভে সে রাক্ষসীর মত ভয়ঙ্করী। দুই পার্শ্বে চার-পাঁচ মাইল গাঢ় পিঙ্গলবর্ণ জলস্রোতে পরিব্যাপ্ত করিয়া বিপুল স্রোতে সে তখন ছুটিয়া চলে। আবার কখনও কখনও আসে“হড়পা” বান, ছয়-সাত হাত উচ্চ জলস্রোত সম্মুখের বাড়ি-ঘর’ক্ষেত-খামার গ্রামের পর গ্রাম নিঃশেষে ধুইয়া মুছিয়া দিয়া সমস্ত দেশটাকে প্লাবিত করিয়া দিয়া যায়। কিন্তু সে সচরাচর হয় না । বিশ বৎসর পূর্বে একবার হইয়াছিল।
মাথার উপর রৌদ্র প্রখর হইয়া উঠিয়াছিল। একজন পুরুষ যাত্রী ছাতা খুলিয়া বসিল। তারিণী বলিল,পাল খাটিও না ঠাকুর,পাল খাটিও না। তুমিই উড়ে যাবা।
লোকটি ছাতা বন্ধ করিয়া দিল। সহসা নদীর উপরের দিকে একটা কলরব ধ্বনিত হইয়া উঠিল—আর্ত কলরব।
ডোঙার যাত্রীসব সচকিত হইয়া পড়িল। তারিণী ধীরভাবে লগি চলাইয়া বলিল, এই সব হুঁশ করে। তোমাদের কিছু হয় নাই। ডোঙা ডুবেছে ওলকুড়োর ঘাটে। এই বুড়ি মা, কাঁপছ কেনে,ধর ধর ঠাকুর,বুড়িকে ধর। ভয় কি? এই দেখ,আমরা আর-ঘাটে এসে গেইছি।
নদীও শেষ হইয়া আসিয়াছিল।
তারিণী বলিল, কেলে!
কি?

