ভারতবর্ষ। রমাপদ চৌধুরী ।।

ফৌজী সংকেতে নাম ছিল বি এফ থ্রি-থার্টি-টু, সেটা আদপে কোনো স্টেশনই ছিলো না, না প্ল্যাটফর্ম, না টিকিটঘর । শুধু একদিন দেখা গেল ঝকঝকে নতুন কাঁটাতার দিয়ে রেল লাইনের ধারটুকু ঘিরে দেওয়া হয়েছে। ব্যস্‌ , ঐটুকুই। সারা দিনে আপ-ডাউনের একটা ট্রেনও থামতো না। থামতো শুধু একটি বিশেষ ট্রেন। হঠাৎ এক-একদিন সকালবেলায় এসে থামত। কবে কখন সেটা থামবে, তা শুধু আমরাই আগে থেকে জানতে পেতাম, বেহারী কুক ভগোতীলালকে নিয়ে আমরা পাঁচজন।

স্টেশন ছিলো না, ট্রেন থামতো না, তবু রেলের লোকদের মুখে মুখে একটা নতুন নাম চালু হয়ে গিয়েছিলো। তা থেকে আমরাও বলতাম ‘আণ্ডাহল্ট’।

আন্ডা মানে ডিম। আণ্ডাহল্টের কাছ ঘেঁষে দুটো বেঁটেখাটো পাহাড়ী টিলার পায়ের নীচে একটা মাহাতোদের গ্রাম ছিল, গ্রামে-ঘরে মুর্গী চরে বেড়াতো দূরে, অনেক দূরে ভূরকুণ্ডার শনিচারী হাটে-হাটে সেই মুর্গী কিংবা মুর্গীর ডিম বেচতেও যেতো মাহাতোরা। কখনো সাধের মোরগ বগলে চেপে মোরগ-লড়াই খেলতে যেতো। কিন্তু সেজন্য বি এফ থ্রি থার্টি টু-র নাম আণ্ডাহল্ট হয়ে যায়নি।

আসলে মাহাতোগাঁয়ের ডিমের ওপর আমাদের কোনো লোভই ছিলো না।

আমাদের ঠিকাদারের সঙ্গে রেলওয়ের ব্যবস্থা ছিল, একটা ঠেলা-ট্রলিও ছিলো তার, লাল শালু উড়িয়ে সেটা রেলের ওপর দিয়ে গড়িয়ে এসে মালপত্র নামিয়ে দিয়ে যেতো। নামিয়ে দিয়ে যেতো রাশি রাশি ডিম। বেহারী কুক ভগোতীলাল আগের রাত্রে সেগুলো সেদ্ধ করে রাখতো।

কিন্তু সেজন্যেও নাম আণ্ডাহল্ট হয়নি। হয়েছিল ফুল-বয়েলড ডিমের খোসা কাঁটাতারের ওপারে ক্রমশ স্তূপীকৃত হয়ে জমেছিলো বলে। ডিমের খোসা দিনে দিনে পাহাড় হচ্ছিল বলে।

ফৌজী ভাষার বি এফ থ্রি থার্টি টু-র প্রথমেই যে দুটো অ্যালফাবেট, আমাদের ধারণা ছিলো তা কোনো সংকেত নয়, ব্রেকফাস্ট কথাটার সংক্ষিপ্ত রূপা।

রামগড়ে তখন পি ও ডবলু ক্যাম্প, ইটালিয়ান যুদ্ধবন্দীরা সেখানে বেয়নেটে আর কাঁটাতারে ঘেরা। তাদেরই মাঝে মাঝে একটা ট্রেনে বোঝাই করে এ পথ দিয়ে কোথায় যেন চালান করে দিতো। কেন এবং কোথায়, আমরা কেউ জানতাম না।

শুধু আমরা খবর পেতাম ভোরবেলায় একটা ট্রেন এসে থামবে। ঠিকাদারের চিঠি পড়ে আগের দিন ডিমের ঝুড়িগুলো দেখিয়ে কুক ভগোতীলালকে বলতাম, তিনশো তিশ ব্রেকফাস্ট।

ভগোতীলাল গুনে গুনে ছ’শো ষাট আর গোটা পঁচিশ ফাউ বের করে নিতো। যদি পচা বের হয়। তারপর সেগুলো জলে ফুটিয়ে শক্ত ইট হয়ে গেলে তিনটে সার্ভার কুলির সঙ্গে হাত মিলিয়ে খোসা ছাড়াতো।

কাঁটাতারের ওপারে সেগুলোই দিনে দিনে স্তূপীকৃত হতো।

সক্কাল বেলায় ট্রেন এসে থামতো, আর সঙ্গে সঙ্গে কামরা থেকে ট্রেনের দু পাশে ঝুপঝাপ নেমে পড়তো মিলিটারি গার্ড। সঙ্গিন উঁচু-করা রাইফেল নিয়ে তারা যুদ্ধবন্দীদের পাহারা দিতো।

ডোরাকাটা পোশাকের বিদেশী বন্দীরা একে একে কামরা থেকে নেমে আসতো বড়সড়ো মগ আর এনামেলের থালা হাতে

দুটো বড়-বড় ড্রাম উলটে রেখে সে দুটোকেই টেবিল বানিয়ে সার্ভার কুলি তিনজন দাঁড়াত। আর ওরা লাইন দিয়ে একে-একে এগিয়ে এসে ব্রেকফাস্ট নিতো। একজন কফি ঢেলে দিতো মগে, একজন দু পিস করে পাঁউরুটি দিতো, আরেকজন দিত দুটো করে ডিম। ব্যস্‌, তারপর ওরা গিয়ে গাড়িতে উঠতো। কাঁধে আই-ই. খাকি বুশ-শার্ট পরা গার্ড হুইস্‌ল্‌ দিতো, ফ্লাগ নাড়তো, ট্রেন চলে যেতো।

মাহাতোরা কেউ কাছে আসতো না, দূরে দূরে ক্ষেতিতে জনারের বীজ রুইতে রুইতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে দেখতো।

ট্রেন চলে যাওয়ার পরে ভগোতীলালের জিম্মায় টেস্ট রেখে আমরা কোনো কোনো দিন মাহাতোদের গ্রামের দিকে চলে যেতাম সবজির খোঁজে। পাহাড়ের ঢালুতে পাথুরে জমিতে ওরা সর্ষে বুনতো, বেগুন আর ঝিঙেও।

আণ্ডাহল্ট একদিন হল্ট-স্টেশন হয়ে গেল রাতারাতি। মোরম ফেলে লাইনের ধারে কাঁটাতারে ঘেরা জায়গাটুকু উঁচু করা হলো প্ল্যাটফর্মের মতো।

