স্কুলস্মৃতি ও খাঁটি ঘি সমাচার

স্কুলজীবনে সবচেয়ে বেশী সন্ত্রস্ত থাকতাম রণজিৎ কুমার মৌলিক স্যারকে নিয়ে। তাঁকে নিয়ে এতো বেশী তিক্ত মধুর স্মৃতি , এখনো যদি স্কুল ফ্রেন্ডরা একসাথে হই, রণজিৎ স্যারের কথা উঠবেই উঠবে।তিনি যেমন রাশভারী ছিলেন ,তাঁকে ত্যক্ত করার মতো উপাদানও ( ছাত্র ও ছাত্রদের আচরণ, আর কী! ) আমাদের ক্লাসে কম ছিলনা।

আমাদের এক বন্ধু ছিল মুকুল, অপ্রাসঙ্গিক কথা বলায় ওর জুড়ি মেলা ভার। স্যার হয়তো ভয়েজ ন্যারেশন পড়াচ্ছেন, মুকুল মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘স্যার একটা প্রশ্ন ছিল’ বলে সন্ধি-সমাস নিয়া ত্যানা প্যাঁচানো শুরু করলো।

মুকুলকে দেওয়া স্যারের অনেকগুলো ঝাড়ির মধ্যে একটা ভীষণ জ্বলজ্বলে।

সেবার ও মুকুল ত্যানা প্যাঁচানো শুরু করতেই, স্যার কেন জানি না অনেকক্ষণ ধরে খুব মন দিয়ে শুনলেন।
বললেন , ‘কথা শেষ হইছে?’
‘ জী স্যার !’

স্যার খুব খুব স্বাভাবিক গলায় ‘মুকুল তোর দেশের বাড়ি কোথায়?’
জেলার নাম বললো মুকুল।
‘শোন্‌ , তোদের ওইখানে খাঁটি ভালো ঘি পাওয়া যায়?’
‘জী স্যার ’
‘তোর বাপ্‌রে কবি, খাঁটি ঘি নিয়ে আসতে।’
আমরা তখনো বুঝতে পারছি না , ঘটনা কোনদিকে যাচ্ছে।
‘ভোরে ঘুম থেকে উঠবি। এক টেবিল চামচ ঘি , সঙ্গে একটু চিনি দিবি চামচের উপর। এইভাবে কয়েকমাস খাবি।

মুকুলের বিনীত প্রশ্ন ‘কিন্তু স্যার এইটা খাইলে কী হবে?’

‘শোন্‌ মুকুল, এইটা পাগলামির ওষুধ , এইটা করলে তোর পাগলামি সারবে ! কারণ তুই একটা পাগল !’
এইবার সারা ক্লাস মাথা নিচু করে হো হো করে হেসে উঠলাম এবং অনেকে হাসি চাপার ব্যর্থ চেষ্টা করে গেলাম !

হে নবীন প্রজন্ম !

কানে হেডফোন দেওয়া অথবা মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকা কিশোর বা কিশোরী, তোমাকে বলছি !

হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি !
বাইরে তাকাও।
রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধের অসম্ভব সুন্দর এই পৃথিবীর চারপাশ তাকিয়ে, শুঁকে, শুনে ,চেখে উপভোগ করো। পৃথিবীটাকে ওই কয়েকটা গানের ও অ্যাপ্‌সের ভেতরে সীমাবদ্ধ কোর না !
ইন্টারনেট ও ফেসবুকের ভার্চুয়াল জগতটাকেই সব ভেবে নিও না।

বাইরে তাকাও, বই পড়ো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দাও, বাবা-মার সাথে গল্প করো। ছোট ভাইটাকে দুইটা ম্যাথ দেখিয়ে দাও। ছোট্ট বোনটাকে বলো, ওকে এই নতুন জামায় অনেক সুন্দর লাগছে!
আবারো বলি, পৃথিবী অনিঃশেষ সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে অপেক্ষা করে আছে তোমার জন্য।

নিজেকে বঞ্চিত কোর না !

কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন ( চাকরি ভালোবাসার সহজ পদ্ধতি )

আজ সকালে আমার প্রাক্তন বসের কাছ থেকে মেসেজ পেলাম।
উল্লেখ্য, তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক দুর্দান্ত বন্ধুসুলভ। কিন্তু এতো কঠিন সত্য, নিদারুণ বাস্তবতা –কেউ এইভাবে বলতে পারে? এই অব্‌জার্ভেশনে আমি মুগ্ধ !

1. If you don’t love your job, take a home loan; you’ll start loving it.
2. Take another loan; you will start loving your boss as well.
3. Get Married… You will start loving your office too.

