২০১৫ সাল পর্যন্ত আমি আমার প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত রিক্রুটমেন্ট ইন্টারভিউয়ের বোর্ডে বসতাম। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ইউনিভার্সিটির সদ্য গ্র্যাজুয়েট তরতাজা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে ভালই লাগত। প্রাথমিক কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার পরে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিয়ে কথা বলার সময়ে দুটো প্রধান শ্রেণির মুখোমুখি হতাম। একদল ছিল, বিনয়ের সঙ্গে আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী যে স্যালারি স্ট্রাকচার আছে, সেটা জেনে দরকষাকষি করত। আরেকদল ছিলেন, যারা নিজেদেরকে বেশি মূল্যবান ভাবত অথবা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জন্য খুব বেশি বেতন চেয়ে বসত।

আমার মনে আছে, আমি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন করেছি, সেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে গেলাম। একজন আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, অন্য চাকুরিপ্রার্থীর চেয়ে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা , হেনতেন অনেক বেশি। আমার প্রতিষ্ঠানের অবশ্যই উচিৎ তাকে অন্যদের চেয়ে বেশি বেতন দেওয়া। আমি যে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, সেটা আমি তাকে প্রথমে বলিনি , সেও জানে না। তো , এক পর্যায়ে বললাম–আপনি দাঁড়িয়ে আছেন আপনার ১০ বছরের মাধ্যমিক আর ২ বছরের উচ্চমাধ্যমিকের ভালো ফলাফলের উপরে। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, গত ৪/৫ বছরে যতোখানি শেখার কথা ছিল গ্রাজুয়েশনে তার এক চতুর্থাংশও আপনি শেখেন নাই। আমাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর লেভেলের পড়াশোনা সম্পর্কে আমার মোটামুটি ভালো আইডিয়া আছে।

ক্যান্ডিডেট তখন গিয়ে বুঝতে পারল, আমার কথার যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো না। মূলত: স্নাতক লেভেলে সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাঁকির পরিমাণ সীমাহীন । সীমিত কয়েকজন ছাড়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থী সিনিয়রদের নোটের ফটোকপি আর নীলক্ষেতের বই ফটোকপির দোকানে দৌড়াদৌড়ি করে শিক্ষাজীবন শেষ করে।

বই পড়ার ব্যাপারে আমার হয়েছে তাই। আমি ক্লাস সিক্স থেকে শুরু করে ক্লাস টেন পর্যন্ত দস্যু বনহুর , সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা, ওয়েস্টার্ন, তিন গোয়েন্দা, কিশোর ক্লাসিকে ডুবে ছিলাম। এরপরে বন্ধুর বড়ভাইদের লাইব্রেরিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার,বুদ্ধদেব গুহ আর নিমাই ভট্টাচার্যের সঙ্গে পরিচয়। হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসগুলোর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো গোগ্রাসে গিলতাম। আমাদের বাসায় নিয়মিত ঈদসংখ্যা আর পশ্চিমবঙ্গের শারদীয় পূজা সংখ্যা রাখা হোত। সেই উপলক্ষে সমকালীন মোটামুটি সব লেখকদের লেখালেখির সঙ্গে পরিচয় হয় আমার।

স্কুল জীবন পার হয়ে , বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে পরিচয় কলেজ কর্মসূচির মাধ্যমে ; ৯০ সালের শেষের দিকে। তখন কেন্দ্রের বাছাই করা বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের কাছে শুনে শুনে আরো কিছু ক্লাসিক পড়ে ফেললাম। কলেজ কর্মসূচির পরে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের পড়ার অভ্যাস চালিয়ে যাওয়ার জন্য মৌলিক উৎকর্ষ নামের একটা ছোট পাঠচক্র চালালেন। আগের পড়া লেখকদের কারো কারো রচনার বিস্তৃত পড়া হল। যতদূর মনে আছে, ঐ মৌলিক উৎকর্ষে আমরা কয়েকজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসসমগ্র পড়ে ফেললাম। ঐ বয়সে রবীন্দ্রসঙ্গীত, কবিতা আর ছোটগল্পের সঙ্গে আর সবার যতোটুকু পরিচয়, আমাদেরও ততোটুকু। তারপরেও ১৭/১৮ বছরের কয়জনই বা রবীন্দ্রনাথের সবগুলো উপন্যাস পড়ে ফেলে ! অন্যদের চেয়ে একটু বেশি পড়া নিয়ে আমাদের বিস্ময় ছিল, ভালোলাগা ছিল।

তবে স্যারের সামনে আমরা ম্রিয়মান হয়ে থাকতাম । আমাদের সবাই স্যারের কথা শুনে ভাবতাম একজীবনে একজন মানুষের পক্ষে এতো বই পড়া কীভাবে সম্ভব ! বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের এতো এতো বই সায়ীদ স্যার কীভাবে পড়েছেন আবার সেই সব পঠিত বইয়ের শ্রেষ্ঠ লাইনগুলো কীভাবে মনেও রেখেছেন ! আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতাম , যেহেতু পাকেচক্রে আমারও কিছু ক্লাসিক পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এই ব্যাপারটা আমাদের ব্যাচের বন্ধুদের ভিতরেও ছিল। বেশি পড়া নিয়ে কোনরকম আত্মশ্লাঘা বা কম পড়াদের ব্যাপারে তাচ্ছিল্য ছিল না।

তবে শুনেছি, আমাদের পরবর্তী ব্যাচগুলোতে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। বাগান বড় হলে , বাগানে ফুল গাছের সঙ্গে সঙ্গে আগাছাও বাড়ে। এদেরই কারো কারো উন্নাসিকতা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ব্যাপারে অন্যদের একটা ভুল মেসেজ দিয়ে বসে। যাই হোক, সেটা হতেই পারে।

তো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পড়া নিয়ে আমার একটা স্মৃতি আছে। টেক্সটাইলে আসার আগে আমি কয়েক মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রিতে পড়েছিলাম। তো, কী কারণে যেন কয়েকজন বিজ্ঞান অনুষদের বন্ধুরা আড্ডা মারতে গেছি মধুর ক্যান্টিন বা তার আশেপাশে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল । আমি বোধহয় মৃদু ভাষায় কিছু একটা বলেছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের কুলীন ছাত্র-ছাত্রীদের কয়েকজন এমন করে আমার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকালো –মনে হল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপরে তাদেরই একচ্ছত্র অধিকার। বিজ্ঞানের ছাত্র , চিকিৎসক বা প্রকৌশলীদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে কথা বলাটা সমীচীন না ! এই অভিজ্ঞতা আমার নিতান্তই আংশিক অভিজ্ঞতা হতে পারে। ধরে নিচ্ছি, ভুল করে আমি কিছু কলাভবনের কিছু উন্নাসিকের আড্ডার মাঝে গিয়ে পড়েছিলাম, যারা আমাকে ব্রাত্য ভেবেছিল ।

যাই হোক ৯০ সালের আশেপাশের কয়েকবছরে আমি যে পরিমাণ বই পড়েছি তার এক দশমাংশও আমি গত কুড়ি বছরে পড়ি নি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে গেলাম ; চাকরিতে আরো কাহিল অবস্থা। স্থির হয়ে বই পড়ার অবকাশ কোথায় ? আমার যতদূর মনে পড়ে আমি এই সময়ে প্রতিবছরে বড়জোর হাতে গুণে ৪ থেকে ৫ টির বেশি বই পড়তে পারিনি।

শেষবারের মতো বাসা বদলেছি ২০১৫ সালের শুরুতে। ড্রয়িং রুমে নিজের মতো করে একটা বুকশেলফ করলাম। বইমেলায় গিয়ে নিজের পছন্দের বই কেনা শুরু করলাম। শুধু কেনাই হয়, পড়া হয় না কিছুই। দিন যায়, মাস যায় ; প্রতিবছর বইমেলা থেকে নতুন পুরনো লেখকদের বই কিনি। কন্যার জন্য লাইব্রেরিতে খাতা-কলম কিনতে গেলে হুট করে একটা দুইটা কিনি। বই কিনি , কিন্তু পড়ি না ! মূলত: আমার বইয়ের আলমিরায় বর্তমান বইগুলোর শতকরা ১০ভাগ বইও আমার পড়া হয়নি। আমার বইয়ের আলমিরা দেখে কারো যদি ধারণা হয় আমি এখনো অনেক পড়ি, তিনি ভুল ভাবছেন ; তার ভুল ধারণা ভেঙ্গে দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব।
২০২০ সালের এই বইমেলায় আমি বই কিনব কী কিনব না তাই নিয়ে দোলাচলে আছি। গত পাঁচ বছরের কেনা বইগুলোরই তো কিছু পড়া হয়নি।

২০১৬ সালের আগেও আমি মিরপুর থেকে উত্তরাতে আমার কর্মস্থলে আসতাম ৩০ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ বড়জোর ৬০ মিনিটে। মেট্রো রেলওয়ের কাজ শুরু হওয়ার পরে আমার জীবন হয়ে গেল বীভৎস ট্র্যাফিকময়। পুরো মিরপুর আর আমার চলাচলের পথে জায়গায় জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি । সপ্তাহের দুইএক দিন আগের মতোই হয়তো সময় মেনে যাওয়া আসা সম্ভব; বাকী চারদিন কখন , কোথায় এবং কেন কীভাবে আমাকে ঘণ্টাখানেক, ঘণ্টা দুয়েক জ্যামে বসে থাকতে হবে সেটার সদুত্তর দেওয়ার মতো কেউ এই ধরাধামে নাই !

এখন সারাদিন পরে ট্র্যাফিক ঠেলে ঠেলে রাতের খাবার ; কিছুটা সময় কন্যাদেরকে দেওয়ার পরে যখন একটা বই পড়া শুরু করি ; কয়েক পাতা পড়তে না পড়তেই ঘুমে ঢলে পড়ি । আবার নতুন ভোর আসে ; আবার সেই ট্র্যাফিক, অফিস আবার সেই রাত্রি করে বাড়ি ফেরা। বেসরকারি চাকরিতে সাপ্তাহিক ছুটি একদিন ; তাও আবার এরশাদের বদমাইশির জন্য রোববারে একার মতো একা। সেই একটা দিন নানা বাকী থাকা কাজ আর কন্যাদের স্কুল-কোচিং এ দৌড়াদৌড়ি করতে করতে কখন কেটে যায় বোঝা যায় না।

কেউ কেউ বলেছে, জ্যামে পড়লে বই খুলে বসতে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে গাড়ির ঝাঁকুনিতে আমি সামান্য দৈনিক পত্রিকাও পড়তে পারি না। কয়েক মিনিট পরেই মাথা ভোঁ ভোঁ করে। ঢাকা শহরের এই ট্র্যাফিকময় ব্যস্ত জীবনে বই পড়ার অবসর কোথায় সেটাই আমি বুঝে উঠতে পারছি না। সে ক্ষেত্রে শুধু শুধু অর্থের অপচয় করে বই কেনার দরকার কী সেটাই ভাবছি !

প্রকাশকালঃ ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০