প্রবাসী ও শুভঙ্করের ফাঁকি

আমার প্রবাসী আত্মীয়-বন্ধুদের প্রতি সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রেখে এই পোস্ট দিচ্ছি। কেউ এটাকে পারসোনালি নিবেন না, সেই আশা করতেই পারি।

বছর খানেক আগে এক কানাডা প্রবাসীর সাথে কথা হচ্ছিল। নানা কথার পরে সে যেটা বলল সেটা মনে দাগ কাটার মতো বলেই এখন পর্যন্ত মনে আছে।

কানাডা প্রতি বছর লক্ষাধিক এশিয়ান নিচ্ছে ইমিগ্রান্ট হিসাবে। ইদানীং শুনছি লাখ তিনেক ডলার ওখানকার ব্যাংকে রাখলে বা জয়েন্টভেঞ্চারে ইনভেস্ট করলে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি কনফার্ম। ২০০১ সাল থেকে গড়ে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লক্ষ থেকে তিন লক্ষ লোক কানাডা প্রবাসী হচ্ছে বিভিন্ন এশিয়ান দেশ থেকে। এইসব পশ্চিমা দেশগুলো গরীব-দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ নিজেদের অর্থনীতিতে পাম্প করে এঁদের প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছেন।
আমি অর্থনীতিবিদ নই, ব্যক্তিগত হিসাবেও যথেষ্ট কাঁচা । তবু একটা সংক্ষিপ্ত হিসাব দেওয়ার চেষ্টা করি। ধরেন ২,৫০,০০০ ইমিগ্রান্ট X US$ ৩,০০০০০= US$ ৭,৫০০০০০০০০০.০০ মানে সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার ! এইবার আপনি ওইখানে পৌঁছানোর পর ওই উন্নত দেশের নানারকম সুবিধায় চমৎকৃত হতে থাকবেন, হতেই থাকবেন।

কেননা, আপনি তো গেছেন পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি থেকে। আপনি রাস্তা দেখে , বাতি দেখে অবাক হবেন, করিৎকর্মা পুলিশের ভেঁপু শুনে অবাক হবেন। বহু শতবর্ষের লক্ষ লোকের ঘাম-রক্তের বিনিময়ে গড়া আমাদের চেয়ে শত বৎসর এগিয়ে থাকা সভ্যতার ঘি মাখন এয়ারপোর্ট থেকে নেমেই বিনা পরিশ্রমে আপনি ভোগ করা শুরু করবেন । । বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের কাছে আর বন্ধু-বান্ধবের কাছে ফোন করে নানা রকম তুলনামূলক তত্ত্ব শোনাবেন আর আমাদের দীর্ঘশ্বাস শুনে বিমলানন্দ উপভোগ করবেন।

তবে আসল শুভঙ্করের ফাঁকি ব্যাপারটা অনেকে বুঝে ফেলেন কয়েকবছরের মধ্যে । আপনারই দেওয়া টাকাপয়সায় আপনার ওয়েলফেয়ার ইনস্যুরেন্স, গাড়ি বাড়ি লোনের হ্যাপায় ওই পশ্চিমা দেশ আপনাকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াবে , আপনি তখন ধোপার গাধা– না ঘরকা , না ঘাটকা! এই দুষ্ট চক্রের বাইরে আসতে পারবেন না। আপনি ও আপনার প্রিয় পরবর্তী প্রজন্ম ওই চক্করের ভিতরে থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে চীজ বার্গার খেয়ে দিনাতিপাত করবেন। যখন বুঝবেন, ততদিনে ওই দুর্ভেদ্য চক্র ভাঙ্গার সাহস বা সামর্থ্য দুইটাই অবলুপ্ত আপনার।

একইভাবে, নন প্রোডাক্টিভ কিছু দেশ আছে, যেমন যুক্তরাজ্য বা ইংল্যান্ড। লক্ষ লক্ষ ছাত্র প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার এশিয়া থেকে নিয়ে যেয়ে ওই দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছে আর চক্করের ভিতরে পড়ছে।পড়ুক, আমার তাতে কোন আপত্তি নাই। আপনি দুধ বেচে তামাক খাবেন , নাকি তামাক বেচে দুধ খাবেন সেটা আপনার ইচ্ছা।
কিন্তু , আমার আপত্তি অন্য খানে!