মানুষের বুঝি অনেক জমির দরকার।How Much Land Does a Man Need

আমার বৈষয়িক সম্পদের ও সম্পত্তির পরিমাণ স্বল্প ! কিছু টাকা জমলেই , একটা না একটা বড়ো বিপদ বা ঝামেলা এসে হাজির হয়। নিজের কাছে টাকা আছে অথচ পরিবারের কারো বিপদে আমি সেটা খরচ করছি না, এটা আমাকে দিয়ে হয় না। আমার খুব কাছের বন্ধু-বান্ধবরা এগুলো জানে। সংসারের সম্পত্তি বৃদ্ধিতে আমি অ-বৈষয়িকই থেকে গেলাম।

যাক ! চল্লিশের পরে উপভোগ্য জীবন আর কতদিনের যে , উঞ্ছবৃত্তি করে জমিজমা ফ্ল্যাট করে যেতেই হবে। নইলে জীবনটা বার্থ! আমার মনে হয়, আমি এমন কিছু মূল্যবোধের বা ভ্যালুজের মধ্যে মানুষ হয়েছি, যে ওই মূল্যবোধ বজায় রাখতে গিয়ে আমাকে সারাক্ষণ একটা আর্থিক টানাটানির ভিতরে থাকতে হয়। এটা নিয়া আমার সহধর্মিণীর আফসোস আছে। এখন আবার দুই কন্যার নিরাপত্তার কথা বলে ভয় দেখায় আমাকে। গতস্যশোচনা নাস্তি। তেমন লাভ হচ্ছে না ! দীর্ঘ কর্মজীবনে অফিস থেকে ইনসেন্টিভ বা ওইরকম গালভরা নামের কিছু পেয়েছি মাত্র দু একবার । তাই দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছোট্ট একটা ‘পূর্বাচল চান্দের দেশ’ টাইপ এক জায়গার শেয়ারে আছি। এটাও করছি বউয়ের চাপে, আর আমার দুই কন্যা যাতে পরবর্তী জীবনে আমারে গালিগালাজ না করে। বাকীটা সময়ই বলে দেবে !

সম্পত্তির নিদারুণ অভাবে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার কৌশল কীভাবে যেন বের করে ফেলেছি। সম্পত্তির কথা উঠিয়ে আমার আফসোস জাগানো লোকজনকে লিয়েফ্‌ তল্‌স্তোয় বা লেভ টলস্টয়-এর একটা গল্পের কথা মনে করিয়ে দিই। মানে আমাকে যখনই কেউ জমি কিনতে বলে, আমি এই গল্প নিজেকে নিজে শোনাই তাকেও শোনাই! আপনারা শুনতে চাইলে বলি ।

ওই যে, ‘How Much Land Does a Man Need’ বঙ্গানুবাদ ‘কতটুকু জমি দরকার?’ বা ‘ মানুষের বুঝি অনেক জমির দরকার’- নামের গল্পটা।

গাঁয়ের ভূমিহীন কৃষক পাখোম স্বপ্ন দেখত কিছু নিজের জমির । দশ বিঘা , বিশ বিঘা করে শ’ দেড়েক বিঘা। সস্তার জমির কথা শুনে দূরদেশে দশগুণ সম্পত্তি পেয়েও তা সামান্য ঠেকতে লাগলো। লোকমুখে সে শুনতে পেল বাশ্‌কির বা উরাল পার্বত্য এলাকায় সর্দারদের সামান্য উপহারের বিনিময়ে এখনকার চেয়ে হাজারগুণ সম্পত্তি উর্বর জমি পাওয়া যাবে।

ক্রমাগত সম্পত্তির লোভে সে এসে পৌঁছে সর্দারদের কাছে। সামান্য উপহারের বিনিময়ে সর্দাররা রাজী হয় দিগন্ত বিস্তৃত উর্বর জমি দিতে। জমির দাম দিনে একহাজার মুদ্রা । শর্ত একটাই। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গোত্রপ্রধান একটা লাঠি পুঁতে দেবেন মাটিতে। এইবার জমির দাবীদারকে হাঁটা শুরু করতে হবে। সামনে আদিগন্ত ভূমি। কিন্তু সূর্যাস্তের আগেই পুঁতে দেওয়া লাঠির কাছে ফিরে আসতে হবে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতখানি জায়গা ঘুরে আসতে পারবে, সব জমি তাঁর নামে লিখে দেবেন ওই গোত্র প্রধানরা। সূর্য ডোবার আগে আগের জায়গায় ফিরে আসতে না পারলে টাকা ও জমি কিছুই পাবে না সে !

পাখোম হাঁটা শুরু করলেন, যত এগোয় ততোই ভালো সরেস জমি। আরেকটু আরেকটু করতে করতে দুপুর। তাঁর মনে পড়লো ফিরে যেতে হবে, দূরে পাহাড়ের ধারে গোত্রপ্রধানদের দেখা যাচ্ছে। জোরে হাঁটা শুরু করলো । বেলা ঢলে আসছে, আরো জোরে। সূর্যাস্ত হয় হয়। স্বপ্নজাল বুনতে বুনতে লোকটা দৌড়ানো শুরু করলো। আগের রাত্রে উত্তেজক নির্ঘুম রাত আর অনেক শ্রান্তির লোকটি প্রাণপণে দৌড়োতে লাগলো, সর্দাররা উৎসাহ দিচ্ছে এইতো আরেকটু । যখন সে পুঁতে রাখা লাঠিটার কাছে পৌঁছালো , পড়ে গিয়ে নিথর মৃত।
সবাই মিলে ওই জায়গাতেই কবর খুঁড়ল, মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছ’ ফিট জমি।
সেইখানে তাকে শুইয়ে দেয়া হলো।
ওইটুকু জমিই তার প্রয়োজন ছিল !
অনেক আগে পড়া গল্পটা মাথায় এমনভাবে গেঁথে আছে। মনে হয় কী লাভ জমির পিছনে ছুটে ! আমি জানি আমার এই অ-বৈষয়িক উন্নাসিকতার চরম দাম আমার পরবর্তী প্রজন্মকে দিতে হতেও পারে। নাও পারে ! তাঁরা আমাকে গালিগালাজ করতেও পারে , নাও পারে!

যাই হোক জমির নেশা থেকে আমি মুক্ত !

প্রকাশকালঃ এপ্রিল, ২০১৩

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ও বাঙালি চরিত্র

আমার বর্তমান কর্মস্থলের মালিক-পক্ষ ও প্রধান কার্যালয় সিংগাপুরে ।
বাংলাদেশীদের চরিত্রের একটা ব্যাপার নিয়ে প্রায়শ: আমার সাথে তাঁদের কথা হয়।

আমাদের সামাজিকতায় অধীনস্থ কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা সরাসরি ঊর্ধ্বতনকে কোন কথা বলতে পারে না। রুমে ঢুকে নানা রকম খাজুরালাপ করেন ; ত্যানা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে শেষে এসে আসল কথা বলেন।

আমাকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের সমস্যাটা কি, সরাসরি কেন আসল কথা বলতে পার না ? কেন অযথা সময় নষ্ট কর?’

আমি তাঁদেরকে বললাম, কেন –এটা আমিও বুঝি না। তবে এই অভ্যাস আমাদের মজ্জাগত। খাজুর করা ও ত্যানা প্যাঁচানো আমাদের জাতিগত বদভ্যাস !

প্রাসঙ্গিক ,অনেক আগে শোনা আমাদের পূর্ববঙ্গের একটা গ্রাম্য কাহিনী মনে পড়ে গেল।
চৈত্রের কাঠফাটা রোদে উঠানের দাওয়ায় বসে একলোক তামাক খাচ্ছে আর দা দিয়ে চেঁছে চেঁছে বেড়া তৈরির কাজ করছে।
ওই সময় এক পথচারী এসে পাশে বসলেন।
লোকটার পাশের ছেলেটা বলল , ‘আব্বা তুমার জন্যি আবার তামাক সাজা নিয়ে আসি।’
লোকটা বলল ‘যা সাজায়ে নিয়ে আয়।’
তো পথচারী ও ঘর্মাক্ত লোকের কথোপকথন অনেকটা এই রকম ছিল। স্মৃতি থেকে লিখছি।
পথচারী, ‘ভাই কি করতেছেন?;
তিরিক্ষি মেজাজে লোকটা খেঁকে উঠলেন, ‘দেখতেইতো পারতেছেন কি করতিছি।’
‘ভাই ওই যে ছাওয়ালটা তামাক সাজাতি গেল, সিডা কি আপনার ছাওয়াল ?’
‘আরে মরণ ! আমাক বাপ ডাইকলো কেবল, ওই ছাওয়াল আমার না তো কি আপনার?’
‘ভাই, এই বাড়ীডাও কি আপনের ?’
‘না , এই বাড়ী আমার না আপনার ! কি কতি চাচ্ছেন সুজা করে কনতো।’
‘না, মানে হাঁইটে যাচ্ছিলাম তো, ভাবলাম আপনার কাছ থেকে দুইটান তামাক খায়া যাই, একটু খাজুর করতিছিলাম আর কি।’
‘তামাক খাবেন সিডা সরাসরি কলিই তো হয়।’

তো আমাদের সিংহভাগ জনতাই ওই পথচারীর মতো। তামাক খাওয়ার কথা সরাসরি না বলে খাজুর করি, ত্যানা প্যাঁচাই।
এর মধ্যে স্বাভাবিক সৌজন্যের বিষয় আছে নিশ্চয়ই । কিন্তু এই গ্রাম্য-কাহিনী দিয়ে আমাদের বাঙালী চরিত্র যতো সহজে আপনারা বুঝবেন, আমার বিদেশী সহকর্মীদের সেটা বোঝানো সম্ভব না !