তখন আর শুধু পি-ও-ডব্লু নয়, মাঝে মাঝে মিলিটারি স্পেশালও এসে দাঁড়াতো। গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট পরা হিপ পকেটে টাকার ব্যাগ গোঁজা আমেরিকান সৈনিকদের স্পেশাল মিলিটারি পুলিশ ট্রেন থেকে নেমে পায়চারি করতো, দু-একটা ঠাট্টাও ছুঁড়তো, আর সৈনিকের দল তেমনি সারি দিয়ে মগ আর থালা হাতে একে একে রুটি নিতো, ডিম নিতো, মগভরতি কফি। তারপরে যে যার কামরায় আবার উঠতো, খাকি বুশ-শার্টের গার্ড হুইস্‌ল্‌ বাজিয়ে ফ্লাগ নাড়তো, আমি ছুটে গিয়ে সাপ্লাই ফর্মে মেজরকে দিয়ে ও-কে করাতাম।

ট্রেন চলে যেতো, কোথায় কোন্‌দিকে আমরা কেউ জানতে পারতাম না।

সেদিনও এমনি আমেরিকান সোলজারদের ট্রেন এসে দাঁড়াল। সার্ভার কুলি তিনটে ডিম রুটি কফি সার্ভ করছিলো। ভগোতীলাল নজর রাখছিলো কেউ ডিম পচা কিংবা রুটি স্লাস-এন্ড বলে ছুঁড়ে দেয় কি না।

ঠিক সেই সময় আমার হঠাৎ চোখ গেল কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে।

কাঁটাতার থেকে আরো খানিক দূরে নেংটি-পরা মাহাতোদের একটি ছেলে চোখ বড়ো করে তাকিয়ে দেখছে। কোমরের ঘুনসিতে লোহার টুকরো বাঁধা ছেলেটাকে একটা বাচ্চা মোষের পিঠে বসে যেতে দেখেছি একদিন।

ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিলো ট্রেনটা। কিংবা রাঙামুখ আমেরিকান সৈনিকদের দেখছিল।

একজন সৈনিক তাকে দেখতে পেয়ে হঠাৎ ‘হে-ই’ বলে চিৎকার করলো, আর সঙ্গে সঙ্গে নেংটি-পরা ছেলেটা পাঁইপাঁই করে ছুটে পালালো মাহাতোদের গাঁয়ের দিকে কয়েকটা আমেরিকান সৈনিক তখন হা-হা করে হাসছে।

ভেবেছিলাম ছেলেটা আর কোনো দিন আসবে না।

মাহাতোরা কেউ আসতো না, কেউ না। ক্ষেতিতে কাজ করতে করতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ওরা শুধু অবাক-অবাক চোখ মেলে দূর থেকে দেখতো।

কিন্তু তারপর আবার যেদিন ট্রেন এলো, ট্রেন থামল, সেদিন আবার দেখি কোমরের ঘুনসিতে লোহা বাঁধা ছেলেটা কাঁটাতারের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে আরেকটা ছেলে, তার চেয়ে আরেকটু বেশী বয়েস। গলায় লাল সুতোয় ঝুলোনো দস্তার তাবিজ, ভূরকুণ্ডার হাটে একদিন গিয়েছিলাম, রাশি রাশি বিক্রি হয় মাটিতে ঢেলে, রাশি রাশি সিঁদুর, তাবিজ, তামার পিতলের দস্তার, বাঁশে ঝোলানো থাকে রঙিন সুতলি, পুঁতির মালা। একটা ফেরিওলাকে দেখেছি কখনো কখনো এক হাঁটু ধুলো নিয়ে, কাঁধে অগুন্তি পুঁতির ছড়, দূর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাহাতোদের গাঁয়ের দিকে যায়।

ছেলে দুটো অবাক-অবাক চোখ মেলে কাঁটাতারের ওপারে দাঁড়িয়ে আমেরিকান সৈনিকদের দেখছিলো। প্রথম দিনের বাচ্চাটার চোখে একটু ভয়, হাঁটু তৈরি, কেউ চোখে একটু ধমক মাখালেই সে চট করে হরিণ হয়ে যাবে।

আমি হাতে ফর্ম নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিলাম, সুযোগ পেলে হেসে হেসে মেজরকে তোয়াজ করছিলাম। একজন সৈনিক তার কামরার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মগে চুমুক দিতে দিতে ছেলে দুটোকে দেখে পাশের জি আই-কে বললে, অফুল!

আমার এতদিন মনে হয়নি। ওরা তো দিব্যি ক্ষেতে-খামারে কাজ করে, গুল্‌তি নয়তো তীরধনুক নিয়ে খাটাশ মারে, নাটুয়া গান শোনে, হাঁড়িয়া খায়, ধনুকের ছিলার মতো কখনো টান টান হয়ে রুখে দাঁড়ায়। নেংটি-পরা সরু শরীর, কালো, রুক্ষ। কিন্তু ব্যাটা জি আই-এর ‘অফুল’ কথাটা যেন আমাকে খোঁচা দিলো। ছেলে দুটোর ওপর আমার খুব রাগ হলো।

সৈনিকদের কে একজন গলা ছেড়ে এক কলি গান গাইলো, দু-একজন হা-হা করে হাসছিলো, একজন চটপট কফির মগে চুমুক দিয়ে সার্ভার কুলিটাকে চোখ মেরে আবার ভরতি করে দিতে বললে। গার্ড এগিয়ে দেখতে এলো আর কত দেরি পাঞ্জাবী গার্ড কিন্তু দিব্যি চন্দ্রবিন্দু লাগিয়ে কথা বললে মেজরের সঙ্গে।

তারপর হুইস্‌ল্‌ বাজলো, ফ্ল্যাগ নড়লো, সবাই চটপট উঠে পড়লো ট্রেনে, হাতে চওড়া লাল ফিতে বাঁধা মিলিটারি পুলিশরাও।

ট্রেন চলে গেলে আবার সেই শূন্যতা, ধু-ধু বালির মধ্যে ফণিমনসার গাছের মতো শুধু সেই কাঁটাতারের বেড়া।

দিন কয়েক পরেই আবার একটা ট্রেন এলো। এবার পি-ও-ডবলু গাড়ি, ইটালিয়ান যুদ্ধবন্দীরা রামগড় থেকে আবার কোথাও চালান হচ্ছে। কোথায় আমরা জানতাম না, জানতে চাইতাম না।

ওদের পরনে স্ট্রাইপ-দেওয়া অন্য পোশাক, মুখে হাসি নেই, রাইফেল উঁচিয়ে সারাক্ষণ ওদেরই ট্রেনটা চারদিক থেকে গার্ড দেওয়া হতো। আমাদেরও একটু ভয় ভয় করতো। ভূরকুণ্ডায় গল্প শুনে এসেছিলাম, একজন নাকি ধুতিপাঞ্জাবি পরে পালাবার চেষ্টা করেছিলো, পারেনি। বাঙালী বলেই আমার আরো ভয়-ভয় করতো।

ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর লক্ষ্য করলাম, কাঁটাতারের ওপারে শুধু সেই বাচ্চা ছেলে দুটো, খাটো কাপড়ের একটা বছর পনেরোর মেয়ে, দুটো পুরুষ ক্ষেতের কাজ ছেড়ে এসে দাঁড়িয়েছিলো। ট্রেন চলে যাওয়ার পর ওরা নিজেদের মধ্যে কি সব বলাবলি করলো, হাসলো, কলকল করতে করতে ঝরনার জলের মতো মাহাতোদের গাঁয়ের দিকে চলে গেল।

একজন, দুজন, পাঁচজন সেদিন দেখি জন দশেক মাহাতোগাঁয়ের লোক ট্রেন আসতে দেখেই মাঠ থেকে দৌড়তে শুধু করেছে। ট্রেনের জানালায় জানালায় খাকি রঙ দেখেই বোধ হয় ওরা বুঝতে পারতো। দিনে দুখানা প্যাসেঞ্জার মেল ট্রেনের মতো হুস করে বেরিয়ে যেতো, দু একখানা গুডস ট্রেন ঠুং-ঠুং করতে করতো তখন তো কই থামবে ভেবে মাহাতোগাঁয়ের লোক আসতো না ভিড় করে!

একদিন গিয়ে বলেছিলাম মাহাতোবুড়োকে, লোক পাঠিয়ে আমাদের আণ্ডাহল্টের তাঁবুতে বেচে আসতে সবজি আর চিংড়ি, সরপুঁটি, মৌরলা।

বুড়ো হেসে বলেছিল–ক্ষেতির কাজ ছেড়ে যাবো নাই।

তাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম। কালো কালো নেংটি-পরা লোকগুলোকে, খাটো শাড়ির মেয়েগুলোকে। শুধু খালি-গা মাহাতোবুড়োর পায়ে একটা টাঙি জুতো, গেঁয়ো মৃধার কাছে বানানো টাঙি জুতো, এসে সারি দিয়ে ওরা কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে দাঁড়ালো।

ট্রেন ততক্ষণে এসে গেছে। ঝুপঝাপ নেমে পড়ে আমেরিকান সৈনিকের দল সারি দিয়ে চলেছে মগ আর থালি হাতে

দুশো আঠারো ব্রেকফাস্ট তখন রেডি বি এফ থ্রি থার্টি টু-তো বি এফ থ্রি থার্টি টু মানে আণ্ডাহল্ট।

তখন একটু শীত-শীত পড়তে শুরু করেছে। দূরের পাহাড়ে কুয়াশার মাফলার জড়ানো গাছগাছালি শিশির-ধোয়া সবুজ।

একজন সৈনিক ইয়াঙ্কি গলায় মুগ্ধতা প্রকাশ করলো।

আরেকজন কামরার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁটাতারের ওপারের রিক্ততার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো। হঠাৎ কফির মগটা ট্রেনের পা-দানিতে রেখে সে হিপ পকেটে হাত দিলো। ব্যাগ থেকে একটা চকচকে আধুলি বের করে ছুঁড়ে দিলো মাহাতোদের দিকে।

ওরা অবাক হয়ে সৈনিকটার দিকে তাকালো, কাঁটাতারের ভিতরে মোরামের ওপর পড়ে থাকা চকচকে আধুলিটার দিকে তাকালো, নিজেরা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো, তারপর অবাক হয়ে শুধু তাকিয়েই রইলো।

ট্রেনটা চলে যাবার পর ওরা নিঃশব্দে ফিরে চলে যাচ্ছিলো দেখে আমি বললাম, সাহেব বখশিস দিয়েছে, বখশিস তুলে নে ।

সবাই সকলের মুখের দিকে তাকালো, কেউ এগিয়ে এলো না।

আমি আধুলিটা তুলে মাহাতোবুড়োর হাতে দিলাম। সে বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর সবাই নিঃশব্দে চলে গেল। কারও মুখে কোনো কথা নেই।

আমার এই ঠিকাদারের তাঁবেদারি একটুও ভালো লাগতো না। জনমনুষ্য নেই, একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন দাঁড়ায় না, তাঁবুতে ভগোতীলাল আর তিনটে কুলি। নির্জন, নির্জন মাটি রুক্ষ, দুপুরের আকাশ রুক্ষ, রুক্ষ আমার মন।

মাহাতোগাঁয়ের লোকরাও কাছে ঘেঁষতো না। মাঝে মাঝে গিয়ে সবজি কিংবা চুনো মাছ কিনে আনতাম। ওরা বেচতে আসতো না, কিন্তু ভূরকুণ্ডার হাটে যেতো তিন ক্রোশ পথ হেঁটে।

দিন কয়েক কোনো ট্রেনের খবর ছিলো না। চুপচাপ, চুপচাপ।

হঠাৎ সেই কোমরের ঘুনসিতে লোহা-বাঁধা ছেলেটা একদিন এসে জিগ্যেস করলো, টিরেন আসবে না বাবু?

হেসে ফেলে বললাম, আসবে, আসবে।

ছেলেটার আর দোষ কি, বেঁটে বেঁটে পাহাড়, রুক্ষ জমি, একটা দেহাতী ভিড়ের বাস দেখতে হলেও দু’ ক্রোশ হেঁটে যেতে হয় খয়েরগাছের ঝোপের মধ্যে দিয়ে। সকালে একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন একটুও স্পীড না কমিয়ে হুস করে বেরিয়ে যেতো, বিকেলের ডাউন ট্রেনটাও থামতো না, তবু কয়েক মুহূর্ত জানালায় জানালায় ঝাপসা মুখ দেখার জন্যে আমরা তাঁবুর ভেতর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসতাম মানুষ না দেখে আমরা হাঁপিয়ে উঠতাম।

তাই আমেরিকান সৈনিকদের স্পেশাল ট্রেন আসছে শুনলে যেমন বিব্রত বোধ করতাম তেমনি আবার স্বস্তিও ছিলো।

দিন কয়েক পরেই প্রথমে এলো খবর, তার পরদিন মিলিটারি স্পেশাল ঝুপঝাপ করে জি আইরা নামলো, সারি দিয়ে সব ডিম রুটি মগ-ভরতি কফি নিলো।

হঠাৎ তাকিয়ে দেখি কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে মাহাতোগাঁয়ের ভিড় ভেঙে পড়েছে। বিশ হতে পারে, তিরিশ হতে পারে, হাঁটুসমান বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কত কে জানে। খাটো শাড়ির মেয়েগুলোও বোকা-বোকা চোখ মেলে তাকিয়ে ছিলো। ওদের দেখে আমার কেমন ভয়-ভয় করলো। ভগোতীলাল কিংবা সার্ভার কুলি তিনটে মাহাতোগাঁয়ের দিকে যেতে চাইলে আমার বড় ভয়-ভয় করতো।