নদীবক্ষের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিয়া তারিণী বলিল,লগি ধর দেখি।
কালাচাঁদ উঠিয়া পড়িল। তাহার হাতে লগি দিতে দিতে তারিণী বলিল,হুই-দেখ-হুই-হুই ডুবল।-বলিতে বলিতেই সে খরস্রোতা নদীগর্ভে ঝাঁপ দিয়া পড়িল। ডোঙার উপর কয়েকটি বৃদ্ধা কাঁদিয়া উঠিল,ও বাবা তারিণী,আমাদের কি হবে বাবা।
কালাচাঁদ বলিয়া উঠিল,এই,বুড়িরা পেছু ডাকে দেখ দেখি। মরবি মরবি,তোরা মরবি।
পিঙ্গলবর্ণ জলস্রোতের মধ্যে শ্বেতবর্ণের কি একটা মধ্যে মধ্যে ডুবিতেছিল,আবার কিছুদূরে গিয়া ভাসিয়া উঠিতেছিল। তাহাকে লক্ষ্য করিয়াই তারিণী ক্ষিপ্রগতিতে স্রোতের মুখে সাঁতার কাটিয়া চলিয়াছিল। সে চলার মধ্যে যেন কত স্বচ্ছন্দ গতি। বস্তুটার নিকটেই সে আসিয়া পড়িয়াছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই সেটা ডুবিল। সঙ্গে সঙ্গে তারিণীও ডুবিল। দেখিতে দেখিতে সে কিছুদূরে গিয়া ভাসিয়া উঠিল। এক হাতে তাহার ঘন কালো রঙের কি রহিয়াছে। তারপর সে ঈষৎ বাঁকিয়া স্রোতের মুখেই সাঁতার কাটিয়া ভাসিয়া চলিল।
দুই তীরের জনতা আশঙ্কাবিমিশ্র ঔৎসুক্যের সহিত একাগ্রদৃষ্টিতে তারিণীকে লক্ষ্য করিতেছিল। এক তীরের জনতা দেখিতে দেখিতে উচ্চরোলে চীৎকার করিয়া উঠিল, হরিবোল।
অন্য তীরের জনতা চীৎকার করিয়া প্রশ্ন করিতেছিল,উঠেছে? উঠেছে?
কালাচাঁদ তখন ডোঙা লইয়া ছুটিয়াছিল।
তারিণীর ভাগ্য ভালো। জলমগ্ন ব্যক্তিটি স্তানীয় বর্ধিষ্ণু ঘরেরই একটি বধূ। ওলকুড়ার ঘাটে ডোঙা ডুবে নাই, দীর্ঘ অবগুণ্ঠনাবৃতা বধূটি ডোঙার কিনারায় ভর দিয়া সরিয়া বসিতে গিয়া এই বিপদ ঘটাইয়া বসিয়াছিল। অবগুণ্ঠনের জন্যই হাতটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া সে টলিয়া জলে পড়িয়া গিয়াছিল। মেয়েটি খানিকটা জল খাইয়াছিল। কিন্তু তেমন বেশি কিছু নয়-অল্প শুশ্রূষাতেই তাহার চেতনা ফিরিয়া আসিল।
নিতান্ত কচি মেয়ে-তের চৌদ্দ বৎসরের বেশি বয়স নয়। দেখিতে বেশ সুশ্রী,দেহে অলঙ্কারও কয়খানা রহিয়াছে-কানে মাকড়ি,নাকে টানা-দেওয়া নথ,হাতে রুলি,গলায় হার। সে তখনও হাঁপাইতেছিল। অল্পক্ষণ পরেই মেয়েটির স্বামী ও শ্বশুর আসিয়া পৌঁছিলেন।
তারিণী প্রণাম করিয়া বলিল,পেনাম ঘোষ মশাই।
মেয়েটি তাড়াতাড়ি দীর্ঘ অবগুণ্ঠন টানিয়া দিল।
তারিণী বলিল,আর সান কেড়ো না মা,দম লাও,দম লাও। সেই যে বলে-লাজে মা কুঁকুড়ি,বেপদের ধুকুড়ি।
ঘোষ মহাশয় বলিলেন,কি চাই তোর তারিণী,বল্?
তারিণী মাথা চুলকাইয়া সারা হইল,কি তাহার চাই,সে ঠিক করিতে পারিল না। অবশেষে বলিল,এক হাড়ি মদের দাম-আট আনা।
জনতার মধ্য হইতে সেই সাবি মেয়েটি বলিয়া উঠিল,আ মরণ তোমার। দামী কিছু চেয়ে নে রে বাপু!
তারিণীর যেন এতক্ষণে খেয়াল হইল,সে হেঁট মাথাতেই সলজ হাসি হাসিয়া বলিল, ফাঁদি লত একখানা ঘোষ মশাই।
জনতার মধ্য হইতে সাবিই আবার বলিয়া উঠিল,হ্যাঁ বাবা তারিণী,বউমা বুঝি খুব নাক নেড়ে কথা কয়?
প্রফুল্লচিত্ত জনতার হাস্যধ্বনিতে খেয়াঘাট মুখরিত হইয়া উঠিল।
বধূটি ঘোমটা খুলে নাই,দীর্ঘ অবগুণ্ঠনের মধ্য হইতে তাহার গৌরবর্ণ কচি হাতখানি বাহির হইয়া আসিল-রাঙা করতলের উপর সোনার নথখানি রৌড্রভায় ঝকঝক করিতেছে।
ঘোষ মহাশয় বলিলেন,দশহরার সময় পার্বণী রইল তোর কাপড় আর চাদর,বুঝলি তারিণী? আর এই নে-পাঁচটা টাকা।
তারিণী কৃতজ্ঞতায় নত হইয়া প্রণাম করিয়া কহিল,আজ্ঞ হুজুর চাদরের বদলে যদি শাড়ি—
হাসিয়া ঘোষ মহাশয় বলিলেন,তাই হবে রে,তাই হবে।
সাবি বলিল,তোর বউকে একবার দেখতাম তারিণী।
তারিণী বলিল,নেহাত কালে কুচ্ছিত মা।
তারিণী সেদিন রাত্রে বাড়ি ফিরিল আকণ্ঠ মদ গিলিয়া। এখানে পা ফেলিতে পা পড়িতেছিল ওখানে। সে বিরক্ত হইয়া কালাচাঁদকে বলিল, রাস্তায় এত নেলা কে কাটলে রে কেলে? শুধুই নেলা–শুধুই–অ্যা–অ্যাই–একটো—নেলা
কালাচাঁদও নেশায় বিভোর,সে শুধু বলিল,হুঁ।
তারিণী বলিল,জলাম্পয়-সব জলাম্পয় হয়ে যায়,সাঁতরে বাড়ি চলে যাই। শালা খাল নাই,নেলা নাই,সমান–স–ব সমান।
টলিতে টলিতেই সে শূন্যের বায়ুমণ্ডলে হাত ছুঁড়িয়া ছুঁড়িয়া সাঁতারের অভিনয় করিয়া চলিয়াছিল।
গ্রামের প্রান্তেই বাড়ি। বাড়ির দরজায় একটি আলো জ্বালিয়া দাঁড়াইয়াছিল –তারিণীর স্ত্রী।
তারিণী গান ধরিয়া দিল,– লো-তুন হয়েছে দেশে ফাঁদিলতের আমদানি-
সুখী তাহার হাত ধরিয়া বলিল,খুব হয়েছে,এখন এস। ভাত কটা জুড়িয়ে কড়কড়ে হিম হয়ে গেল।
হাতটা ছাড়াইয়া লইয়া কোমরের কাপড় খুঁজিতে খুঁজিতে তারিণী বলিল,আগে তোকে লত পরতে হবে। লতা কই-কই-কোথা গেল শালার লত?
সুখী বলিল, কোন্ দিন ওই করতে গিয়ে আমার মাথা থাবে তুমি। এবার আমি গলায় দড়ি দোব কিন্তু।
তারিণী ফ্যালফ্যাল করিয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, কেনে কি করলাম আমি?
সুখী দৃষ্টিতে তাহাকে তিরস্কার করিয়া বলিল,এই পাথার বান,আর তুমি—
তারিণি অট্টআসিতে বর্ষার রাত্রির সজল অন্ধকার ত্রস্ত হইয়া উঠিল।হাসি থামাইয়া সে সুখীর দিকে চাহিয়া বলিল,মায়ের বুকে ভয় থাকে? বল্,তু বল্,বলে যা বলছি। পেটের ভাত ওই ময়ূরাক্ষীর দৌলতে। জবাব দে কথার-অ্যাই!
সুখী তাহার সহিত আর বাক্যব্যয় না করিয়া ভাত বাড়িতে চলিয়া গেল।
তারিণী ডাকিল,সুখী,অ্যাই সুখী,অ্যাই!
সুখী কোন উত্তর দিল না। তারিণী টলিতে টলিতে উঠিয়া ঘরের দিকে চলিল। পিছন হইতে ভাত বাড়িতে ব্যস্ত সুখীকে ধরিয়া বলিল,চল,এখুনি তোকে যেতে হবে।
সুখী বলিল,ছাড়,কাপড় ছাড়। তারিণী বলিল,আলবত যেতে হবে। হাজার বার-তিনশো বার।
সুখী কাপড়টা টানিয়া বলিল,কাপড় ছাড়-যাব,চল। তারিণী খুশি হইয়া কাপড় ছাড়িয়া দিল। সুখী ভাতের থালাটা লইয়া বাহির হইয়া গেল।
তারিণী বলিতেছিল,চল,তোকে পিঠে নিয়ে ঝাঁপ দোব গনুটের ঘাটে,উঠব পাঁচথুপীর ঘাটে।
সুখী বলিল,তাই যাব,ভাত খেয়ে লাও দেকিন। বাহির হইয়া আসিতে গিয়া দরজার চৌকাঠে কপালে আঘাত পাইয়া তারিণীর আস্ফালনটা একটু কমিয়া আসিল।
ভাত খাইতে খাইতে সে আবার আরম্ভ করিল,তুলি নাই সেবার এক জোড়া গোরু? পনেরো টাকা-পাঁচ টাকা কম এক কুড়ি,শালা মদন গোপ ঠকিয়ে লিলে? তোর হাতের শাঁখা-বাঁধা কি করে হল? বল্,কে-তোর কোন্ নানা দিলে?
সুখী ঘরের মধ্যে আমানি ছাঁকিতেছিল,ঠাণ্ডা জিনিস নেশার পক্ষে ভাল। তারিণী বলিল, শালা মদনা–লিলি ঠকিয়ে–লে। সুখীর শাঁখা-বাঁধা তো হয়েছে,ব্যস্,আমাকে দিস আর না দিস। পড়ে শালা এক দিন ময়ূরাক্ষীর বানে-শালাকে গোটাকতক চোবল দিয়ে তবে তুলি।
সম্মুখে আমানির বাটি ধরিয়া দিয়া সুখী তারিণীর কাপড়ের খুঁট খুলিতে আরম্ভ করিল, বাহির হইল নথখানি আর তিনটি টাকা ।
সুখী প্রশ্ন করিল,আর দু টাকা কই? তারিণী বলিল,কেলে,ওই কেলে,দিয়ে দিলাম কেলেকে–যা,লিয়ে যা ।
সুখী এ কথায় কোন বাদ-প্রতিবাদ করিল না,সে তাহার অভ্যাস নয়। তারিণী আবার বকিতে শুরু করিল,সেবার সেই তোর যখন অসুখ হল,ডাক পার হয় না,পুলিস সায়েব ঘাটে বসে ভাপাইছে, হুঁ হুঁ বাবা-সেই বকশিশে তোর কানের ফুল। যা,তু যা,এখুনি ডাক লদীর পার থেকে,এই,উঠে আয় হারামজাদী লদী। উঠে আসবে,যা যা।
সুখী বলিল,দাঁড়াও আয়নাটো লিয়ে আসি,লতটো পারি। তারিণী খুশি হইয়া নীরব হইল। সুখী আয়না সম্মুখে রাখিয়া নাথ পরিতে বসিল। সে হাঁ করিয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল,ভাত খাওয়া তখন বন্ধ হইয়া গিয়াছে। নথ পরা শেষ হইতেই সে উচ্ছিষ্ট হাতেই আলোটা তুলিয়া ধরিয়া বলিল,দেখি দেখি।
সুখীর মুখে পুলকের আবেশ ফুটিয়া উঠিল,উজ্জল শ্যামবর্ণ মুখখানি তাহার রাঙা হইয়া উঠিল।
তারিণী সাবি-ঠাকরুণকে মিথ্যা কথা বলিয়াছিল। সুখী তণ্বী,সুখী সুশ্রী,উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা,সুখীর জন্য তারিণীর সুখের সীমা নাই।
তারিণী মত্ত অবস্থাতে বলিলেও মিথ্যা বলে নাই। ওই ময়ূরাক্ষীর প্রসাদেই তারিণীর অন্নবস্ত্রের অভাব হয় না। দশহরার দিন ময়ূরাক্ষীর পূজাও সে করিয়া থাকে। এবার তেরো শো বিয়াল্লিশ সালে দশহরার দিন তারিণী নিয়মমত পূজা-অর্চনা করিতেছিল। তাহার পরনে নূতন কাপড়,সুখীর পরনেও নূতন শাড়ি-ঘোষ মহাশয়ের দেওয়া পার্বণী। জলহীন ময়ূরাক্ষীর বালুকাময় গর্ভ গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রে ঝিকমিক করিতেছিল। তখনও পর্যন্ত বৃষ্টি নামে নাই। ভোগপুরের কেষ্ট দাস নদীর ঘাটে নামিয়া একবার দাঁড়াইল। সমস্ত দেখিয়া একবার আকাশের দিকে চাহিয়া বলিল,তাই ভাল করে পুজো কর তারিণী,জল-টল হোক,বান-টান আসুক, বান না এলে চাষ হবে কি করে?
ময়ূরাক্ষীর পলিতে দেশে সোনা ফলে।
