বিধাতা।। বনফুল

বাঘের বড় উপদ্রব। মানুষ অস্থির হইয়া উঠিল। গরু বাছুর, শেষে মানুষ পর্যন্ত বাঘের কবলে মারা পড়িতে লাগিলো। সকলে তখন লাঠি সড়কি বর্শা বাহির করিয়া বাঘটাকে মারিল। একটা বাঘ গেল- কিন্তু আর একটা আসিল। শেষে মানুষ বিধাতার নিকট আবেদন করিল-
ভগবান, বাঘের হাত হইতে আমাদের বাঁচাও।
বিধাতা কহিলেন- আচ্ছা।
কিছু পরেই বাঘরা আসিয়া বিধাতার দরবারে নালিশ জানাইলো, আমরা মানুষের জ্বালায় অস্থির হইয়াছি। বন হইতে বনান্তরে পলাইয়া ফিরিতেছি। কিন্তু শিকারি কিছুতেই আমাদের শান্তিতে থাকিতে দেয় না। ইহার একটা ব্যবস্থা করুন।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
তৎক্ষনাৎ নেড়ার মা বিধাতার নিকট আবেদন পেশ করিলেন, বাবা, আমার নেড়ার যেন একটি টুকটুকে বউ হয়। দোহাই ঠাকুর , তোমায় পাঁচ পয়সার ছিন্নি দেব।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
হরিহর ভট্রাচার্য মামলা করিতে যাইতেছিল। সে বিধাতাকে সম্বোধন করিয়া বলিল, আজীবন তোমার পুজো করে এসেছি।উপবাসে দেহ ক্ষীণ করেছি। শালা ভাইপোকে আমি দেখে নিতে চাই। তুমি আমার সহায় হও।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
সুশীল পরীক্ষা দিবে। সে রোজ বিধাতাকে বলে, ঠাকুর, পাস করিয়ে দাও। আজ সে বলিল, ঠাকুর, যদি স্কলারশিপ পাইয়ে দিতে পার, পাঁচ টাকা খরচ করে হরিলুট দেব।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
হরেন পুরকায়স্থ ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান হইতে চায়। কালী পুরোহিতের মারফত সে বিধাতাকে ধরিয়া বসিল- এগারটা ভোট আমার চাই। কালী পুরোহিত মোটারকম দক্ষিণা খাইয়া ভুল সংস্কৃত মন্ত্রের চোটে বিধাতাকে অস্থির করিয়া তুলিল। ভোটং দেহি, ভোটং দেহি—
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা, আচ্ছা ।
কৃষক দুই হাত তুলিয়া কহিল, দেবতা, জল দাও।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
পীড়িত সন্তানের জননী বিধাতাকে প্রার্থনা জানাইল, আমার একটি মাত্র সন্তান, ঠাকুর কেড়ে নিও না।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
পাশের বাড়ির ক্ষেন্তি পিসি উপরোক্ত মাতার সম্পর্কে বলিলেন, বিধাতা মাগীর বড় দেমাক। নিত্য নতুন গয়না প’রে ধরাকে সরাজ্ঞান করছিল। ছেলের টুঁটিটি টিপে ধরে বেশ করেছ দয়াময়। মাগীকে বেশ একটু শিক্ষা দিয়ে দাও তো।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
দার্শনিক কহিলেন হে বিধাতা, তোমাকে বুঝিতে চাই ।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
চীন দেশ হইতে চীৎকার আসিল, জাপানিদের হাত হইতে বাঁচাও প্রভু।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
বাংলা দেশ হইতে এক তরুণ ধরিয়া বসিল, কোনও সম্পাদক আমার লেখা ছাপিতেছে না। প্রবাসী’তে লেখা ছাপাইতে চাই। রামানন্দবাবুকে সদয় হইতে বলুন।
বিধাতা কহিলেন, আচ্ছা।
একটু ফাঁক পড়িতেই বিধাতা পার্শ্বোপবিষ্ট ব্রহ্মাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনার বাসায় খাঁটি সরষের তেল আছে?
ব্রহ্মা কহিলেন, আছে। কেন বলুনতো?
বিধাতা। আমার একটু দরকার। দেবেন কি?
ব্রহ্মা। (পঞ্চমুখে) অবশ্য, অবশ্য।
ব্রহ্মার বাসা হইতে ভাল সরিষার তৈল আসিল। বিধাতা তৎক্ষণাৎ তাহা নাকে দিয়া গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িলেন।
আজও ঘুম ভাঙে নাই।