কোন কোন প্রবাসী শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে ভিওআইপি সস্তা রেটে কল করে বা ফ্রী স্কাইপে, ভাইবারে, হোয়াটস অ্যাপে আধাঘণ্টা ধরে বাংলাদেশের ‘আম্লীগ বিম্পি’ নিয়া কচলা কচলি করে, আর বোঝানোর চেষ্টা করে আমরা কতিপয় ভোঁদাই আমজনতা আসলে গুপ্তকেশ উৎপাটন করছি । উপসংহারে বা গৌরচন্দ্রিকাতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় , ‘দেশটার হচ্ছে টা কি?’

কেন জানি না তাঁদের ধারনা হয়েছে , বাংলাদেশে আমরা শুয়ে বসে আর টকশো দেখে দিনাতিপাত করছি। । আর দুই বরাহ শাবকের দলকে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এনে দেশের বারোটা বাজাচ্ছি। আমরাও যে ব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছি, অফিসের টাইমে হুদা মিছা প্যাঁচাল না পেড়ে আমরাও যে , যে যার জায়গায় পরিশ্রম করে যাচ্ছি, এটা তাঁদের বোঝানো মুশকিল। মনে হয় দুনিয়াতে তাঁরাই শুধু ব্যস্ত আর আমরা শুধু গুপ্তকেশ উৎপাটন করে আঁটি বাঁধছি ! আগে মন দিয়ে শুনতাম বা হু হা করতাম, এখন বয়সের জন্যই কীনা জানিনা। এইসব বাল ও ছালের আলাপ শুনতে আর ভালো লাগে না!

ভাইরে, আপনি থাকেন আপনার পশ্চিমা দেশের ঘি মাখন জ্যাম জেলি নিয়ে ! এই বাংলাদেশের জন্য কে কী ছিঁড়ছেন আমরা তো কম বেশী জানি। কেন খামোখা গুচ্ছের সময় নষ্ট করে আমাদের অপরাধ বোধে ভোগাতে চান? দেশের এই অবস্থা আমরা কি একা করেছি ?

প্রকাশকালঃ মার্চ, ২০১৩

জীবনচক্র; বার্ধক্য

আব্বা-আম্মার দিকে তাকালে ইদানীং খারাপ লাগা শুরু হয়।

জীবন চক্রের যে জায়গাটায় আজ আমি দাঁড়িয়ে ; সেখান থেকে সামনে পিছনে দুইদিকেই চোখ চলে যায়। চল্লিশোর্ধ জীবন মানেই টুকটাক হৃদকম্পনের সাথে সাথে মধুমেহ ইত্যাদি ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যায় আমাদের দেহ। আমি দেখতে পাই আমার ভবিষ্যৎ চেহারাটাকে ঠিক আব্বার জায়গায়।

আমার আশেপাশের মুরব্বিদেরও বছর পঞ্চান্ন- ষাট পর্যন্ত তেমন কোন পরিবর্তন আমার চোখে ধরা পড়ে নাই। কিন্তু, অবাক হয়ে দেখলাম , একেকজন একেক সময়ে মাস-দুয়েকের ভিতর হঠাৎ করে করে বুড়িয়ে গেলেন। হঠাৎ করেই তাঁদের বয়স যেন বছর দশেক করে বেড়ে গেল। চামড়া কুঁচকে, চুল কমে বিশ্রী একটা অবস্থা। এটাই যে নিয়তি, এটাই যে হয়ে আসছে সবসময় — আমার মাথাতেই ছিল না !

আম্মা এখন যে পরিমাণ ওষুধ খান সকালে, আমিতো দুষ্টামি করি এই বলে যে, তোমারতো নাস্তা করার দরকার নেই। ওষুধেই পেট ভর্তি !