তারিণী হাসিয়া বলিল,তাই বল বাপু। লোকে বলে কি জান দাস,বলে,শালা বানের লেগে পুজো দেয়। এই মায়ের কিপাতেই এ মুলুকের লক্ষ্মী। ধর্ ধর্ কেলে,ওরে,পাঠা পালাল,ধর। বলির পাঠাটা নদীগর্তে উত্তপ্ত বালুকার উপর আর থাকিতে চাহিতেছিল না।
পূজা-অর্চনা সুশৃঙ্খলেই হইয়া গেল। তারিণী মদ খাইয়া নদীর ঘাটে বসিয়া কালাচাঁদকে বলিতেছিল,হড়হড়-কলকল-বান,লে কেনে তু দশদিন বাদ।
কালাচাঁদ বলিল,এবার মাইরি,তু কিন্তুক ভাসা জিনিস ধরতে পাবি না। এবার কিন্তুক আমি ধরব,হ্যাঁ।
তারিণী মন্ত হাসি হাসিয়া বলিল,বড় ঘুরণ-চাকে তিনটি বুটবুটি,বুক-বুক-বুক, বাস-কালাচাঁদ ফরসা।
কালাচান্দ অপমানে আগুন হইয়া উঠিল,কি বললি শালা?
তারিণী খাড়া সোজা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, কিন্তু সুখী মধ্যস্থলে দাঁড়াইয়া সব মিটাইয়া দিল। সে বলিল,ছোট বানের সময়-হুই পাকুড়গাছ পর্যন্ত বানে দেওর ধরবে,আর পাকুড়গাছ ছাড়লেই তুমি।
কালাচাঁদ সুখীর পায়ের ধূলা লইয়া কাঁদিয়া বুক ভাসাইয়া দিল,বউ লইলে ই বলে কে?
পরদিন হইতে ডোঙা মেরামত আরম্ভ হইল,দুইজনে হাতুড়ি নেয়ান লইয়া সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রম করিয়া ডোঙাখানাকে প্রায় নূতন করিয়া ফেলিল।
কিন্তু সে ডোঙায় আবার ফাট ধরিল রৌদ্রের টানে। সমস্ত আষাঢ়ের মধ্যে বান হইল না। বান দূরের কথা,নদীর বালি ঢাকিয়া জলও হইল না। বৃষ্টি অতি সামান্য-দুই-চারি পশলা। সমস্ত দেশটার মধ্যে একটা মৃদু কাতর ক্রন্দন যেন সাড়া দিয়া উঠিল। প্রত্যাসন্ন বিপদের জন্য দেশ যেন মৃদুস্বরে কাঁদিতেছিল। কিংবা হয়তো বহুদূরের যে হাহাকার আসিতেছে, বায়ুস্তরবাহিত তাহারই অগ্রধ্বনি এ। তারিণীর দিন আর চলে না। সরকারী কর্মচারীদের বাইসিকল ঘাড়ে করিয়া নদী পার করিয়া দুই-চারিটা পয়সা মেলে,তাহাতেই সে মদ খায়। সরকারী কর্মচারীদের এ সময়ে আসা-যাওয়ার হিরিক পড়িয়া গিয়াছে -তাহারা আসেন দেশে সত্যই অভাব আছে কি না,তাহারই তদন্তে। আরও কিছু মেলে-সে তাঁহাদের ফেলিয়া-দেওয়া সিগারেটের কুটি।
শ্রাবণের প্রথমেই প্রথম বন্যা আসিল। তারিণী হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। বন্যার প্রথম দিন বিপুল আনন্দে সে তালগাছের মত উঁচু পাড়ের উপর হইতে ঝাঁপ দিয়া নদীর বুকে পড়িয়া বন্যার জল আরও উজ্জ্বল ও চঞ্চল করিয়া তুলিল।
কিন্তু তিনদিনের দিন নদীতে আবার হাঁটু-জল হইয়া গেল। গাছে বাঁধা ডোঙাটা তরঙ্গাঘাতে মৃদু মৃদু দোল খাইতেছিল। তাহারই উপর তারিণি ও কালাচাঁদ বসিয়া ছিল-যদি কেহ ভদ্র যাত্রী আসে তাহারই প্রতীক্ষায়,সে হাঁটিয়া পার হইবে না। এ অবস্থায় তাহারা দুইজনে মিলিয়া ডোঙ্গাটা ঠেলিয়া লইয়া যায়।
সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিতেছিল। তারিণী বলিল,ই কি হল বল দেখি কেলে?
চিন্তাকুলভাবে কালাচাঁদ বলিল,তাই তো। তারিণী আবার বলিল,এমন তো কখনও দেখি নাই।
সেই পূর্বের মতই কালাচাঁদ উত্তর দিল,তাই তো।
আকাশের দিকে চাহিয়া তারিণী বলিল,আকাশ দেখ কেনে-ফরসা লী-ল। পচি দিকেও তো ডাকে না!
কালাচাঁদ এবারও উত্তর দিল,তাই তো।
ঠাস করিয়া তাহার গালে একটা চড় কসাইয়া দিয়া তারিণী বলিল-তাই তো! “তাই তো’ বলতেই যেন আমি ওকে বলছি। তাই তো! তাই তো! তাই তো!
কালাচাঁদ একান্ত অপ্রতিভের মত তারিণীর মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। কালাচাঁদের সে দৃষ্টি তারিণী সহ্য করিতে পারিল না,সে অন্য দিকে মুখ ফিরাইয়া বসিল। কিছুক্ষণ পর অকস্মাৎ যেন সচেতনের মত নড়িয়া-চড়িয়া বসিয়া সে বলিয়া উঠিল,বাতাস ঘুরেছে লয় কেলে,পচি বইছে,না? বলিতে বলিতে সে লাফ দিয়া ডাঙ্গায় উঠিয়া শুষ্ক বালি এক মুঠ ঝুরঝুর করিয়া মাটিতে ফেলিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু বায়ুপ্রবাহ অতি ক্ষীণ,পশ্চিমের কি না ঠিক বুঝা গেল না। তবুও সে বলিল,হুঁ পচি থেকে ঠেলা বইছে-একটুকুন। আয় কেলে,মদ খাব,আয়। দু আনা পয়সা আছে আজ। বার করে লিয়েছি আজ সুখীয় খুঁট খুলে।
সস্নেহ নিমন্ত্রণে কালাচাঁদ খুশি হইয়া উঠিয়াছিল। সে তারিণীর সঙ্গ ধরিয়া বলিল, তোমার বউয়ের হাতে টাকা আছে দাদা।বাড়ি গেলে তোমার ভাত ঠিক পাবেই। মলাম আমরাই।
তারিণী বলিল,সুখী বড় ভাল রে কেলে,বড় ভাল। উ না থাকলে আমার‘হাড়ির ললাট ডোমের দুগগতি’ হয় ভাই। সেবার সেই ভাইয়ের বিয়েতে-
বাধা দিয়া কালাচাঁদ বলিল,দাঁড়াও দাদা,একটা তাল পড়ে রইছে,কুড়িয়ে লি।
সে ছুটিয়া পাশের মাঠে নামিয়া পড়িল।
একদল লোক গ্রামের ধারে গাছতলায় বসিয়া ছিল,তারিণী প্রশ্ন করিল,কোথা বাবা যে তোমরা,বাড়ি কোথা?
একজন উত্তর দিল,বীরচন্দপুর বাড়ি ভাই আমাদের,খাটতে যাব আমরা বদ্ধমান।
কাঁলাচান্দ প্রশ্ন করিল,বদ্ধমানে কি জল হইছে নাকি?
জল হয় নাই,ক্যানেল আছে কিনা।
দেখিতে দেখিতে দেশে হাহাকার পড়িয়া গেল। দুর্ভিক্ষ যেন দেশের মাটির তলেই আত্মগোপন করিয়া ছিল,মাটির ফাটলের মধ্য দিয়া পথ পাইয়া সে ভয়াল মূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করিয়া বসিল! গৃহস্থ আপনার ভাণ্ডার বন্ধ করিল;জনমজুরের মধ্যে উপবাস শুরু হইল। দলে দলে লোক দেশ ছাড়িতে আরম্ভ করিল।
সেদিন সকালে উঠিয়া তারিণী ঘাটে আসিয়া দেখিল কালাচাঁদ আসে নাই। প্রহর গড়াইয়া গেল,কালাচাঁদ তবুও আসিল না। তারিণী উঠিয়া কালাচাঁদের বাড়ি গিয়া ডাকিল,কেলে !
কেহ উত্তর দিল না। বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিল,ঘর দ্বার শূন্য-খাঁ খাঁ করিতেছে,কেহ কোথাও নাই। পাশের বাড়িতে গিয়া দেখিল,সে বাড়িও শূন্য। শুধু সে বাড়িই নয়,কালাচাঁদের পাড়াটাই জনশূন্য। পাশের চাষাপাড়ায় গিয়া শুনিল,কালাচাঁদের পাড়ার সকলেই কাল রাত্রে গ্রাম ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে।
হারু মোড়ল বলিল,বললাম আমি তারিণী,যাস না সব,যাস না। তা শুনলে না, বলে,বড়নোকের গায়ে ভিখ করব।
তারিণীর বুকের ভিতরটা কেমন করিতেছিল;সে ওই জনশূন্য পল্লীটার দিকে চাহিয়া শুধু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল।
হারু আবার বলিল,দেশে বড়ানোক কি আছে? সব তলা-ফাঁক। তাদের আবার বড় বেপদ। পেটে না খেলেও মুখে কবুল দিতে পারে না। এইতো কি বলে-গাঁয়ের নাম,ওই যে পলাশডাঙ্গা, পলাশডাঙ্গার ভদ্ধরনোক একজন, গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে। শুধু অভাবে মরেছে।
তারিণী শিহরিয়া উঠিল।
পরদিন ঘাটে এক বীভৎস কাণ্ড! ঘাটের পাশেই এক বৃদ্ধার মৃতদেহ পড়িয়া ছিল। কতকটা তাহার শৃগাল-কুকুরে ছিঁড়িয়া খাইয়াছে। তারিণী চিনিল,একটি মুচি পরিবারের বৃদ্ধ মাতা এ হতভাগিনী। গত অপরাহ্ণে চলচ্ছক্তিহীনা বৃদ্ধার মৃত্যু-কামনা বার বার তাহারা করিতেছিল। বৃদ্ধার জন্যই ঘাটের পাশে গত রাত্রে তাহারা আশ্রয় লইয়াছিল। রাত্রে ঘুমন্ত বৃদ্ধাকে ফেলিয়া তাহারা পালাইয়াছে।
সে আর সেখানে দাঁড়াইল না। বরাবর বাড়ি আসিয়া সুখীকে বলিল,লে সুখী,খান চারেক কাপড় আর গয়না কটা পেট-আঁচলে বেঁধে লে। আর ই গায়ে থাকব না,শহর দিকে যাব। দিন-খাটুনি তো মিলবে।
জিনিসপত্র বাঁধিবার সময় তারিণী দেখিল,হাতের শাখা ছাড়া আর কোন গহনাই সুখীর নাই। তারিণী চমকিয়া উঠিয়া প্রশ্ন করিল,আর?
সুখী ম্লান হাসি হাসিয়া বলিল,এতদিন চলল কিসে,বল?
তারিণীও গ্রাম ছাড়িল।
দিন তিনেক পথ চলিবার পর সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামের প্রান্তে তাহারা রাত্রির জন্য বিশ্রাম লইয়াছিল। গোটা দুই পাকা তাল লইয়া দুইজনে রাত্রির আহার সারিয়া লইতেছিল। তারিণী চট করিয়া উঠিয়া খোলা জায়গায় গিয়া দাঁড়াইল। থাকিতে থাকিতে বলিল,দেখি সুখী, গামছাখানা। গামছাখানা লইয়া হাতে ঝুলাইয়া সেটাকে সে লক্ষ্য করিতে আরম্ভ করিল। ভোরবেলায় সুখীর ঘুম ভাঙিয়া গেল,দেখিল,তারিণী ঠায় জাগিয়া বসিয়া আছে। সে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল,ঘুমোও নাই তুমি?
হাসিয়া তারিণী বলিল,না,ঘুম এল না। সুখী তাহাকে তিরস্কার আরম্ভ করিল, ব্যামো-স্যামো হলে কি করব বল দেখি আমি? ই মানুষের বাইরে বেরুনো কেনে বাপু,
ছি-ছি-ছি!
তারিণী পুলকিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল,দেখেছিস,সুখী দেখেছিস?
সুখী বলিল,আমার মাথামুণ্ডু কি দেখব,বল?
তারিণী বলিল,পিঁপড়েতে ডিম মুখে নিয়ে ওপরের পানে চলল। জল এইবার হবে।
সুখী দেখিল,সত্যই লক্ষ লক্ষ পিপীলিকা শ্রেণীবদ্ধভাবে পোড়ো ঘরখানার দেওয়ালের উপরে উঠিয়া চলিয়াছে। মুখে তাহদের সাদা সাদা ডিম।
সুখী বলিল,তোমার যেমন-
তারিণী বলিল,ওরা ঠিক জানতে পারে,নিচে থাকলে যে জলে বাসা ভেসে যাবে। ইদিকে বাতাস কেমন বইছে,দেখেছিস? ঝাড়া পচ্চিম থেকে।
আকাশের দিকে চাহিয়া সুখী বলিল,আকাশ তো ফটফট-চকচক করছে।
