টোনাকাহিনী ( বিবাহবার্ষিকী )

গতকল্য ১৯শে জানুয়ারি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ টোনা টুনির ষোড়শ বিবাহবার্ষিকী ছিল। যথারীতি সারাদিনের কর্মস্থলের চাপে পিষ্ট হইয়া টোনার গৃহে প্রবেশ। ম্লান সম্ভাষণে সন্ধ্যার শুরু। যেহেতু, অধুনা শহর ঢাকায় আনন্দ বিনোদন উদযাপনের দুইটি মাত্র পথ খোলা রহিয়াছে। হয়, নিজ গৃহে আরো কিছু ঘনিষ্ঠজনকে ডাকিয়া ঘৃত তৈল মিশ্রিত খাদ্য দ্বারা আপ্যায়ন। অথবা আশেপাশের কোন খাদ্য সরবরাহকারী দোকানে যাইয়া গুচ্ছের অর্থ খরচ করিয়া ভক্ষণ।

গত রজনীতে টোনা টুনির বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে জনৈক শুভাকাঙ্ক্ষী করুণাবশতঃ নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। দুই ছোট টুনটুনিকে লইয়া টোনা ও টুনি রেস্তোরাঁয় আপ্যায়িত হইতে গিয়াছিল।

কথা তাহা নহে ! প্রায় দেড়যুগের কাছাকাছি টোনা টুনির বিবাহিত জীবনে বহু ঘাতপ্রতিঘাত ও ভালোবাসার অন্তঃসলিল ধারা একইসঙ্গে বহিয়া চলিয়াছে।

বিবাহের প্রাক্বালে টোনা, টুনিকে সান্ত্বনা দিয়াছিল । যেহেতু, বিশেষ সামাজিক দিবসগুলোতে কোথা হইতে যেন টোনার কপালে রাজ্যের ঝামেলা ও জঞ্জাল আসিয়া জোটে। সেইহেতু , বিশেষ দিবসের যথাযথ প্রাপ্য, টোনা টুনিকে অন্য কোন সাধারণ দিনে উদযাপনে ক্ষতিপূরণ করিয়া দিবার প্রতিশ্রুতবদ্ধ ছিল। অদ্যাবধি, টোনা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিবার আপ্রাণ চেষ্টা করিয়া আসিতেছে। টুনিও গত্যন্তর না দেখিয়া ইহা মানিয়া লইয়াছে!
সেই শুভাকাঙ্ক্ষীর শুভকামনা জানাইবার সময়, টোনা লম্বা শ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ আমাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ এই দীর্ঘ ১৬ বছর যেমন তেমন করিয়া হইলেও সংসার তো করিতেছি!’

টুনি তদপেক্ষা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ বরং আমাকেই বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ। টোনার মতো বেহিসাবি, ছন্নছাড়া, নির্বোধের সঙ্গে অদ্যাবধি ঘরসংসার করিয়া চলিতেছি বলিয়া !’

জ্যেষ্ঠা টুনটুনি মৃদু হাসিয়া মধ্যবর্তিনী হইয়া কহিল, ‘ কাহাকেও পুরস্কৃত করিবার প্রয়োজন দেখিতেছি না ! প্রতিটি দম্পতির বিবাহবার্ষিকীতেই এবম্বিধ বাক্যাবলী হইয়া থাকে !’

মনে বুঝিলাম, আমাদের সেইদিনের ছোট্ট টুনটুনি বড়ো হইয়া গিয়াছে। নহিলে , জগতের এই স্বাভাবিক সত্য সে এতো সহজে কী করিয়া বুঝিয়া ফেলিল !

প্রকাশকালঃ ২০শে জানুয়ারি,২০২০

বিবাহবার্ষিকীর কথকতা

২০০১ সালের এক বিষণ্ণ শীতের বিকালে আমরা পৌঁছালাম আমার হবু জীবনসঙ্গিনীর বাড়িতে; কুমারখালী কুষ্টিয়ায়। তারপর নানা আয়োজন উপচারের ভিতর দিয়ে সামাজিকভাবে আমাদের জীবনের শুরু।

প্রথমদিকের বিবাহবার্ষিকীর কথা মনে রাখতেন বরকনের দুই পিতামাতা। নিজের বড়ভাই-ভাবী এবং জনৈক গহনার দোকানদার ; যার কাছ থেকে গহনা কেনা হয়েছিল। প্রায়শ: ব্যাংক থেকে ফরমেটেড শুভেচ্ছা আসতো। আব্বা-আম্মা প্রয়াত হওয়ার পরে শুভেচ্ছা জানানোর জনসংখ্যা গেল কমে।

চতুর্দশী বড় কন্যা রাত বারোটায় এসে হ্যাপি অ্যানিভার্সারি জানিয়ে চমকে দিল ! বোধ করি বাকী জীবনে একজন শুভেচ্ছা-দাত্রী বাড়ল।

বাস্তবতা ১ : সত্য সবসময় সুন্দরই হয় না ; অনেকাংশে তা অশ্লীলতার সীমারেখায় ঘোরাফেরা করে ! দাম্পত্যের দেড়যুগ পরে প্রকৌশলী বন্ধুদের এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় হা হুতাশ চলছিল।
‘দিনশেষে ঘরে ফিরে স্ত্রীর আচরণকে মনে হয় আপন বোনের মত। বিছানায় মনে হয় ভাইবোন শুয়ে আছি!’
এই কথার পর, আমি কিছুটা আমতা আমতা করে বললাম , ‘কিন্তু আমি তো বিয়েই করেছি মামাতো বোনকে ! আমার তাহলে কি হবে?’
আমার প্রত্যুৎপন্নমতি প্রকৌশলী বন্ধুটি গভীর উদাস কণ্ঠে বলল, ‘কী আর হবে ! মনে হবে তোরা দুই ভাই এক বিছানায় শুয়ে আছিস !’