যাকগে ! যে জীবনচক্রের কথা বলছিলাম, ওই অমোঘ চক্রের সামনে আমরা সবাই কতটাই না অসহায় ! এতো মূল্যবান একটা জীবন– তুচ্ছ কিছু অর্থের জন্য, অন্নসংস্থান , ছাঁদ , ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা –ইত্যাদি ইত্যাদি বাল ও ছালের জন্য অপচিত হচ্ছে। কোন মানে হয় !

তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসের নিতাই কবিয়ালের কথা মনে হয়।
লাইনগুলো আগে এতোবার শোনা, মর্মার্থ বুঝতে বয়স হওয়া লাগলো, চল্লিশ পেরুতে হলো!

“ এই খেদ মোর মনে,
ভালবেসে মিটল না আশ, কুলাল না এ জীবনে।
হায় জীবন এত ছোট কেনে ,
এ ভুবনে?”
হায় ! জীবন এত ছোট কেনে ?”

প্রকাশকালঃ ২৭শে মার্চ,২০১৩

অবসর জীবন

আমরা গতানুগতিক বাঙালীরা চল্লিশ পেরুলেই অবসর জীবনের চিন্তা শুরু করে দিই। দাদা-নানাদের সময়ে তাঁদের নাকি ত্রিশ পেরুলেই এই চিন্তা আসতো আর চল্লিশ পেরুলে হজ্জ্ব সেরে তসবীহ্‌ গোনা।

আব্বা এই সেদিন পর্যন্তও সক্রিয় ছিলেন। কিডনীরোগে প্রতিদিনের ডায়ালাইসিস আর অসুস্থতা এমন করে জেঁকে বসেছে যে, ইচ্ছা করলেও উনি আর মিরপুর থেকে সদরঘাটের কোর্টে যেতে পারেন না। অসম্ভব দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছেন বলে শারীরিক পরিশ্রমকে উনি ভয় পান না। পেটানো শরীরের ছ ফুটের দীর্ঘদেহী আব্বাকে দেখলে এখন শিশুর মতো ন্যুব্জ মনে হয়। আমাকে দেখে অনেকেই বলেন , ভাই ব্যাম-ঠ্যাম করেন নাকি। আমি বলি, নারে ভাই, শরীরটা বাপ-মায়ের জেনেটিক্সে পাওয়া। মহল্লার অনেক মুরব্বী চাচাদেরকে দেখি যারা আব্বার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট তাঁরা আরো বছর দশেক আগেই বুড়িয়ে গেছেন। মৃত্যুর জন্য বিনীত অপেক্ষা তাঁদের।

মাস কয়েক আগে এক চীনা বংশোদ্ভূত ক্রেতা, যে কিনা সেকেন্ড জেনারেশন আমেরিকান তার সাথে কথা হচ্ছিল। বয়স প্রায় ৬৫ হবে। সে কোম্পানির এমডি, সর্বেসর্বা।

টাকা পয়সা পরিশোধ নিয়ে ঢিলেমির জন্য আমি এক পর্যায়ে বললাম, ‘কাহিনী কি ? এইটা ঝুলাইয়া রাখার মানে কি ? তুমি মালিক, তুমি বললেই তো হয়ে যায় ! ’

সে বলল, ‘আমার চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে আবার কে? তার কথাতো আগে বলো নাই।’
‘উনি আমার বাবা।’
‘বয়স কতো ?’
‘৮৯ বছর !’
‘এই বয়সে সে অফিস করে ! ’
‘না, সেই অর্থে অফিস করে না ! উনি প্রতিদিন নিয়মিত সকাল আটটায় অফিসে আসেন ঘড়ি ধরে। আমি তাঁর ব্যবসার উত্তরসূরি , সো আমার অফিসের ফিন্যান্সটা এখনো উনিই দেখেন। মাঝে মাঝে দুপুরের পরেও থাকেন , নইলে বাড়ী যেয়ে বা মহল্লাতে চ্যারিটি কিছু সংস্থা আছে সময় কাটান !’

‘উরি বাপস্‌ , বলো কি তুমি !’