তারিণী চাহিয়া ছিল অন্য দিকে,সে বলিল,মেঘ আসতে কতক্ষণ? ওই দেখ কাকে কুটো তুলছে-বাসার ভাঙা-ফুটো সারবে। আজ এই-খানেই থাক সুখী,আর যাব না;দেখি মেঘের গতিক।
খেয়া-মাঝির পর্যবেক্ষণ ভুল হয় নাই। অপরাহ্ণের দিকে আকাশ মেঘে ছাইয়া গেল,পশ্চিমের বাতাস ক্রমশ প্রবল হইয়া উঠিল।
তারিণী বলিল,ওঠ সুখী,ফিরব।
সুখী বলিল,এই অবেলায়?
তারিণী বলিল,ভয় কি তোর,আমি সঙ্গে রইছি। লে,মাথালি তু মাআয় দে।টিপিটিপি জল ভারি খারাপ।
সুখী বলিল,আর তুমি,তোমায় শরীল বুঝি পাথরের?
তারিণী হাসিয়া বলিল,ওরে ই আমার জলের শরীল,রোদে টান ধরে,জল পেলেই ফোলে। চল,দে,পুঁটুলি আমাকে দে।
ধীরে ধীরে বাদল বাড়িতেছিল। উতলা বাতাসের সঙ্গে অল্প কিছুক্ষণ রিমিঝিমি বৃষ্টি হইয়া যায়,তারপর থামে। কিছুক্ষণ পর আবার বাতাস প্রবল হয়,সঙ্গে সঙ্গে নামে বৃষ্টি।
যে পথ গিয়াছিল তাহারা তিন দিনে,ফিরিবার সময় সেই পথ অতিক্রম করিল দুই দিনে। সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরিয়াই তারিণী বলিল,
দাঁড়া,লদীর ঘাট দেখে আসি। ফিরিয়া আসিয়া পুলকিত চিত্তে তারিণী বলিল,লদী কানায় কানায়,সুখী।
প্রভাতে উঠিয়াই তারিণী ঘাটে যাইবার জন্য সাজিল। আকাশ তখন দুরন্ত দুর্যোগে আচ্ছন্ন,ঝড়ের মতো বাতাস,সঙ্গে সঙ্গে ঝমঝম করিয়া বৃষ্টি।
দ্বিপ্রহরে তারিণী ফিরিয়া আসিয়া বলিল,কামার-বাড়ি চললাম আমি।
সুখী ব্যস্তভাবে বলিল,খেয়ে যাও কিছু।
চিন্তিত মুখে ব্যস্ত তারিণী বলিল,না,ডোঙার একটা বড় গজাল খুলে গেইছে। সে না হলে—উহুঁ অল্প বান হলে না হয় হত,লদী একেবারে পাথার হয়ে উঠেছে;দেখসে আয়। সুখীকে সে না দেখাইয়া ছাড়িল না। পালেদের পুকুরের উঁচু পাড়ের উপর দাঁড়াইয়া সুখী দেখিল,ময়ূরাক্ষীর পরিপূর্ণ রূপ। বিস্তৃতি যেন পারাপারহীন। রাঙা জলের মাথায় রাশি-রাশি পুঞ্জিত ফেনা ভাসা ফুলের মতো দ্রুতবেগে ছুটিয়া চলিয়াছে। তারিণী বলিল,ডাক শুনছিল-সোঁ-সোঁ ? বান আরও বাড়বে! তু বাড়ি যা,আমি চললাম। লইলে কাল আর ডাক পার করতে পারব না।
সুখী অসন্তুষ্ট চিত্তে বলিল,এই জলঝড়—
তারিণী সে কথা কানেই তুলিল না। দুরন্ত দুর্যোগের মধ্যেই সে বাহির হইল।
যখন সে ফিরিল,তখন সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। দ্রুতপদে সে আসিতেছিল । কি একটা‘ডুগডুগ’ শব্দ শোনা যায় না? হাঁ, ডুগডুগিাই বটে। এ শব্দের অর্থ তো সে জানে,আসন্ন বিপদ। নদীর ধারে গ্রামে গ্রামে এই সুরে ডুগডুগি যখন বাজে,তখনই বন্যার ভয় আসন্ন বুঝিতে হয়।
তারিণীর গ্রামের ও-পাশে ময়ূরাক্ষী,এ-পাশে ছোট একটা কাঁতার অর্থাৎ ছোট শাখা-নদী। একটা বাঁশের পুল দিয়া গ্রামে প্রবেশের পথ। তারিণী সঠিক পথ ধরিয়া আসিয়াও বাঁশের পুল খুঁজিয়া পাইল না। তবে পথ ভুল হইল নাকি? অন্ধকারের মধ্যে অনেকক্ষণ পর সে ঠাহর করিল,সে পুলের মুখ এখনও অন্তত একশত বিঘা জমির পরে। ঠিক বন্যার জলের ধারেই সে দাঁড়াইয়া ছিল, আঙুলের ডগায় ছিল জলের সীমা। দেখিতে দেখিতে গোড়ালি পর্যন্ত জলে ডুবিয়া গেল। সে কান পাতিয়া রহিল,কিন্তু বাতাস ও জলের শব্দ ছাড়া কিছু শোনা যায় না,আর একটা গর্জনের মতো গোঁ-গোঁ শব্দ। দেখিতে দেখিতে সর্বাঙ্গ তাহার পোকায় ছাইয়া গেল। লাফ দিয়া দিয়া মাটির পোকা পলাইয়া যাইতে চাহিতেছে।
তারিণী জলে ঝাঁপ দিয়া পড়িল ।
ক্ষিপ্রগতিতে মাঠের জল অতিক্রম করিয়া গ্রামে প্রবেশ করিয়া সে চমকিয়া উঠিল। গ্রামের মধ্যেও বন্যা প্রবেশ করিয়াছে। এককোমর জলে পথঘাট ঘরদ্বার সব ভরিয়া গিয়াছে। পথের উপর দাঁড়াইয়া গ্রামের নরনারী আর্ত চীৎকার করিয়া এ উহাকে ডাকিতেছে। গোরু ছাগল ভেড়া কুকুরের সে কি ভয়ার্ত চীৎকার। কিন্তু সে সমস্ত শব্দ আচ্ছন্ন করিয়া দিয়াছিল ময়ূরাক্ষীর গর্জন,বাতাসের অট্টহাস্য,আর বর্ষণের শব্দ;লুণ্ঠনকারী ডাকাতের দল অট্টহাস্য ও চীৎকারে যেমন করিয়া ভয়ার্ত গৃহস্থের ক্রন্দন ঢাকিয়া দেয়,ঠিক তেমনই ভাবে।
গভীর অন্ধকারে পথও বেশ চেনা যায় না ।
জলের মধ্যে কি একটা বস্তুর উপর তারিণীর পা পড়িল,জীব বলিয়াই বোধ হয়। হেঁট হইয়া তারিণী সেটাকে তুলিয়া দেখিল,ছাগলের ছানা একটা,শেষ হইয়া গিয়াছে। সেটাকে ফেলিয়া দিয়া কোনরূপে সে বাড়ির দরজায় আসিয়া ডাকিল,সুখী-সুখী!
ঘরের মধ্য হইতে সাড়া আসিল-অপরিমেয় আশ্বস্ত কণ্ঠস্বরে সুখী সাড়া দিল,এই যে, ঘরে আমি।
ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া তারিণী দেখিল,ঘরের উঠানে এক-কোমর জল। দাওয়ার উপর এক-হাঁটু জলে চালের বাঁশ ধরিয়া সুখী দাঁড়াইয়া আছে।
তারিণী তাহার হাত টানিয়া ধরিয়া বলিল,বেরিয়ে আয়,এখন কি ঘরে থাকে,ঘর চাপা পড়ে মরবি যে ।
সুখী বলিল,তোমার জন্যই দাঁড়িয়ে আছি। কোথা খুঁজে বেড়াতে বল দেখি?
পথে নামিয়া তারিণী দাঁড়াইল,বলিল,কি করি বল দেখি সুখী?
সুখী বলিল,এইখানেই দাঁড়াও। সবার যা দশা হবে আমাদেরও তাই হবে।
তারিণী বলিল, বান যদি আরও বাড়ে সুখী? গোঁ-গোঁ ডাক শুনছিস না?
সুখী বলিল,আর কি বান বাড়ে গো? আর বান বাড়লে দেশের কি থাকবে? ছিষ্টি কি আর লষ্ট করবে ভগবান?
তারিণী এ আশ্বাস গ্রহণ করিবার চেষ্টা করিল,কিন্তু পারিল না। একটা হুড়মুড় শব্দের সঙ্গে বন্যার জল ছটকাইয়া দুলিয়া উঠিল। তারিণী বলিল,আমাদেরই ঘর পড়ল সুখী। চল্, আর লয়,কোমরের ওপর উঠল,তোর তো এক-ছাতি হইছে তা হলে।
অন্ধকারে কোথায় বা কাহার কণ্ঠস্বর বোঝা গেল না,কিন্তু নারীকণ্ঠের কাতর ক্রন্দন ধ্বনিয়া উঠিল,ওগো,খোকা পড়ে গেইছে বুক থেকে। খোকা রে!
তারিণী বলিল,এইখানেই থাকবি সুখী,ডাকলে সাড়া দিস। সে অন্ধকারে মিলাইয়া গেল। শুধু তাহার কণ্ঠস্বর শোনা যাইতেছিল,কে? কোথা? কার ছেলে পড়ে গেল,সাড়া দাও ওই!
ওদিক হইতে সাড়া আসিল,এই যি।
তারিণী আবার হাকিল,ওই!
কিছুক্ষণ ধরিয়া কলমস্বরের সঙ্কেতের আদান-প্রদান চলিয়া সে শব্দ বন্ধ হইয়া গেল। তাহার পরই তারিণী ডাকিল,সুখী!
সুখী সাড়া দিল,অ্যাঁ ?
শব্দ লক্ষ্য করিয়া তারিণী আসিয়া বলিল,আমার কোমর ধর সুখী। গতিক ভাল নয়।
সুখী আর প্রতিবাদ করিল না। তারিণীর কোমরের কাপড় ধরিয়া বলিল,কার ছেলে বটে? পেলে?
তারিণী বলিল,পেয়েছি,ভূপতে ভল্লার ছেলে।
সন্তর্পণে জল ভাঙিয়া তাহারা চলিয়াছিল। জল ক্রমশ যেন বাড়িয়া চলিয়াছে। তারিণী বলিল,আমার পিঠে চাপ সুখী। কিন্তু এ কোন্ দিকে এলাম সুখী,ই—ই—
কথা শেষ হইবার পূর্বেই অথই জলে দুইজনে ডুবিয়া গেল। পরক্ষণেই কিন্তু তারিণী ভাসিয়া উঠিয়া বলিল,লদীতেই বা পড়লাম সুখী। পিঠ ছেড়ে আমার কোমরের কাপড় ধরে ভেসে থাক ।
স্রোতের টানে তখন তাহারা ভাসিয়া চলিয়াছে। গাঢ় গভীর অন্ধকার,কানের পাশ দিয়া বাতাস চলিয়াছে-হু-হু শব্দে,তাহারই সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে ময়ূরাক্ষীর বানের হুড়দুড় শব্দ। চোখে মুখে বৃষ্টির ছাট আসিয়া বিঁধিতেছিল তীরের মতো। কুটার মতো তাহারা চলিয়াছে-কতক্ষণ,তাহার অনুমান হয় না;মনে হয়,কত দিন কত মাস তাহার হিসাব নাই-নিকাশ নাই। শরীরও ক্রমশ যেন আড়ষ্ট হইয়া আসিতেছিল। মাঝে মাঝে ময়ূরাক্ষীর তরঙ্গ শ্বাসরোধ করিয়া দেয়। কিন্তু সুখীর হাতের মুঠি কেমন হইয়া আসে যে! সে যে ক্রমশ ভারী হইয়া উঠিতেছে! তারিণী ডাকিল,সুখী-সুখী !
উন্মত্তার মতো সুখী উত্তর দিল,অ্যাঁ?
ভয় কি তোর, আমি—
পর-মুহূর্তে তারিণী অনুভব করিল,অতল জলের তলে ঘুরিতে ঘুরিতে তাহারা ডুবিয়া চলিয়াছে। ঘূর্ণিতে পড়িয়াছে তাহারা। সমস্ত শক্তি পুঞ্জিত করিয়া সে জল ঠেলিবার চেষ্টা করিল। কিছুক্ষণেই মনে হইল,তাহারা জলের উপরে উঠিয়াছে। কিন্তু সম্মুখের বিপদ তারিণী জানে,এইখানে আবার ডুবিতে হইবে। সে পাশ কাটাইবার চেষ্টা করিল। কিন্তু এ কি,সুখী যে নাগপাশের মতো তাহাকে জড়াইয়া ধরিতেছে? সে ডাকিল,সুখী-সুখী
ঘুরিতে ঘুরিতে আবার জলতলে চলিয়াছে। সুখীর কঠিন বন্ধনে তারিণীর দেহও যেন অসাড় হইয়া আসিতেছে। বুকের মধ্যে হৃদপিণ্ড যেন ফাটিয়া গেল। তারিণী সুখীর দৃঢ় বন্ধন শিথিল করিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু সে আরও জোরে জড়াইয়া ধরিল। বাতাস-বাতাস! যন্ত্রণায় তারিণী জল খামচাইয়া ধরিতে লাগিল। পর-মুহূর্তে হাত পড়িল সুখীর গলায়। দুই হাতে প্রবল আক্রোশে সে সুখীর গলা পোষণ করিয়া ধরিল। সে কি তাহার উন্মত্ত ভীষণ আক্রোশ। হাতের মুঠিতেই তাহার সমস্ত শক্তি পুঞ্জিত হইয়া উঠিয়াছে। যে বিপুল ভারটা পাথরের মতো টানে তাহাকে অতলে টানিয়া লইয়া চলিয়াছিল,সেটা খসিয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে সে জলের উপরে ভাসিয়া উঠিল। আঃ,আঃ–বুক ভরিয়া বাতাস টানিয়া লইয়া আকুলভাবে সে কামনা করিল, আলো ও মাটি।