বাস্তবতা ২ : অনেক আগে শোনা, স্মৃতি থেকে লিখছি।
এক ডাক্তারের ডাক পড়েছে শীতের গভীর রাতে। বহু কষ্টে লেপের ভিতরে থেকে বেরিয়ে রোগীর বাসায়। কিছুক্ষণ রোগীকে দেখে তিনি বললেন, ‘আপনাদের আত্মীয়স্বজন যে যেখানে আছেন খবর পাঠান, আসতে বলেন!’
রোগীসহ সবাই বুঝে গেলেন, আর বেশি সময় নেই ! যথারীতি সবাইকে খোঁজ দেওয়া হল।
সবাই এলে, উৎসুক কেউ একজন জানতে চাইলেন, ‘রোগীর অবস্থা কি খুব খারাপ ! আর কতক্ষণ সময় আছে ?’
ডাক্তার ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বললেন, ‘না, না রোগী একদম সুস্থ, কোন আশংকা নেই!’
‘তবে যে আপনি সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে ডেকে পাঠালেন !’
ডাক্তার হাই তুলতে তুলতে বললেন, ‘এই গভীর রাতে এইরকম একটা আনন্দের সংবাদ আমি একা একা সেলিব্রেট করব, সেটা কী ঠিক হবে ! তাই সবাইকে ডাকা, সবাই মিলে সেলিব্রেট করেন !

ডাক্তার বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলেন।
তো, বাস্তব জগতের ৩/৪ জন মাত্র আমাদের বিবাহবার্ষিকীর কথা মনে রাখে।

অথচ, আমি চলছি এক অদ্ভুতুড়ে অন্তর্জালিক ভার্চুয়াল জগতের ভিতর দিয়ে। যেখানে বাস্তব মানুষগুলোর চেয়ে বেশি সময় কাটছে এঁদের সঙ্গে। আমি সারাদিন ধরে এঁদের নানা ঢংয়ের নানা ধরণের সেলিব্রেশনের ছবিতে লাইক কমেন্ট করি। বিবাহ বার্ষিকী, অন্নপ্রাশন , হাতেখড়ি, প্রথম স্কুলে যাবার দিন, বাচ্চার জিপিএ ফাইভ, প্রথম প্রপোজালের দিন, প্রথম ব্রেকাপের দিন, বাচ্চার প্রতিটি জন্মদিন ও স্কুলের প্রতিটি সাফল্যের সেলিব্রেশন,তাঁদের মামাতো , কাকাতো ফুফাতো, জ্যাঠাতো ভাইবোনের সব সাফল্যের সেলিব্রেশনে আমি অংশগ্রহণ করে থাকি। একই ভাবে, তাঁদের রক্তদানের ছবি, হাসপাতালের বেডে শুয়ে আহা উঁহু গেলামরের সেলফির ছবিতে ; শ্বশুর, চাচা, বাবা, ফুফা, ভাইবোন, কাকা কাকী, মামা মামী জগাই মাধাই সবার মৃত্যু সংবাদে স্যাড ইমো দিই, সমবেদনা জানাই।

তো আমার সেই কাছের ভার্চুয়াল বন্ধুবান্ধবীদের কাছ থেকে আমার জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক বেদনাঘন দিনের ১৯তম বার্ষিকীতে কিছু সমবেদনা তো আশা করতেই পারি। যদিও সব লাইক কমেন্টস ভার্চুয়াল হবে। আমি যেমন কাউকে একগোছা গোলাপ কখনো পাঠাইনি, কী করে আশা করি আমি পাব !
অতঃপর কোন এক গোধূলি বেলায় আমার প্রয়াত আম্মার কথা প্রসঙ্গে আমার সহধর্মিণীকে বলেছিলাম, ‘ জানো, আম্মা আমার জীবনের দুইটা অসাধারণ ভালো কাজ করেছে।
সে জিজ্ঞেস করল কি কি ?
প্রথমটি, আমাকে এই অসাধারণ পৃথিবীতে এনে। তাঁর প্রতি এই কৃতজ্ঞতা আমৃত্যু থাকবে।
দ্বিতীয়টি , তোমাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসাবে পছন্দ করে। তুমি না থাকলে, আমি কোথায় ভেসে যেতাম।
প্রথম কথায় তাঁর কোন রিঅ্যাকশন ছিল না।

দ্বিতীয় কথায় আমার সহধর্মিণী অবিশ্বাসের সরু চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। আমি বুঝে গেলাম , নারীর বিশ্বাস অর্জন কোন পুরুষের পক্ষে একজীবনে সম্ভব না !

প্রকাশকালঃ ১৯শে জানুয়ারি,২০২০

পুনশ্চ: বস্ত্রকথা ( অর্ডার কেন কম )

আমি ছাপোষা চাকরিজীবী। টেক্সটাইল-গার্মেন্টস ট্রেডে আছি দুইযুগ ধরে।

ইদানীং কিছু প্রশ্ন টেবিলে মুখোমুখি বসলেই চলে আসছে। নিজের দুঃখ শেয়ার করতে গিয়ে, অনেকেই এই প্রশ্নগুলো করছেন। নানা প্রশ্ন –ভাই গার্মেন্টসের এ কী অবস্থা ! আপনার মতামত কি , অর্ডার ফ্লো আসবে কবে, আদৌ কি আসবে ? এই সেক্টরের হচ্ছেটা কি ! সরকার কি করছে ? বিজিএমইএ কি করছে? মালিকপক্ষ কি করছে?