আমার বিস্ময় প্রকাশে সে বলল, ‘ তোমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে আমাদের এইটা একটা বড়ো মানসিক পার্থক্য। তোমরা তীব্রভাবে পরকালে বিশ্বাসী। আমরা নই। আমরা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজের ভিতরে থেকে নিজেকে মূল্যবান মনে করতে চাই।’

আসলেই তো, চারপাশে যা দেখেছি। মধ্যবিত্তের রিটায়ারমেন্ট মানে– পুরোপুরি অপাঙতেয় মূল্যহীন জীবন। ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। দুইটা রাস্তা খোলা, কবরস্থান আর মসজিদ। তসবিহ্‌ নিয়া মসজিদে যাওয়া আসা করো এবং সারাক্ষণ সাড়ে তিন হাত অন্ধকার কবরের কথা চিন্তা করো। মানুষ দ্রুত বুড়িয়ে যাবে না কেন ? কাজ নেই , আলো নেই, বাতাস নেই, হাসি নেই, দুরারোগ্য অসুস্থতায় সার্বক্ষণিক মৃত্যুর কথায় কে না বুড়িয়ে যায় !

কয়েক বছর আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। বড়ো কোন অসুস্থতায় না পড়লে, যতদিন পারি কাজের ভিতর থাকব। সেই কাজ অর্থকরী হোক বা সমাজকল্যাণমূলক হোক। মরার আগে মরতে চাই না। অপাঙতেয় মূল্যহীন জীবন চাই না ।

প্রকাশকালঃ ২৭শে মার্চ,২০১৩

গল্পের জাল বোনা

লেখকেরা যেমন এক স্থানের চরিত্রকে আরেক জায়গায় নিয়ে গল্পের জাল বুনে যান, আমরাও কিন্তু অল্প বিস্তর তা করি।
ধরুন নতুন কোন উপায়ে আপনি প্রতারিত হলেন বা ধরা খেলেন ।
ঘরে ফিরে বউকে বললেন , ‘অমুক ভাই ক্যাম্নে ধরা খাইছে জানো?’
নিজের নামটা চেপে গেলেন দিব্যি !
আবার ধরুন , আপনি ঢাকা শহরে কোন এক পার্টিতে একটু বেশী পানে বেসামাল হলেন। কিন্তু, আপনার এই ব্যাপারটাও অন্য কোন বন্ধু বা কলিগের উপর দিয়ে চালিয়ে দিলেন।
‘ বুঝছ কিনা, অমুক ভাই, খাইতে পারে না, কিন্তু ৭/৮ পেগ মাইরা বইসা আছে। ফ্রি পাইলে যা হয় আর কি ! বমি টমি কইরা অস্থির ! শালার বাঙ্গালী , মাগনা পাইলে আলকাতরাও খায়!’

প্রকাশকালঃ মার্চ, ২০১৩

সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর বিবর্তনে আমি

ঘরকুনো হিসাবে আমার সুখ্যাতি আছে। অচেনা কারো সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলাপচারিতা করা আমার হয়ে ওঠে না। আমার অন্তর্মুখিতা নিয়ে আমার তেমন উদ্বেগ নেই। যেহেতু গার্মেন্টসের চাকরি করি , সবকিছুকে বয়স ভিত্তিক একটা সীমারেখায় ফেলে ফিরে দেখি আমার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর বিবর্তন কীভাবে হয়েছে। আধুনিক ফেসবুকের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং কেমন করে যে ঢুকে পড়লাম ! বাইরের অফিসিয়াল ট্রিপে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পরিবার ছেড়ে দুরে থাকলে এখনো হোম-সিক ও নস্টালজিক হয়ে পড়ি।

তো রক্তের আত্মীয় পরিজনের বাইরে আমার অনেকবার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর অভিজ্ঞতা আছে ! শেয়ার করে ফেলি। লেখাটা মনে হচ্ছে বড়ই হবে।