শ্রেষ্ঠ গল্প বনফুল । রচনাকাল ১৯৩৬।

করোনায় গার্মেন্টস খোলা থাকবে নাকি বন্ধ থাকবে

গার্মেন্টস খোলা থাকবে নাকি বন্ধ থাকবে এটা নিয়ে সবাই কনফিউজড ছিলেন। পক্ষে বিপক্ষে অঢেল যুক্তিতর্ক আছে। নানা যুক্তিতর্কের পরে সবার সম্মতিতে সীমিত আকারে গার্মেন্টস চালু করা হয়েছে।

এই কিছুক্ষণ আগে একবন্ধু ইন-বক্সে বলল, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে গার্মেন্টসে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া আর নববিবাহিত দম্পতিকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সংসার করার আদেশ দেওয়া একই কথা!’

ওর কথা শুনে, বহুদিন আগের একটা কাহিনী মনে পড়ে গেল। যৎসামান্য অশ্লীলতা ক্ষমার্হ !

কাহিনী হেরিটেজ হোটেলের (রাজা-মহারাজাদের প্রাসাদগুলোকে মূলত: হেরিটেজ হোটেল বানানো হয়।)
তো , এক নববিবাহিত দম্পতি হেরিটেজ হোটেলে রুম ভাড়া নিতে গেছে ! কোন রুম ফাঁকা নেই।একটাই রুম ফাঁকা, শতবছর আগে মহারাজা স্বয়ং ওই রুমে থাকতেন।

হোটেল ম্যানেজার : ‘দেখুন , এই রুমের খাটটি অনেক অনেক পুরাতন । এগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । তো, স্বামী–স্ত্রী দের আমরা এই রুমে কখনই থাকতে দিই না। আপনাদেরকে দিচ্ছি । আপনারা কষ্ট করে ফ্লোরে থাকবেন।’
এই বলে ম্যানেজার রুমবয় কে ডেকে বলল : ‘এই খাটটা সরিয়ে ফেল্।’

স্বামী : দেখুন ভাই, আমরা নববিবাহিত …

ম্যানেজার ( রুমবয়কে ডেকে ) : ‘এই, চেয়ার গুলাও সরা…..’

প্রকাশকালঃ ১লা মে, ২০২০

গার্মেন্টস নিয়ে পুরনো কিন্তু প্রাসঙ্গিক লেখা

ওইদিকে আমেরিকা আর এইদিকে ইউরোপের মধ্যে জার্মানি আমাদের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক-ক্রেতা দেশ। এদের বেশ কিছু নাম করা ডিসকাউন্টার আছে যাদের দোকানের সংখ্যা দশ হাজার, বারো হাজার মায় কুড়ি-হাজার পর্যন্ত আছে। পাড়ার মোড়ে মোড়ে এদের দোকান। গত বছর কী মনে করে আমেরিকা ও জার্মানি দুই দেশেরই কয়েকটা ডিসকাউন্টারের বড়ো বড়ো দোকান ঘুরে দেখার সুযোগ মিললো।

প্রথমে আসি , ওয়ালমার্টের কথায়। এদের কিছু সুপার শপ আছে। এই পাশ থেকে ওই পাশ দেখা যায় না। টয়লেট পেপার থেকে শুরু করে গাড়ীর চাকা পর্যন্ত বিক্রি করে। কতো সস্তায় এরা পণ্য বিক্রি করছে, উদাহরণ দিয়ে বুঝাই। বাইরে ৫০০ মিলির একই ব্রান্ডের এক বোতল পানি হয়তো দেড় দুই ডলার। কিন্তু , সুপারশপে আপনি যদি এক সঙ্গে ২৪ টার এক ক্রেট পানি কেনেন তবে ওইটার দাম ৫ ডলার মানে প্রতি পিস পড়ছে ২০ সেন্ট ! ক্যাম্নে কী !