এই সেক্টরে বহু রথীমহারথী ছাড়াও শ্রমিক পর্যায়ে সরাসরি জড়িত ৪০ লক্ষ লোক। রপ্তানির ৮১ ভাগ এই গার্মেন্টস দিয়ে আর জিডিপির ২০ ভাগ এখান থেকে। এখন পর্যন্ত আর কোন বিকল্প ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠেনি বা ওঠার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। আমি আদার ব্যাপারী জাহাজের খোঁজ নেওয়া অনুচিত হলেও কিছু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ শেয়ার করতেই পারি। সেটা কারো পছন্দ হবে, কারো হবে না। আমার কাজ আমি করি।
প্রথমত: বাংলাদেশ বিশ্বের গার্মেন্টসের মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ উৎপাদন করে। এর মানে, আমরা মেধাতালিকায় চীনের পরে দ্বিতীয় হলেও সেটা অনেক নাম্বারের ব্যবধানে ! চায়না যদি করে ৩০০ বিলিয়ন ডলার, আমাদের ৩২ বিলিয়ন করতে হিমসিম। এর মানে, বিশ্ববাজারে আমাদের ইমপ্যাক্ট এমন কিছু নয় যে, আমাদের গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেলে পশ্চিমের লোকজন কাপড়চোপড় ছাড়া অর্ধ-নগ্ন হয়ে চলবে! অন্য দেশগুলোর সক্ষমতা দিয়ে তাঁদের দিব্যি চলে যাবে।

আর, আমাদের বাংলাদেশ যে ধরণের বেসিক গার্মেন্টসগুলো করে ; সেগুলো এখন অবলীলায় পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, ভারত, চায়না, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া মায় শ্রীলংকাও করতে পারে। অধুনা আফ্রিকার কিছু দেশও আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামা লিখিয়েছে। বছর দশেকের ভিতরে তাদের প্রোডাক্টের গুণগত মান আমাদের কাছাকাছি চলে যাবে বলে আশংকা করছেন সবাই।

প্রথমতঃ  ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝেছি, আমাদের আভ্যন্তরীণ দুটি ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ক্রেতা সংস্থা তাঁদের সোর্সিং এর ব্যাপারে ব্যাক-আপ নিয়েছিল। প্রথমটি ২০১৮ সালের গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি। অনেক কাহিনীর পরে সেটা যখন ২০১৮ সালের শেষভাগে কার্যকরী হওয়ার কথা ; তার বহু আগে থেকেই আমাদের সেক্টরের সবাই ক্রেতা-সংস্থাকে ক্রমাগত চাপ দিয়েছেন খুচরা মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য। ক্রেতা যে আইটেম ২ ডলারে কিনেছেন ২০১৮ সালে আমরা তাঁদেরকে আওয়াজ দিয়েছি, সেটা বেতন বৃদ্ধির পরে ন্যূনতম ২.৪০ ডলারে কিনতে হবে। আতংকিত ক্রেতা সংস্থা তাঁদের সোর্সিংকে বিভিন্ন দেশে ডিস্ট্রিবিউট করে ব্যাল্যান্স করেছেন। তাঁরা আমাদের উপর ঠিক সেইভাবে ভরসা করতে পারেন নি।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আমাদের জাতীয় নির্বাচন হয়েছে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। এর আগের তথ্য উপাত্ত বলে –প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের পরে মাস ছয়েক বা বছর খানেক ধরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকে। এই আশংকা থেকেও তাঁরা কিছু অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিয়েছেন।
এই দুই ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়াতে দেখা গেল, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে অর্ডারের জন্য হাহাকার।
বিশাল বিশাল গার্মেন্টস ! একেকটা ফ্লোর এতো বড় যে এপাশ থেকে ওপাশ দেখা যায় না ! সেই সব ইন্ডাস্ট্রির ৪০ ভাগ থেকে শুরু করে ৫০ ভাগ পর্যন্ত ক্যাপাসিটি ফাঁকা থাকা শুরু করল। যে গার্মেন্টস ২ ডলারে করেছেন মালিক, সেটা পারলে তিনি দেড় ডলারে করার জন্য প্রস্তুত। পুরো সেক্টরে একটা অরাজকতা শুরু হল।

এর বাইরে প্রথমেই যে কারণ নিয়ে কথা হচ্ছিল যে , আন্তর্জাতিক মার্কেটে আমাদের তেমন কোন ইমপ্যাক্ট নেই প্রথম থেকেই। না আছে কোন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, না আছে কোন ব্র্যান্ডিং।
‘পুকুর কাটা’ শেখার জন্য আমাদের সরকারী কর্মকর্তারা দল বেঁধে বিদেশ যাচ্ছেন, অথচ এই সেক্টরের অ্যাডভারটাইজমেনটের বা ব্রান্ডিং এর জন কোন কার্যকর উদ্যোগ নেই। আমি কয়েকবার আমেরিকার বিখ্যাত সোর্সিং ফেয়ার বা মেলা ( ম্যাজিক লাস ভেগাস)- এ গেছি কোম্পানির পক্ষ থেকে। আমাদের বিভিন্ন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ও ট্রেডিং অফিসের আয়োজকদের সঙ্গে ইপিবি , পাট ও টেক্সটাইল মন্ত্রণালয়, সংসদ সদস্য আরো নানা শ্রেণির লোক গেছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে।

প্রথম মেলায় যাওয়ার আগে। সম্ভবত: ২০১৩ সালে – অংশগ্রহণকারী সবাইকে ডাকা হল, জাতীয় সংসদ ভবনে। মাননীয় সংসদ সদস্য তাঁর নানা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমাদের কোন সমস্যায় তিনি নিজেও আমেরিকাতে থাকবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করলেন।

তো, আমদের আমেরিকা ভ্রমণের শুরু। যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের হুজ্জত পেরিয়ে, গুচ্ছের লটবহর আর গার্মেন্টসের স্যাম্পল নিয়ে আমরা মেলার দুইদিন আগে পৌঁছলাম। জেট ল্যাগ না কাটতেই দেড় দিন ধরে নিজেদের স্টলগুলো সাজালাম সাধ্যমত। একদম প্রথম সারিতেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্টল।