প্রকাশকালঃ ২৭শে মার্চ,২০২০

ভারতবর্ষ। রমাপদ চৌধুরী ।।

ফৌজী সংকেতে নাম ছিল বি এফ থ্রি-থার্টি-টু, সেটা আদপে কোনো স্টেশনই ছিলো না, না প্ল্যাটফর্ম, না টিকিটঘর । শুধু একদিন দেখা গেল ঝকঝকে নতুন কাঁটাতার দিয়ে রেল লাইনের ধারটুকু ঘিরে দেওয়া হয়েছে। ব্যস্‌ , ঐটুকুই। সারা দিনে আপ-ডাউনের একটা ট্রেনও থামতো না। থামতো শুধু একটি বিশেষ ট্রেন। হঠাৎ এক-একদিন সকালবেলায় এসে থামত। কবে কখন সেটা থামবে, তা শুধু আমরাই আগে থেকে জানতে পেতাম, বেহারী কুক ভগোতীলালকে নিয়ে আমরা পাঁচজন।

স্টেশন ছিলো না, ট্রেন থামতো না, তবু রেলের লোকদের মুখে মুখে একটা নতুন নাম চালু হয়ে গিয়েছিলো। তা থেকে আমরাও বলতাম ‘আণ্ডাহল্ট’।

আন্ডা মানে ডিম। আণ্ডাহল্টের কাছ ঘেঁষে দুটো বেঁটেখাটো পাহাড়ী টিলার পায়ের নীচে একটা মাহাতোদের গ্রাম ছিল, গ্রামে-ঘরে মুর্গী চরে বেড়াতো দূরে, অনেক দূরে ভূরকুণ্ডার শনিচারী হাটে-হাটে সেই মুর্গী কিংবা মুর্গীর ডিম বেচতেও যেতো মাহাতোরা। কখনো সাধের মোরগ বগলে চেপে মোরগ-লড়াই খেলতে যেতো। কিন্তু সেজন্য বি এফ থ্রি থার্টি টু-র নাম আণ্ডাহল্ট হয়ে যায়নি।

আসলে মাহাতোগাঁয়ের ডিমের ওপর আমাদের কোনো লোভই ছিলো না।

আমাদের ঠিকাদারের সঙ্গে রেলওয়ের ব্যবস্থা ছিল, একটা ঠেলা-ট্রলিও ছিলো তার, লাল শালু উড়িয়ে সেটা রেলের ওপর দিয়ে গড়িয়ে এসে মালপত্র নামিয়ে দিয়ে যেতো। নামিয়ে দিয়ে যেতো রাশি রাশি ডিম। বেহারী কুক ভগোতীলাল আগের রাত্রে সেগুলো সেদ্ধ করে রাখতো।

কিন্তু সেজন্যেও নাম আণ্ডাহল্ট হয়নি। হয়েছিল ফুল-বয়েলড ডিমের খোসা কাঁটাতারের ওপারে ক্রমশ স্তূপীকৃত হয়ে জমেছিলো বলে। ডিমের খোসা দিনে দিনে পাহাড় হচ্ছিল বলে।

ফৌজী ভাষার বি এফ থ্রি থার্টি টু-র প্রথমেই যে দুটো অ্যালফাবেট, আমাদের ধারণা ছিলো তা কোনো সংকেত নয়, ব্রেকফাস্ট কথাটার সংক্ষিপ্ত রূপা।

রামগড়ে তখন পি ও ডবলু ক্যাম্প, ইটালিয়ান যুদ্ধবন্দীরা সেখানে বেয়নেটে আর কাঁটাতারে ঘেরা। তাদেরই মাঝে মাঝে একটা ট্রেনে বোঝাই করে এ পথ দিয়ে কোথায় যেন চালান করে দিতো। কেন এবং কোথায়, আমরা কেউ জানতাম না।

শুধু আমরা খবর পেতাম ভোরবেলায় একটা ট্রেন এসে থামবে। ঠিকাদারের চিঠি পড়ে আগের দিন ডিমের ঝুড়িগুলো দেখিয়ে কুক ভগোতীলালকে বলতাম, তিনশো তিশ ব্রেকফাস্ট।

ভগোতীলাল গুনে গুনে ছ’শো ষাট আর গোটা পঁচিশ ফাউ বের করে নিতো। যদি পচা বের হয়। তারপর সেগুলো জলে ফুটিয়ে শক্ত ইট হয়ে গেলে তিনটে সার্ভার কুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে খোসা ছাড়াতো।

কাঁটাতারের ওপারে সেগুলোই দিনে দিনে স্তূপীকৃত হতো।

সক্কাল বেলায় ট্রেন এসে থামতো, আর সঙ্গে সঙ্গে কামরা থেকে ট্রেনের দু পাশে ঝুপঝাপ নেমে পড়তো মিলিটারি গার্ড। সঙ্গিন উঁচু-করা রাইফেল নিয়ে তারা যুদ্ধবন্দীদের পাহারা দিতো।

ডোরাকাটা পোশাকের বিদেশী বন্দীরা একে একে কামরা থেকে নেমে আসতো বড়সড়ো মগ আর এনামেলের থালা হাতে

দুটো বড়-বড় ড্রাম উলটে রেখে সে দুটোকেই টেবিল বানিয়ে সার্ভার কুলি তিনজন দাঁড়াত। আর ওরা লাইন দিয়ে একে-একে এগিয়ে এসে ব্রেকফাস্ট নিতো। একজন কফি ঢেলে দিতো মগে, একজন দু পিস করে পাঁউরুটি দিতো, আরেকজন দিত দুটো করে ডিম। ব্যস্‌, তারপর ওরা গিয়ে গাড়িতে উঠতো। কাঁধে আই-ই. খাকি বুশ-শার্ট পরা গার্ড হুইস্‌ল্‌ দিতো, ফ্লাগ নাড়তো, ট্রেন চলে যেতো।

মাহাতোরা কেউ কাছে আসতো না, দূরে দূরে ক্ষেতিতে জনারের বীজ রুইতে রুইতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে দেখতো।

ট্রেন চলে যাওয়ার পরে ভগোতীলালের জিম্মায় টেস্ট রেখে আমরা কোনো কোনো দিন মাহাতোদের গ্রামের দিকে চলে যেতাম সবজির খোঁজে। পাহাড়ের ঢালুতে পাথুরে জমিতে ওরা সর্ষে বুনতো, বেগুন আর ঝিঙেও।

আণ্ডাহল্ট একদিন হল্ট-স্টেশন হয়ে গেল রাতারাতি। মোরম ফেলে লাইনের ধারে কাঁটাতারে ঘেরা জায়গাটুকু উঁচু করা হলো প্ল্যাটফর্মের মতো।

তখন আর শুধু পি-ও-ডব্লু নয়, মাঝে মাঝে মিলিটারি স্পেশালও এসে দাঁড়াতো। গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট পরা হিপ পকেটে টাকার ব্যাগ গোঁজা আমেরিকান সৈনিকদের স্পেশাল মিলিটারি পুলিশ ট্রেন থেকে নেমে পায়চারি করতো, দু-একটা ঠাট্টাও ছুঁড়তো, আর সৈনিকের দল তেমনি সারি দিয়ে মগ আর থালা হাতে একে একে রুটি নিতো, ডিম নিতো, মগভরতি কফি। তারপরে যে যার কামরায় আবার উঠতো, খাকি বুশ-শার্টের গার্ড হুইস্‌ল্‌ বাজিয়ে ফ্লাগ নাড়তো, আমি ছুটে গিয়ে সাপ্লাই ফর্মে মেজরকে দিয়ে ও-কে করাতাম।

ট্রেন চলে যেতো, কোথায় কোন্‌দিকে আমরা কেউ জানতে পারতাম না।

সেদিনও এমনি আমেরিকান সোলজারদের ট্রেন এসে দাঁড়াল। সার্ভার কুলি তিনটে ডিম রুটি কফি সার্ভ করছিলো। ভগোতীলাল নজর রাখছিলো কেউ ডিম পচা কিংবা রুটি স্লাস-এন্ড বলে ছুঁড়ে দেয় কি না।

ঠিক সেই সময় আমার হঠাৎ চোখ গেল কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে।

কাঁটাতার থেকে আরো খানিক দূরে নেংটি-পরা মাহাতোদের একটি ছেলে চোখ বড়ো করে তাকিয়ে দেখছে। কোমরের ঘুনসিতে লোহার টুকরো বাঁধা ছেলেটাকে একটা বাচ্চা মোষের পিঠে বসে যেতে দেখেছি একদিন।

ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিলো ট্রেনটা। কিংবা রাঙামুখ আমেরিকান সৈনিকদের দেখছিল।

একজন সৈনিক তাকে দেখতে পেয়ে হঠাৎ ‘হে-ই’ বলে চিৎকার করলো, আর সঙ্গে সঙ্গে নেংটি-পরা ছেলেটা পাঁইপাঁই করে ছুটে পালালো মাহাতোদের গাঁয়ের দিকে কয়েকটা আমেরিকান সৈনিক তখন হা-হা করে হাসছে।

ভেবেছিলাম ছেলেটা আর কোনো দিন আসবে না।

মাহাতোরা কেউ আসতো না, কেউ না। ক্ষেতিতে কাজ করতে করতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ওরা শুধু অবাক-অবাক চোখ মেলে দূর থেকে দেখতো।

কিন্তু তারপর আবার যেদিন ট্রেন এলো, ট্রেন থামল, সেদিন আবার দেখি কোমরের ঘুনসিতে লোহা বাঁধা ছেলেটা কাঁটাতারের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে আরেকটা ছেলে, তার চেয়ে আরেকটু বেশী বয়েস। গলায় লাল সুতোয় ঝুলোনো দস্তার তাবিজ, ভূরকুণ্ডার হাটে একদিন গিয়েছিলাম, রাশি রাশি বিক্রি হয় মাটিতে ঢেলে, রাশি রাশি সিঁদুর, তাবিজ, তামার পিতলের দস্তার, বাঁশে ঝোলানো থাকে রঙিন সুতলি, পুঁতির মালা। একটা ফেরিওলাকে দেখেছি কখনো কখনো এক হাঁটু ধুলো নিয়ে, কাঁধে অগুন্তি পুঁতির ছড়, দূর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাহাতোদের গাঁয়ের দিকে যায়।

ছেলে দুটো অবাক-অবাক চোখ মেলে কাঁটাতারের ওপারে দাঁড়িয়ে আমেরিকান সৈনিকদের দেখছিলো। প্রথম দিনের বাচ্চাটার চোখে একটু ভয়, হাঁটু তৈরি, কেউ চোখে একটু ধমক মাখালেই সে চট করে হরিণ হয়ে যাবে।

আমি হাতে ফর্ম নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিলাম, সুযোগ পেলে হেসে হেসে মেজরকে তোয়াজ করছিলাম। একজন সৈনিক তার কামরার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মগে চুমুক দিতে দিতে ছেলে দুটোকে দেখে পাশের জি আই-কে বললে, অফুল!