এইবার আসেন জার্মানিতে, বাইরে এক বোতল ওয়াইনের দাম ১৫ ইউরো। কিন্তু, সুপার শপে ৬টা এক সাথে কিনলে, ৪০ ইউরো।

দেখলাম , একটা গ্যাস লাইটারের বাইরে দাম ১ বা দেড় ইউরো , কিন্তু এরা ১২ টা একসাথে বিক্রি করছে ১.৭৫ ইউরোতে মানে একটার দাম ১৫ সেন্টের কাছাকাছি !একটা গ্যাস লাইটারের উৎপাদন খরচ চীনে কতো হতে পারে, আর জার্মানি পর্যন্ত এনে কেমন করে এই দামে বিক্রি করছে, সেটা বড়ো কোন গবেষণার বিষয় না। আপনি নিজেই হিসাব করতে পারবেন। ধরেন ওই গ্যাস লাইটার চীন থেকে ৫০০০ পিস কিনলে আপনি যে দামে পেতেন, তার এক দশমাংশ দামে পাবেন , যদি আপনি পাঁচকোটি গ্যাস লাইটার কেনেন একসাথে । সেক্ষেত্রে একটি গ্যাস লাইটারের দাম ৩ বা ৪ সেন্ট করে পড়বে!
এই ডিসকাউন্টারগুলো, They are simply killing and spoiling the market !

মাঝে মাঝেই গার্মেন্টস মালিকদের সাথে কথা হয়। অনেকেই বিকল্প কোন সেক্টরের কথা চিন্তা করতে বলেন বা জিজ্ঞাসা করেন , অন্যকোন ব্যবসা ক্ষেত্র আছে কীনা । ৯০ এর দশকের কোটা(Quota) কেনাবেচার আমলে গার্মেন্টসের ব্যবসায় রমরমা লাভ ছিল, আজকের বড়ো বড়ো সব গ্রুপগুলো কোটার ব্যবসা করে শত শত লাইনের আর ডজন ডজন বিল্ডিং এর মালিক। দুই টাকা যদি সিএম( কাটিং মেকিং কস্ট ) থাকতো, কোটা থেকে পেতেন কুড়ি টাকা। যারা সেই আমলের গার্মেন্টস ব্যবসা করেছেন তারা জানেন কী পরিমাণ লাভ তারা করেছে। কিন্তু পরের যুগের গার্মেন্টস উদ্যোক্তারা যে কত রকম সীমাবদ্ধতার মাঝখান দিয়ে এই সেক্টরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন , সেটা আমরা কাছ থেকে অনেকেই দেখছি।

আমাদের আসলেই একটা বিকল্প ক্ষেত্র দরকার!

এই একরৈখিক একমাত্রিক পরনির্ভরতা আমাদেরকে নীচের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পশ্চিমা ক্রেতারা জানে, এই তৈরি পোশাক খাতে যারা বড়ো বড়ো বিনিয়োগ করে বসে আছেন তাঁদের অর্ডার দরকার। অনেকে শুধুমাত্র পেটেভাতে দাম মিললেও অর্ডার নিয়ে নেন। এইটাকে আমরা বলি ব্রেক ইভেন কস্ট-এ অর্ডার নেওয়া । ফ্লোর বসিয়ে রাখলে যে ক্ষতি , সস্তার অর্ডার নিয়ে ফ্লোর চালালে অন্তত আর্থিক ক্ষতিটা এড়ানো যায়। এ এক দুর্ভেদ্য দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে গেছেন তারা। আবার নতুন উদ্যোক্তারা। ১৮% সুদে ব্যাংক লোন নিয়ে, সস্তার কাজ নিয়ে ন্যূনতম লাভ তুলতে পারছেন না।

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন, যারা ফ্যাশন ক্রেতা তারাও হুমকির মুখে আছে কিছু ডিসকাউন্টারের অতি মূল্যহ্রাসের দুষ্টচক্রে। যে ফ্যাশন ক্রেতা, সে হয়তো ৫০০০ টি-শার্ট নিবে। সে ২.৫০ বা ৩ ডলার FOB দিয়ে কিনে ৯ ইউরোতে বিক্রি করবে। তাঁদের প্রাথমিক লভ্যাংশ ৫৫ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ ভাগ থাকে। পরে সেল ও অফ সিজন ধরে দোকান খরচ দিয়ে পুষিয়ে যায় ।