৫ দিনের মেলার প্রথম দিন একজন পূর্বপরিচিত সরকারী কর্মকর্তাকে দেখলাম, বিশাল সেই প্যাভিলিয়নে একটা টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে আছেন। সামনে একটা কাঁচের জারে কিছু চকলেট আর কিছু লিফলেট। হাই , হ্যালো হল। পরেরদিন দেখি তিনি নাই। আমেরিকার স্থানীয় দূতাবাসের একজন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা বসে আছেন। এদিকে মেলা চলছে, আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নানাভাবে নানা ক্রেতাকে আমাদের বাংলাদেশ থেকে পণ্য কেনার জন্য , আমাদের কারখানাগুলো দেখে আসার জন্য অনুপ্রেরণা দিচ্ছি। দুপুরে খাই কি খাই না। অনেক রাতে ক্লান্ত হয়ে হোটেলে ফিরে স্বপ্ন দেখি নতুন ক্রেতার অর্ডারের।

দুইদিন পরে দেখি বাংলাদেশ অ্যাম্বেসির সেই নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাও নাই। ঢুঁ ঢুঁ !
এক চ্যাংড়া বয়সের ছেলে বসে আছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কে তিনি, কেন তিনি। যা উত্তর পেলাম, উনি সেই নিম্নপদস্থ কর্মকর্তার দুঃসম্পর্কের ভাই, আমেরিকা থাকেন, ভাই বলেছে, তাই বসে আছেন ! তো , এই হচ্ছে আমাদের সরকারী সফরের নমুনা।

আগের প্রসঙ্গে আসি। কেন এই অর্ডারের জন্য হাহাকার আমাদের এই সময়ে।

তৃতীয়ত: বিশ্ব মন্দার ধাক্কা অস্বীকার করার কিছু নাই। এটা যে কখন কোন দেশ থেকে শুরু হয়, আর কোথায় যেয়ে শেষ হয়, সেটা আমি অর্থনীতিবিদদের উপরে ছেড়ে দিচ্ছি।
আরেকটা বড় ব্যাপার বিশ্বজুড়ে নীরবে গত দুই দশকে ঘটে গেছে । সেটা হচ্ছে বিনোদনের জগতে ইন্টারনেট, স্মার্ট ফোন ও ভার্চুয়াল সেবা সারা বিশ্বকে গ্রাস করে নিয়েছে। এখন, আমাদের দেশে প্রতি বছর সরকারী হিসাবে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে ৭ থেকে শুরু করে ১৫ শতাংশ হারে। আর মধ্য-স্বত্বভোগী ও অতি মুনাফাখোরদের লোভে বাড়ে আরো ১০ ভাগ বা আরো বেশি। যে পণ্য আপনি ২০১৮ সালে কিনতে পারবেন ১০০ টাকায়, সেটা ২০২০ সালে এসে হয়ে যায় ১৩০ টাকা বা আরো বেশি।
হ্যাঁ, দফায় দফায় সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন সুবিধা বাড়িয়েছে সরকার বাহাদুর। সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে । বেড়েছে, প্রশাসন ও পুলিশের ক্ষমতা। থানা বেড়েছে, রাজনৈতিক চামচা বেড়েছে, স্যারের সংখ্যা বেড়েছে। শুধু বাড়েনি আমাদের আমজনতার বেতন-ভাতা ও নাগরিক সুবিধা।

ও হ্যাঁ বেড়েছে !

আমাদেরও বেড়েছে ! আমাদের ট্যাক্সের পরিমাণ বেড়েছে, আমাদের যেসব নিত্য-পণ্য ছাড়া চলেনা, সেগুলোর রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি বেড়েছে। ঢাকার মতো একটা ইতরের শহরে ট্রাফিক জ্যাম বেড়েছে।

পশ্চিমা দেশে এতোটা জুলুমবাজি নেই। আমি যে ক্রেতাকে ১০ বছর আগে হাজার চারেক ইউরোর বেতন পেতে দেখেছি, সে আজও ঐ বেতনের আশেপাশে। ১০/১৫ বছর আগে, পশ্চিমাদের বিনোদন ছিল খাওয়া দাওয়া, ঘোরাফেরা আর শপিং।
অধুনা , তাঁদের বাজেটে যোগ হয়েছে, আইফোন, স্যামসাং, আইপ্যাড, নেটফ্লিক্স, আমাজন ইত্যাদি। সুতরাং যে ক্রেতা আগে বছরে ২০টি পোশাক কিনত। সে বাজেট কমিয়ে কিনছে ১০/১২টা বা আরো কম। সে এখন চাইছে, কম দামে টেকসই পোশাক, ইদানীং যার নাম হয়েছে সাসটেইনেবল প্রোডাক্ট, গ্রীন প্রোডাক্ট ইত্যাদি । এই যে বিশ্বব্যাপী পোশাকের চাহিদা কিছুটা হলেও কমেছে, সেটার চাপ পড়েছে বাংলাদেশের মতো দেশের উপরে — যারা খুব লো কস্টে বেসিক গার্মেন্টস বানাতে পারে।

আফসোস ! বিশ্ববাজারে টিকে থাকার জন্য , নিজেদেরকে কম্পিটিটিভ করার জন্য , সম্মিলিতভাবে আমাদের আরএমজি ( রেডি মেইড গার্মেন্টস) সেক্টরের সঙ্গে জড়িত, মালিক, শ্রমিক, এজেন্ট, বিজিএমইএ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় গত তিন দশকে তেমন কিছুই করেনি। চট্টগ্রাম পোর্ট, হাইওয়ে এইসবের কথা বাদই দিলাম ।

এদিকে মালিকদের এক শ্রেণি বুঝে না বুঝে তাঁদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছেন। সেই বাড়তি ক্যাপাসিটি এখন তাঁদের গলার কাঁটা হয়ে বিঁধছে। আরেক শ্রেণি ব্যাংকের টাকা হাপিশ করে কানাডা আমেরিকায় কেটে পড়েছে। ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ১ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১ লক্ষ ২ হাজার কোটি ঋণ অনাদায়ী। আর অনাদায়ী ঋণের মধ্যে শুধু টেক্সটাইল-গার্মেন্টস সেক্টরে অনাদায়ী আছে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বোঝেন অবস্থা !

সম্ভবত: ৮৪/৮৫ সালে শোনা। জনৈক ঈশ্বর অবিশ্বাসী নাস্তিক পশ্চিমা ভদ্রলোক ঢাকায় এসেছেন । মাস খানেক থেকে তিনি নাকি বিশ্বাসী হয়ে গেলেন। ‘কেন ভাই? কেন ভাই ?’ তো তিনি সংবাদ সম্মেলন করে বললেন, ঢাকায় একমাস কাটানোর সময় তিনি বিভ্রান্তিতে ছিলেন, কীভাবে এই ঢাকার শহর চলছে, মানে কে চালাচ্ছে ! কোন নিয়মনীতি নাই। না আছে সরকার , না আছে অন্য কিছু ! তাই তিনি অবশেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে , অবশ্যই ঈশ্বর আছেন। একমাত্র ঈশ্বরই এই দেশকে চালাচ্ছেন। সুতরাং তিনি নাস্তিকতা ত্যাগ করে ধর্মের পথে চলে এসেছিলেন। তো ৮৫ সাল থেকে ২০২০ , ৩৫ বছরে তেমন কিছুর পরিবর্তন হয় নাই। গতকাল, অফিসের হ্যাপা সামলে, সন্ধ্যা ছয়টায় উত্তরা থেকে মিরপুরের বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। বিশ্বরোডে এসে দেড় ঘণ্টা গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে বসে থেকে, সোয়া আটটায় বাসায় ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত হয়ে ঢুকলাম।

এমন একটা দেশে থাকি, যেখানে বেশিরভাগ কাজ হয় আল্লাহর ওয়াস্তে।

আপনার যদি পশ্চিমাদেশে ঈশ্বর অবিশ্বাসী কোন বন্ধুবান্ধব থাকে , তাঁকে ঢাকা শহরে মাস-খানেক থাকতে বলেন। সর্বময় ঈশ্বরের উপরে তাঁর ভরসা না এসে উপায় থাকবে না।

প্রকাশকালঃ ১৫ই জানুয়ারি,২০২০

কেন এই অর্থহীন লেখালেখির ব্যর্থ চেষ্টা !

সরকারের কোন হিসাবেই আমার বা আমাদের আস্থা নেই ! শোনা যায় বাংলাদেশের ৭০ ভাগের কাছাকাছি লোক নাকি স্বাক্ষর। এর মধ্যে খুব সামান্য একটা জনগোষ্ঠী টেক্সট বুকের বাইরে কিছু পড়ে অথবা পড়ে না। আবার তার চেয়েও সামান্য একটা অংশ ফিকশন বা নন ফিকশন কিছু পড়ে। আর ক্ষুদ্রতম একটা অংশ পড়ার পাশাপাশি লেখালেখি করে বা চেষ্টা করে।

এখন ধরেন, অন্যদের কথাবার্তা শুনে শুনে –আমি নিজেকে তাদের একজন বলে গণ্য করে ফেললাম ! এবং এটা সেটা পড়াশোনা করে, পুরনো ধ্যানধারণার উপর ভিত্তি করে, রূপান্তর করে নতুনের মতো কিছু একটা দাঁড় করলাম।
ধরেন সেই লেখার যৎসামান্য ভ্যালু আছে অথবা নাই। না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

গুগল বলছে, এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে ১৩ কোটি বই লিখিত হয়েছে। ১০ হাজার বছরের পুরনো বই রক্ষিত আছে মাত্র ৩টি !
৫ হাজার বছরের পুরনো বই আছে, ৫১ টি, হাজার বছরের পুরনো বই ২১৩টি। এখন এই ১৩ কোটি বইয়ের জীবনকাল কয়েকশ বছর পরে কী হতে পারে, আন্দাজ করা যায়।
১০ বছর আগেও প্রতিবছর বই প্রকাশিত হতো সারাবছরে মাত্র ২ লক্ষ !
এখন প্রতিবছর বই প্রকাশিত হচ্ছে ২০ লক্ষ ! জ্ঞানের বিশাল প্রবাহে আমাদের সমকালীন পৃথিবী।