আমার বয়স যখন ০ থেকে ৫:
শত্রু সম্পত্তির তালিকাভুক্ত থাকায় আব্বাকে র‍্যাঙ্কিন ওয়ারীর বাড়ি ছেড়ে দিতে হলো। কিছুদিন নানাবাড়িতে বিরতি। বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে আম্মা ব্যস্ত আম্মাকে নিয়ে। নুরুন্নাহার খালা, যাকে আমি নুন্নী খালা বলতাম তাঁর সাথেই রক্তের সম্পর্কের বাইরে প্রথম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং । খাওয়া দাওয়া , গোসল-ঘুম, সব নুন্নী খালা। আম্মাও বাঁচলেন দায়িত্ব থেকে।

গ্রামে কিছুদিন বিরতি নিয়ে আবার ঢাকার মিরপুরে চলে আসলাম আমরা। বাড়িভাড়া ঠিক হওয়ার আগের মধ্যবর্তী সময়ে বড়ফুপুর বাড়িতে । বড়ফুপুর ছোট ননদ , সম্ভবত: নন্দিনী আন্টি আমার দ্বিতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং । একরাশ চুল নিয়ে মিষ্টি চেহারার শ্যামলা নন্দিনী আন্টি। তাঁর বিয়ের কথাবার্তা চলছিল । পাত্র প্রায় ঠিক, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। আমি নন্দিনী আন্টির চারপাশে ঘুরঘুর করি। ওঁনার গল্প-আদরের ভক্ত। একদিন সাহস করে গম্ভীর মুখে যেয়ে বললাম, আন্টি আমি আপনাকে বিয়ে করব! নন্দিনী আন্টি ব্যাপারটা নিয়ে মোটেও হাসাহাসি করলেন না। ফুপুকে যেয়ে বললেন, ভাবী আমার পাত্র খোঁজার দরকার নাই ! পাত্র পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ওইখানেই শেষ।

আমার বয়স যখন বয়স ৫ থেকে ১৪:
কিছু পত্র-মিতালী পত্রিকা ছিল, টাকা দিয়ে নাম-ঠিকানা ছাপানো যায়। বিয়ারিং ডাকযোগে অনেক নামের সাথে ছাপানো নিজের নামটাও আসে। টাকা দিয়ে বই ছাড়িয়ে নিতে হয়। তো, নীলফামারীর একমেয়ের নামের প্রেমে পড়ে গেলাম। বয়স সমান সমান । সাদিয়া আফরিন। সে কী গভীর উৎকণ্ঠা আর আবেগ নিয়ে হলুদ খামের চিঠি আর তার উত্তরের প্রতীক্ষা ! বেশ কয়েকমাস পরে সে জিজ্ঞাসিল আমি কোন ক্লাসে পড়ি। সরলমনে বললাম, ক্লাস সিক্সে। তার শেষ চিঠি আসলো হিন্দি সিনেমার ভাষার আবেগে ! নেহি ! কাভি নেহি ! ‘এ হয় না, এ হতে পারে না। তোমার আমার সম্পর্ক এইখানেই শেষ , তুমি আমাকে ভুলে যাও, আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি!’ আমি তারপরে তাঁকে বহুবার চিঠি দিয়েছি, আর উত্তর আসে নি। সাদিয়া আফরিন, তুমি কোন ডাকাত ঘরের বউ হয়ে দিন কাটাচ্ছো, জানতে ইচ্ছে করে। পত্র-মিতালী দিয়া সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর প্রথম পর্ব ওইখানেই শেষ !

স্কুলের শেষ বেঞ্চের ছাত্র হলেও রেজাল্ট ভালো করতাম। তো বিশেষ দিনগুলোতে ( একুশে ফেব্রুয়ারি , বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা , বিজয় দিবস ইত্যাদি ) সম্মিলিত অনুষ্ঠান হতো বয়েজ ও গার্লস সেকশন মিলে। ওই এক দুই দিনের জন্য আমরা ছেলেরা উন্মুখ হয়ে থাকতাম। অমরাবতী থেকে নেমে আসা, সাদা-ড্রেসের ফুটফুটে বালিকারা পৃথিবীর মাটিতে নেমে আসতো ! আমরা কতিপয় ময়লা জামার , স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরা খ্যাত জুলজুল করে তাকিয়ে থাকতাম ওই বালিকাদের দিকে। প্রভাতফেরীর এক মুগ্ধ সকালে এক কন্যাকে দেখে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং করতে ইচ্ছে হলও। এক সহপাঠীর সাথে শেয়ার ও করলাম। ও একটু খোঁজ-খবর নিয়া বললও, ওই কন্যা পাড়ার উঠতি মাস্তানের বোন এবং অন্য এক মাস্তানের বাগদত্তা। তৃতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং একবেলাতেই শেষ।
দূর থেকে যদি দেখি –নিজের পরিবারের বাইরে যে কোন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং দীর্ঘদিন ধরে রাখার তীব্র অক্ষমতা আছে আমার।