প্ল্যাটফর্ম তো ছিলো না, শুধু উঠতে নামতে সুবিধের জন্যে লাইনের ধারটুকু মোরম ফেলে উঁচু করা হয়েছিলো। আমেরিকান সৈনিকরা কফির মগে চুমুক দিতে দিতে পায়চারি করছিলো। দু একজন স্থির দৃষ্টিতে মাহাতোগাঁয়ের কালো কালো মানুষগুলোকে দেখছিল।

হঠাৎ একজন ভগোতীলালের দিকে এগিয়ে গিয়ে হিপ পকেট থেকে ব্যাগ বের করলো, ব্যাগ থেকে একখানা দু’ টাকার নোট, তারপর জিগ্যেস করলে, কয়েনস আছে? নোটভাঙানো খুচরো সৈনিকরা কেউ রাখতেই চাইতো না, পয়সা ফেরত না নিয়ে দোকানী কিংবা ফেরিওয়ালা কিংবা ট্যাকসি ড্রাইভারকে বলতো, ঠিক আছে, ঠিক আছে। রাঁচিতে গিয়ে কয়েকবার দেখেছি।

এক-আনি, দু-আনি আর সিকি মিলিয়ে ভগোতীলাল ভাঙিয়ে দিচ্ছিলো, হঠাৎ দেখি কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে ভিড়ের ভিতর থেকে কোমরের ঘুনসিতে লোহার টুকরো বাঁধা সেই ছেলেটা হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে কি চাইছে।

সঙ্গে সঙ্গে ভগোতীলালের কাছ থেকে সেই খুচরো আনি-দুয়ানিগুলো মুঠোর মধ্যে নিয়ে সেই আমেরিকান সৈনিক মাহাতোদের দিকে ছুঁড়ে দিলো।

আমার তখন সাপ্লাই ফর্ম ও-কে করানো হয়ে গেছে, গার্ড হুইস্‌ল্‌ দিয়েছে।

ট্রেন চলতে শুরু করেছে, অমনি মাহাতোদের দিকে ফিরে তাকালাম।

ওরা তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো, তাকিয়ে ছিলো। তারপর হঠাৎ, লাল মোরামের ওপর, ছড়ানো পয়সাগুলোর ওপর কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো কোমরের ঘুনসিতে লোহা বাঁধা ছেলেটা আর গলায় লাল সুতলিতে দস্তার তাবিজ-বাঁধা ছেলেটা।

সেই মুহূর্তে টাঙি-জুতো পরা মাহাতোবুড়ো ধমক দিয়ে বলে উঠলো, খবর্দার ! এমন জোরে চিৎকার করলো যে আমি নিজেও চমকে উঠেছিলাম।

কিন্তু বাচ্চা দুটো ওর কথা শুনলো না। তারা দুজনে তখন যে যত পেরেছে আনি দু-আনি কুড়িয়ে নিয়েছে। মুখ খোসা-ছাড়ানো কচি ভুট্টার মতো হাসছে। মেয়েপুরুষের সমস্ত ভিড় হাসছে।

টাঙি-জুতো পরা মাহাতোবুড়ো রেগে গিয়ে তাদের ভাষায় অনর্গল কি সব বলে গেল। মেয়েপুরুষের ভিড় হাসলো।

মাহাতোবুড়ো রাগে গজগজ করতে করতে গাঁয়ের দিকে চলে গেল একাই। মাহাতোগাঁয়ের লোকগুলোও চলে গেল কলকল কথা বলতে বলতে, খলখল হাসতে হাসতে

ওরা চলে যেতেই আণ্ডাহল্ট আবার নির্জন নিস্তব্ধ শূন্যতা আমার এক-এক সময় ভীষণ মন খারাপ হয়ে যেতো। দূরে দূরে পাহাড়, মহুয়ার বন, খয়েরের ঝোপ পার হয়ে একটা ছোট্ট জল চোঁয়ানো ঝরনা, মাহাতোগাঁয়ের সবুজ ক্ষেত। চোখ জুড়িয়ে যায়, চোখ জুড়িয়ে যায় তার মধ্যে। কালো কালো নেংটি-পরা মানুষ।

এদিকে মাঝে মাঝেই আমেরিকান সোলজারদের ট্রেন আসে, থামে, ডিম রুটি মগ-ভরতি কফি খেয়ে চলে যায়। মাহাতোগাঁয়ের লোক ভিড় করে আসে, কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে সারি দিয়ে দাঁড়ায়।

–সাব বখশিস, সাব বখশিস!

একসঙ্গে অনেকগুলো দেহাতী গলা চিৎকার করে উঠল।

মেজরের কাছে ফর্ম ও-কে করাতে গিয়ে আমি চমকে ফিরে তাকালাম। দেখলাম, শুধু বাচ্চা ছেলে দুটো নয়, কয়েকটা জোয়ান পুরুষও হাত বাড়িয়েছে। খাটো শাড়ির একটা তুখোড় শরীরের মেয়েও ।

একদিন সবজি নিতে গিয়েছিলাম, ঐ মেয়েটা হেসে হেসে জিগ্যেস করেছিলো, টিরেন কবে আসবে ?

এক-একদিন অকারণেই ওরা দল বেঁধে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো, অপেক্ষা করে করে চলে যেতো।

কাঁধে-স্ট্রাইপ তিন-চারটে আমেরিকান ততক্ষণে হিপ পকেট থেকে মুঠো মুঠো আনি দু-আনি বের করে ওদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে। ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষা করেনি, ওরা হুমড়ি খেয়ে পড়লো পয়সাগুলোর ওপর। হুড়োহুড়িতে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়তে গিয়ে হাত-পা ছড়ে গেল কারও, কারও বা নেংটির কাপড় ফেঁসে গেল।

ট্রেন চলে যাওয়ার পর ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম ওদের। মনে হলো মাহাতোগাঁয়ের আধখানাই এসে জড় হয়েছে। সবারই মুখে স্ফুর্তির হাসি, সবাই কিছু-না-কিছু পেয়েছে। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেই টাঙি-জুতোর মাহাতোবুড়োকে দেখতে পেলাম না। মাহাতোবুড়ো আসেনি। সেদিন ওর আপত্তি, ওর ধমক শুনেও পয়সাগুলো ফেলে দেয়নি ছেলে দুটো। তাই বোধ হয় রেগে গিয়ে আর আসেনি।

আমার ভাবতে ভালো লাগল বুড়োটা ক্ষেতে দাঁড়িয়ে একা-একা মাটি কোপাচ্ছে।

আমাদের দিন, কুক ভগোতীলালকে নিয়ে আমাদের পাঁচজনের দিন আণ্ডাহল্টের তাঁবুর মধ্যে কোনোরকমে কেটে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে এক-একদিন সৈনিক-বোঝাই ট্রেন আসছিলো, থামছিলো, চলে যাচ্ছিলো। মাহাতোগাঁয়ের লোক ভিড় করে এসে কাঁটাতারের ধারে সারি দিয়ে দাঁড়াতো, হাত বাড়িয়ে সবাই ‘সাব বখশিস, সাব বখশিস’ চেঁচাতো।

হঠাৎ এক-একদিন মাহাতোবুড়োকে দেখতে পেতাম কোনো দিন ক্ষেতের কাজ ফেলে দু হাতের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে হনহন করে এগিয়ে আসতো, রেগে গিয়ে ধমক দিতে সকলকে ওর কথা শুনছে না বলে কখনো বা অসহায় প্রতিবাদের চোখে গাঁয়ের লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতো।

কিন্তু ওর দিকে কেউ ফিরেও তাকাতো না। সৈনিকরা হিপ পকেটে হাত দিয়ে হা-হা করে হাসতে হাসতে মুঠো-ভরতি পয়সা ছুঁড়ে দিতো। মাহাতোগাঁয়ের লোক হুমড়ি খেয়ে পড়তো সেই পয়সাগুলোর ওপর, নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে ঝগড়া বাধাতো। তা দেখে সৈনিকরা হা-হা করে হাসতো।

শেষে পর পর কয়েক দিন লক্ষ্য করলাম টাঙি-জুতো পরা মাহাতোবুড়ো আর আসে না মাহাতোবুড়ো ওদের দেখে রেগে যেতে বলে, মাহাতোবুড়ো আর আসতো না বলে আমার এক ধরনের গর্ব হতো। কারণ, এক-একসময় ঐ লোকগুলোর ব্যবহারে আমরা—আমি আর ভগোতীলাল খুব বিরক্তি বোধ করতাম ভিতরে ভিতরে লজ্জা পেতাম ওদের কালেকুলো দীন দরিদ্র বেশ দেখে সৈনিকের দল নিশ্চয় ওদের ভিখিরী ভাবতে ভাবতো বলেই আমার খুব খারাপ লাগতো।

সেদিন কাঁটাতারের ওপার থেকে ওরা বখশিস বখশিস বলে চিৎকার করছে, কাঁধে আই ই খাকি বুশশার্টের গার্ড জানকীনাথের সঙ্গে আমি গল্প করছি, আমাদের পাশ দিয়ে একজন অফিসার মচমচ করে যেতে যেতে চিৎকার শুনে থুতু ফেলার মতো গলায় বলে উঠলো, ব্লাডি বেগার্স ।

আমি আর জানকীনাথ পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম আমাদের মুখ অপমানে কালো হয়ে গেল মাথা তুলে তাকাতে পারলাম না। শুধু অক্ষম রাগে ভিতরে ভিতরে জ্বলে উঠলাম

ব্লাডি বেগার্স, ব্লাডি বেগার্স।

সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো মাহাতোদের ওপর। ট্রেন চলে যেতেই আমি ভগোতীলালকে সঙ্গে নিয়ে ওদের তাড়া করে গেলাম। ওরা কুড়োনো পয়সা ট্যাঁকে গুঁজে হাসতে হাসতে পালালো।

তবু ওদের জন্যে সমস্ত লজ্জা আমি একটা অহঙ্কারের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলাম। পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে সেই অহঙ্কারটা আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো মাহাতোবুড়োর চেহারা নিয়ে।

কিন্তু সেদিন আমার বুকের মধ্যের সমস্ত জ্বালা জুড়িয়ে গেল।

ভূরকুণ্ডায় ঠিকাদারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েই খবর পেয়েছিলাম।

সার্ভার দুজন কুলি তখন টেবিল বানানো ড্রাম দুটোকে পায়ে ঠেলে ঠেলে আণ্ডাহল্টের কাঁটাতারের ওপারে সরিয়ে দিচ্ছিলো। তাঁবুর দড়ি খুলছিলো আরেকজন। ভগোতীলাল ড্রামটার গায়ে একটা জোর লাথি মেরে বললে, খেল খতম, খেল খতম।

হঠাৎ হই-হল্লা শুনে চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখি মাহাতোগাঁয়ের লোক ছুটতে ছুটতে আসছে।

আমরা অবাক হয়ে তাকালাম তাদের দিকে। ভগোতীলাল কি জানি কেন হেসে উঠলো।

ততক্ষণে কাঁটাতারের ওপারে ভিড় করে দাঁড়িয়ে গেছে ওরা।

সঙ্গে সঙ্গে একটা হুইস্‌ল্‌ শুনতে পেলাম, ট্রেনের শব্দ কানে এলো।

ফিরে তাকিয়ে দেখি ট্রেনটা বাঁক দিয়ে আণ্ডাহল্টের দিকেই আসছে, জানালায় জানালায় খাকি পোশাক।

আমরা বিব্রত বোধ করলাম, আমরা অবাক হলাম। তা হলে কি খবর পাঠাতেই ভুলে গেছে ভূরকুণ্ডার আপিস? না যে খবর শুনে এসেছি সেটাই ভুল?

ট্রেনটা যত এগিয়ে আসছে ততই একটা অদ্ভুত গমগম আওয়াজ আসছে। আওয়াজ নয়, গান। একটু কাছে আসতেই বোঝা গেল সমস্ত ট্রেন, ট্রেন-ভরতি সৈনিকের দল পরস্পরের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইছে।

বিভ্রান্তের মতো আমি একবার ট্রেনটার দিকে তাকালাম, একবার কাঁটাতারের ভিড়ের দিকে। আর সেই মুহূর্তে চোখ পড়লো সেই মাহাতোবুড়োর দিকে। সমস্ত ভিড়ের সঙ্গে মিশে গিয়ে মাহাতোবুড়োও হাত বাড়িয়ে চিৎকার করছে, সাব বখশিস, সাব বখশিস !

উন্মাদের মতো, ভিক্ষুকের মতো তারা চিৎকার করছে। তারা এবং সেই মাহাতোবুড়ো। কিন্তু আমেরিকান সৈনিকদের সেই ট্রেনটা অন্যদিনের মতো এবারে আর আণ্ডাহল্টে এসে থামলোনা। প্যাসেঞ্জার ট্রেনগুলোর মতোই আণ্ডাহল্টকে উপেক্ষা করে হুস্‌ করে চলে গেল।

আমরা জানতাম ট্রেন আর থামবে না। ট্রেনটা চলে গেল। কিন্তু মাহাতোগাঁয়ের সবাই ভিখিরি হয়ে গেল। ক্ষেতিতে চাষ করা মানুষগুলো সব—সব ভিখিরি হয়ে গেলো।

দেশ । বর্ষ ৩৬ সংখ্যা ৩। ৩০ কার্তিক ১৩৭৫ । ১৬ নভেম্বর ১৯৬৮

কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন ( অথবা নিছক ঢাকাইয়া চুটকি )

বৃহদাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বা গ্রুপ অভ কোম্পানি গুলোতে কোন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে চাকরীচ্যুত করতে হলে বা মানে মানে বিদায় করতে হলে একেক কোম্পানি একেকরকম নিয়ম মেনে চলে। টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে চাকরি করার সময় দেখেছি— যখনই প্রোডাকশন ও কারখানা থেকে বড় কোন কর্মকর্তাকে হেড অফিসে ডেকে কোন পোস্টিং দেওয়া হয় ; আমরা বুঝে ফেলতাম ‘অমুক স্যার’ আর বেশীদিন নেই গ্রুপে।

আবার, অনেক কোম্পানিতে বেতন বোনাসের বাইরেও প্রত্যক্ষ অবহেলার পরিমাণ এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে, তিনি যতদূর সম্ভব ইজ্জত নিয়ে কেটে পড়েন। কোন কোম্পানিতে মালিকপক্ষ সম্ভাব্য টার্গেটেড ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টের লোকজন নিয়ে আলাদা মিটিং করা শুরু করেন, তাকে না জানিয়েই।
আরও মোক্ষম উপায় মালিকপক্ষের কাছে আছে ; সেটা হচ্ছে সম্ভাব্য ব্যক্তিকে তাঁর কাজের দক্ষতার সঙ্গে মিল নেই, এইরকম ফালতু কিছু কাজের দায়িত্ব দিয়ে বসিয়ে রাখা। সরকারি চাকুরীতে OSD ( Officer on Special Duty) করে রাখার মত আর কী !
সবচেয়ে মোক্ষম ও কার্যকর উপায় হচ্ছে, সম্ভাব্য ব্যক্তির চেয়ে অনভিজ্ঞ সহকর্মী বা তাঁর অধস্তন অযোগ্য ব্যক্তিকে পদন্নোতি দিয়ে দেওয়া। এই অপমান মূলত: কোন সুস্থ লোকের পক্ষে হজম করা সম্ভব হয় না।
যাই হোক, এক যুগ আগে আমিও অনেকটা এইরকম একটা সিচুয়েশনের মুখোমুখি হয়েছিলাম। কোনভাবেই কিছু যখন হচ্ছিল না , তখন রাগে দুঃখে ক্ষোভে তৎকালীন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মালিকপক্ষের আস্থাভাজন বসকে গিয়ে এই চুটকি শোনালাম। পরিশেষে প্রশ্ন করলাম, ‘ আপনি আসলে আমাকে নিয়ে কি করতে চাচ্ছেন ?’
যদিও উত্তর মেলেনি কখনই !

সেই চুটকি আবারও সবার সঙ্গে শেয়ার করছি, যৎসামান্য খিস্তি ক্ষমার্হ হবে আশা রাখি।
ঘটনা ব্রিটিশ আমলের।
মহল্লা প্রধান বা সর্দাররা জাতে ওঠার জন্য ঘরে বন্দুক রাখতেন। নতুন সর্দার যথারীতি দোনলা বন্দুক কিনলেন। কিনে রেখে দিলে তো হবে না ! ‘ ছিকার-ঠিকার না করলে — মহল্লা বুঝব ক্যাম্থে, বন্দুক কিনবার লাগছি !’
তো , সর্দার যাবেন পাখী শিকারে। সন্দেহ থাকতেই পারে, নতুন সর্দারের বন্দুক চালানোটা ঠিকমত জানা আছে কী নেই। ঢাকার আশেপাশে তখন অসংখ্য জলাভূমি এবং অতিথি পাখীর আনাগোনা। শীতের শেষ, অস্বস্তিকর চিটচিটে রৌদ্রের শুরু। অনেক আয়োজন করে কাক-ডাকা ভোরে নৌকা ও মাঝিকে নিয়া সর্দার পাখী-শিকারে বের হলেন। এই জলা, সেই জলা, পাখীর আর দেখা নাই। মাঝি চূড়ান্ত বিরক্ত। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল। ধীরেধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। হঠাৎ দূরে ঘাস, লতা-পাতার আড়ালে একটা বক দেখা গেল। মাঝি খুব সাবধানে বৈঠার আওয়াজ না করে আস্তে আস্তে নৌকা এগিয়ে নিয়ে চলছে।
শ’ খানেক হাত দূরে ।

মাঝি: ‘ গুলি করেন ছর্দার সাব।’
সর্দারঃ ‘ আরেকটু আউগাইয়া যা !’
পঞ্চাশ হাত দূরে–
মাঝি: ‘ গুলি করেন ছর্দার সাব।’
সর্দার: ‘আরেকটু আউগাইয়া যা !’
এমন করতে করতে বিশ হাত দূরে গিয়ে অবশেষে সর্দার বন্দুক তাক করলেন ।
মাঝি: ‘এইবার গুলি করবার লাগেন, বক তো উইড়া যাইব গা।’
সর্দার: ‘ আরেকটু আউগাইয়া যা’।
তিতবিরক্ত হয়ে মাঝি সর্দারকে: ‘ ছর্দার সাব, আপনারে এউগা কথা জিগাই?’
বন্দুকে চোখ রেখেই সর্দার বললেন: ‘ জিগা।’
মাঝি: ‘ সত্যি কইরা কন্ তো, আপনে হালায় বক রে গুলি করবেন, নাকি বকের পুঁটকি মারবেন?’

[ প্রকাশকালঃ ২৮শে সেপ্টেম্বর ,২০১৬ ]

কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন ( নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলুন )

ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালাম-এর সেই বিখ্যাত উক্তি বহুশ্রুত ও সবার জানা। “ Love your job, but don’t love your company , because you may not know when your company stops loving you.”

অনেকেই ব্যাপারটাকে নেগেটিভলি ব্যবহার করেন ; এতে করে মালিক-কর্মচারী দূরত্ব বেড়ে যায়। আমি যেহেতু আশাবাদী লোক, তাই আশার কথা বলি। মূলত: এই ব্যাপারটিকে যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যায় , সেটা বছর পনের আগে আমার প্রতিষ্ঠানের সিইও এক ঘরোয়া মিটিং-এ আমাদের কয়েকজনকে বলেছিলেন। উনি এখন আর আমাদের দৈনন্দিন ব্যবসায় জড়িত নন। ভাল লেগেছিল, তাই মনে আছে।

আসলে আপনি যেখানে কাজ করছেন সেই কাজকে এনজয় করার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে আনুগত্য এবং ‘Good-feeling’ থাকতে হবে। পরিবারের সঙ্গে আপনার কথোপকথন সকালে ঘণ্টাখানেক আর রাতে বাড়ী ফিরে সর্বোচ্চ ঘণ্টাদুয়েক। অথচ খেয়াল করে দেখেন, জাগ্রত আপনাকে পরিবারের চেয়ে আপনার কর্মস্থলে তিনগুণ বেশী সময় দিতে হচ্ছে ! আবার, নিজের সম্পূর্ণটা দিতে না পারলে কী করে বুঝবেন আপনার সঠিক সম্ভাবনা কতখানি বা আপনার পক্ষে কতদূর যাওয়া সম্ভব ! নিজের কর্মদক্ষতা বাড়লে আপনার সুনাম যেমন বাড়বে, প্রতিষ্ঠানেও আপনার অবস্থান শক্ত হবে। একই সঙ্গে মার্কেটেও আপনি পরিচিত হয়ে উঠবেন।

একজন মালিক হিসাবে তিনি আমাদেরকে তাঁর কোম্পানির জন্য শতভাগ দিতে বলেছিলেন ; একইসঙ্গে আমাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন মার্কেটে নিজের একটা স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে। নিজের নেটওয়ার্কিং স্কিল, কমিটমেন্ট, পাবলিক রিলেশন, সততা, দক্ষতা দিয়ে নিজের একটা ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করা আবশ্যক ! আমি অনেকসময় দেখেছি , কিছু দক্ষ কর্মকর্তা ও ম্যানেজার পরিশ্রম দিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের চেয়েও নিজের নামকে বড় করে ফেলেছেন। একসময় দেখা যায় , মার্কেটে তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠানকে চেনে সবাই। বলেন , অমুক সাহেবের তমুক প্রতিষ্ঠান।

জানি সবাই উচ্চাকাঙ্ক্ষী হবে না । কিন্তু এই লেখা তেমন কারো চোখে পড়লে, সে নিশ্চয় চেষ্টা করবে এবং সফলও হবে ! আশা করতে দোষ কী !

[ প্রকাশকালঃ ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ]

কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন ( মাকড়শা ম্যানেজমেন্ট )

আমার পড়াশোনা শুরু থেকেই বিজ্ঞানবিভাগে। ম্যানেজমেন্টের উপর নামকা ওয়াস্তে একটা অখ্যাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খুবই ‘হালকার উপর ঝাপসা’মানের একটা MBA ডিগ্রী আছে। তাও সেটার সার্টিফিকেট গত একযুগ ধরে পড়ে আছে সেই ইউনিভার্সিটির কোন এক জং ধরা ক্যাবিনেটে ; আমার সুবিখ্যাত আলস্যের কারণে ওটা আর তুলতেও যাই নি

তো ‘Trial and Error’ , সেই বিখ্যাত মৌলিক পদ্ধতিতে আমার ম্যানেজমেন্ট শেখার হাতেখড়ি । প্রতিমুহূর্তেই শেখার আবশ্যকতা আছে এবং জীবন্ত মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে গেলে যা হয়–একজনের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, আরেকজনের ক্ষেত্রে সেটা ভীষণভাবে ব্যর্থ ! সবকিছু বিবেচনা করে এখন পর্যন্ত ‘Situational Leadership’ বা ‘Situational Management’ সবগুলোর একটা সম্মিলিত রূপ মনে হয়েছে।

আরেকটা ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি খুব কার্যকর, বহুল প্রচলিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় আমাদের দেশে । ম্যানেজমেন্টের ভাষায় এটাকে Autocratic Management বলা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমি এটার নাম দিয়েছি Spider Management বা ‘মাকড়শা ম্যানেজমেন্ট’।

ধরুন , একজন মেধাবী লোক একটা কোম্পানির মালিক অথবা একজন সিইও বা ম্যানেজার। তার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই। এই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকেই আছেন এবং ছোট্ট প্রতিষ্ঠানে বাকী লোকেরা তার চেয়ে কম মেধাবী। এবং যে কোন পরিপ্রেক্ষিতে অন্যকেউ যেই সিদ্ধান্তই দিক না কেন, ঐ মেধাবী মালিকের বা ম্যানেজারের সিদ্ধান্ত পরীক্ষিতভাবে সবচেয়ে কার্যকর !

তো, হয় কী , ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের সবধরনের সিদ্ধান্তের একচ্ছত্র অধিকারী হয়ে বসেন তিনি ! এক পর্যায়ে দেখা যায় রিসিপশনের চেয়ার টেবিলের রং , কার্পেট , কাপ-পিরিচ থেকে টয়লেটের কমোড কেনার সিদ্ধান্তও তাকে দিতে হয়। সকলেই ব্যাপারটাকে মেনে নেয়। সবাই তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। কোম্পানির সর্বোচ্চ মঙ্গলের জন্য ব্যক্তিটিকে এককভাবে সাধুবাদ দেওয়া হয়। আর ঐ ব্যক্তি নিজেকে ধীরে ধীরে কোম্পানির অন্যান্য আসবাবপত্রের মতো নিজেকে অপরিহার্য করে ফেলে।

ব্যাপারটা মাকড়শার মতো অনেকটা। একটা মাকড়শা তার জালের ঠিক কেন্দ্রে থেকে মুখ দিয়ে , পেট দিয়ে , হাত দিয়ে পা দিয়ে চারপাশ আঁকড়ে থাকে। অনেক সময় সেই স্কুলপাঠ্যের লোভী স্বার্থপর মাকড়শার মতো হয়, চারদিকের টানে নিজেকে একসময় ছিঁড়েখুঁড়ে ধ্বংস করে ফেলে সে। কর্মজীবনে এই মাকড়শা মালিক বা ম্যানেজারদের মুখোমুখি হতেই হবে আপনাকে। আমাদের চারপাশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ম্যানেজাররাই এই পদ্ধতিতে চলতে চান। কেন চান , সে গল্প আরেকদিন হবে।

দীর্ঘমেয়াদি মুশকিল হয় অন্যখানে। একজন মানুষ যতো দক্ষ বা সিদ্ধান্তগ্রহণে পারঙ্গম হন না কেন; সিদ্ধান্তগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার গুণগত মান কমতে থাকে। একজন দক্ষ ডাক্তার দিনে একটা অপারেশন করলে যে গুণগত মান পাওয়া যাবে ; ১০টা করলে সেক্ষেত্রে ছোটখাটো বা বড় ধরণের ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ! যে মালিক বা ম্যানেজার সপ্তাহে ১০টি বড় ধরণের সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, ধরে নিচ্ছি তার এফিসিয়েন্সির মান শতকরা ৯৫ ভাগ। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি যখন ১০০ টা সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন বা দিতে বাধ্য হচ্ছেন, তার এফিসিয়েন্সি কমে যাচ্ছে । ধরুন, তা নেমে হয়ে গেল ৯০ ভাগে। এখন ২০০টি সিদ্ধান্ত হলে, ২০টি দুর্বল সিদ্ধান্ত বা ভুল সিদ্ধান্ত অনেকাংশে প্রতিষ্ঠানের জন্য বা কর্মচারীদের জন্য নিদারুণ ক্ষতিকর হতে পারে।

কিন্তু এই দুষ্টচক্র থেকে ঐ ব্যক্তি বের হয়ে আসতে পারেন না কোনভাবেই। নিজের জালে নিজে এমনভাবে আটকে যান যে– না পারেন ছিঁড়তে, না পারেন বের হতে, না পারেন কাউকে বলতে। নিজের পরিবারপরিজন থেকে ধীরে ধীরে সরে যান ; পরিবারও তাকে ছাড়া দিব্যি চলতে শিখে যায়।

আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, ‘মাকড়শা ম্যানেজমেন্ট’ ছোট প্রতিষ্ঠানের উত্থানের জন্য দারুণ কার্যকর একটা পদ্ধতি। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠান যখন ২০ জন থেকে ২০০ বা ২০০০ জনের হয়ে যায় ; তখন তা থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে, সেটা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, দুইজনের জন্য চরম অমঙ্গলকর !

[ প্রকাশকালঃ ২৩শে সেপ্টেম্বর , ২০১৬ ]

কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন (ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি )

ম্যানেজমেন্ট চালানোর অসংখ্য পদ্ধতি আছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পন্থা আবিষ্কৃত হচ্ছে। প্রচলিত জনপ্রিয়তম পদ্ধতি হচ্ছে অধীনস্থ সাথে একটু দূরত্ব রেখে হুকুম করে বা ডিরেক্ট করে সবকিছু ম্যানেজ করা । অধুনা ইন্টারনেটের বহুল মোটিভেশনাল স্পিকারদের কল্যাণে কোচিং ম্যানেজমেন্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠছে । ম্যানেজার এখানে সফল কোচের মতো হাতেকলমে সবকিছু দেখিয়ে দেন, মোটিভেট করেন, কর্মচারীদের কাছ থেকে তাদের সর্বোচ্চটি আদায় করে নেন। খুব বিরলভাবে আছে ডেলিগেশন ম্যানেজমেন্ট। অসামান্য কিছু ম্যানেজার আছেন যারা দায়িত্ব এমনভাবে পরবর্তীদেরকে ডেলিগেট করেন যে, কিছুদিন পরে উনি নিজেকে সবার কাছে অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেন। এতে করে প্রতিষ্ঠানের লাভ হয়, সেকেন্ড জেনারেশন তৈরি হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানে । পাঠ্যপুস্তকের বিস্তীর্ণ পড়াশোনায় নানাধরনের পদ্ধতি বাস্তবে কিছুটা-তো অবশ্যই কাজে আসে; নইলে আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেন !

কিন্তু মাঝেমাঝে এমন কিছু জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে প্রচলিত কোন নিয়মই আর কাজ করে না। আপনি ম্যানেজার মালিক যাই হন না কেন, দিব্যি দেখতে পাচ্ছেন – ঘটনাতে এমন প্যাঁচ লেগেছে ! একেবারে ল্যাজেগোবরে অবস্থা — ম্যাজিক ছাড়া কোনভাবেই ঐ বিপদ থেকে উত্তরণের কোন উপায় নেই। দুর্ভাগ্যবশত: আপনি জাদুকর জুয়েল আইচ বা পিসি সরকার নন , যে ছুঃ মন্তর দিয়ে সমস্যার সমাধানের কোন উপায় বাৎলে দেবেন। এটাকে অনেকসময় আমরা বলি বটলনেক (Bottleneck ) সিচুয়েশন। হুট করে গিটঠু খোলার কোন চান্স থাকে না ।

অথচ সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, আপনি কোন একটা পথ দেখাবেন । আমি আমার জীবনে ব্যক্তিগত ভাবে সাংঘাতিক মেধাবী ও ক্যারিসমাটিক কয়েকজন মালিক ও ম্যানেজারকে দেখেছি, যারা সমস্যারে কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালেই কীভাবে যেন সবকিছু ঠিক হয়ে যেতো !

এখন আরেকটা স্বল্প-মেধাবী কিন্তু কার্যকর পদ্ধতির কথা বলি ; সেটা দিয়েও অনেক বুদ্ধিমান মালিক-ম্যানেজারকে জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরিত হতে দেখেছি বহুবার। যেহেতু আমি ও আপনি উভয়েই জানি যে , আমাদের চারপাশে ক্যারিসমাটিক ম্যানেজার বা মালিকের অভাব আছে । সুতরাং ক্ষেত্র-বিশেষে দ্বিতীয় পদ্ধতিটা মন্দ নয়।

এসব ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সোজা একটা কথা বলে দিলেই কাজ হয়।
‘আমি জানিনা কীভাবে করবেন, কিন্তু অমুক সময়ের ভিতরে এটা করতেই হবে। কয়জন মিলে, কী কী রিসোর্স লাগবে, কীভাবে করবেন সেটা আমার দেখার বিষয় না।’
এই পদ্ধতিতে কী কাজ হয়? আলবৎ হয় ! আসলে , গভীর সমস্যায় পড়লে অধীনস্থরা অনেক সময় হাল ছেড়ে দেয়। ‘বসেরা-তো জানেই কতখানি সমস্যা, আমি নতুন করে কী করতে পারি।’ সে তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ না করে কমফোর্ট জোনে থাকতে চায় ।

খেয়াল করে দেখবেন , পশ্চিমাদেশের বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে, বিশেষ করে তরুণ খেলোয়াড়দের মোটিভেট করার জন্য একটা কথা ঘুরে ফিরে বলা হয় “ When someone pushes his/her limits, he/she can reach their maximum potential !” ঠিক একইভাবে কাউকে বিপদসীমার উপরে এক্সট্রিম লেভেলে ঠেলে পাঠিয়ে দিলে, ভয়ংকর প্রেশার বা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন সে ম্যাজিক দেখাতে পারে।

তবে লক্ষণীয় এই যে, এই ‘পদ্ধতি’ সারাবছরে একবার বা দুইবারের বেশী প্রয়োগ করা উচিৎ নয়। ঘন ঘন এক্সট্রিম প্রেশার মালিক বা ম্যানেজারকে অধীনস্থদের কাছে ক্লিশে করে ফেলে !

[ প্রকাশকালঃ ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ]