একটি দিন। লিপিকা।।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মনে পড়ছে সেই দুপুরবেলাটি। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টিধারা ক্লান্ত হয়ে আসে, আবার দমকা হাওয়া তাকে মাতিয়ে তোলে। ঘরে অন্ধকার, কাজে মন যায় না। যন্ত্রটা হাতে নিয়ে বর্ষার গানে মল্লারের সুর লাগালেম।

পাশের ঘর থেকে একবার সে কেবল দুয়ার পর্যন্ত এল। আবার ফিরে গেল। আবার একবার বাইরে এসে দাঁড়াল। তার পরে ধীরে ধীরে ভিতরে এসে বসল। হাতে তার সেলাইয়ের কাজ ছিল, মাথা নিচু করে সেলাই করতে লাগল। তার পরে সেলাই বন্ধ ক’রে জানলার বাইরে ঝাপসা গাছগুলোর দিকে চেয়ে রইল।বৃষ্টি ধরে এল, আমার গান থামল। সে উঠে চুল বাঁধতে গেল।

এইটুকু ছাড়া আর কিছুই না। বৃষ্টিতে গানেতে অকাজে আঁধারে জড়ানো কেবল সেই একটি দুপুরবেলা।

ইতিহাসে রাজাবাদশার কথা, যুদ্ধবিগ্রহের কাহিনী, সস্তা হয়ে ছড়াছড়ি যায়। কিন্তু, একটি দুপুরবেলার ছোটো একটু কথার টুকরো দুর্লভ রত্নের মতো কালের কৌটোর মধ্যে লুকোনো রইল, দুটি লোক তার খবর জানে।

যাপিত জীবনের ক্লান্তি

জানি—তবু জানি
নারীর হৃদয়—প্রেম—শিশু—গৃহ—নয় সবখানি;
অর্থে নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত- ক্লান্ত করে; ”

যাপিত জীবনের ক্লান্তি আমাকে নিয়মিত বিরতিতে বিষণ্ণতায় ভুগিয়েছে। ডিপ্রেশন, অবসন্নতা, ক্লান্তি যাই বলি না কেন, আমাদের প্রাত্যহিকতার অবিচ্ছেদ্য। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমি বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার নানারকম পদ্ধতি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি।

শৈশবে আম্মা ছিলেন সবচেয়ে বড় মানসিক আশ্রয়। কৈশোরে আম্মার পাশাপাশি দিনলিপি লেখার অভ্যাস ছিল। মনের যে কোন অন্তর্গত ক্লান্তি , বেদনার ভার কমিয়ে ফেলার জন্য দিনলিপিতে সবকিছু লিখে ফেলতাম। গল্পের বইয়ের পাশাপাশি ছিল গান শোনার বাতিক । রবি শংকরের সেতার থেকে শুরু করে সোলস, ফিডব্যাক ! কলেজ জীবনে কৈশোরের অভ্যাসগুলোর পাশাপাশি নানাধরনের মোটিভেশনাল বই ও উজ্জীবক লেখা খুঁজে খুঁজে পড়তাম । প্রিয় বাক্যগুলো নিজের মত করে ডায়েরীতে টুকে রাখতাম।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়ার চাপ, দূরাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা প্রায়শ: বিষণ্ণ করতো আমাকে। ওই সময়ে পরীক্ষা, প্রিপারেটরি লিভ যাই হোক না কেন – হুট করে হল ছেড়ে বাসায় চলে যেতাম , আম্মার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার হলে ফিরে যেতাম। অনেক সময় সবচেয়ে মজার বন্ধুটিকে খুঁজে বের করে ওঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিতাম।

বিয়ের আগে ও পরের বছরগুলোতে আমার জীবনসঙ্গিনীর সঙ্গে কাটানো সময় অনেকাংশে মানসিক বিষণ্ণতা দূর করত। গত বছর দশেক ধরে দুই কন্যাই আমার বিষণ্ণতা কাটানোর মহৌষধ।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্যজন্মের তুচ্ছতা যেভাবে বুঝতে পারছি, আবার না চাইতেই পাওয়া জীবন যে কতোখানি অমূল্য তা ও বোঝার চেষ্টা করছি। অনুতাপ, অনুশোচনা যৌক্তিক-অযৌক্তিক আকাঙ্ক্ষায় সীমিত সময় দিয়ে জীবনকে উপভোগ করার তাগিদ দিচ্ছি নিজেকে।
সাময়িক বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার জন্য বন্ধু-মহলে অন্য সবার কি কি ধরণের ব্যক্তিগত পদ্ধতি আছে , জানতে ইচ্ছে করছে। একটা খোলামেলা আলোচনা হলে মন্দ হয় না !

প্রকাশকালঃ ২৬শে মে, ২০১৭

স্মাইল প্লিজ।। তারাপদ রায়

স্মাইল প্লিজ, আপনারা প্রত্যেকেই একটু হাসুন,
দয়া করে তাড়াতাড়ি, তা না হলে রোদ পড়ে গেলে
আপনারা যে রকম চাইছেন তেমন হবে না,
তেমন উঠবে না ছবি। আপনার ঘড়িটা ডানদিকে
আর একটু, একটু সোজা করে প্লিজ, আপনি কি বলছেন
ঘাড়-টাড় সোজা করে দাঁড়ানো হ্যাবিট নেই, তবে,
কি বলছেন অনেকদিন, অনেকদিন হাসার অভ্যাস,
হাসার-ও অভ্যাস নেই? এদিকে যে রোদ পড়ে এলো
এ রকম ঘাড়গোঁজা বিমর্ষ মুখের একদল
মানুষের গ্রুপফটো, ফটো অনেকদিন থেকে যায়,
ব্রমাইড জ্বলে যেতে প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর।
বিশ-পঁচিশ বছর পরে যদি কোনো পুরোনো দেয়ালে
কিংবা কোনো অ্যালবামে এরকম ফটো কেউ দেখে,
কি বলবেন, বলবেন, ক্যামেরাম্যানের ত্রুটি ছিলো,
ঘাড় ঠিকই সোজা ছিলো, সব শালা ক্যামেরাম্যানের
সেই এক বোকার শাটারে এই রকম ঘটেছে।

সরস্বতী।। বুদ্ধদেব বসু

লক্ষ্মী দেবী ভালোমানুষ
অসংখ্য তাঁর ভক্ত,
সরস্বতীর খামখেয়ালে
নাগাল পাওয়া শক্ত ।
পুজো তাঁকে করতে হবে
সপ্তাহে সাতদিনই,
তাই বলে যে তুষ্ট হবেন
তেমন তো নন ইনি ।
সন্ধে , সকাল, রাত-দুপুরেও
সাধতে হবে তোমায়,
কোনোমতেই সইবে না তাঁর
একটি বেলা কামাই ।
কিন্তু যদি চিন্তা করো –
মিটল মনোবাঞ্ছা ?
দেখবে তখন আরো অনেক
দুরে তোমার প্রাণ চায় ।
হঠাৎ যদি একটি কোনো
বর দিয়ে দেন দৈবে ,
ভেব না সেই ভাগ্য তোমার
চিরটা কাল রইবে ।
দিয়ে আবার ফিরিয়ে নিতে
দিব্যি তিনি পারেন ,
ডান হাতে যা আজকে দিলেন
বাঁ হাতে কাল কাড়েন।
এইজন্যে সরস্বতীর
নেই পপুলারিটি,
পদ্মবনে একলা তাঁকে
দুরে রাখাই রীতি ।
লক্ষ্মী আছেন ঘরে-ঘরে
মা-কাকিমার যত্নে,
সরস্বতীর বেস্পতিবার
কারোই তাতে মত নেই।
মায়ের পাশে লক্ষ্মীদেবী
মন্দিরে জীবন্ত,
কোথাও আছে একটিও কি
সরস্বতীর জন্য ?
বেশি কী আর – বাংলা ভাষার
কাণ্ড দ্যাখো লক্ষ্যি ,
ভালো হলেই ছেলে-বুড়ো
সক্কলে হয় ‘লক্ষ্মী’ ।
পাপ্‌পা যখন পড়তে বসে
বেলুন-বাঁশি ফেলে,
তখন তারে কেউ কি বলে
‘সরস্বতী ছেলে’ ?

বর্ষ ২১ সংখ্যা ১৪ । ১ ফাল্গুন ১৩৬০। ১৩ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪

দুটি কবিতা।। শিবরাম চক্রবর্তী

।। ১ ।।
ও … ওই বাড়ীর ছাদে একটি মেয়ে।
আর আমি একলা এখানে
আমার ব্যলকনির ডেক চেয়ারে।
মেয়েটি আমার দিকে ভুলেও কখনো তাকায় না।
কিন্তু আমি তাকালেই সে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
কী করে যে টের পায় কে জানে !

।। ২ ।।
একটা বয়েস এলেই নাকি ব্যর্থতাবোধ এসে যায়।
কিন্তু কেউ-কেউ আবার ব্যর্থতাবোধ নিয়ে জন্মায় ;
সে খুব ভাগ্যবান ।
সে কিছুই আশা করে না, কেননা তার পাবার কিছু নেইকো,
পাওনা নেই তার কোনোখানেই ।
(তবুও এই দুনিয়ার একেবারেরি কিছু না পেয়ে
শুধু হাতে যাবার কারো জো আছে নাকি ? )
তাই যখন সে যা পায় তাই তার কাছে অভাবিত ;
তাই তার কাছে পরমাশ্চর্য—পরমার্থ-উপায় !
কেননা কোনো কিছুর পরেই নেই তার কোনো দাবি তো ;
তাই একটুখানি বর্ষণেই তার ধূসর মরু প্লাবিত।
তাই সর্বদাই তার মনে হয় সে বুঝি ব্যর্থ হয়,
পড়ে-পাওয়া চৌদ্দ আনাই ত লাভ তার !
যদিও সেই চৌদ্দ আনার ষোলো আনাই ফাঁকি ।।

বর্ষ ৩৫ সংখ্যা ৭ । ২৯ অগ্রাহয়ণ ১৩৭৪। ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৬৭