আমার এতদিন মনে হয়নি। ওরা তো দিব্যি ক্ষেতে-খামারে কাজ করে, গুল্‌তি নয়তো তীরধনুক নিয়ে খাটাশ মারে, নাটুয়া গান শোনে, হাঁড়িয়া খায়, ধনুকের ছিলার মতো কখনো টান টান হয়ে রুখে দাঁড়ায়। নেংটি-পরা সরু শরীর, কালো, রুক্ষ। কিন্তু ব্যাটা জি আই-এর ‘অফুল’ কথাটা যেন আমাকে খোঁচা দিলো। ছেলে দুটোর ওপর আমার খুব রাগ হলো।

সৈনিকদের কে একজন গলা ছেড়ে এক কলি গান গাইলো, দু-একজন হা-হা করে হাসছিলো, একজন চটপট কফির মগে চুমুক দিয়ে সার্ভার কুলিটাকে চোখ মেরে আবার ভরতি করে দিতে বললে। গার্ড এগিয়ে দেখতে এলো আর কত দেরি পাঞ্জাবী গার্ড কিন্তু দিব্যি চন্দ্রবিন্দু লাগিয়ে কথা বললে মেজরের সঙ্গে।

তারপর হুইস্‌ল্‌ বাজলো, ফ্ল্যাগ নড়লো, সবাই চটপট উঠে পড়লো ট্রেনে, হাতে চওড়া লাল ফিতে বাঁধা মিলিটারি পুলিশরাও।

ট্রেন চলে গেলে আবার সেই শূন্যতা, ধু-ধু বালির মধ্যে ফণিমনসার গাছের মতো শুধু সেই কাঁটাতারের বেড়া।

দিন কয়েক পরেই আবার একটা ট্রেন এলো। এবার পি-ও-ডবলু গাড়ি, ইটালিয়ান যুদ্ধবন্দীরা রামগড় থেকে আবার কোথাও চালান হচ্ছে। কোথায় আমরা জানতাম না, জানতে চাইতাম না।

ওদের পরনে স্ট্রাইপ-দেওয়া অন্য পোশাক, মুখে হাসি নেই, রাইফেল উঁচিয়ে সারাক্ষণ ওদেরই ট্রেনটা চারদিক থেকে গার্ড দেওয়া হতো। আমাদেরও একটু ভয় ভয় করতো। ভূরকুণ্ডায় গল্প শুনে এসেছিলাম, একজন নাকি ধুতিপাঞ্জাবি পরে পালাবার চেষ্টা করেছিলো, পারেনি। বাঙালী বলেই আমার আরো ভয়-ভয় করতো।

ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর লক্ষ্য করলাম, কাঁটাতারের ওপারে শুধু সেই বাচ্চা ছেলে দুটো, খাটো কাপড়ের একটা বছর পনেরোর মেয়ে, দুটো পুরুষ ক্ষেতের কাজ ছেড়ে এসে দাঁড়িয়েছিলো। ট্রেন চলে যাওয়ার পর ওরা নিজেদের মধ্যে কি সব বলাবলি করলো, হাসলো, কলকল করতে করতে ঝরনার জলের মতো মাহাতোদের গাঁয়ের দিকে চলে গেল।

একজন, দুজন, পাঁচজন সেদিন দেখি জন দশেক মাহাতোগাঁয়ের লোক ট্রেন আসতে দেখেই মাঠ থেকে দৌড়তে শুধু করেছে। ট্রেনের জানালায় জানালায় খাকি রঙ দেখেই বোধ হয় ওরা বুঝতে পারতো। দিনে দুখানা প্যাসেঞ্জার মেল ট্রেনের মতো হুস করে বেরিয়ে যেতো, দু একখানা গুডস ট্রেন ঠুং-ঠুং করতে করতো তখন তো কই থামবে ভেবে মাহাতোগাঁয়ের লোক আসতো না ভিড় করে!

একদিন গিয়ে বলেছিলাম মাহাতোবুড়োকে, লোক পাঠিয়ে আমাদের আণ্ডাহল্টের তাঁবুতে বেচে আসতে সবজি আর চিংড়ি, সরপুঁটি, মৌরলা।

বুড়ো হেসে বলেছিল–ক্ষেতির কাজ ছেড়ে যাবো নাই।

তাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম। কালো কালো নেংটি-পরা লোকগুলোকে, খাটো শাড়ির মেয়েগুলোকে। শুধু খালি-গা মাহাতোবুড়োর পায়ে একটা টাঙি জুতো, গেঁয়ো মৃধার কাছে বানানো টাঙি জুতো, এসে সারি দিয়ে ওরা কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে দাঁড়ালো।

ট্রেন ততক্ষণে এসে গেছে। ঝুপঝাপ নেমে পড়ে আমেরিকান সৈনিকের দল সারি দিয়ে চলেছে মগ আর থালি হাতে

দুশো আঠারো ব্রেকফাস্ট তখন রেডি বি এফ থ্রি থার্টি টু-তো বি এফ থ্রি থার্টি টু মানে আণ্ডাহল্ট।

তখন একটু শীত-শীত পড়তে শুরু করেছে। দূরের পাহাড়ে কুয়াশার মাফলার জড়ানো গাছগাছালি শিশির-ধোয়া সবুজ।

একজন সৈনিক ইয়াঙ্কি গলায় মুগ্ধতা প্রকাশ করলো।

আরেকজন কামরার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁটাতারের ওপারের রিক্ততার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো। হঠাৎ কফির মগটা ট্রেনের পা-দানিতে রেখে সে হিপ পকেটে হাত দিলো। ব্যাগ থেকে একটা চকচকে আধুলি বের করে ছুঁড়ে দিলো মাহাতোদের দিকে।

ওরা অবাক হয়ে সৈনিকটার দিকে তাকালো, কাঁটাতারের ভিতরে মোরামের ওপর পড়ে থাকা চকচকে আধুলিটার দিকে তাকালো, নিজেরা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো, তারপর অবাক হয়ে শুধু তাকিয়েই রইলো।

ট্রেনটা চলে যাবার পর ওরা নিঃশব্দে ফিরে চলে যাচ্ছিলো দেখে আমি বললাম, সাহেব বখশিস দিয়েছে, বখশিস তুলে নে ।

সবাই সকলের মুখের দিকে তাকালো, কেউ এগিয়ে এলো না।

আমি আধুলিটা তুলে মাহাতোবুড়োর হাতে দিলাম। সে বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর সবাই নিঃশব্দে চলে গেল। কারও মুখে কোনো কথা নেই।

আমার এই ঠিকাদারের তাঁবেদারি একটুও ভালো লাগতো না। জনমনুষ্য নেই, একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন দাঁড়ায় না, তাঁবুতে ভগোতীলাল আর তিনটে কুলি। নির্জন, নির্জন মাটি রুক্ষ, দুপুরের আকাশ রুক্ষ, রুক্ষ আমার মন।

মাহাতোগাঁয়ের লোকরাও কাছে ঘেঁষতো না। মাঝে মাঝে গিয়ে সবজি কিংবা চুনো মাছ কিনে আনতাম। ওরা বেচতে আসতো না, কিন্তু ভূরকুণ্ডার হাটে যেতো তিন ক্রোশ পথ হেঁটে।

দিন কয়েক কোনো ট্রেনের খবর ছিলো না। চুপচাপ, চুপচাপ।

হঠাৎ সেই কোমরের ঘুনসিতে লোহা-বাঁধা ছেলেটা একদিন এসে জিগ্যেস করলো, টিরেন আসবে না বাবু?

হেসে ফেলে বললাম, আসবে, আসবে।

ছেলেটার আর দোষ কি, বেঁটে বেঁটে পাহাড়, রুক্ষ জমি, একটা দেহাতী ভিড়ের বাস দেখতে হলেও দু’ ক্রোশ হেঁটে যেতে হয় খয়েরগাছের ঝোপের মধ্যে দিয়ে। সকালে একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন একটুও স্পীড না কমিয়ে হুস করে বেরিয়ে যেতো, বিকেলের ডাউন ট্রেনটাও থামতো না, তবু কয়েক মুহূর্ত জানালায় জানালায় ঝাপসা মুখ দেখার জন্যে আমরা তাঁবুর ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসতাম মানুষ না দেখে আমরা হাঁপিয়ে উঠতাম।

তাই আমেরিকান সৈনিকদের স্পেশাল ট্রেন আসছে শুনলে যেমন বিব্রত বোধ করতাম তেমনি আবার স্বস্তিও ছিলো।

দিন কয়েক পরেই প্রথমে এলো খবর, তার পরদিন মিলিটারি স্পেশাল ঝুপঝাপ করে জি আইরা নামলো, সারি দিয়ে সব ডিম রুটি মগ-ভরতি কফি নিলো।

হঠাৎ তাকিয়ে দেখি কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে মাহাতোগাঁয়ের ভিড় ভেঙে পড়েছে। বিশ হতে পারে, তিরিশ হতে পারে, হাঁটুসমান বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কত কে জানে। খাটো শাড়ির মেয়েগুলোও বোকা-বোকা চোখ মেলে তাকিয়ে ছিলো। ওদের দেখে আমার কেমন ভয়-ভয় করলো। ভগোতীলাল কিংবা সার্ভার কুলি তিনটে মাহাতোগাঁয়ের দিকে যেতে চাইলে আমার বড় ভয়-ভয় করতো।