বয়স ১৪ থেকে ২১:
ঢাকা কলেজের দেড় বছর, দেড় মাসের মতো কোনদিক দিয়ে যে বেরিয়ে গেল। মাঝে মাঝে নিউমার্কেটে ইডেন সুন্দরীদের দিকে আড়চোখে তাকানো। চোখে তখন অন্য স্বপ্ন ! ‘ পড়ালেখা করে যেই গাড়ীঘোড়া চড়ে সেই ’ টাইপ আর কি। বালিকারা আমার মতো প্রেমিককে মিস করলো !
পত্র-মিতালীর দ্বিতীয় পর্ব। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় । রুমমেট ছদ্মনামে শহীদ আজিজ হলের ঠিকানা দিয়া নাম ছাপায়। প্রকৌশলের ছাত্র, হলের ঠিকানা দেখে গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে বালিকারা পত্র দেয়। বানানের বাহার আর চিঠির সৌকর্য দেখে আমরা ব্যাপক বিনোদন পাই। তো, লেজকাটা শিয়ালের মতো, রুমমেট ( সঙ্গত: কারণে নামোল্লেখ করছি না। ) তার পত্র-মিতার সাথে ফেউ হিসাবে আমাদের নামও দিত। এবং তার পত্র-মিতার অনুরোধে তার বান্ধবীদের সঙ্গে একসময় পরিচিত হলাম আমরা কয়েকজন। স্ট্রেন্থ অব ম্যাটেরিয়াল আর কার্ডিং মেশিনের ক্যাচালের মধ্যে থেকে যতদূর সম্ভব আর কী ! কোন এক পবিত্র সকালে বন্ধুর প্ররোচনায় গ্রুপ টু গ্রুপ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর জন্য রওয়ানা দিলাম মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে। সাজু-গুজু বালিকারা- নৌকা ভ্রমণের , খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছিল। আপ্যায়ন ভালোই হলো। খটকা লাগলো অন্য জায়গায়, পত্র-মিতালী থেকে তাঁরা জীবন সঙ্গিনী হওয়ার সুখচিন্তায় মশগুল। ‘ছেড়ে দে মা , কেঁদে বাঁচি!’ পত্র-মিতালীর মাধ্যমে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর ওই পর্বের আকস্মিক সমাপ্তি !

এর পরে আসলো, ডায়াল আপ কানেকশন, ইন্টারনেটের দ্বিতীয় প্রজন্ম। শুনলাম মেসেঞ্জারে নাকি নানা দেশের তন্বী তরুণীদের সাথে কথা বলা যায়, চ্যাট করা যায়। ধৈর্য ধরে থাকলে আরো অনেক কিছু করা যায়। কীসের কি, বাসার ফোন লাইন নিয়া ডায়াল আপে গুচ্ছের টাকা খরচ করাই সার । রাতভর এই চ্যাটরুমে, সেই চ্যাটরুমে ঢুঁ মারা ; হা হতোস্মি ! সুন্দরীর নাম দেখে মেসেজ ইন বক্স করি asl? ( age, sex , location ?) হয় উত্তর আসে নামটা মেয়ের হলে কী হবে, সে আসলে ৪৫ বছরের এক বুড়া, মোটর মেকানিক্সের কাজ করে। আবারো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর চেষ্টা মাঠে মারা গেল।