কিন্তু, ডিসকাউন্টাররাও ওই একই টি- শার্ট ৫ লক্ষ পিস নিবে। সে কিনতে চাবে , ১.৫০ ডলারে। এখন সে যদি চায় কম লাভে ওই টি-শার্ট রিটেল মার্কেটে বিক্রি করবে, ইচ্ছা করলেই সে দেড় থেকে দুই ইউরোতে বিক্রি করতে পারবে ওইটা । সে কোন মার্ক-আপ রাখবে না। বড়ো বড়ো গ্রসারি ডিসকাউন্টার Wal-Mart, Primark, LIDL, TCHIBO, TESCO, ALDI এদের প্রধান পণ্য কিন্তু পোশাক নয়, এরা মূলত: গৃহস্থালি , শাক-সবজী, খাদ্যদ্রব্য, পানীয়ের ফাঁকে হাজার হাজার দোকানে সস্তার টি-শার্ট বা অন্য পোশাক বিক্রি করছে নামমাত্র মূল্যে। এদের সাথে তাল মিলিয়ে INDITEX, H&M এর মতো বড়ো চেইন রিটেইল গুলোও ক্রেতা আকর্ষণ করতে ডলারে কিনে সমমূল্যের ইউরোতে পোশাক বিক্রি করছে। মানে, ২ ডলারে টি-শার্ট কিনে , ২ ইউরোতে বিক্রি করে ক্রেতা আকৃষ্ট করছে।

মাঝখানে বিপদে পড়ে গেছে ওই মাঝারি মাপের ফ্যাশন রিটেলগুলো, যারা অনেক ডিজাইনার রেখে , অনেক গবেষণা করে একটা টি শার্ট ৯ ইউরোতে বিক্রি করতে চায়। দরিদ্র হিস্পানিক ও এশিয়ান ইমিগ্রান্টরা হন্যে হয়ে Wal-Mart, K-Mart, TESCO, PRIMARK এ ছুটে যাচ্ছে। মাঝখানে Wal-Mart এর Everyday Low Price থিওরির চক্করে পড়ে নাভিশ্বাস উঠছে আমাদের পোশাক প্রস্তুতকারীদের।

আর সাদা চামড়ার ওই সব খুচরা ক্রেতাদের কথা বলছেন ? তারা সোফায় বসে টিভিতে বাংলাদেশের তাজরীন বা রানা প্লাজার কথা শুনে একটু হু হা করবে হয়তো। কিন্তু পরের দিন ভোরে উঠেই ছুটবে সেই সস্তার দোকানেই ! এদের ভণ্ডামির কথা না হয় আরেকদিন বলবো।

প্রকাশকালঃ ১লা মে,২০২০

পূর্ববঙ্গের ধনীঃ অবদান ও সমালোচনা

জমিদার, রাজা মহারাজাদের সব কর্মকাণ্ডকে অবলীলায় মেনে নেওয়ার পক্ষে আমি নই। কিন্তু তাঁদের সম্পদের বাহুল্যের মাঝেও সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য যাঁরা দান করেছেন, স্কুল কলেজ আর হাসপাতাল করেছেন তাঁদের ব্যাপারে আমার শ্রদ্ধা আছে। একই সঙ্গে বাঙালি মুসলমান সমাজের ধনীদের নিয়ে আছে প্রশ্ন !

নওয়াবি আমলের পরে ইংরেজ শাসনামলে বাঙালি মুসলমান বড় একটা ভুল করে বসেছিল আধুনিক শিক্ষা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে। সেই অধঃপতনের ধারা তারা আজো বয়ে চলছে। সেই ভুলের খেসারতে হিন্দু সমাজের অনেকে জমিদারির পত্তন শুরু করেন। এঁদের মাঝে আমাদের পূর্ববঙ্গে বহু জমিদারকে পেয়েছি যারা সমাজসেবক ছিলেন। এমন না যে সেই সময়ে সমস্ত মুসলমান একেবারে হত দরিদ্র ছিলেন। বহু সম্পদশালী বাঙালী মুসলমান ছিলেন, কিন্তু মনে করার মতো ফিলান্থ্রপিস্ট ( Philanthropist) ছিলেন হাজী মুহাম্মদ মহসীন। নওয়াব আহসানউল্লাহ্, স্যার সলিমুল্লাহ তো বাংলাভাষী ছিলেন না।