মূল কথায় আসি, আমার সন্তান সে কালো হোক,বোঁচা হোক আমার সন্তান। আমার যেহেতু সৃষ্টি , আমার কাছে তো তা মূল্যবান মনে হতেই পারে। মহাকালের প্রেক্ষিতে যেহেতু আমি, আপনি ও আমাদের সন্তানেরা কেউই থাকবে না; তার মূল্য ও মূল্য-হীনতার প্রশ্ন অবান্তর।
পনেরো আনা প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “ ছাগলের যতটুকু শিং আছে, তাহাতে তাহার কাজ চলিয়া যায়, কিন্তু হরিণের শিঙের পনেরো আনা অনাবশ্যকতা দেখিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়া থাকি। ময়ূরের লেজ যে কেবল রংচঙে জিতিয়াছে, তাহা নহে— তাহার বাহুল্যগৌরবে শালিক-খঞ্জন-ফিঙার পুচ্ছ লজ্জায় অহরহ অস্থির।……… জীবন বৃথা গেল। যাইতে দাও। কারণ, যাওয়া চাই। যাওয়াটাই একটা সার্থকতা। নদী চলিতেছে— তাহার সকল জলই আমাদের স্নানে এবং পানে এবং আমন-ধানের খেতে ব্যবহার হইয়া যায় না। তাহার অধিকাংশ জলই কেবল প্রবাহ রাখিতেছে। আর-কোনো কাজ না করিয়া কেবল প্রবাহরক্ষা করিবার একটা বৃহৎ সার্থকতা আছে। তাহার যে-জল আমরা খাল কাটিয়া পুকুরে আনি, তাহাতে স্নান করা চলে, কিন্তু তাহা পান করে না; তাহার যে-জল ঘটে করিয়া আনিয়া আমরা জালায় ভরিয়া রাখি, তাহা পান করা চলে, কিন্তু তাহার উপরে আলোছায়ার উৎসব হয় না।………
আমরা যাহাকে ব্যর্থ বলি, প্রকৃতির অধিকাংশই তাই। সূর্যকিরণের বেশির ভাগ শূন্যে বিকীর্ণ হয়, গাছের মুকুল অতি অল্পই ফল পর্যন্ত টিঁকে। কিন্তু সে যাঁহার ধন তিনিই বুঝিবেন। সে-ব্যয় অপব্যয় কি না, বিশ্বকর্মার খাতা না দেখিলে তাহার বিচার করিতে পারি না। আমরাও তেমনি অধিকাংশই পরস্পরকে সঙ্গদান ও গতিদান ছাড়া আর-কোনো কাজে লাগি না; সেজন্য নিজেকে ও অন্যকে কোনো দোষ না দিয়া, ছটফট না করিয়া, প্রফুল্ল হাস্যে ও প্রসন্ন গানে সহজেই অখ্যাত অবসানের মধ্যে যদি শান্তিলাভ করি, তাহা হইলেই সেই উদ্দেশ্যহীনতার মধ্যেই যথার্থভাবে জীবনের উদ্দেশ্য সাধন করিতে পারি।……
সকল ঘাস ধান হয় না। পৃথিবীতে ঘাসই প্রায় সমস্ত, ধান অল্পই। কিন্তু ঘাস যেন আপনার স্বাভাবিক নিষ্ফলতা লইয়া বিলাপ না করে— সে যেন স্মরণ করে যে, পৃথিবীর শুষ্ক ধূলিকে সে শ্যামলতার দ্বারা আচ্ছন্ন করিতেছে, রৌদ্রতাপকে সে চিরপ্রসন্ন স্নিগ্ধতার দ্বারা কোমল করিয়া লইতেছে। বোধ করি ঘাসজাতির মধ্যে কুশতৃণ গায়ের জোরে ধান্য হইবার চেষ্টা করিয়াছিল— বোধ করি সামান্য ঘাস হইয়া না থাকিবার জন্য, পরের প্রতি একান্ত মনোনিবেশ করিয়া জীবনকে সার্থক করিবার জন্য তাহার মধ্যে অনেক উত্তেজনা জন্মিয়াছিল— তবু সে ধান্য হইল না। কিন্তু সর্বদা পরের প্রতি তাহার তীক্ষ্ম লক্ষ নিবিষ্ট করিবার একাগ্র চেষ্টা কিরূপ, তাহা পরই বুঝিতেছে। মোটের উপর এ-কথা বলা যাইতে পারে যে, এরূপ উগ্র পরপরায়ণতা বিধাতার অভিপ্রেত নহে। ইহা অপেক্ষা সাধারণ তৃণের খ্যাতিহীন, স্নিগ্ধসুন্দর, বিনম্র-কোমল নিষ্ফলতা ভালো।”

শতভাগ অথবা প্রবল সম্ভাবনা আছে, আমার কাছে যে চিন্তাটি নতুন মনে হচ্ছে ; গভীর আবেগে আমি সারা দিনরাত ব্যয় করছি যে চিন্তার পিছনে ; সেটা ঐ ১৩ কোটি বইয়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই অসংখ্যবার লিখিত হয়েছে।সুতরাং আমার নব আবিষ্কৃত আবেগ ও ধ্যানধারণা বহু আগেই বাতিলের খাতায় চলে গেছে। যারা সত্যিকার সৃষ্টিশীল যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ষোল আনার মধ্যে এক আনা, প্রয়োজনীয় —তাঁদের কথা বাদ দিয়ে , যারা বাকী পনেরো আনা, এই আমার মতো—তাদের কেউ, যদি সবার মিথ্যা প্ররোচনায় বা অনুপ্রেরণায় কষ্টেসৃষ্টে একটা বই প্রকাশ করেও ফেলে, সেটা আসলে অর্থহীন। বছর দশেক পরে, আমার কন্যাদের স্তূপীকৃত নানা বইয়ের ফাঁকে সেই বইয়ে ধুলো পড়বে। জেলা শহরের অখ্যাত কোন লাইব্রেরিতে শেষের সেলফের উপরের সারিতে মাকড়সার জালের সঙ্গে তার সহাবস্থান হবে। তারপর, দুই দশক পরে এই প্রয়োজনীয় পৃথিবীর কাছে সেটা আবর্জনার বাইরে আর কিছু না !

তাহলে আমি কি লেখালেখি করব না ?

লেখালেখির একটা উদ্দেশ্য তো থাকেই নতুন করে কিছু বোঝার চেষ্টা করা। অথবা অন্যদের চিন্তাগুলো নাড়াচাড়া করে নিজের সময়ের প্রেক্ষিতে নিজের মতো করে কিছু বলা। সমকালে সেটার দাম থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে।

তাহলে আমি কেন লিখব ?

নিজের জীবনের এই সামান্য সময়, ১৩ কোটি বইয়ের মাঝে, আরেকটি বই বাড়িয়ে কেন আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকু নষ্ট করব ? আমার লেখালেখি যদি আমার প্রজন্মকে নতুন কিছু চিন্তা করাতে নাই পারে, বৃথা কেন কষ্ট করব আমি ?
নাকি শুধুমাত্র নিজের আনন্দের জন্য লিখব, প্রকাশিত হওয়ার আনন্দে লিখব?

