আপনি থেকে তুমি আর তুমি থেকে তুই সম্বোধনে আসতে কিছুটা সময় লাগে আমার।
আমাদের মিরপুরের মহল্লায় ৮৬ ব্যাচের সবাইকে ভাই বলতাম। ৮৭ ব্যাচের একজন ছিল, সে আমাদের সঙ্গেই চলত, সুতরাং তুমি। আর ৮৮, ৮৯, ৯০ আর ৯১ ব্যাচে আপনি সম্বোধনের বালাই ছিল না। কেউ কাউকে তুমি বলেছে তো আরেকজন বলেছে তুই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় রেগুলার ব্যাচে কেমিস্ট্রি বিভাগে ভর্তি হয়ে দেখলাম, ৮৯ ব্যাচের অনেকে আছে। সেটা তাঁদের সমস্যা, ইয়ার লস তো আমি দিই নাই। তাই রেগুলার ব্যাচের সঙ্গে সঙ্গে ৮৯ ব্যাচের সবাইকে তুমি, তুই বলে চালিয়েছি।
একই সমস্যায় পড়লাম আমি যখন ইয়ার লস দিয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হলাম ৯১ ব্যাচের সঙ্গে !এক ব্যাচ জুনিয়র ছেলেরা তুই তোকারি করত ! হা হা হা ! অবশ্য, আশার কথা ক্লাস শুরু হওয়ার পরে দেখা গেল আমাদের সঙ্গে রেগুলার ব্যাচের ছেলেদের চেয়ে ‘ধরা খাওয়া’ ব্যাচ বেশি। সুতরাং আমাদের তুই তোকারি নিয়ে তেমন কোন সমস্যা হল না।
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে, দুই কিশোরীকে পেলাম , ওদেরকে তুমি থেকে তুই বলতে বছর-খানেক লাগল।
এই যে জড়তা সেটা কিন্তু অনেকের নাই। শুধুমাত্র প্রথম পরিচয়ে আরেক ব্যাচ মেটকে তুই বলার মতো স্মার্টনেস আমার নেই। মাস খানেক আগেও ৯০ ব্যাচের এক সেনাকর্মকর্তা বন্ধুর বাসায় ঘরোয়া আড্ডা। সে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল তাঁর লং কোর্সের আরেক উচ্চপদস্থ বন্ধুর সঙ্গে।এদের একজন ৯০ ব্যাচের আরেকজন ৮৯ ব্যাচের। দুইজনকেই আপনি বলে শুরু করে শেষে তুমি বলে বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলাম। হুট করে তুই-তে নেমে আসতে হলে আরও কয়েকটা আড্ডা দরকার।
কর্পোরেট চাকরিতে আছি প্রায় ২১ বছর ধরে। এমন অনেক মালিকের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছে, যারা আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। কিন্তু স্যার বা বস বলা ছাড়া তো উপায় নেই ! যদিও তিনিও ভদ্রতা রেখে জাহিদ ভাই বা আপনি করেই বলেছে।
আবার অনেক সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করছি, স্বভাবতই আপনি সম্পর্ক। কিন্তু , বছর দুয়েকের মাথায় জানা গেল, সে আমার ৯০ ব্যাচেরই। কিন্তু তখন সম্বোধনের যে দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে, তা আর ভাঙ্গা হয়ে ওঠেনি।
উল্টোটাও হয়েছে অনেকবার। ওপেক্স গ্রুপে কাজ করার সময়, আমাদের সহকর্মী ছিল ৮৪,৮৫,৮৬ ব্যাচের কয়েকজন। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা এমন পর্যায়ের ছিল, একে অপরকে তুই বলে চালিয়েছি। অফিসের চিপায় এক সিগারেট ভাগ করে খেয়েছি, আর দুইজনের দুই বস যে আসলেই খাঁটি বাঞ্চোত ও চুতিয়া সে ব্যাপারে একমত হয়েছি।
আমি বিয়ে করলাম ২৮ বছর বয়সে ২০০১ সালে। আমার পাশের ডিপার্টমেন্টে সঙ্গে জাহাঙ্গীর নগরের গণিত বিভাগের এক আদম কাজ করত। সম্ভবত: ও ৮৫/৮৬ ব্যাচের। ওর সঙ্গে আমার কাকা-কাকা সম্পর্ক কেন যে হয়েছিল জানি না। ও আমাকে কাকা বলত, আমিও তাই।
তো, আমার বিয়ের কথা শুনে সে বলল, খালাম্মাকে বল আমার জন্যেও একটা মেয়ে দেখতে। আমি বললাম, তুই তো বুইড়ারে। তোরে মেয়ে দেবে কে, বয়স তো ৩৬ পার হয়ে গেছে তোর ! আম্মা মেয়ে দেখতে গেলে প্রথমেই তো পাত্রের বয়স জিজ্ঞেস করবে।
সে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, খালাম্মাকে বলিস আমার ৩২ বছর চলছে !
আমি বললাম, সেটা কী করে হয় !
সে আরো সিরিয়াস ভঙ্গীতে জবাব দিল, শোন্ জাহিদ বিয়ের বাজারে পাত্রের বয়স কখনোই ৩২ পার হয় না !
টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি আর গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজে আমার সঙ্গে কাজ করেছে, আমার চেয়ে জুনিয়র কিন্তু অসাধারণ মেধাবী কয়েকজন। তাঁদের অনেকেই সত্যিকারের এন্ট্রাপ্রেনার। অনেকে সঠিক সময়ে চাকরি ছেড়ে বিশাল কারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। চাকরি করার সময় তাঁদের সাথে আপনি আপনি সম্পর্ক ছিল। এখনো আছে। শুধুমাত্র আমার এসএসসি পাশের সাল তাঁর চেয়ে এগিয়ে আছে– সেই অনধিকার চর্চায় তাঁকে আমি কখনোই তুমি বলতে পারি নি। আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাটা আপনিতেই আটকে আছে।
আবার ট্রেডিং অফিসে এখনো আমার কয়েকজন সহকর্মী আছেন, যারা ৮২ থেকে ৮৬ ব্যাচের। কিন্তু যোগ্যতার মাপকাঠিতে কর্পোরেট ইঁদুর দৌড়ে নানা কারণে আমি তাঁদের উপরে চলে এসেছি। আমি ‘ অমুক সাহেব’ বা শুধু ‘অমুক’ বলে ডাকলেও –তাঁরা দূরত্ব বজায় রেখে আমাকে ‘জাহিদ ভাই’ বলেছে এবং বলছে। আমি এভাবেই অভ্যস্ত। হুট করে শুধু বয়স বা ব্যাচের অজুহাতে কাউকে তুমি বলা আমার হয়ে ওঠেনি। হোক সে আমার ব্যাচের অথবা নিচের।
উল্লেখ্য, একবছর জলাঞ্জলি দিয়ে যখন ৯১ ব্যাচের সঙ্গে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছি, আমার নিজের ব্যাচের ঢাকা কলেজের অথবা পূর্ব পরিচিত ৯০ ব্যাচের সবাইকে তুই তোকারি করেছি ঠিকই । কিন্তু রেগুলার ব্যাচের কারো কারো সঙ্গে তো দূরত্ব ছিলই; তাঁদেরকে ভাই , আপনি বলে চালাতে হয়েছে। যদিও রেগুলার ব্যাচের একজন এই গ্রুপে আমার পোস্টে কমেন্ট করেছে, জাহিদ আর আপনি বলতে হবে না, তুমি বইল !
এতো গেল পুরুষ মহলের কাহিনী। নারীমহলে আমার অবস্থা আরো শোচনীয়!
আমার দশ বছরের জুনিয়র যে ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় আছে, তাঁকে আপনি বলতে আমার কখনোই বাঁধেনি। কয়েকজন লেখক লেখিকা আছেন, দারুণ তাঁদের লেখা। জানি তাঁরা বয়সে আমার ছোট বা সমবয়সী। কিন্তু সেই অজুহাতে আমি তাঁদেরকে কখনোই তুই দূরে থাক, তুমিও বলিনি।
অন্যদিকে অনেক ধনকুবের বয়স্ক গার্মেন্টস মালিক আছেন যারা তাঁর প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর, জিএম সবাইকে তুমি বলে অভ্যস্ত ; তাঁদের কেউ কেউ হয়তো ইচ্ছে করেই অন্য অফিসের কর্মকর্তাদের তুমি বলে একটা ডমিনেটিং অ্যাডভান্টেজ নিতে চান। আমি তাঁদের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে চলেছি। আমার চেয়ে বয়সে ও পজিশনে বড় কেউ যদি আমাকে তুমি বলে ভাল বোধ করেন, করুক না , আমি সমস্যা দেখি না। বরং তাঁদের এই তুমি বলার অ্যাডভান্টেজ আমিও নিয়েছি। বড় কোন সমস্যায় সিনিয়র ভাইয়ের কাছে যেমন করে আবদার করা যায়, আমিও আবদার করে আমার কাজ উদ্ধার করেছি। তবে, আমার চেয়ে বয়সে ছোট কেউ এখন পর্যন্ত আমাকে হুট করে তুমি বা তুই তোকারি করেনি এই যা রক্ষে !
৯০ ব্যাচের একটা ‘সমগ্র বাংলাদেশ’ ফেসবুক গ্রুপ হয়েছে। আমাকেও কেউ সংযুক্ত করেছে । আগের পরিচিত বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে সাথে নানা জেলার অনেক বন্ধু-বান্ধবীর সম্মিলন। সদ্য পাওয়া বন্ধু ও বান্ধবীদের কাছে আমার সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করলাম।
এই আপনি , তুমি , তুই ব্যালেন্স করে করেই পেশাগত ও সামাজিক জীবনে আমার তিন দশক চলে গেছে । আমার মতো কাউকে হয়তো পাওয়া যাবে, যে হুট করে তুমি বা তুইতে নামতে পারে না। কিছুটা প্রাচীনপন্থী । আবার আধুনিক ও আধুনিকারাও আছে, যারা অনেক স্বচ্ছন্দ– সম্পর্কের এই গভীরতা বৃদ্ধিতে। যাই হোক, আমার মতের সঙ্গে হয়তো কেউ একমত পোষণ করবে, অনেকেই করবে না ; সেটাও আমি জানি।
সবার জন্য শুভকামনা !
প্রকাশকালঃ ৩রা জানুয়ারি, ২০২০
সাম্প্রতিক মন্তব্য