তখন থেকেই গড় সম্পদশালী মুসলমানদের সমাজসেবায় দুর্বলতা আমাদের চোখে পড়ে।

ব্রিটিশ আমলের কথা বাদ দিলাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে নব্যধনী বাঙালী মুসলমানেরা শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য সংখ্যা অনুপাতে মোটেও এগিয়ে আসে নি। সারাদেশ জুড়ে আমরা দেখেছি, বড়লোকেরা বাড়ির পাশে একটা করে কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে মোজাইক করা মসজিদ স্থাপন করে তাদের ও তাদের পরিবারের আখিরাতের সুরাহা করেছেন। চৌধুরী পরিবারের মসজিদে খোন্দকার সাহেবরা নামাজ পড়লে সওয়াব কম হবে, সেই জাত্যভিমানে ২০০ গজ দূরে একই গ্রামে আরেকটি মসজিদ তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে আরেকটা মাদ্রাসা। এরা বছরের পর বছর না করেছেন কোন সাধারণ শিক্ষালয়, না করেছেন কোন হাসপাতাল।

আমি আবারো বলছি বাঙালি মুসলমান ধনীরা যা করেছেন তা তাঁদের সামগ্রিক সামর্থ্যের তুলনায় এতো অনুল্লেখ্য যে তা হাতে গুণে বলে দেওয়া যায়। মাঠ পর্যায়ের ধনীরা আখিরাতের চিন্তায় নিজের ও বাপের নামে মসজিদ আর মায়ের নামে মাদ্রাসা করা ছাড়া তেমন কিছু করেন নাই। এতো এতো মাদ্রাসা দিয়ে দেশের যে তেমন কোন লাভ হয় নি সেটা বোঝার জন্য আইনস্টাইন হওয়ার দরকার নেই।
পূর্ববঙ্গে রণদাপ্রসাদ সাহা, ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী কলেজ, কুমুদিনী হাসপাতাল , কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট কী না করেছেন। যদিও তিনি জমিদার ছিলেন না ; ছিলেন সাধারণ থেকে উঠে আসা একজন ব্যবসায়ী। যেদিকে তাকাবেন দেখবেন টাঙ্গাইলের রানী বিন্দুবাসিনী চৌধুরী , বরিশালে ব্রজমোহনের করা বিএম কলেজ ; খুলনায় বাবু ব্রজলাল চ্যাটার্জির বিএল কলেজ। আমার নিজের জেলা কুষ্টিয়াতে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার একাধারে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা থেকে শুরু করে মথুরানাথ প্রেস আর মথুরানাথ স্কুল করে পুরো এলাকার শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এছাড়াও মোহিনী মোহন মিল ও তাদের করা শিক্ষালয়গুলো তো আছেই।

সেই অর্থে নব্যধনী বাঙালি মুসলমানের আর্থিক সামর্থ্য গত কয়েক দশক তুলনারহিত বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথায় তাদের সমস্যা ? কেন দেশের যে কোন দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে এঁদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে ! সমাজ ও মানুষের সার্বিক কল্যাণে এঁদের অবদান কোথায় ?
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম নামের মহতী প্রতিষ্ঠানের কাজ অনেক আগে থেকেই আমার অসম্ভব ভালো লাগে। নাম পরিচয়হীণ মৃতদেহ যে একটা সন্মানজনক সৎকারের দাবি রাখে এবং সেটা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে, ব্যাপারটা অসাধারণ । আমার ধারণা ছিল এটি ব্রিটিশ পরবর্তী কোন বাঙালি মুসলমানের কেউ করেছেন। পরে দেখলাম এটি তৈরি হয়েছে ১৯০৫ সালে কোলকাতায়।
আচ্ছা, এই লেখার উপরের অংশ লেখা একদিনে। লিখে রেখে দিয়েছিলাম।

