উপলব্ধি: ১২

ধর্ম ও নৈতিকতার পারস্পরিক সম্পর্ক হাজার বছর আগে ছিল। আধুনিক পুঁজিবাদের এই যুগে ধর্ম ও নৈতিকতার পারস্পরিক কোন সম্পর্ক নেই। ধার্মিক লোক মানেই সৎ, নৈতিক, বিবেকবান, উপকারি, মহৎ লোক নয়। সংশয়ী, অজ্ঞেয়বাদী, প্রচলিত ধর্মে অবিশ্বাসী লোকেরাও অসম্ভব নৈতিক ও বিবেকবান হতে পারেন।

আমার এই উপলব্ধি পদে পদে দেখে ও ঠেকে শেখা। স্বল্প-জীবনে উপলব্ধি, নৈতিক লোক ধার্মিক হলেও হতে পারেন ; অন্য ধর্মের হতে পারেন অথবা ধর্মহীনও হতে পারে। অনেকটা ইশকুলের ক্লাস সেভেন-এইটের বিজ্ঞানশিক্ষার মতো, ‘সকল ক্ষারই ক্ষারক কিন্তু সকল ক্ষারক ক্ষার নহে।

মিরপুরে আমার শৈশবের বেড়ে ওঠা বিশাল একটা বাজারের পাশে।
বাড়ির পাশেই বৃহদায়তন মসজিদ, মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসা। বাজারের সব ব্যবসায়ীরা ওই মসজিদে আসতেন। ভেজাল থেকে শুরু করে, কালোবাজারি, মজুতদারি, সিন্ডিকেট ও বহুবিধ দুই নাম্বারি ধান্ধার কথা ছোটবেলা থেকেই জানতাম। জীবনের নানা চড়াই উৎরাইতে আমি অনৈতিক লোকেদের ধর্মের লেবাসে ও মুখোশে দেবদূতের চেহারায় ঘুরতে দেখেছি। মুশকিল হচ্ছে, প্রায় প্রতিটি ধর্মেই পার্থিব যে কোন অন্যায় করে প্রায়শ্চিত্ত ও মুচলেকা দিয়ে সর্বময় পরম-করুণাময় সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা পাওয়ার ব্যাপারটা আছে। এজন্যেই বেশিরভাগ ধার্মিকরা বছরের পর বছর অর্থলিপ্সু দুর্নীতি চালিয়ে যান । যেমন আমাদের ধর্মে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, ভণ্ডামি, দুর্নীতি, নষ্টামি যাই করেন না কেন, হজ্ব করে দুধে ধোয়া শিশুর মতো অপাপবিদ্ধ হওয়া যায়। এই অদ্ভুত চক্র দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ধার্মিক ব্যক্তিকে পুরোপুরি নৈতিক হতে দেয় না। একেবারে শেষ বয়সে এসে সে নানা অক্ষমতায় নিতান্ত বাধ্য হয়ে ক্ষান্তি দেয় দুর্নীতির।

বন্ধু-মহলে যখনই ধর্ম ও নৈতিকতা নিয়ে কথা আলোচনা তর্ক, কুতর্ক চলে ; তখনই বাঙালি মুসলমানের শিখা আন্দোলনের কথা মনে আসে। যা কীনা ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ হিসাবে পরিচিত। শিখা আন্দোলনের মটো ছিল: “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট – মুক্তি সেখানে অসম্ভব।”

শিখা আন্দোলনের অন্যতম মোতাহের হোসেন চৌধুরী এবং তাঁর সুবিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সংস্কৃতি-কথা’ খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। সীমিত-সংখ্যক পাঠক-পাঠিকাদের জন্যে তাঁর প্রবন্ধের চুম্বকাংশ আবারো:

সংস্কৃতি-কথা। মোতাহের হোসেন চৌধুরী।।

ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম। কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা—সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে অবহিতি। সাধারণ লোকেরা ধর্মের মারফতেই তা পেয়ে থাকে। তাই তাদের ধর্ম থেকে বঞ্চিত করা আর কালচার থেকে বঞ্চিত করা এক কথা।