এটাতো ঠিক যে, বংশগতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জীন আমরা বয়ে নিয়ে চলছি গত ৪৪ কোটি বছর ধরে ! প্রকৃতি চেয়েছে প্রাণের ধারাবাহিকতা রক্ষা হোক। হোক তার সৃষ্টির প্রায় পুরোটাই অর্থহীন, মূল্যহীন। কিন্তু এই প্রবণতা না থাকলে তো সৃষ্টির উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্য রক্ষিত হবে না ! আমার ছোটমামা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং এর সিনিয়র প্রফেসর, বাংলাদেশের জেনেটিক্স জগতের ওস্তাদ মানুষ। আমাকে হাসতে হাসতে একদিন বলছিলেন, ‘বুঝলা ভাগ্নে, প্রাণী যাতে বংশগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, সেজন্য প্রকৃতি তাদের যৌনমিলনে আনন্দ দিয়ে দিয়েছে। এক কাজে দুই কাজ হয় ! প্রকৃতির স্বার্থও রক্ষিত হয় ; আবার প্রাণীরাও আনন্দ চিত্তে সেটা করে !’
লেখালেখির ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কি তাই না ? হয়তো কিছু সফল সৃষ্টির অপেক্ষায় , এক আনা প্রয়োজনীয় লেখার জন্য বাকী পনেরো আনাদের নিয়ে প্রকৃতির এই বিশাল আয়োজন। সেই অর্থে অসংখ্য অপ্রয়োজনীয় লেখালেখির দরকার। তা না হলে, কারো কারো শ্রেষ্ঠ লেখাটা রচিত হবে না ; আর সেটা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছুতেও পারবেন না।

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, দুইটা উদ্দেশ্যেই লেখালেখি করা দরকার। প্রকৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আর নিজের আনন্দের জন্য।

কর্পোরেট অব‌জার্ভেশন ( ঢাকা ও মফঃস্বলের তরুণ)

বিষয়টি  একটু স্পর্শকাতর মনে হতে পারে। যেহেতু এটি একটি বাস্তবতা এবং আমাদেরকে প্রাত্যহিক এই পরিস্থিতির সম্মুখীন সবাইকে কমবেশি হতে হয় ; তাই কয়েকটা কথা বা আমার নিজস্ব অব্‌জার্ভেশন সবার সঙ্গে শেয়ার করা মনে হয় অনুচিত হবে না।

ঢাকাকে নগর, মহানগর বা মেগাসটি বলা হলেও, এর সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা এবং অত্যল্প মফঃস্বল শহর থেকে আসা জনগোষ্ঠী। যেমন আমার আব্বা ৬০-এর দশকেই জীবিকার টানে গ্রাম থেকে ঢাকাতে চলে আসেন। কিছুদিন ডেমরার মাতুয়াইলের সরকারী স্কুলের শিক্ষকতা, তারপর আবহাওয়া অফিস, এদিক সেদিক করে ৬৫/৬৬ এর দিকে চলে যান তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচীতে। আম্মার সঙ্গে বিয়ে ৬৮-তে। বিয়ের পরে আম্মা আব্বা করাচীতে বছর খানেক থাকেন। ভাইয়ার জন্ম আমাদের জেলায়। আম্মার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর ঘাঁটি গাড়েন পুরনো ঢাকার ওয়ারীতে। আমার জন্ম মাতুয়াইলে, ডেমরাতে। সেই হিসাবে আমি হচ্ছি ঢাকা শহরের গ্রাম থেকে আগতদের দ্বিতীয় প্রজন্ম।

উঠতি নিম্নমধ্যবিত্ত হিসাবে আব্বাকে কেন্দ্র করে আমাদের পুরো পরিবারের বেড়ে ওঠা। অসচ্ছলতা ও আর্থিক অনটনের পাশাপাশি আব্বা তাঁর অন্যান্য ভাইবোনদেরকেও ধীরে ধীরে ঢাকা-মুখী করে তোলেন।

দ্বিতীয় প্রজন্ম হিসাবে আমার স্কুলের সময়টিতে ঢাকার স্থায়ী, অস্থায়ী বন্ধুদের সঙ্গে কয়েকজন মফঃস্বল আগত বন্ধু ছিল। কেউ হয়তো সদ্যই বড়ভাইয়ের বাড়িতে থেকে পড়তে এসেছে। সিংহভাগ সহপাঠী ছিল ঢাকার স্থায়ী অথবা অস্থায়ী বাসিন্দা। সেই অর্থে মফঃস্বলের ছেলেদের সঙ্গে আমাদের তেমন কোন মিথষ্ক্রিয়া ছিল না।স্কুল পেরিয়ে ঢাকা কলেজে পড়তে গিয়ে জেলা শহরের দুর্দান্ত মেধাবী ছেলেদের সঙ্গে পরিচয়। সেখানেও এতো কম সময় থাকতে হয়েছে, ঠিকমতো পরিচয়ের আগেই আমাদের সবাই এখানে ওখানে ছিটকে পড়েছি। টেক্সটাইলে ভর্তি হওয়ার আগে কিছুদিন ছিলাম রসায়ন বিভাগে। প্রথম ক্লাসে শিক্ষিকার জিজ্ঞাস্য ছিল, কে কে কোথা থেকে এসেছে এবং তাঁদের জীবনের লক্ষ্য কি। মফঃস্বলের ছেলেরা বেশ সপ্রতিভ-ভাবে উত্তর দিলেও আমরা ঢাকার গুটি কয়েক আমতা আমতা করলাম। মূলত: আমাদের সবার লক্ষ্য তখনো আবার বুয়েটে পরীক্ষা দেয়া। সে কথাতো আর ম্যাডামকে বলা যায় না ! রসায়ন বিভাগ ডঃ হুমায়ূন আহমেদের মতো ছাত্র পেলেও আমাদের সময়ের পদার্থ বা রসায়ন নিতান্ত ঠেকায় না পড়লে কারো আকাঙ্ক্ষিত সাবজেক্ট হওয়ার কথাও না।

কেমিস্ট্রিতে পড়ার খুব সামান্য সময়ে বেশ কিছু মফঃস্বলের মেধাবী ছেলেদের সঙ্গে মিশে আমি কীভাবে যেন বুঝে ফেললাম এঁরা দারুণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তবে তাঁদের সঙ্গে আমার মূল মিথষ্ক্রিয়া ও বন্ধুত্বের সুযোগ ঘটল টেক্সটাইলের শহীদ আজিজ হলে ; এঁদের সংগে দীর্ঘ ৫/৬ বছর কাছাকাছি বিছানায় ও আড্ডা মেরে সময় কাটিয়ে। ক্লাসের শুরুর দিকে এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হল সে উপজেলার দুঁদে ছাত্র। কথায় কথায় তাঁর জীবনের লক্ষ্য শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাঁর ইচ্ছে টেক্সটাইলে পড়াশোনা করে সে কিছুদিন চাকরি বাকরি করবে, তারপরে নিজেই ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হবে।পড়াশোনার পাশাপাশি টেক্সটাইলের ঘরোয়া রাজনীতি করবে সে এবং পরবর্তীতে সে জাতীয় রাজনীতিতে যোগদান করে দেশের মূল শাসন ব্যবস্থায় অংশ নেবে।