আজকে পরের অংশ লিখতে গিয়ে মনে হল, আমার মনে হয় কোথাও একটা ভুল হচ্ছে !
ধনী মুসলমান সমাজ তো এগিয়ে এসেছে, আমাদের চারপাশে অনেক হিন্দু স্কুল ও কলেজের পাশাপাশি নব্যধনী মুসলমান সমাজ গত পাঁচ দশকে তাঁদের স্ত্রী-বাবা-মার নামে অনেক স্কুল-কলেজও করেছেন। তারপরেও সমাজের এই দুরবস্থা কেন ? তখন হিসেব করে দেখলাম ; নব্যধনী মুসলমান সমাজ যদি একটা সাধারণ শিক্ষার স্কুল তৈরি করে থাকে, মাদ্রাসা-মসজিদ করেছে দশটা। সুতরাং সমাজে এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পিছিয়েছে বেশি।

মাদ্রাসার মতো একটা অনাধুনিক, অনুৎপাদনশীল, পরিত্যক্ত শিক্ষা সমাজকে এগিয়ে নেবে কী করে ! সেই কুদরতে খুদার সময় থেকে রাষ্ট্র যতোবার মাদ্রাসা শিক্ষায় আধুনিকায়ন করতে গেছেন ততোবারই কওমি সম্প্রদায় হা রে রে করে তেড়ে এসেছে। দেশের সবচেয়ে বড় একটা জনগোষ্ঠী আমৃত্যু অনুৎপাদনশীল থেকে জ্যামিতিক হারে বংশবৃদ্ধি করে গেলে দেশ এগুবে কী দিয়ে !

প্রকাশকালঃ

করোনার দিনলিপি ২

গত কয়েক দশকের মহামারী- সার্স, বার্ড ফ্লু, মার্স, জিকা, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু সব ভাইরাসেই মৃত্যু আশঙ্কা ছিল। কিন্তু এইবার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কোভিড ১৯ করোনা ভাইরাসের সঙ্গে মৃত্যুশঙ্কার চেয়েও বড় আতঙ্ক বোধকরি সামাজিক সন্মান ।

ইংল্যান্ডের প্রিন্স চার্লসের হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের হয়েছে, হলিউডের অস্কার জয়ী টম হ্যাঙ্কসের হয়েছে। আমাদের মিডিয়া সেটা ফলাও করে প্রচারও করেছে। বাংলাদেশের কারো হলে তাঁর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে সেতো পাগলেও বোঝে। সেই অর্থে সে যে অচ্ছুৎ সে ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নাই, কিন্তু তাঁর ও তাঁর পরিবারের এতো সামাজিক গোপনীয়তার কারণ কী হতে পারে ! কুশিক্ষা আর অমানবিকতা !

কোভিড ১৯ কারো হলে মনে হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তি বোধহয় খুব জঘন্য কিছু করে এই রোগ বাঁধিয়েছে !
নব্বইয়ের দশকে আমাদের বাঙালি মুসলমান সমাজে সমকামী ও পতিতাগামী এইডস রোগীদের যেভাবে দেখা হতো , কোভিড ১৯ রোগীদের সেইভাবে দেখা হচ্ছে। এই সামাজিক অবমাননার কারণে অনেকে চেপে থাকতে চাচ্ছেন রোগটিকে । মহল্লায় মহল্লায় গুজব আর বাঁশ নামিয়ে লকডাউনের ছড়াছড়ি হচ্ছে।

ব্যতিক্রম যে নেই তা না ; উচ্চশিক্ষিত যাঁদের হয়েছে, সুস্থ হচ্ছেন, যেমন বিএসএমএমইউ এর সাবেক উপ-উপাচার্যের করোনা থেকে রোগমুক্তির কথা টিভিতে দেখলাম। এই ডাক্তার ভদ্রলোক ও তাঁর কন্যা জানেন, এটা তাঁদের সামাজিক সন্মানের সঙ্গে জড়িত কিছু নয় মোটেও।
অথচ এই অতিমিডিয়ার যুগে করোনা ভাইরাস একজন আক্রান্তের যা কিছু অর্জন সেটা ধূলায় মিশিয়ে দিচ্ছে, । কেউ আক্রান্ত হয়েছেন এটা তার চেয়েও তার পরিবারের জন্য বেশি বিড়ম্বনার, আতঙ্কের ও যন্ত্রণার মনে হচ্ছে।

প্রকাশকালঃ ২৬শে এপ্রিল,২০২০