পিকনিক ১৯৮১ স্টাইলঃ

ক্লাস টুতে পড়ি , জীবনের প্রথম পিকনিক। ক্লাস টিচার বললেন, ‘কাল সকালে ৮:০০ টায় ভাওয়াল ন্যাশনাল পার্কে পিকনিক। বাসা থেকে প্লেট আর গ্লাস নিয়া আসবা!’ ওক্কে ! স্কুল ড্রেস দুইবার করে ইস্তিরি করি। সাদা কেড্‌সে চক মারি। সারারাত এপাশ ওপাশ, মিস যেন না হয় !
আম্মা অনেক চিন্তা ভাবনা করে ভঙ্গুর চীনামাটির জায়গায় ষ্টীলের গ্লাস-প্লেট দিলেন। পলিথিন ব্যাগে গ্লাস-প্লেট নিয়া স্কুলের বাসের কাছে হাজির। ন্যাশনাল পার্ক। হতাশ ! কিছু শাল গাছ, কয়েকটা ডোবা টাইপ পুকুর, মাঝে মাঝে ক্ষত চিহ্নের মতো ন্যাড়া ধানক্ষেত ! দুই তিন বন্ধু মিলে অবশেষে একটা বড়ই গাছ আবিষ্কার করি , কাঁচা বড়ই খেয়ে মুখ কষা ! পরের বছরগুলোতে ঘুরেফিরে ওই একই জায়গায় কয়েকবার। নিজের গ্লাস-প্লেট নিয়ে গেছি একবারই। প্রতিবার সন্ধ্যায় ফেরার পথে মুক্ত স্বাধীন চিৎকার । বাসের উপরে মাইকে বাজে—‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখোনা বেঁধে আমায় —।’
চাকরিক্ষেত্রে দেখা গেল, আমাদের টেক্সটাইল মিল কল-কারখানা সব ওই দিকে এবং সপ্তাহে ৩/৪ দিন যেতে হয় ন্যাশনাল পার্কের ধারপাশ দিয়ে । শালবন দেখি, হঠাৎ হঠাৎ পুরানা স্মৃতি ভেসে ওঠে মনে। প্রথম পিকনিক , প্রথম প্রেমের মতোই ভুলিনি । নিজের গ্লাস প্লেট নেওয়ার ব্যাপারটা এখনো বুঝি নাই। এমন না যে, ওই সময়ে ডেকোরেটর ছিল না। হয়তো, খরচ কমানোর জন্য সবাইকে বাসা থেকে গ্লাস-প্লেট আনতে বলেছিলেন। বড় হওয়ার পরে সেই ক্লাস টিচারের সাথে আর দেখা হয় নাই, হলে জিজ্ঞেস করতাম।

পিকনিক ২০১৩ স্টাইলঃ

মেয়ের স্কুল পিকনিক। টু মিনিট ইনস্ট্যান্ট নুডল্‌সের মতো সব প্রিপ্যাকড । স্থান সেই ভাওয়ালের আশে পাশের একটা স্পট। দুই মেয়েকে নিয়ে বউয়ের চারদিন আগের থেকে প্রিপারেশন। ম্যাচিং ড্রেস, কয়েকটা ব্যাগ, ক্যামেরা, হাল্কা খাবার, পানি , কী নাই !
সাজানো গোছানো দেয়াল ঘেরা বদ্ধ পিকনিক স্পট। গাড়ীতেই নাস্তা। নামার সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার পাতা, ছায়া ঘেরা বাগান। ফুটফুটে বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে। ঠিক দুপুর একটায় প্যাকেট খাবার, পানি, কোল্ড ড্রিঙ্কস মায় টিস্যু পর্যন্ত। বিকালে পিঠা –চা। আর আমার বিনোদন ? পিচ্চি গুলার সাথে একান্ত কিছু সময় , আর অন্য বাচ্চাদের মায়েদের দিকে ইতি উতি তাকানো, হা হা হা !
ধুর ! এইটা কোন পিকনিক হইলো !

পাদটীকা:

এই ফেব্রুয়ারিতে বছর চারেক পরে কন্যাদের পিকনিক হয়েছে ‘ফ্যান্টাসি কিংডম’-এ। কারো সঙ্গে কারো কথা বার্তা নেই। যার যার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাইডগুলোতে উঠছে। টিকেট দিয়ে খাবার নিচ্ছে। যেটুকু কথাবার্তা বাসে যেতে যেতে। আরো বছর চারেক পরে কি পিকনিকের কি অবস্থা দাঁড়ায় সেটার জন্য অপেক্ষা।

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৩