প্ল্যাটফর্ম তো ছিলো না, শুধু উঠতে নামতে সুবিধের জন্যে লাইনের ধারটুকু মোরম ফেলে উঁচু করা হয়েছিলো। আমেরিকান সৈনিকরা কফির মগে চুমুক দিতে দিতে পায়চারি করছিলো। দু একজন স্থির দৃষ্টিতে মাহাতোগাঁয়ের কালো কালো মানুষগুলোকে দেখছিল।

হঠাৎ একজন ভগোতীলালের দিকে এগিয়ে গিয়ে হিপ পকেট থেকে ব্যাগ বের করলো, ব্যাগ থেকে একখানা দু’ টাকার নোট, তারপর জিগ্যেস করলে, কয়েনস আছে? নোটভাঙানো খুচরো সৈনিকরা কেউ রাখতেই চাইতো না, পয়সা ফেরত না নিয়ে দোকানী কিংবা ফেরিওয়ালা কিংবা ট্যাকসি ড্রাইভারকে বলতো, ঠিক আছে, ঠিক আছে। রাঁচিতে গিয়ে কয়েকবার দেখেছি।

এক-আনি, দু-আনি আর সিকি মিলিয়ে ভগোতীলাল ভাঙিয়ে দিচ্ছিলো, হঠাৎ দেখি কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে ভিড়ের ভিতর থেকে কোমরের ঘুনসিতে লোহার টুকরো বাঁধা সেই ছেলেটা হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে কি চাইছে।

সঙ্গে সঙ্গে ভগোতীলালের কাছ থেকে সেই খুচরো আনি-দুয়ানিগুলো মুঠোর মধ্যে নিয়ে সেই আমেরিকান সৈনিক মাহাতোদের দিকে ছুঁড়ে দিলো।

আমার তখন সাপ্লাই ফর্ম ও-কে করানো হয়ে গেছে, গার্ড হুইস্‌ল্‌ দিয়েছে।

ট্রেন চলতে শুরু করেছে, অমনি মাহাতোদের দিকে ফিরে তাকালাম।

ওরা তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো, তাকিয়ে ছিলো। তারপর হঠাৎ, লাল মোরামের ওপর, ছড়ানো পয়সাগুলোর ওপর কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো কোমরের ঘুনসিতে লোহা বাঁধা ছেলেটা আর গলায় লাল সুতলিতে দস্তার তাবিজ-বাঁধা ছেলেটা।

সেই মুহূর্তে টাঙি-জুতো পরা মাহাতোবুড়ো ধমক দিয়ে বলে উঠলো, খবর্দার ! এমন জোরে চিৎকার করলো যে আমি নিজেও চমকে উঠেছিলাম।

কিন্তু বাচ্চা দুটো ওর কথা শুনলো না। তারা দুজনে তখন যে যত পেরেছে আনি দু-আনি কুড়িয়ে নিয়েছে। মুখ খোসা-ছাড়ানো কচি ভুট্টার মতো হাসছে। মেয়েপুরুষের সমস্ত ভিড় হাসছে।

টাঙি-জুতো পরা মাহাতোবুড়ো রেগে গিয়ে তাদের ভাষায় অনর্গল কি সব বলে গেল। মেয়েপুরুষের ভিড় হাসলো।

মাহাতোবুড়ো রাগে গজগজ করতে করতে গাঁয়ের দিকে চলে গেল একাই। মাহাতোগাঁয়ের লোকগুলোও চলে গেল কলকল কথা বলতে বলতে, খলখল হাসতে হাসতে

ওরা চলে যেতেই আণ্ডাহল্ট আবার নির্জন নিস্তব্ধ শূন্যতা আমার এক-এক সময় ভীষণ মন খারাপ হয়ে যেতো। দূরে দূরে পাহাড়, মহুয়ার বন, খয়েরের ঝোপ পার হয়ে একটা ছোট্ট জল চোঁয়ানো ঝরনা, মাহাতোগাঁয়ের সবুজ ক্ষেত। চোখ জুড়িয়ে যায়, চোখ জুড়িয়ে যায় তার মধ্যে। কালো কালো নেংটি-পরা মানুষ।

এদিকে মাঝে মাঝেই আমেরিকান সোলজারদের ট্রেন আসে, থামে, ডিম রুটি মগ-ভরতি কফি খেয়ে চলে যায়। মাহাতোগাঁয়ের লোক ভিড় করে আসে, কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে সারি দিয়ে দাঁড়ায়।

–সাব বখশিস, সাব বখশিস!

একসঙ্গে অনেকগুলো দেহাতী গলা চিৎকার করে উঠল।

মেজরের কাছে ফর্ম ও-কে করাতে গিয়ে আমি চমকে ফিরে তাকালাম। দেখলাম, শুধু বাচ্চা ছেলে দুটো নয়, কয়েকটা জোয়ান পুরুষও হাত বাড়িয়েছে। খাটো শাড়ির একটা তুখোড় শরীরের মেয়েও ।

একদিন সবজি নিতে গিয়েছিলাম, ঐ মেয়েটা হেসে হেসে জিগ্যেস করেছিলো, টিরেন কবে আসবে ?

এক-একদিন অকারণেই ওরা দল বেঁধে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো, অপেক্ষা করে করে চলে যেতো।

কাঁধে-স্ট্রাইপ তিন-চারটে আমেরিকান ততক্ষণে হিপ পকেট থেকে মুঠো মুঠো আনি দু-আনি বের করে ওদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে। ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষা করেনি, ওরা হুমড়ি খেয়ে পড়লো পয়সাগুলোর ওপর। হুড়োহুড়িতে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়তে গিয়ে হাত-পা ছড়ে গেল কারও, কারও বা নেংটির কাপড় ফেঁসে গেল।

ট্রেন চলে যাওয়ার পর ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম ওদের। মনে হলো মাহাতোগাঁয়ের আধখানাই এসে জড় হয়েছে। সবারই মুখে স্ফুর্তির হাসি, সবাই কিছু-না-কিছু পেয়েছে। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেই টাঙি-জুতোর মাহাতোবুড়োকে দেখতে পেলাম না। মাহাতোবুড়ো আসেনি। সেদিন ওর আপত্তি, ওর ধমক শুনেও পয়সাগুলো ফেলে দেয়নি ছেলে দুটো। তাই বোধ হয় রেগে গিয়ে আর আসেনি।

আমার ভাবতে ভালো লাগল বুড়োটা ক্ষেতে দাঁড়িয়ে একা-একা মাটি কোপাচ্ছে।

আমাদের দিন, কুক ভগোতীলালকে নিয়ে আমাদের পাঁচজনের দিন আণ্ডাহল্টের তাঁবুর মধ্যে কোনোরকমে কেটে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে এক-একদিন সৈনিক-বোঝাই ট্রেন আসছিলো, থামছিলো, চলে যাচ্ছিলো। মাহাতোগাঁয়ের লোক ভিড় করে এসে কাঁটাতারের ধারে সারি দিয়ে দাঁড়াতো, হাত বাড়িয়ে সবাই ‘সাব বখশিস, সাব বখশিস’ চেঁচাতো।

হঠাৎ এক-একদিন মাহাতোবুড়োকে দেখতে পেতাম কোনো দিন ক্ষেতের কাজ ফেলে দু হাতের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে হনহন করে এগিয়ে আসতো, রেগে গিয়ে ধমক দিতে সকলকে ওর কথা শুনছে না বলে কখনো বা অসহায় প্রতিবাদের চোখে গাঁয়ের লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতো।

কিন্তু ওর দিকে কেউ ফিরেও তাকাতো না। সৈনিকরা হিপ পকেটে হাত দিয়ে হা-হা করে হাসতে হাসতে মুঠো-ভরতি পয়সা ছুঁড়ে দিতো। মাহাতোগাঁয়ের লোক হুমড়ি খেয়ে পড়তো সেই পয়সাগুলোর ওপর, নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে ঝগড়া বাধাতো। তা দেখে সৈনিকরা হা-হা করে হাসতো।

শেষে পর পর কয়েক দিন লক্ষ্য করলাম টাঙি-জুতো পরা মাহাতোবুড়ো আর আসে না মাহাতোবুড়ো ওদের দেখে রেগে যেতে বলে, মাহাতোবুড়ো আর আসতো না বলে আমার এক ধরনের গর্ব হতো। কারণ, এক-একসময় ঐ লোকগুলোর ব্যবহারে আমরা—আমি আর ভগোতীলাল খুব বিরক্তি বোধ করতাম ভিতরে ভিতরে লজ্জা পেতাম ওদের কালেকুলো দীন দরিদ্র বেশ দেখে সৈনিকের দল নিশ্চয় ওদের ভিখিরী ভাবতে ভাবতো বলেই আমার খুব খারাপ লাগতো।

সেদিন কাঁটাতারের ওপার থেকে ওরা বখশিস বখশিস বলে চিৎকার করছে, কাঁধে আই ই খাকি বুশশার্টের গার্ড জানকীনাথের সঙ্গে আমি গল্প করছি, আমাদের পাশ দিয়ে একজন অফিসার মচমচ করে যেতে যেতে চিৎকার শুনে থুতু ফেলার মতো গলায় বলে উঠলো, ব্লাডি বেগার্স ।

আমি আর জানকীনাথ পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম আমাদের মুখ অপমানে কালো হয়ে গেল মাথা তুলে তাকাতে পারলাম না। শুধু অক্ষম রাগে ভিতরে ভিতরে জ্বলে উঠলাম

ব্লাডি বেগার্স, ব্লাডি বেগার্স।

সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো মাহাতোদের ওপর। ট্রেন চলে যেতেই আমি ভগোতীলালকে সঙ্গে নিয়ে ওদের তাড়া করে গেলাম। ওরা কুড়োনো পয়সা ট্যাঁকে গুঁজে হাসতে হাসতে পালালো।

তবু ওদের জন্যে সমস্ত লজ্জা আমি একটা অহঙ্কারের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলাম। পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে সেই অহঙ্কারটা আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো মাহাতোবুড়োর চেহারা নিয়ে।

কিন্তু সেদিন আমার বুকের মধ্যের সমস্ত জ্বালা জুড়িয়ে গেল।

ভূরকুণ্ডায় ঠিকাদারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েই খবর পেয়েছিলাম।

সার্ভার দুজন কুলি তখন টেবিল বানানো ড্রাম দুটোকে পায়ে ঠেলে ঠেলে আণ্ডাহল্টের কাঁটাতারের ওপারে সরিয়ে দিচ্ছিলো। তাঁবুর দড়ি খুলছিলো আরেকজন। ভগোতীলাল ড্রামটার গায়ে একটা জোর লাথি মেরে বললে, খেল খতম, খেল খতম।

হঠাৎ হই-হল্লা শুনে চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখি মাহাতোগাঁয়ের লোক ছুটতে ছুটতে আসছে।

আমরা অবাক হয়ে তাকালাম তাদের দিকে। ভগোতীলাল কি জানি কেন হেসে উঠলো।

ততক্ষণে কাঁটাতারের ওপারে ভিড় করে দাঁড়িয়ে গেছে ওরা।

সঙ্গে সঙ্গে একটা হুইস্‌ল্‌ শুনতে পেলাম, ট্রেনের শব্দ কানে এলো।

ফিরে তাকিয়ে দেখি ট্রেনটা বাঁক দিয়ে আণ্ডাহল্টের দিকেই আসছে, জানালায় জানালায় খাকি পোশাক।

আমরা বিব্রত বোধ করলাম, আমরা অবাক হলাম। তা হলে কি খবর পাঠাতেই ভুলে গেছে ভূরকুণ্ডার আপিস? না যে খবর শুনে এসেছি সেটাই ভুল?

ট্রেনটা যত এগিয়ে আসছে ততই একটা অদ্ভুত গমগম আওয়াজ আসছে। আওয়াজ নয়, গান। একটু কাছে আসতেই বোঝা গেল সমস্ত ট্রেন, ট্রেন-ভরতি সৈনিকের দল পরস্পরের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইছে।

বিভ্রান্তের মতো আমি একবার ট্রেনটার দিকে তাকালাম, একবার কাঁটাতারের ভিড়ের দিকে। আর সেই মুহূর্তে চোখ পড়লো সেই মাহাতোবুড়োর দিকে। সমস্ত ভিড়ের সঙ্গে মিশে গিয়ে মাহাতোবুড়োও হাত বাড়িয়ে চিৎকার করছে, সাব বখশিস, সাব বখশিস !

উন্মাদের মতো, ভিক্ষুকের মতো তারা চিৎকার করছে। তারা এবং সেই মাহাতোবুড়ো। কিন্তু আমেরিকান সৈনিকদের সেই ট্রেনটা অন্যদিনের মতো এবারে আর আণ্ডাহল্টে এসে থামলোনা। প্যাসেঞ্জার ট্রেনগুলোর মতোই আণ্ডাহল্টকে উপেক্ষা করে হুস্‌ করে চলে গেল।

আমরা জানতাম ট্রেন আর থামবে না। ট্রেনটা চলে গেল। কিন্তু মাহাতোগাঁয়ের সবাই ভিখিরি হয়ে গেল। ক্ষেতিতে চাষ করা মানুষগুলো সব—সব ভিখিরি হয়ে গেলো।

দেশ । বর্ষ ৩৬ সংখ্যা ৩। ৩০ কার্তিক ১৩৭৫ । ১৬ নভেম্বর ১৯৬৮

কসাই।। নির্মলেন্দু গুণ

একদিন এক বিজ্ঞ কসাই
ডেকে বললোঃ ‘এই যে মশাই,
বলুন দেখি, পাঁঠা কেন
হিন্দুরা খায়,
গরু কেন মুসলিমে?’
আমি বললামঃ ‘ সে অনেক কথা,
ফ্রেশ করে তা লিখতে হবে
কর্ণফুলীর এক রীমে।‘
কসাই শুনে মুচকি হাসেঃ
‘বেশ বলেছেন খাঁটি,
আমি কিন্তু একি ছোরায়
এই দুটোকেই কাটি।’

উদয়ের পথে ।। জয়দেব বসু

ছেলেটির বয়স যখন সাত-
চাঁদা দিতে না পারায় চোখের সামনে তাঁর বাবাকে
সপাটে চড় কষিয়েছিল পাড়ার এক নেতা ;
কেউ কোন প্রতিবাদ করেনি।
দু’বছর—
সরকারী জমিতে শনি-মন্দির তুলতে বাধা দেবার জন্য
‘প্রকাশ্য দিবালোকে’ তার দাদাকে ফেলে পিটিয়েছিল
যেসব ছেলেরা,
একদা তারা অন্য দলের হলেও, এখন ওই নেতারই
অনুগামী।
ছেলেটি এসব দেখেছিল।
সে দেখেছিল—
১)একটা লোকও বাধা দিতে আসেনি। ২) অজ্ঞান
দাদার মুখে জলের ঝাপটা দিতেও পারেনি কোন বন্ধু,
কারণ ‘পাঞ্জা’ কেটে নেওয়ার ভয় ছিল।৩) পাড়ার ডাক্তার
প্রাথমিক চিকিৎসাও করতে আসেনি। ৪) থানা কোন
এফ-আই-আর নেয় নি।৫)পুরপিতা তার কোঁচকানো মুখের
বাবাকে বলেছিলেন, ‘দোষ তো আপনার ছেলেরই , সে কেন
লাগতে যায়…!’

দেখতে-দেখতেই ছেলেটার ষোলো বছর বয়স হল।
তার গাল এখন কচি দুর্বাঘাসের গালচে, হাড় হয়ে উঠছে
চওড়া
নাইন-টেনের মেয়েরা এখন তার দিকে আড়চোখে তাকায়,
কিন্তু তারা জানে না,
ঘাসের ঐ গালিচার নীচে তার চোয়াল হয়ে উঠেছে কঠিন,
চোখের কোনায় জমেছে রক্ত,যা সাদা চোখে দেখা যায় না।
গল্পে বা সিনেমায় এসব ছেলেরাই এখন রুখে দাঁড়ায়,
শোধ নেয় বাপ-দাদার অপমানের,
হাতে তুলে নেয় বিচার-
অমিতাভ বচ্চন থেকে শাহ্‌রুখ খান
আমাদের এমনটাই দেখিয়ে আসছেন।
কিন্তু, শিল্প ও জীবনের মধ্যে, কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে
অহর্নিশ যে লুকোচুরি চলে,
তাতে মাঝে-মাঝেই আমাদের শিল্প ও কল্পনা যে
মারাত্মক হোঁচট খায়, তাতে আর সন্দেহ কী !
ষোলো বছরের ঐ ছেলে , একদিন সামান্য বিবাদের জন্য,
আর তিন বন্ধুর সঙ্গে নিজের বাবার পেটেই ঢুকিয়ে দিল
চাকু।
খুব স্বাভাবিক,
কারণ, ছোট থেকেই সে দেখেছে,
এই লোকটাকে মারা যায়—কেউ কোন প্রতিবাদ করে না।
বাধা দিতে এসেছিল তার দাদা—
ফালাফালা হয়ে গেল সেও।
কেননা, তাকেও তো মারা যায়,
মারলে কোন শাস্তি হয় না,
পুলিশ এফ-আই-আর-নেয় না,
পুরপিতা চায়ে চুমুক দিয়ে বলেন, ‘দোষ তো ওরই…।’
তারপর, অস্ত্রগুলো ধুয়েমুছে পরিপাটি করে টেবিলে সাজিয়ে
স্বাভাবিক মুখে বেরিয়ে পড়ল চারজন।
ভোরের আগেই তিনজন সীমান্ত পেরিয়ে গেল,
দূরে কোথাও বৃষ্টি হওয়ায় তারা ঠান্ডা বাতাসও পেয়েছিল।
আর, চতুর্থজন—আমাদের নায়ক—আশ্রয় নিল
সেই নেতার কাছে,
একদা যিনি চড় মেরে তার বাবাকে সহবৎ শিখিয়েছিলেন।
কোন প্রত্যক্ষদর্শী নেই—ছেলেটি জামিন পেল।
প্রত্যক্ষদর্শী নেই—বেকসুর খালাস পেল।
প্রত্যক্ষদর্শী নেই—পিতৃসম্পত্তি পেতেও অসুবিধা হল না।
পাড়ার মোড়েই এখন তার আড্ডা,
চোখের রক্ত আরো গাঢ় হয়েছে, সাদা চোখে
যা বোঝা যায় না।
নাইন-টেনের মেয়েরা এখন তাকে দেখলেই
ঘরে ঢুকে পড়ে,
আবার দমচাপা সেই ভয়ের মধ্যে আকর্ষণও যে কিছু নেই
জোর দিয়ে বলা যায় না কিছু।
এরকম কেন হয় !
হে ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাগণ,
এরকম কেন হয়—
এটাই তো আপনাদের প্রশ্ন?
তবে শুনুন,
এই মহতী বাস্তবতার অনুপম ভিত্তিটি
অমর্ত্য উদাসীনতায়, কুটোটুকুও না নেড়ে
আপনারাই এতদিন ধরে তৈরী করেছেন।
এখন আপনাদের ভেড়ুয়া বললে…
মাইরি বলছি… ভেড়ুয়াদেরই খিস্তি করা হয়।

‘দেশ’ বর্ষ ৬৩ সংখ্যা ১৯। ২৯ আষাঢ় ১৪০৩। ১৩ জুলাই ১৯৯৬

যেতে পারি, কিন্তু কেন যাবো? – শক্তি চট্টোপাধ্যায়।।

ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো।

এতো কালো মেখেছি দু হাতে
এতোকাল ধরে!
কখনো তোমার ক’রে, তোমাকে ভাবিনি।

এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে
চাঁদ ডাকে : আয় আয় আয়
এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে
চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয়
যেতে পারি

যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাবো?

সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো

যাবো
কিন্তু, এখনি যাবো না
একাকী যাবো না অসময়ে।।

কুড়ি বছর পরে ।। জীবনানন্দ দাশ

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি
আবার বছর কুড়ি পরে-
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে-
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে- তখন হলুদ নদী
নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়- মাঠের ভিতরে!
অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর,
ব্যস্ততা নাইকো আর,
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়
পাখির নীড়ের থেকে খড়
ছড়াতেছে; মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর শিশিরের জল!

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি- কুড়ি বছরের পার,-
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!
হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে
সরু-সরু কালো-কালো ডালপালা মুখে নিয়ে তার,
শিরীষের অথবা জামের,
ঝাউয়ের- আমেরঃ
কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে!

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার-
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!
তখন হয়তো মাঠ হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে-
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশ্বত্থের জানালার ফাঁকে
কোথায় লুকায় আপনাকে!
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে-
সোনালি সোনালি চিল- শিশির শিকার ক’রে নিয়ে গেছে তারে-
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!