আর আমাদের ঢাকার কয়েকজন তখনো এই হুতাশন নিয়ে ব্যস্ত, কই আসলাম, কেন আসলাম , কোথায় যাচ্ছি—এই সব নিয়ে। পরবর্তীতে আমার ঐ বন্ধুটি ঠিকই আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে বৃহত্তর প্রকৌশলীদের সংগঠনে জড়িত হয়ে পড়েছে। মাত্র কিছুদিন চাকরি করেই ব্যবসা শুরু করেছে সে এবং আমার ধারণা সে তাঁর ঠিক লক্ষ্যেই আছে। দুই যুগ আগে থেকেই সে জানত ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল তাঁকে কি কি অর্জন করতে হবে। আর আমি এখনো এই চল্লিশোর্ধ বয়সে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভুগে চলেছি !
মূল কথায় আসি। কর্পোরেট জগতে, ঢাকার বাসিন্দা ও মফঃস্বলের আগতদের মানসিকতা ও কাজের ধরণে একটা বড় পার্থক্য চোখে পড়েছে আমার। যেহেতু, আমি ঢাকার দ্বিতীয় প্রজন্ম , আমার কথায় পক্ষপাতিত্ব থেকে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকছেই। তবু যতোখানি পারি নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার চেষ্টা করি।

মফঃস্বলের যে মেধাবী তরুণটি আরো হাজার-খানেক ছেলেকে পিছে ফেলে ঢাকা শহরের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসছে, সে কিন্তু তাঁর ছোট্ট পরিমণ্ডলে পরিবার ও পরিপার্শ্বের কেন্দ্রবিন্দু। গ্রামের অমুকের ছেলে তমুক কি করেছে, বা জেলা শহরের আরেক মেধাবী কতখানি সাফল্য অর্জন করেছে, সেটা তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। নিজের ভিতরে একটা উচ্চাকাঙ্ক্ষার আগুন দপদপ করতে থাকে। আমাদের ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না, জেলা শহরের বা গ্রামের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেটি ছিল তাঁর স্কুলের ব্যাঘ্র-শাবক। সুতরাং তাঁর হুংকার হয়তো নাগরিক রাস্তায় ম্রিয়মাণ হয়ে আসে। কিন্তু নিজের আসল পরিচয় সে কোনভাবেই ভুলে যেতে পারে না।

নানাবিধ কারণে মফঃস্বলের তরুণেরা দুর্দান্ত কর্মঠ হয়। ঢাকার তরুণদের হয়তো থাকার একটা সংস্থান আছে, তাঁকে কিন্তু মেসে বা হোস্টেলে সংগ্রাম করে থাকতে হচ্ছে।

ঢাকার তরুণটির হয়তো কেউ না কেউ বড়ভাই, মামা-চাচা আছে কোন খোঁজ খবর দেওয়ার ও নেওয়ার। ঐ তরুণটিকে কিন্তু ‘এসো নিজে করি’ স্টাইলে সব নিজেকেই করতে হচ্ছে। গ্রামের বা মফঃস্বলের বাবা-মার তাঁকে দিক নির্দেশনা দেওয়ার অবস্থা নেই।
মূলত: ঢাকার তরুণদের মাঝে কিছুটা গা ছাড়া উন্নাসিকতা থাকে, ‘ দেখি কী হয়’ টাইপের। তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ফোকাস থাকে চাকরি বাকরি করে মোটামুটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছানো। অমুকের মতো হতে হবে, তমুকের মতো উপরে উঠতে হবে, খুব দ্রুত একটা থাকার সংস্থান ফ্ল্যাট করতেই হবে, গাড়ী না থাকলে চলছেই না—তেমনটি ঢাকার তরুণদের কিছুটা কম থাকে।

আমার সংক্ষিপ্ত চাকরির সময়কালে, ঢাকার সংখ্যা গরিষ্ঠ ছেলেদের, আমি আবারো বলছি সংখ্যাগরিষ্ঠ ছেলেদের( ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে), ভিতরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অ্যাগ্রেসিভনেস মফঃস্বলের তরুণদের তুলনায় কম দেখেছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্মনিষ্ঠতায় , বসের আস্থা অর্জনে, কর্পোরেট মইয়ের ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মফঃস্বলের তরুণদের ডেডিকেশন থাকে প্রশ্নাতীত। এই সব ক্ষেত্রে মালিক-পক্ষ ও সিনিয়র ম্যানেজাররাও তাঁদেরকে বাড়তি সুবিধা দিয়ে থাকেন, এগিয়ে যেতে দেন। বলা-বাহুল্য অনেকাংশে সবাইকে পিছে ফেলে উপরে ওঠার এই প্রবণতা ভুক্তভোগী অনেকের শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যে কোন বিজয়ের জয়-রথে রাস্তার পাশের ছোটখাটো লতাগুল্মের পিষ্ট হওয়ার শঙ্কা সব ক্ষেত্রেই থাকে।

আমার কাছে মনে হয়েছে ,একইভাবে ঢাকার কোন একজন তরুণ যখন প্রবাসী হয়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে বসতি গড়ে– তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ওই এলাকার স্থানীয় যে কোন তরুণদের চেয়ে বেশীই হবে। তাই আমি পুরো প্রক্রিয়াটিকে স্বাভাবিক ও আশাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই দেখছি।

প্রকাশকালঃ জানুয়ারি ২০১৬