চাকরির শুরুতে বন্ধু বান্ধব দূরে সরা শুরু করলো। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে ও কেউ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমালো নিশ্চিত জীবন, কালচে সবুজ, কালচে নীল-নোটের মোহে। আমি পড়ে থাকলাম নতুন কোন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর অপেক্ষায়। হট মেইলে (ইয়াহু, হট মেইলে ) নানা রকম ক্লিপ, ছবি আদান প্রদান জমে উঠলো একসময়। হট মেইলে, কে কত হট জিনিষ আদান প্রদান করতে পারে তার প্রতিযোগিতা। উৎসাহে ভাঁটা পড়তে সময় লাগে না আমাদের । মাঝে মাঝে ফোন আসে, ‘আরে দোস্ত তুমি তো আর জিনিষ পত্র কিছুই পাঠাও না।’ ওই পর্যন্তই। ওয়ান ওয়ে সার্ভিস, আমি দুনিয়ার নেট ঘেঁটে তোমাদের পাঠাব আর তোমরা আরো চৌদ্দ জনরে পাঠিয়ে মজা নাও ! ধ্যাত! এইটাও একসময়ে একঘেঁয়েমিতে পেয়ে বসলো। এর মাঝে Hi5, Badoo মায় twitter পর্যন্ত ট্রাই করলাম। মজা পাইনা!

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে বেশ কয়েক বছর ধরে, ‘ইয়েস, নো, ভেরি গুড’ টাইপ কথাবার্তা বাংলিশে লেখা বা কিছু ছবি আপলোড করা। কিন্তু অভ্র দিয়া বাংলা শিখলাম মাত্রই গত নভেম্বরে ২০১৩ তে । নিজের ভাষায় কথা বলার, ভাবপ্রকাশের চেয়ে মধুর কিছু আছে কিনা জানিনা। গত কয়েকমাসে ফেসবুকিং , মতের আদানপ্রদান। নাম না জানা তরুণ তরুণীদের সাথে মত বিনিময়। ঢাকা কলেজের শেষপ্রান্তে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কয়েকটা বছর ছিল তরতাজা কিছু সমমনার সাথে দুর্দান্ত সময়। কিন্তু, সপ্তাহে সপ্তাহে মিরপুর টু বাংলামোটর , আমার সুবিখ্যাত আলস্য নিয়া সম্ভব না। এরপরে দীর্ঘ সময় , নতুন কিছু শোনাতে পারে এই রকম কোন গোষ্ঠীর সাথে ইন্টার অ্যাক্ট হয়নি আমার। পেশাগত কারনেই সম্ভবও ছিল না। ফেসবুক সেই সুযোগ করে দিল।

মাঝে মাঝে ফেসবুকের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ভার্চুয়াল সময়ক্ষেপণ ভালো লাগে না ! খুব কাছের কিছু মানুষ মতপার্থক্যের জন্য দূরে সরে যায় ! পরিবারের লোকজন বলে, দেশোদ্ধারের জন্য ছাপোষা এই আমিই কেন? আর কেউ নাই ? সে জন্য মাঝে মাঝে ডুব দিই সবরকম নেটওয়ার্কিং থেকে।নিজেকে কতটুকুই বা চিনি ? কিন্তু যেটুক চিনি , আন্দাজ করি, আমি ফেসবুকের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং- এও বেশীদিন হয়তো নেই !