ধর্ম মানে জীবনের নিয়ন্ত্রণ। মার্জিত আলোকপ্রাপ্তরা কালচারের মারফতেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করে। বাইরের আদেশে নয়, ভেতরের সূক্ষ্ণ চেতনাই তাদের চালক, তাই তাদের জন্য ধর্মের ততটা দরকার হয় না। বরং তাদের ওপর ধর্ম তথা বাইরের নীতি চাপাতে গেলে ক্ষতি হয়। কেননা তাতে তাদের সূক্ষ্ণ চেতনাটি নষ্ট হয়ে যায়, আর সূক্ষ্ণ চেতনার অপর নাম আত্মা।

সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত কালচারের উদ্দেশ্য নয়—উপায়। উদ্দেশ্য, নিজের ভেতরে একটা ঈশ্বর বা আল্লাহ সৃষ্টি করা। যে তা করতে পেরেছে সে-ই কালচার্ড অভিধা পেতে পারে, অপরে নয়। বাইরের ধর্মকে যারা গ্রহণ করে তারা আল্লাহ্কে জীবনপ্রেরণা রূপে পায় না, ঠোঁটের বুলি রূপে পায়। তাই শ’র উক্তি: Beware of the man whose God is in the skies—আল্লাহ্ যার আকাশে তার সম্বন্ধে সাবধান। কেননা, তার দ্বারা যে-কোন অন্যায় ও নিষ্ঠুর কাজ হতে পারে। আল্লাহ্কে সে স্মরণ করে ইহলোকে মজাসে জীবন-যাপন করার জন্য আর পরকালে দোজখের আজাব থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশ্যে, অথবা স্বর্গে একটি প্রথমশ্রেণির সিট রিজার্ভ করার আগ্রহে—অন্য কোনও মহৎ উদ্দেশ্যে নয়। ইহকালে ও পরকালে সর্বত্রই একটা ইতর লোভ।

অন্যদিকে কালচার্ড লোকেরা সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে অন্যায় আর নিষ্ঠুরতাকে , অন্যায় নিষ্ঠুরতাকে তো বটেই, ন্যায় নিষ্ঠুরতাকেও। মানুষকে ন্যায়সঙ্গতভাবে শাস্তি দিতেও তাদের বুক কাঁপে। নিষ্ঠুর হয়ো না—এই তাদের ভেতরে দেবতার হুকুম আর সে হুকুম তারা তামিল না করে পারে না, কেননা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই একটা ব্যক্তিগত জীবন-দর্শন বা স্বধর্ম সৃষ্টি করা কালচারের উদ্দেশ্য। যেখানে তা নেই সেখানে আর যাই হোক কালচার নেই। কালচার একটা ব্যক্তিগত ধর্ম। ব্যক্তির ভেতরের ‘আমি’কে সুন্দর করে তোলাই তার কাজ। …………..

অনেকে সংস্কারমুক্তিকেই সংস্কৃতি মনে করে, উভয়ের মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখতে পায় না। কিন্তু তা সত্য নয়। সংস্কারমুক্তি সংস্কৃতির একটি শর্ত মাত্র। তা-ও অনিবার্য শর্ত নয়। অনিবার্য শর্ত হচ্ছে মূল্যবোধ। সংস্কারমুক্তি ছাড়াও সংস্কৃতি হতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ ছাড়া সংস্কৃতি অসম্ভব। মূল্যবোধহীন সংস্কারমুক্তির চেয়ে কুসংস্কারও ভালো। শিশ্নোদর-পরায়ণতার মতো মন্দ সংস্কার আর কী হতে পারে? অর্থগৃধ্নতাও তাই—কিন্তু এসব মূল্যবোধহীন সংস্কারমুক্তিরই ফল। তাই শুধু সংস্কারমুক্তির উপর আস্থা স্থাপন করে থাকা যায় না। আরও কিছু দরকার। কামের চেয়ে প্রেম বড়, ভোগের চেয়ে উপভোগ—এ-সংস্কার না জন্মালে সংস্কৃতি হয় না। সূক্ষ্ণ জীবনের প্রতি টান সংস্কৃতির জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু মূল্যবোধহীন সংস্কারমুক্তির টান সে দিকে নয়, তা স্থূল জীবনেরই ভক্ত।

সংক্ষেপে সুন্দর করে, কবিতার মতো করে বলতে গেলে সংস্কৃতি মানে সুন্দর ভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা ; প্রকৃতি-সংসার ও মানব-সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির শিকড় চালিয়ে গিয়ে বিচিত্র রস টেনে নিয়ে বাঁচা ; কাব্যপাঠের মারফতে, ফুলের ফোটায়, নদীর ধাওয়ায়, চাঁদের চাওয়ায় বাঁচা ; আকাশের নীলিমায়, তৃণগুল্মের শ্যামলিমায় বাঁচা, বিরহীর নয়নজলে , মহতের জীবনদানে বাঁচা ; গল্পকাহিনীর মারফতে, নরনারীর বিচিত্র সুখ-দুঃখে বাঁচা ; ভ্রমণকাহিনীর মারফতে, বিচিত্র দেশ ও বিচিত্র জাতির অন্তরঙ্গ সঙ্গী হয়ে বাঁচা ; ইতিহাসের মারফতে মানব-সভ্যতার ক্রমবিকাশে বাঁচা ; জীবনকাহিনীর মারফতে দুঃখীজনের দুঃখ নিবারণের অঙ্গীকার বাঁচা । বাঁচা, বাঁচা, বাঁচা। প্রচুরভাবে , গভীরভাবে বাঁচা। বিশ্বের বুকে বুক মিলিয়ে বাঁচা।

(সংস্কৃতি-কথা প্রবন্ধের খণ্ডাংশ)

উপলব্ধি: ১১

শর্টকাট ক্যান কাট ইউ শর্ট (Shortcut can cut you short)।
সবকিছুতে শর্টকাট ভালো নয়। কেননা, শর্টকাট পদ্ধতি আকস্মিক কর্তন করে আপনাকে শর্টও করে দিতে পারে। আমার যে শান্তিপ্রিয় টাইপের চরিত্র ; বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, শৈশব থেকে এটা এমনিতেই আমি মেনে চলতাম। অন্যকে কনুই দিয়ে ঠেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রাসী মনোভাব আমার কখনই ছিল না। কোনকিছু পেতে হলে লাইনে দাঁড়াতাম, ভাগ্যে থাকলে আমার টার্ন আসতে আসতে হয়তো পেতাম, হয়তো পেতাম না। ব্যাপারটা পরিবার ও অন্তর্মুখিতা থেকেই এসেছে। তারুণ্যে পৌঁছে অবশ্য কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নিজের অধিকার চাইবার অভ্যাস হয়েছে।

ইতিহাসে আছে, আলেকজান্ডার দি গ্রেটের প্রয়াণের পরে টলেমি ( Ptolemy ) মিশরের শাসনকর্তা হন। সেই সময়ে আরেক বিখ্যাত গণিতবিদ ইউক্লিড(Euclid)-এর গবেষণা নিয়ে তাঁর ব্যাপক আগ্রহ ছিল ; কিন্তু তিনি সহজে সেটা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সম্রাট হয়েও ইউক্লিড-কে তিনি অনুরোধ করলেন সহজ কোন উপায়ে তাঁর গণিতকে আয়ত্ত করা যায় কীনা। ইউক্লিড উত্তর দিয়েছিলেন, জ্যামিতি শেখার জন্যে কোন রাজকীয় পথ নেই। (“Sire, there is no royal road to geometry.” )

সেই আদিম যুগ থেকেই অনিশ্চয়তা মানুষকে লোভী করেছে। ব্যক্তি মানুষের আদিম জৈবিক, শারীরবৃত্তীয় লোভের সঙ্গে ভোগবাদ আরও নানা উপকরণকে অপরিহার্য করে তাঁকে অধিকতর লোভী করে তুলেছে। তোমার মতো, অন্য আরেকজনের আছে, তোমার নেই কেন? আরেকজনের হচ্ছে, তোমার কেন হবে না? অন্যে পারলে তুমি কেন পারবে না ? কেন? কেন? কেন?

সত্যি কথা বলতে কী, এই সামগ্রিক পুঁজিবাদী লোভই কিন্তু সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে। দিন-কয়েক আগে, বড়কন্যা আমাকে কোন একটা আলস্য নিয়ে খোঁটা দিচ্ছিল। আমি বললাম, দেখ পৃথিবীতে বড়বড় আবিষ্কারের পিছনে অলস লোকেদের কৃতিত্ব। পরিশ্রম করেই যদি জীবন চালানো মেনে নিতো মানুষ, তাহলে এতো গাড়ি, ট্রেন, উড়োজাহাজ আর প্রযুক্তি তৈরি হত না। কীভাবে আরও আরামে, আরও অনায়াসে, আরও সহজে কাজ করা যায় সেটা আবিষ্কারের উদ্ভাবনী স্পৃহা আলস্য থেকেই এসেছে।

পুঁজিবাদী পৃথিবীতে কতো দ্রুত কোন কিছু অর্জন করা যায়, সেটার একটা কুৎসিত, দৃষ্টিকটু প্রতিযোগিতা আছে। আমাদের তৃতীয় বিশ্বে নিয়তিবাদী লোকেরা, কিছু না পেলে ভাবে কপালে নেই, সর্বময় ঈশ্বর সবাইকে সবকিছু দেয় না, ইত্যাদি। কিন্তু পশ্চিমাদেশের লোকেরা তো আর এতোটা নিয়তিবাদী নয়। সে জানে কীভাবে কোনকিছু অর্জন করতে হয়, এ জন্যেই সেসব দেশে মোটিভেশনের বই মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়। কীভাবে কম পরিশ্রম করে মিলিয়নার হওয়া যায়, সেটা নিয়েই বোধহয় এঁদের লক্ষাধিক বই আছে! মোটিভেশন বক্তা এবং তাঁদের অনূদিত বই বাংলাদেশেও দারুণ জনপ্রিয়

প্রযুক্তির যুগে এই দ্রুত শর্টকাটে বিখ্যাত হওয়ার লোভ প্রকটতম। সারাক্ষণ অপরিণত মস্তিষ্কের লোকের টিকটক, ফেসবুক, ইন্সটা , ইউটিউব আপনাকে বিশ্বাস করাবে, যে আপনিও একটু ইচ্ছে করলেই ওঁদের মতো হতে পারবেন ; যা চান তাই অর্জন করতে পারবেন ; যেখানে খুশী যেতে পারবেন। কোটিপতি ও সফল চকচকে লোকটি হওয়া কোন ব্যাপারই না, শুধু একটু কষ্ট করে আপনাকে ‘ইচ্ছে’ করতে হবে, ‘মোটিভেটেড’ হতে হবে। এই চক্করে পড়ে মানুষ শর্টকাট খোঁজে। এই নিয়ম ফেলে দেওয়ার মতো নয়। আমাদের কৈশোরে বা তারুণ্যে বন্ধুদের মধ্যে যারা দ্রুত, অস্বাভাবিক বা বাঁকা-পথে কোন কিছু অর্জন করার চেষ্টা করতো, শুদ্ধ বাংলায় তাঁদের ‘চালিয়াত’ বলতাম। আরেকটু অশুদ্ধ বাংলায় ‘পাকনাদোচা’ বলতাম।

তবে নানা অভিজ্ঞতায় আমার মনে হয়েছে , দ্রুত সফল কিংবা আর্থিক লাভবান হওয়ার আশায় অপ্রচলিত, অনৈতিক শর্টকাট পদ্ধতি অবলম্বন না করাই ভালো। অতিরিক্ত লোভ ও স্বল্প সময়ে সাফল্যের আকাঙ্ক্ষায় অনেকে সর্বস্ব হারিয়েছে। সবসময় শর্টকাট সাফল্য বয়ে আনেনা ; বরং তা মর্মান্তিক ব্যর্থতা কারণ হতে পারে, সেটা মাথায় রাখা ভালো। স্বাভাবিক উপায়ে ও গতিতে আপনি দ্রুত সম্পদ ও সম্পত্তির অধিকারী না হতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে সুখী হবেন।

উপলব্ধি: ১০

সাফল্য, প্রাপ্তিতে মাত্রাতিরিক্ত উৎফুল্ল হয়ে প্রবাহপতিত না হওয়া এবং ব্যর্থতা, অপ্রাপ্তিতে অনর্থক উদ্বিগ্ন না হয়ে অপেক্ষা করা শিখতে হয়। কৈশোর উত্তীর্ণ প্রবল আবেগে যখন ভেসে যাচ্ছি, সম্ভবত রবি ঠাকুরের কোন এক লেখায় পড়লাম, জীবনের সমাধান –“ দুঃখেষু অনুদ্বিগ্নমনা ,সুখেষু বীতস্পৃহ। ” সকল দুঃখে অনুদ্বিগ্ন থাকো এবং সুখের আশা কোর না !  তো , এরকম মহামানব তো আমরা নই– এই জীবন দর্শনে কীভাবে আমাদের চলবে ! চিরন্তন সত্য হচ্ছে এই যে, নিজের শরীর মনের স্বার্থেই মাত্রাতিরিক্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখার অনুশীলন ভালো।

শহুরে শিশু হিসাবে বেড়ে ওঠায় তেমন কোন জীবনসংগ্রামের মুখোমুখি তো আর হতে হয়নি। তবে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার সুতীব্র সামাজিক পারিবারিক চাপ ; কখনো একতরফা কোন সুন্দরীর প্রেমে পড়ে হা হুতাশ করা, ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থতা ইত্যাদি ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে পড়াশোনার হুজ্জৎ, পরীক্ষা, পরীক্ষা , পরীক্ষা এবং অন্তহীন পরীক্ষার শেষে চাকরিজীবনে ঢোকা; সংসার-যাপন। মনে আছে, সুদূর কৈশোরের ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে দুইদিন প্রায় নাওয়া খাওয়া বন্ধের উপক্রম হয়েছিল। অথচ বছর না ঘুরতেই নিজের বোকামিতে নিজেই হেসেছি। যুক্তি দিয়ে বুঝেছি। উচ্চমাধ্যমিকের পরে ভর্তি পরীক্ষার জন্য আমার প্রস্তুতি খুব সুবিধার ছিল না। নড়বড়ে প্রিপারেশনে যেখানে যেখানে চান্স পাওয়ার ছিল, আমি তাই পেয়েছি। এতে উদ্বিগ্ন ও হতাশ হওয়ার কী আছে !

আমার বাগদত্তা ও পরবর্তীতে সহধর্মিণীর সঙ্গে বছর দুয়েকের প্রেম ছিল। প্রেমটা যখন হয়েছিল তখন আমি চাকরি করি, আবেগ থিতু হয়ে গেছে। কিন্তু অনেক বন্ধুকে কৈশোরিক ‘বাছুর-প্রেমে’বারবার পড়তে দেখেছি। কিশোরী প্রেমিকার বিরহে কেউ কেউ ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার উপক্রম করেছে। আবার একইসঙ্গে কেউ কেউ সকালে একজনের সঙ্গে ডেট করে সন্ধ্যায় আরেকজনের সঙ্গে করেছে। বিশ্বপ্রেমিকদের রোমাঞ্চের সত্যি গল্প আর জাল গল্প আমরা বুভুক্ষের মতো শুনেছি, দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। প্রেমে ব্যর্থদের কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দিয়েছি। প্রেমের ব্যাপারটা বড্ডো আবেগের, আর সেখানে ইগো এতো বেশি কাজ করে যে, কে কখন কোন আচরণ করে বসে—সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। আমাদের যে ব্যর্থ প্রেমিক বন্ধুদের কেউ কেউ ভেবেছিল ‘এই জীবন লইয়া আমি কি করিব?’—সেই তারাই কিছুদিন পরে আরেক সাদাসুন্দরীকে বিয়ে করে ছানাপোনা তুলে ভুলে গেছে সেই বালখিল্যতার কথা। স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে, কৈশোরের অধিক উত্তেজনায় বলাকা ব্লেড দিয়ে কব্জিতে আঁচর দেওয়ার চিহ্ন।

বছর বিশেক আগে, আমার এক পশ্চিমা ক্রেতার কাছে শেখা। করপোরেট জীবনের প্রারম্ভিক। মনে হতো, আমার ঊর্ধ্বতন সব কর্মকর্তাই বুঝি সারাক্ষণ আমি কী কী লেজেগোবরে করলাম সেটা টর্চলাইট জ্বালিয়ে দেখছে। যে কোন ব্যর্থতায় ভয়ঙ্কর মুষড়ে পড়তাম। তখন সেই ক্রেতা আমাকে বোঝাল, কীভাবে সমস্যায় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়।

তাঁর সঙ্গে কথোপকথন ছিল অনেকটা এরকম।
মুখোমুখি বসে বলল,
: জাহিদ এই সমস্যা আজকে দিনের শেষে কি অবস্থা হবে?
: সকালে যেমনটি ছিল, তেমনটিই। বরং সবার কাছে এই সমস্যার কথা পৌঁছে আমার উপরে অনেক বেশি প্রেসার তৈরি হবে।
: আচ্ছা, তিনদিন পরে কি হবে?
: সমস্যাটাতে কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে যাবে সবাই। উপরের কর্মকর্তাদের অনেকেই হয়তো যুক্ত হবেন। কেউ কেউ হয়তো সমাধানের চেষ্টা করবে।
: এক সপ্তাহ পরে কি অবস্থা হবে?
: এক সপ্তাহ পরে, হয়তো তেমন কিছুই অগ্রগতি হবে না। তবে, কোন একটা বিকল্প পথ খুঁজে পাওয়াও যেতে পারে। এবং এই একমাত্র সমস্যার সঙ্গে আরও কিছু নতুন সমস্যা এসে যুক্ত হবে। অনেকের মনোযোগ বিভিন্ন সমস্যায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

এভাবে, দুই সপ্তাহ পরে, তিন সপ্তাহ পরে এক মাস পরে কী কী হতে পারে ভাবতে বললেন।
ছয়মাস পরে ঐ দুর্বিষহ সমস্যার কথা আমি কেন, সবাই ভুলে যাবে। একবছর পরে আমি ভুলেই যাব কী ভয়ঙ্কর দিনরাতই না কেটেছে আমার!

ওঁর আগে আমাকে এভাবে কেউ চিন্তা করতে শেখায় নি।
হয়তো ওদের নানারকম অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ট্রেনিং থেকেই ওঁর ওই উপলব্ধি ছিল।
এই যে বেশ কিছুটা দূর পর্যন্ত চিন্তা করার ব্যাপারটা আমাকে তাৎক্ষণিক শারীরিক ও মানসিক অসম্ভব স্ট্রেস থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করে। এখনো কোন সমস্যায় যখন চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে পড়ি, উপরের দর্শনে ফিরে যাই। মানসিক ও শারীরিক স্ট্রেস অনেক ডাইলুট বা তরল করে ফেলি। যদিও পৃথিবীর সব সমস্যাকে এই ধাঁচে ফেলার চিন্তা করাটা ঠিক হবে না।

ও হ্যাঁ, কেন এই কথা বললাম, কারণ ‘মৃত্যু’ ব্যতীত সব সমস্যার একটা আপাত সমাধান আছে বলে আমার মনে হয়।
একমাত্র মৃত্যুর কোন সমাধান নেই। সে অভিজ্ঞতার কথা না হয় আরেকদিন।

উপলব্ধি: ৯

নোবেলজয়ী তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, রিচার্ড পি ফাইনম্যান (Richard P. Feynman) এর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, আমার কাছেও সেটা চিরন্তন মনে হয়। ‘ Never confuse education with intelligence, you can have a PhD and still be an idiot.’

উচ্চশিক্ষিত মানুষ মানেই বুদ্ধিমান ও বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষ নয়।
প্রমথ চৌধুরীর অসাধারণ সেই উক্তিটিও এসে পড়ে, ