by Jahid | Nov 27, 2020 | সাহিত্য
আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় ।
আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি,
গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না ।
কী করে তfও বেঁচে থাকছি, ছবি আঁকছি,
সকালবেলা, দুপুরবেলা অবাক করে
সারাটা দিন বেঁচেই আছি আমার মতে । অবাক লাগে ।
আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষ হলে জুতো থাকতো,
বাড়ি থাকতো, ঘর থাকতো,
রাত্রিবেলায় ঘরের মধ্যে নারী থাকতো,
পেটের পটে আমার কালো শিশু আঁকতো ।
আমি হয়তো মানুষ নই,
মানুষ হলে আকাশ দেখে হাসবো কেন ?
মানুষগুলো অন্যরকম, হাত থাকবে,
নাক থাকবে, তোমার মতো চোখ থাকবে,
নিকেলমাখা কী সুন্দর চোখ থাকবে
ভালোবাসার কথা দিলেই কথা রাখবে ।
মানুষ হলে উরুর মধ্যে দাগ থাকতো ,
বাবা থাকতো, বোন থাকতো,
ভালোবাসার লোক থাকতো,
হঠাৎ করে মরে যাবার ভয় থাকতো ।
আমি হয়তো মানুষ নই,
মানুষ হলে তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখা
আর হতো না, তোমাকে ছাড়া সারাটা রাত
বেঁচে থাকাটা আর হতো না ।
মানুষগুলো সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় ;
অথচ আমি সাপ দেখলে এগিয়ে যাই,
অবহেলায় মানুষ ভেবে জাপটে ধরি ।
by Jahid | Nov 27, 2020 | সাহিত্য
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে , আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য ।
বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত ।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক । আমি হাতপাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী -সেবার দায় থেকে ।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক :
আমার জল লাগবে কি না, নুন লাগবে কি না,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কি না ।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি ।
আমি বলছি না ভলোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক । কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক ।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক : ‘তোমার চোখ এতো লাল কেন ?
by Jahid | Nov 27, 2020 | ছিন্নপত্র, লাইফ স্টাইল
আব্বা-আম্মার দিকে তাকালে ইদানীং খারাপ লাগা শুরু হয়।
জীবন চক্রের যে জায়গাটায় আজ আমি দাঁড়িয়ে ; সেখান থেকে সামনে পিছনে দুইদিকেই চোখ চলে যায়। চল্লিশোর্ধ জীবন মানেই টুকটাক হৃদকম্পনের সাথে সাথে মধুমেহ ইত্যাদি ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যায় আমাদের দেহ। আমি দেখতে পাই আমার ভবিষ্যৎ চেহারাটাকে ঠিক আব্বার জায়গায়।
আমার আশেপাশের মুরব্বিদেরও বছর পঞ্চান্ন- ষাট পর্যন্ত তেমন কোন পরিবর্তন আমার চোখে ধরা পড়ে নাই। কিন্তু, অবাক হয়ে দেখলাম , একেকজন একেক সময়ে মাস-দুয়েকের ভিতর হঠাৎ করে করে বুড়িয়ে গেলেন। হঠাৎ করেই তাঁদের বয়স যেন বছর দশেক করে বেড়ে গেল। চামড়া কুঁচকে, চুল কমে বিশ্রী একটা অবস্থা। এটাই যে নিয়তি, এটাই যে হয়ে আসছে সবসময় — আমার মাথাতেই ছিল না !
আম্মা এখন যে পরিমাণ ওষুধ খান সকালে, আমিতো দুষ্টামি করি এই বলে যে, তোমারতো নাস্তা করার দরকার নেই। ওষুধেই পেট ভর্তি !
যাকগে ! যে জীবনচক্রের কথা বলছিলাম, ওই অমোঘ চক্রের সামনে আমরা সবাই কতটাই না অসহায় ! এতো মূল্যবান একটা জীবন– তুচ্ছ কিছু অর্থের জন্য, অন্নসংস্থান , ছাঁদ , ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা –ইত্যাদি ইত্যাদি বাল ও ছালের জন্য অপচিত হচ্ছে। কোন মানে হয় !
তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসের নিতাই কবিয়ালের কথা মনে হয়।
লাইনগুলো আগে এতোবার শোনা, মর্মার্থ বুঝতে বয়স হওয়া লাগলো, চল্লিশ পেরুতে হলো!
“ এই খেদ মোর মনে,
ভালবেসে মিটল না আশ, কুলাল না এ জীবনে।
হায় জীবন এত ছোট কেনে ,
এ ভুবনে?”
হায় ! জীবন এত ছোট কেনে ?”
প্রকাশকালঃ ২৭শে মার্চ,২০১৩
by Jahid | Nov 27, 2020 | লাইফ স্টাইল
আমরা গতানুগতিক বাঙালীরা চল্লিশ পেরুলেই অবসর জীবনের চিন্তা শুরু করে দিই। দাদা-নানাদের সময়ে তাঁদের নাকি ত্রিশ পেরুলেই এই চিন্তা আসতো আর চল্লিশ পেরুলে হজ্জ্ব সেরে তসবীহ্ গোনা।
আব্বা এই সেদিন পর্যন্তও সক্রিয় ছিলেন। কিডনীরোগে প্রতিদিনের ডায়ালাইসিস আর অসুস্থতা এমন করে জেঁকে বসেছে যে, ইচ্ছা করলেও উনি আর মিরপুর থেকে সদরঘাটের কোর্টে যেতে পারেন না। অসম্ভব দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছেন বলে শারীরিক পরিশ্রমকে উনি ভয় পান না। পেটানো শরীরের ছ ফুটের দীর্ঘদেহী আব্বাকে দেখলে এখন শিশুর মতো ন্যুব্জ মনে হয়। আমাকে দেখে অনেকেই বলেন , ভাই ব্যাম-ঠ্যাম করেন নাকি। আমি বলি, নারে ভাই, শরীরটা বাপ-মায়ের জেনেটিক্সে পাওয়া। মহল্লার অনেক মুরব্বী চাচাদেরকে দেখি যারা আব্বার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট তাঁরা আরো বছর দশেক আগেই বুড়িয়ে গেছেন। মৃত্যুর জন্য বিনীত অপেক্ষা তাঁদের।
মাস কয়েক আগে এক চীনা বংশোদ্ভূত ক্রেতা, যে কিনা সেকেন্ড জেনারেশন আমেরিকান তার সাথে কথা হচ্ছিল। বয়স প্রায় ৬৫ হবে। সে কোম্পানির এমডি, সর্বেসর্বা।
টাকা পয়সা পরিশোধ নিয়ে ঢিলেমির জন্য আমি এক পর্যায়ে বললাম, ‘কাহিনী কি ? এইটা ঝুলাইয়া রাখার মানে কি ? তুমি মালিক, তুমি বললেই তো হয়ে যায় ! ’
সে বলল, ‘আমার চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে আবার কে? তার কথাতো আগে বলো নাই।’
‘উনি আমার বাবা।’
‘বয়স কতো ?’
‘৮৯ বছর !’
‘এই বয়সে সে অফিস করে ! ’
‘না, সেই অর্থে অফিস করে না ! উনি প্রতিদিন নিয়মিত সকাল আটটায় অফিসে আসেন ঘড়ি ধরে। আমি তাঁর ব্যবসার উত্তরসূরি , সো আমার অফিসের ফিন্যান্সটা এখনো উনিই দেখেন। মাঝে মাঝে দুপুরের পরেও থাকেন , নইলে বাড়ী যেয়ে বা মহল্লাতে চ্যারিটি কিছু সংস্থা আছে সময় কাটান !’
‘উরি বাপস্ , বলো কি তুমি !’
আমার বিস্ময় প্রকাশে সে বলল, ‘ তোমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে আমাদের এইটা একটা বড়ো মানসিক পার্থক্য। তোমরা তীব্রভাবে পরকালে বিশ্বাসী। আমরা নই। আমরা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজের ভিতরে থেকে নিজেকে মূল্যবান মনে করতে চাই।’
আসলেই তো, চারপাশে যা দেখেছি। মধ্যবিত্তের রিটায়ারমেন্ট মানে– পুরোপুরি অপাঙতেয় মূল্যহীন জীবন। ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। দুইটা রাস্তা খোলা, কবরস্থান আর মসজিদ। তসবিহ্ নিয়া মসজিদে যাওয়া আসা করো এবং সারাক্ষণ সাড়ে তিন হাত অন্ধকার কবরের কথা চিন্তা করো। মানুষ দ্রুত বুড়িয়ে যাবে না কেন ? কাজ নেই , আলো নেই, বাতাস নেই, হাসি নেই, দুরারোগ্য অসুস্থতায় সার্বক্ষণিক মৃত্যুর কথায় কে না বুড়িয়ে যায় !
কয়েক বছর আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। বড়ো কোন অসুস্থতায় না পড়লে, যতদিন পারি কাজের ভিতর থাকব। সেই কাজ অর্থকরী হোক বা সমাজকল্যাণমূলক হোক। মরার আগে মরতে চাই না। অপাঙতেয় মূল্যহীন জীবন চাই না ।
প্রকাশকালঃ ২৭শে মার্চ,২০১৩
by Jahid | Nov 27, 2020 | সাহিত্য
বড় কিছু পেতে হলে আমাদের যে কিছু দিতে হবে , এ তো নতুন কথা নয়। কিন্তু তা নিগ্রহ বা কষ্টের মধ্য দিয়ে দিলে হবে না, দিতে হবে জীবনের সুপ্রচুর উদ্যাপনের ভেতর দিয়ে। সব কাজ আমাদের কাছে সমান আনন্দ নিয়ে আসে না । অথচ আনন্দ না থাকলে সাধনা শুকিয়ে ওঠে। অবন ঠাকুরের খুব সুন্দর একটা কথা আছে । কথাটা হলঃ ‘ মানুষ কি ভেরেণ্ডা গাছ খেতে পারে ? পারে না; কিন্তু আখ গাছ খেতে পারে। কেন? খেতে পারে এর ভেতরকার মাধুর্যের জন্য ।এর ভিতর মিষ্টি রস আছে বলে।’ জীবনও তা-ই । এর পরিপক্ব ফলটি পেতে হলে এর ভেতরকার মাধুর্যটি আস্বাদন করতে হয়। না হলে এ হয়ে যায় খরখরে কাঠের মতো।
জীবন উৎসর্গ করা মানে ভয়ংকর চেহারা করে দুরূহ শপথে জীবনকে শ্বাসরুদ্ধ করা নয়। উৎসর্গের আসল মানে আনন্দ। উৎসর্গ মানে উদ্যাপন । সর্বোচ্চ আনন্দ আর উদ্দীপনার আলোয় বিচ্ছুরিত হওয়া। যার কাছে বেঁচে থাকা মানে জীবনকে নিগ্রহ নিষ্পিষ্ট করা , সে কিন্তু আসলে জীবন উৎসর্গ করে না। কর্মদানব আর কর্মবীর এককথা নয়। কর্মদানব জীবনকে জবাই করে জীবনকে পায় , আর কর্মবীর পায় জীবনকে বিকশিত করে। ওটাই প্রকৃত উৎসর্গ । এ উৎসর্গ শ্রেয়তর জীবনের জন্য । উচ্চতর লক্ষ্যের জন্য । ….
তাই সফল সেই মানুষ – যে পৃথিবীর কাছ থেকে নেয় বেশি আর সার্থক সেই মানুষ – যে দেয় বেশি। এই সার্থকতাই শেষপর্যন্ত জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু একটা বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত সাফল্য আমাদের চাই। যেমন, টাকার কথাই ধরা যাক। অনেক বেশি হয়ে গেলে এ আত্মঘাতী জিনিশ। কিন্তু কিছু পরিমাণ না হলে তো সবই ভণ্ডুল। সব ক্ষেত্রের জন্যই এ সত্য।
ভাঙ্গো দুর্দশার চক্র। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।।
সাম্প্রতিক মন্তব্য