by Jahid | Nov 25, 2020 | সাহিত্য
এইবার চিন্তা স্থির করবার অবসর এসেছে জীবনে
হৃদয় বয়স্ক হল ঢের ;
মোম জ্বলে নিভে যায় অনেক গভীর রাত হলে
অন্ধকারে একআধটা আবছা ইঁদুরের
আসা-যাওয়া টের পাই ঘরের মেঝেয়
হয়তোবা সিলিঙের ‘পরে
বাইরে শিশির ঝরে কুয়াশায়–শীতে
লক্ষীপেঁচার ডানা সজনের ডালে শব্দ করে।
টেবিলে অনেক বই ছড়িয়ে রয়েছে ;
চিন্তাগুলো যেন অনুলোম প্রতিলোম
পরস্পরের প্রতি—ঠাণ্ডা শাদা নারীর মতন
দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপে মোম—-
একটি গভীর সূত্রে প্রথিত কি হবে
বইয়ের সকল চিন্তা জীবনের সব অভিজ্ঞতা
সকল নক্ষত্র আর সময়ের অপার গতির
ইতিহাসবৃত্তান্তের আগাগোড়া কথা।
এ সব আশ্চর্য তত্ত্ব ভেবে তবু মন
অনুভব করে এই অন্ধকার ঘরে আজ কেউ
নেই, শুধু এক বিন্দু মূল্য নির্ণয়ের চেষ্টা ছাড়া।
কোনো এক দূর মহাসাগরের ঢেউ
এসে এই অন্ধকার বন্দর স্পর্শ করে চুপে
কোন্ এক দূর দিকে চলে যায়, তবে
সময়ের অন্তিম সঞ্চয়ে প্রেম করুণার বলয় রয়েছে ?
ব্যক্তির ও মানবের সফলতা হবে ?
হয়তো এই ব্রহ্মাণ্ডের অবিনাশ অন্ধকার ছাড়া
মানুষের ভবিষ্যতে কিছু নেই আর ;
সেবা ক্ষমা স্নিগ্ধতা যে আলোর মতন
মানুষের হাতে, তার বুজে –যাওয়া অন্ধ আধার
বারবার বড়ো এক পরিবর্তনীয়তার দিকে
যেতে চায়— সনাতন অন্ধকারে এ প্রয়াস ভালো ;
তবু এই পৃথিবীতে প্রেমের গভীর গল্প আছে
জীবনের রয়েছে তার ( অপরূপ ) প্রতিভাত আলো।
“অগ্রন্থিত কবিতা ।। জীবনানন্দ দাশ।”
by Jahid | Nov 25, 2020 | শিল্প ও সংস্কৃতি, সাহিত্য
ইতিমধ্যে বাড়িতে পরে পরে কয়েকটি মৃত্যুঘটনা ঘটিল। ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনোদিন প্রত্যক্ষ করি নাই। মা’র যখন মৃত্যু হয় আমার তখন বয়স অল্প। [{ সারদাদেবীর মৃত্যু, ১২৮১, ২৫ ফাল্গুন, [১৮৭৫, ৮ মার্চ]— র-কথা ]} অনেকদিন হইতে তিনি রোগে ভুগিতেছিলেন, কখন যে তাঁহার জীবনসংকট উপস্থিত হইয়াছিল তাহা জানিতেও পাই নাই। এতদিন পর্যন্ত যে-ঘরে আমরা শুইতাম সেই ঘরেই স্বতন্ত্র শয্যায় মা শুইতেন। কিন্তু তাঁহার রোগের সময় একবার কিছুদিন তাঁহাকে বোটে করিয়া গঙ্গায় বেড়াইতে লইয়া যাওয়া হয়— তাহার পরে বাড়িতে ফিরিয়া তিনি অন্তঃপুরের তেতালার ঘরে থাকিতেন। যে-রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতেছিলাম, তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, “ওরে তোদের কী সর্বনাশ হল রে!” তখনই বউঠাকুরানী [{ ↓কাদম্বরী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী↓]} তাড়াতাড়ি তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া ঘর হইতে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেলেন— পাছে গভীর রাত্রে আচমকা আমাদের মনে গুরুতর আঘাত লাগে এই আশঙ্কা তাঁহার ছিল। স্তিমিত প্রদীপে, অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না। প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপরে শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে-দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না;— সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না। কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর-দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন একেবারে এক-দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকরনার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না। বেলা হইল, শশ্মান হইতে ফিরিয়া আসিলাম; গলির মোড়ে আসিয়া তেতালায় পিতার ঘরের দিকে চাহিয়া দেখিলাম— তিনি তখনো তাঁহার ঘরের সম্মুখের বারান্দায় স্তব্ধ হইয়া উপাসনায় বসিয়া আছেন।
বাড়িতে যিনি কনিষ্ঠা বধূ [{ ↓কাদম্বরী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের পত্নী↓]} ছিলেন তিনিই মাতৃহীন বালকদের ভার লইলেন। তিনিই আমাদিগকে খাওয়াইয়া পরাইয়া সর্বদা কাছে টানিয়া, আমাদের যে কোনো অভাব ঘটিয়াছে তাহা ভুলাইয়া রাখিবার জন্য দিনরাত্রি চেষ্টা করিলেন। যে-ক্ষতি পূরণ হইবে না, যে-বিচ্ছেদের প্রতিকার নাই, তাহাকে ভুলিবার শক্তি প্রাণশক্তির একটা প্রধান অঙ্গ;— শিশুকালে সেই প্রাণশক্তি নবীন ও প্রবল থাকে, তখন সে কোনো আঘাতকে গভীরভাবে গ্রহণ করে না, স্থায়ী রেখায় আঁকিয়া রাখে না। এইজন্য জীবনে প্রথম যে-মৃত্যু কালো ছায়া ফেলিয়া প্রবেশ করিল, তাহা আপনার কালিমাকে চিরন্তন না করিয়া ছায়ার মতোই একদিন নিঃশব্দপদে চলিয়া গেল। ইহার পরে বড়ো হইলে যখন বসন্তপ্রভাতে একমুঠা অনতিস্ফুট মোটা মোটা বেলফুল চাদরের প্রান্তে বাঁধিয়া খ্যাপার মতো বেড়াইতাম— তখন সেই কোমল চিক্কণ কুঁড়িগুলি ললাটের উপর বুলাইয়া প্রতিদিনই আমার মায়ের শুভ্র আঙুলগুলি মনে পড়িত;— আমি স্পষ্টই দেখিতে পাইতাম যে-স্পর্শ সেই সুন্দর আঙুলের আগায় ছিল সেই স্পর্শই প্রতিদিন এই বেলফুলগুলির মধ্যে নির্মল হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে; জগতে তাহার আর অন্ত নাই— তা আমরা ভুলিই আর মনে রাখি।
কিন্তু আমার চব্বিশবছর বয়সের সময় মৃত্যুর [{ ↓কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু, ১২৯১, ৮ বৈশাখ [১৮৮৪, ১৯ এপ্রিল]— রবীন্দ্র-জীবনী ১, পৃ ১৫০↓]} সঙ্গে যে-পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়েসের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়— কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। তাই সেদিনকার সমস্ত দুঃসহ আঘাত বুক পাতিয়া লইতে হইয়াছিল।
জীবনের মধ্যে কোথাও যে কিছুমাত্র ফাঁক আছে, তাহা তখন জানিতাম না; সমস্তই হাসিকান্নায় একেবারে নিরেট করিয়া বোনা। তাহাকে অতিক্রম করিয়া আর-কিছুই দেখা যাইত না, তাই তাহাকে একেবারে চরম করিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলাম। এমনসময় কোথা হইতে মৃত্যু আসিয়া এই অত্যন্ত প্রত্যক্ষ জীবনটার একটা প্রান্ত যখন এক মুহূর্তের মধ্যে ফাঁক করিয়া দিল, তখন মনটার মধ্যে সে কী ধাঁধাই লাগিয়া গেল। চারিদিকে গাছপালা মাটিজল চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা তেমনি নিশ্চিত সত্যেরই মতো বিরাজ করিতেছে, অথচ তাহাদেরই মাঝখানে তাহাদেরই মতো যাহা নিশ্চিত সত্য ছিল— এমন-কি, দেহ প্রাণ হৃদয় মনের সহস্রবিধ স্পর্শের দ্বারা যাহাকে তাহাদের সকলের চেয়েই বেশি সত্য করিয়াই অনুভব করিতাম সেই নিকটের মানুষ যখন এত সহজে এক নিমিষে স্বপ্নের মতো মিলাইয়া গেল তখন সমস্ত জগতের দিকে চাহিয়া মনে হইতে লাগিল, এ কী অদ্ভুত আত্মখণ্ডন! যাহা আছে এবং যাহা রহিল না, এই উভয়ের মধ্যে কোনোমতে মিল করিব কেমন করিয়া! [{ ↓তুমি কোথায় (ভারতী, ১২৯১ পৌষ), কড়ি ও কোমল, রচনাবলী ২ ‘পুষ্পাঞ্জলি (ভারতী, ১২৯২ বৈশাখ) এবং ‘প্রথম শোক’ (‘কথিকা’, সবুজপত্র, ১৩২৬ আষাঢ়), লিপিকা↓]}
জীবনের এই রন্ধ্রটির ভিতর দিয়া যে একটা অতলস্পর্শ অন্ধকার প্রকাশিত হইয়া পড়িল, তাহাই আমাকে দিনরাত্রি আকর্ষণ করিতে লাগিল। আমি ঘুরিয়া ফিরিয়া কেবল সেইখানে আসিয়া দাঁড়াই, সেই অন্ধকারের দিকেই তাকাই এবং খুঁজিতে থাকি— যাহা গেল তাহার পরিবর্তে কী আছে। শূন্যতাকে মানুষ কোনোমতেই অন্তরের সঙ্গে বিশ্বাস করিতে পারে না। যাহা নাই তাহাই মিথ্যা, যাহা মিথ্যা তাহা নাই। এইজন্যই যাহা দেখিতেছি না তাহার মধ্যে দেখিবার চেষ্টা, যাহা পাইতেছি না তাহার মধ্যেই পাইবার সন্ধান কিছুতেই থামিতে চায় না। চারাগাছকে অন্ধকার বেড়ার মধ্যে ঘিরিয়া রাখিলে, তাহার সমস্ত চেষ্টা যেমন সেই অন্ধকারকে কোনোমতে ছাড়াইয়া আলোকে মাথা তুলিবার জন্য পদাঙ্গুলিতে ভর করিয়া যথাসম্ভব খাড়া হইয়া উঠিতে থাকে— তেমনি, মৃত্যু যখন মনের চারিদিকে হঠাৎ একটা ‘নাই’-অন্ধকারের বেড়া গাড়িয়া দিল, তখন সমস্ত মনপ্রাণ অহোরাত্র দুঃসাধ্য চেষ্টায় তাহারই ভিতর দিয়া কেবলই ‘আছে’-আলোকের মধ্যে বাহির হইতে চাহিল। কিন্তু সেই অন্ধকারকে অতিক্রম করিবার পথ অন্ধকারের মধ্যে যখন দেখা যায় না তখন তাহার মতো দুঃখ আর কী আছে।
তবু এই দুঃসহ দুঃখের ভিতর দিয়া আমার মনের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে একটা আকস্মিক আনন্দের হাওয়া বহিতে লাগিল, তাহাতে আমি নিজেই আশ্চর্য হইতাম। জীবন যে একেবারে অবিচলিত নিশ্চিত নহে, এই দুঃখের সংবাদেই মনের ভার লঘু হইয়া গেল। আমরা যে নিশ্চল সত্যের পাথরে-গাঁথা দেয়ালের মধ্যে চিরদিনের কয়েদি নহি, এই চিন্তায় আমি ভিতরে ভিতরে উল্লাস বোধ করিতে লাগিলাম। যাহাকে ধরিয়াছিলাম তাহাকে ছাড়িতেই হইল, এইটাকে ক্ষতির দিক দিয়া দেখিয়া যেমন বেদনা পাইলাম তেমনি সেইক্ষণেই ইহাকে মুক্তির দিক দিয়া দেখিয়া একটা উদার শান্তি বোধ করিলাম। সংসারের বিশ্বব্যাপী অতি বিপুল ভার জীবনমৃত্যুর হরণপূরণে আপনাকে আপনি সহজেই নিয়মিত করিয়া চারিদিকে কেবলই প্রবাহিত হইয়া চলিয়াছে, সে-ভার বদ্ধ হইয়া কাহাকেও কোনোখানে চাপিয়া রাখিয়া দিবে না— একেশ্বর জীবনের দৌরাত্ম্য কাহাকেও বহন করিতে হইবে না— এই কথাটা একটা আশ্চর্য নূতন সত্যের মতো আমি সেদিন যেন প্রথম উপলব্ধি করিয়াছিলাম।
সেই বৈরাগ্যের ভিতর দিয়া প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও গভীররূপে রমণীয় হইয়া উঠিয়াছিল। কিছুদিনের জন্য জীবনের প্রতি আমার অন্ধ আসক্তি একেবারেই চলিয়া গিয়াছিল বলিয়াই, চারিদিকে আলোকিত নীল আকাশের মধ্যে গাছপালার আন্দোলন আমার অশ্রুধৌত চক্ষে ভারি একটি মাধুরী বর্ষণ করিত। জগতকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্য যে-দূরত্বের প্রয়োজন মৃত্যু সেই দূরত্ব ঘটাইয়া দিয়াছিল। আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার উপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম তাহা বড়ো মনোহর।
সেই সময়ে আবার কিছুকালের জন্য আমার একটা সৃষ্টিছাড়া রকমের মনের ভাব ও বাহিরের আচরণ দেখা দিয়াছিল। সংসারের লোকলৌকিকতাকে নিরতিশয় সত্য পদার্থের মতো মনে করিয়া তাহাকে সদাসর্বদা মানিয়া চলিতে আমার হাসি পাইত। সে-সমস্ত যেন আমার গায়েই ঠেকিত না। কে আমাকে কী মনে করিবে, কিছুদিন এ-দায় আমার মনে একেবারেই ছিল না। ধুতির উপর গায়ে কেবল একটা মোটা চাদর এবং পায়ে একজোড়া চটি পরিয়া কতদিন থ্যাকারের [{১↓Thacker Spink & Co.↓]} বাড়িতে বই কিনিতে গিয়াছি। আহারের ব্যবস্থাটাও অনেক অংশে খাপছাড়া ছিল। কিছুকাল ধরিয়া আমার শয়ন ছিল বৃষ্টি বাদল শীতেও তেতালায় বাহিরের বারান্দায়; সেখানে আকাশের তারার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হইতে পারিত এবং ভোরের আলোর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের বিলম্ব হইত না।
এ-সমস্ত যে বৈরাগ্যের কৃচ্ছ্রসাধন তাহা একেবারেই নহে। এ যেন আমার একটা ছুটির পালা, সংসারের বেত-হাতে গুরুমহাশয়কে যখন নিতান্ত একটা ফাঁকি বলিয়া মনে হইল তখন পাঠশালার প্রত্যেক ছোটো ছোটো শাসনও এড়াইয়া মুক্তির আস্বাদনে প্রবৃত্ত হইলাম। একদিন সকালে ঘুম হইতে জাগিয়াই যদি দেখি পৃথিবীর ভারাকর্ষণটা একেবারে অর্ধেক কমিয়া গিয়াছে, তাহা হইলে কি আর সরকারি রাস্তা বাহিয়া সাবধানে চলিতে ইচ্ছা করে। নিশ্চয়ই তাহা হইলে হ্যারিসন রোডের চারতলা-পাঁচতলা বাড়িগুলা বিনা কারণেই লাফ দিয়া ডিঙাইয়া চলি এবং ময়দানে হাওয়া খাইবার সময় যদি সামনে অক্টর্লনি মনুমেণ্ট্টা আসিয়া পড়ে তাহা হইলে ওইটুকুখানি পাশ কাটাইতেও প্রবৃত্তি হয় না, ধাঁ করিয়া তাহাকে লঙ্ঘন করিয়া পার হইয়া যাই। আমারও সেই দশা ঘটিয়াছিল— পায়ের নিচে হইতে জীবনের টান কমিয়া যাইতেই আমি বাঁধা রাস্তা একেবারে ছাড়িয়া দিবার জো করিয়াছিলাম।
বাড়ির ছাদে একলা গভীর অন্ধকারে মৃত্যুরাজ্যের কোনো-একটা চূড়ার উপরকার একটা ধ্বজপতাকা, তাহার কালো পাথরের তোরণদ্বারের উপরে আঁক-পাড়া কোনো-একটা অক্ষর কিংবা একটা চিহ্ন দেখিবার জন্য আমি যেন সমস্ত রাত্রিটার উপর অন্ধের মতো দুই হাত বুলাইয়া ফিরিতাম। আবার, সকালবেলায় যখন আমার সেই বাহিরের পাতা বিছানার উপরে ভোরের আলো আসিয়া পড়িত তখন চোখ মেলিয়াই দেখিতাম, আমার মনের চারিদিকের আবরণ যেন স্বচ্ছ হইয়া আসিয়াছে; কুয়াশা কাটিয়া গেলে পৃথিবীর নদী গিরি অরণ্য যেমন ঝলমল করিয়া ওঠে, জীবনলোকের প্রসারিত ছবিখানি আমার চোখে তেমনি শিশিরসিক্ত নবীন ও সুন্দর করিয়া দেখা দিয়াছে।
by Jahid | Nov 25, 2020 | শিল্প ও সংস্কৃতি, সাহিত্য
আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর কেন ।
আদা জাহাজে করিয়া বিদেশে রপ্তানী হয় না; স্থানীয় হাটে বাজারেই খরিদ বিক্রয় হয়। সেইজন্য আদা ব্যবসায়ীর জাহাজের খবর জানিবার কোন প্রয়োজন নাই। অনধিকারচর্চাস্থলে এই প্রবাদ প্রযুক্ত হয়। “ The Cobbler must stick to his last.” Or “ Let the Cobbler(মুচি) stick to his last.”
আহার নিদ্রা ভয়, যত বাড়াও তত হয়।
আহার , নিদ্রা ও ভয় ইহাদিগকে যত বাড়াইবে ততই বাড়িবে।
উড়ো খৈ গোবিন্দায় নমঃ ।
বাতাসে খৈ উড়িয়ে নিয়ে যাইতেছে, তাহা আর সংগ্রহ করিবার উপায় নাই দেখিয়া সেইগুলি গোবিন্দায় নমঃ বলিয়া দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করিয়া দিল। প্রতিকূল অবস্থায় পড়িইয়া বাধ্য হইয়া কোন সৎ কার্য করা। “ Making a virtue of necessity ”
উসকো মাটিতে বিড়াল হাগে।
নরম লোক পাইলে সকলেই তাহার উপর আধিপত্য প্রকাশ করে।
হিন্দিতে আছে, বিল্লি শাক্তি পার নেহি হাগ্তি।
এক যাত্রার পৃথক ফল।
একসঙ্গে একই কার্য আরম্ভ করিয়া একজনকে যদি পুরস্কৃত এবং অপরজন যদি তিরস্কৃত হয়, তাহা হইলে তাহাদের এক যাত্রায় পৃথক ফল বলা হয়।
এঙ যায়, ব্যাঙ যায়,
খোল্সে বলে আমিও যাই।
চ্যাং মাছ ও ব্যাঙকে লাফাইতে দেখিয়া খোল্সে মাছও সেইরূপ লাফ দিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু কৃতকার্য হইল না। যে যে কাজ করিতে অক্ষম, সমর্থ অপরের অনুকরণ করিতে গিয়া সে সকলের হাস্যভাজন হয়।
[ প্রকাশকালঃ ৫ই জুন, ২০১৫ ]
by Jahid | Nov 25, 2020 | শিল্প ও সংস্কৃতি, সাহিত্য
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে নেপালের রয়েল লাইব্রেরী থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি আধুনিক লিপিতে প্রকাশিত হয় ‘হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহা’ নামে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায়।
এর রচনাকাল সম্পর্কে মতভেদ আছে। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ৬৫০ খ্রীস্টাব্দে আর ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ৯৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এর পদগুলো রচিত হয়। সুকুমার সেন সহ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব পন্ডিতই ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সমর্থন করেন।
অনেকে বলেন , চর্যাপদের রচনাকাল সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী।তা না থাকলে দশম থেকে চতুর্দশ শতাব্দী।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে চর্যাপদের ভাষার নাম – সন্ধ্যা ভাষা বা আলো- আঁধারি ভাষা।
যেহেতু , চর্যাপদের ভাষা অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য। সেই কারণে চর্যায় ব্যবহৃত ভাষাকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন ‘সন্ধ্যাভাষা ’। তাঁর মতে, “সহজিয়া ধর্মের সকল বই-ই সন্ধ্যা ভাষায় লেখা। সন্ধ্যা ভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিকটা বুঝা যায় না। অর্থাৎ, এই সকল উঁচু অঙ্গের ধর্মকথার ভিতরে একটা অন্য ভাবের কথাও আছে। সেটা খুলিয়া ব্যাখ্যা করিবার নয়। যাঁহারা সাধনভজন করেন তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই। ”
সুনীতিকুমার ১৯২৬ সালে ‘Origin and Development of the Bengali Language'(ODBL) গ্রন্থ রচনা করে চর্যাপদকে বাংলা সাহিত্যের বলে প্রমাণ করেন।
৩৩ নং পদে আবহমান বাঙালির চিরায়ত দারিদ্র্যের ছবি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। যেমনঃ
টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী
হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।।
আধুনিক বাংলায় : “লোক শূণ্য স্থানে প্রতিবেশীহীন আমার বাড়ি / হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রেমিক এসে ভিড় করে।”
চর্যার (তেত্রিশ নং) পদটির চরয়িতা মতভেদে ‘ঢেণ্ডণপা’ অথবা ‘ভুসুকুপা’ । ঢেণ্ডণপার জন্মস্থান অবন্তিনগরের উজ্জয়িনীতে। তার জীবৎকাল ৮৪৫ সালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তার আসল নাম হল ঢেণ্ঢস। খ্রিষ্ট্রীয় নবম শতকে তিনি বর্তমান ছিলেন। এক্ষেত্রে বলা যায় তিনি দেবপাল-বিগ্রহপালের সমকালে ছিলেন। ঢেণ্ডণপা মূলত তাঁতি এবং সিদ্ধা ছিলেন। তার পদে বাঙালি জীবনের চিরায়ত দারিদ্রের চিত্র পাওয়া যায়।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে উপরের পদটির রচয়িতা ছিলেন ‘ভুসুকপা’ । ভুসুকপা ছিলেন পূর্ববঙ্গের লোক। তাঁর রচিত ৪৯ নং পদে পদ্মা (পঁউআ) খালের নাম আছে, ‘বাঙ্গাল দেশ’ ও ‘বাঙ্গালী’র কথা আছে। তাঁর রচিত পদসমুহের মাঝে বাঙালি জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। ভুসুকপা রচিত অতিপরিচিত একটি পদঃ অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী।।
[ প্রকাশকালঃ ১২ই মে, ২০১৫ ]
by Jahid | Nov 25, 2020 | সাহিত্য
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী , অপু, দুর্গা, নিশ্চিন্দিপুর, হরিহর, সর্বজয়া, ইন্দির ঠাক্রুন , আম আঁটির ভেঁপু – আমার মনে হয়, আমরাই শেষ আলোড়িত প্রজন্ম । ১৯২৯ সালে লেখা এই উপন্যাস গত পাঁচ-ছয় দশক ধরে প্রতিটি শিক্ষিত বাঙালির সারাজীবনের অংশ হয়ে গেছে । কৈশোরে আমরা প্রত্যেকেই অপু বা দুর্গা। আমাদের বাবাদের কেউ কেউ হরিহর , মায়েদের কেউ সর্বজয়া !
পথের পাঁচালীর শেষের কয়েক লাইন আমাদের বার বার পড়তে হয়।
“পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন – মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নিতোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতেরখেয়াঘাটের সীমানায়? তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে… দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সুর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গন্ডি এড়িয়ে অপরিচয়েরউদ্দেশ্যে…
দিনরাত্রি পার হয়ে, জন্ম মরণ পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মনন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায়… তোমাদের মর্মর জীবন-সপ্ন শেওলা-ছাতারদলে ভরে আসে, পথ আমার তখনো ফুরোয় না… চলে… চলে… চলে… এগিয়েই চলে…
অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ…
সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমাকে ঘরছাড়া করে এনেছি!…
চল এগিয়ে যাই”
কয়েকটাদিন কবিতা নিয়ে মেতে ছিলাম। ‘দেশ ’ পত্রিকার কবিতা সংকলনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তারাপদ রায়ের কবিতাটা ভালো লেগে গেলো।
শতবার্ষিকীর ছায়াপদ্য
তারাপদ রায়
‘Ah , did you once see Shelley , plain….?’
সত্যি, আপনি বিভূতিভূষণকে মুখোমুখি দেখেছিলেন?
সাদামাটা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়?
বনগ্রাম স্টেশনে একদিন দুপুর পার হয়ে প্রায় বিকেলে ,
প্রায় ফাঁকা যশোহর লোকালে উঠে আপনি দেখলেন
ওদিকের সীটে জানালার ধারে তিনি বসে আছেন ?
অল্পদিন আগে কোথায় এক সাহিত্যসভায় দেখেছিলেন,
তাই তাঁকে চিনতে আপনার অসুবিধা হল না।
সেই হালকা-নীল কলারফাটা হাফশার্ট ,
আধময়লা মিলের ধুতি ,তাপ্পি মারা ক্যাম্বিসের জুতো ।
অনেকদিন আগের কথা
তবু মনে আছে আপনার ?
যশোহর রোড কোনাকুনি ভাবে কাটিয়ে
শিয়ালদহ চলেছে দুপুরের নিঝুম রেলগাড়ি ।
জানালার পাশে বিভূতিভূষণ, আপনার মুখোমুখি ।
রেলগাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে ধলচিতের খেয়াঘাট ,
সোনাডাঙ্গার মাঠ, পদ্মফুলে ভঁরা মধুখালির বিল,
নীলকুঠির সাহেবের আমলের তুঁতগাছ পড়ে থাকছে পিছনে ।
বিভূতিভূষণের সঙ্গে আপনি কথা বলেছিলেন ?
আশ্চর্য ! কী বলেছিলেন আপনি , সেটা মনে নেই?
বিভূতিভূষণ আপনার কথার উত্তর দিয়েছিলেন ,
কী বলেছিলেন বিভূতিভূষণ – তাও আপনি ভুলে গেছেন ?
তা হলে আপনার শুধুই মনে আছে,
চলন্ত রেলগাড়ির কামরায় জানালার পাশে,
পুরনো নীল জামা গায়ে বসে আছেন বিভূতিভূষণ ।
বিকেল গড়িয়ে পড়ছে রেলপথের পাশে
বন অপরাজিতার নীলফুলে ছাওয়া বনের মাথায় ,
পাখি ডাকছে শিরীষ-সোঁদালি বনে,
রেলগাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে সোনাডাঙ্গার মাঠ,
মধুখালির বিল, ধলচিতের খেয়াঘাট ।
অপরাহ্ণের রাঙা রোদ জানালা দিয়ে ঢুকেছে কামরায়
নীল নির্জন আকাশ পথে গাঙচিলের ডাক
বাঁশঝাড়ের মাথায় দিনের শেষ আলো
দিনরাত্রি পার হয়ে, জন্ম-মৃত্যু পার হয়ে
মাস, বার, মন্বন্তর , মহাযুগ পার হয়ে,
ঝোঁপে ঝোঁপে নাটা-কাঁটা বনকলমির ফুল
যশোহর লোকালের ফাঁকা কামরায় কাঠের বেঞ্চিতে
বসে আছেন নিঃসঙ্গ ; নির্লিপ্ত বিভূতিভূষণ ।
সত্যি, আপনার মনে আছে ?
সত্যি, আপনি দেখেছিলেন বিভূতিভূষণকে ?
by Jahid | Nov 25, 2020 | সাহিত্য
এ পৃথিবী বড়ো , তবু তার চেয়ে ঢের বেশি এই
সময়ের ঢেউগুলো- অনিঃশেষ সমুদ্রের থেকে
অন্তহীন সাগরের অভিমুখে কোথায় চলেছে ।
রাত্রি আসে –রাত্রি শেষ হয়ে গেলে আলো;
আলো আরো মৃদু হ’লে তার চেয়ে বেশি
স্নিগ্ধ অন্ধকার সব—আকাঙ্ক্ষিত মেয়েটির হাতের মতন
কাছে এসে ,সংবরণ ক’রে তবু, যেন নেপথ্যের
ওপারের থেকে তার কথা বলে ।
অগাধ আয়ুর শিশু এরা সব ঃ এই দিন, এই রাত্রি ,
বাতাসের আসা-যাওয়া , নীল নক্ষত্রের ফুটে ওঠা,
শিশির ঝরার শব্দ , আশ্চর্য পাখির
ডিম প্রসবের সাড়া ; আবার রোদের দিন মাঘ ফাল্গুনের ;
সহসা বৃষ্টির রাত্রি,– হেমন্তের ঠান্ডা নিঃশব্দতা
কবের আয়ুর শিশু এরা সব ;– ম্যামথ দেখেছে।
শতাব্দীর সন্ধিপথে আজ মানুষের
আধো-আলো আধো- আশা অপরূপ অধঃপতনের
অন্ধকারে অবহিত অন্তর্যামীদের মতন ভোরের সূর্য ;
দূরতম সমুদ্রের হাওয়া এসে ছুঁয়ে কিছু ভালো ব’লে যেতে চায় ;
নগরীর বিদগ্ধ লোকেরা কথা ভেবে—ব’লে
প্রেরণা জাগাতে চায় ;
সহজ ত্যাগীরা কাজ করে ;
রক্তে দেশ অন্ধকার হয়ে পড়ে ;
কথা ভাষা স্বপ্ন সাধ সংকল্পের ব্যবহারে
মানুষেরা মানুষের প্রিয়তর না হ’য়ে শুধু দূরতর হয় ;
হৃদয় মলিন হ’য়ে যেতে থাকে ;
নিয়ন্ত্রিত জ্ঞানেরো আকাশ ঢেকে কুয়াশা বাড়ছে;
মুক্ত হতে গিয়ে সুধী কেবলি রোমাঞ্চকর রূঢ় সায়েন্সের
জন্ম দেয় ; চারিদিকে অগণন মানুষের মৃত্যু তার বড়ো কাহিনীর
যবনিকাপাতের প্রাক্কালে ক্লান্তির মতো ;
তখন শতাব্দী অন্ধ—অবসন্ন—ব্যর্থ ।–
হয়তো এ পৃথিবীতে মানবের অনন্ত চারণ,
লোভ থেকে লোভে শুধু –ব্যাথা থেকে ব্যাথার ভিতরে,
ভুল থেকে উল্লোল ক্ষমতাময় ভুলের গহ্বরে;
চাঁদের কুয়াশা থেকে অঘ্রাণ রাতের
নক্ষত্রের অন্ধকারে ;-
তারপর নক্ষত্রেরা নেই।
নবীন প্রয়াণে স্পর্শে মানুষেরা একদিন চীন পিরামিড
গড়েছিল ; সূর্যঘড়ি চিনেছিল ; প্রিয়তর উজ্জ্বল সূর্যকে
দিব্য দিয়ে নগরীর ভাঙ্গা হাড়ে কেবলি গড়েছে
নতুন খিলান স্তম্ভ ফ্যাক্টরি এঞ্জিন ক্রেনঃ
এ সব বিচিত্র নীড় কুশলতা কল
সময়ের থেকে দূর বড় সময়ের কাছে
মানুষের যেই পরিচয় রেখে যায়
তা তার আবেগ বুদ্ধি উৎকণ্ঠার;-
যেন তা কল্যাণ সত্য চায় –তবু অগাধ হিংসার—
রিরংসার পাকে ঘুরে –ঘুরে ঘুরে শূন্য হয়ে যায় ;
অন্ধকার থেকে মৃদু আলোর ভিতরে
আলোর ভিতর থেকে আঁধারের দিকে
জ্ঞানের ভিতর থেকে শোকাবহ আশ্চর্য অজ্ঞানে
বারে- বারে আসা- যাওয়া শেষ ক’রে ।
চিরকাল ইতিহাসবহনের পথে
রক্ত ক্ষয় নাশ ক’রে সে এক জগতে
মানুষের দিকচিহ্ন মাঝে মাঝে মুক্ত হ’য়ে পড়ে ;
তা কোন প্রশান্তি নয় , মৃত্যু নয়, অপ্রেমের মতো নয়,
কোনো হেঁয়ালির শেষ মীমাংসার বার্তা নয়,
অচিহ্নিত সাগরের মতন তা , দূরতম আকাশের মতো ;
পেছনের পার্শ্বের দ্রুতগতি চিহ্ন ও বলয়
অন্তর্হিত হ’য়ে গেলে কূলহীন পটভূমি জেগে ওঠে
ব্যক্তি ও জাতির নাম সময়ের দিগন্তরে শেষ হ’লে
শূন্য নীল আকাশের – মহাসাগরের শূন্যে মেশে ;
চিনে নিতে পারে তার হৃদয়ের অসীম ভূগোলে
আরো শুদ্ধ আরো গাঢ় অনির্বচনীয় সম্মিলন
মানুষ ও মানুষেরঃ চারিদিকে গ্লোবমাস্টারের শব্দে
অন্তহীন অন্ধকারে হাঙর মকর মৃত্যু কুজ্ঝটিকায়
মৃত মূঢ় এরিয়েল ও বেতারের ব্যর্থতায়
যদিও প্রত্যাশা সব সর্বশান্ত ব’লে মনে হয়—
আশার আস্থার আধার তবু নিজেই মানুষ
মহাকাশ কিংবা মহাসাগরের চিহ্নগুলো নয়।
সাম্প্রতিক মন্তব্য