সিক্স সেভেনে পড়ার সময় সাদা ড্রেসের স্কুলবালিকা দেখলেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে যেতো। পরিবারের এক্সপেকটেশন আর পড়াশুনার বেদম চাপে চ্যাপ্টা আমি– ওই বিষণ্ণ হওয়া পর্যন্তই ! বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ, বয়েজ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং( উল্লেখ্য, আমাদের ব্যাচে ৮০ জনের মধ্যে মেয়ে ছিল মাত্র দু’জন ; এঁরাও আমাদের সঙ্গে চলতে চলতে টমবয় টাইপ হয়ে গিয়েছিল– গালিগালাজ করতো, তুই তুকারি করতো ! ) নারী বিবর্জিত পরিপার্শ্বে জীবন হয়েছিল শুস্কং কাষ্ঠং । ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে , তেমন কারো সাথে প্রেম করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা চেপে যেতে হয়েছিল সঙ্গত কারণেই ! পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই , শুরু হলো চাকরি আর ক্যারিয়ারের চাপ। চাকরিজীবী ব্যাচেলর কলিগ-বন্ধুদের কাছে ভাবী-বিষয়ক পরকীয়ার রগরগে বর্ণনা শুনতাম। ইস্‌ ভাবী টাইপ বা আন্টি টাইপ কারো সাথে যদি পরকীয়া করা যেতো ! শুকাতে শুকাতে শুকাতে — অবশেষে সেই আরাধ্য প্রেম, দীর্ঘ(!) বছর দুয়েকের প্রেমের পর বিয়ে। ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েটি আমার জীবনে। ওই একটি মাত্র নারীর কাছ থেকে , তাঁর বয়স পরিবর্তনের সাথে সাথে ভার্সিটি পড়ুয়ার ভালোবাসার পরে এখন ভাবী টাইপ বিনোদন পাচ্ছি ! আন্টি টাইপ বিনোদনও পাবো আশা রাখি ! আর আমি — সেই ১৪ বছরেই থমকে আছি !

প্রকাশকালঃ মার্চ, ২০১৩

আশির দশকে নিম্নমধ্যবিত্তরা

দুই টাকা কেজি মূলা ; আঠারো -বিশ টাকায় মাঝারি সাইজের ইলিশ। বাসায় হঠাৎ মেহমান, কিন্তু আম্মার কাছে নগদ টাকা নাই।
পাড়ার দোকানের আবার বাকীর ব্যাপারে অলিখিত একটা সার্কিট ব্রেকার ছিল। পাঁচশ টাকার উপরে হলে নতুন বাকী বন্ধ। মহল্লাবাসী ঘনিষ্ঠ খালাম্মাদের আগের মাসের ধার শোধ করা হয়নি। আম্মা একটু দূরে কম পরিচিত খালাম্মার বাসায় পাঠালেন। ‘আম্মা একশ টাকা ধার চেয়ে পাঠিয়েছে, আগামী সপ্তাহে দিয়ে দেবে।’

বাসার গেটে মাথা নিচু করে পা দিয়ে মাটি খুঁটতে খুঁটতে অসীম অপেক্ষা। টাকা ধার চাওয়া যে একটা অসম্মানের ব্যাপার , ওই ছোট্ট বয়েসেও আমি বুঝতাম। মাঝে মাঝে ওই মিশনেও ব্যর্থ। আর , আব্বা আছেন আব্বার মতো। সকালের নাস্তা , রাতের রুটি-তরকারী কোথা থেকে আসবে, সেইটা তো আম্মার দায়িত্ব। রাশভারী বড়মামা ঢাকা আসলেই আম্মা পাকোয়ান ভাজা পরোটা দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। উনিও ভালোমন্দ খেতে পছন্দ করতেন। দেশের কেউ আসলে, আম্মা যথাসাধ্য আপ্যায়ন করতেন, আমরা অভাবে আছি বুঝতে দিতে চাইতেন না।
মাঝে মাঝে উপায়ন্তর না দেখে পুরানো খাতা,পেপার, ডানোর ডিব্বা ভাঙারীর দোকানে দেড়-দুই টাকা কেজিতে বিক্রি ; অতঃপর মেহমান ম্যানেজ।

এই যে , নিম্ন মধ্যবিত্তের টানাপড়েন আর প্রাত্যহিক সংগ্রাম—আমার দুই কন্যা কি কখনো বুঝবে ? নাকি, আমি ওদের কখনো বুঝতে দিতে চাই !

আমার ভালোবাসার কন্যারা তোমরা হয়তো অন্যরকম অন্যকোন টানাপড়েনে পার করবে জীবনের অন্যকোন অংশ ; আপাতত: সাইকেল বা ভিডিও গেমের অপর্যাপ্ততা নিয়ে আমার সাথে অনুরাগ দেখাতে থাকো !

প্রকাশকালঃ মার্চ,  ২০১৩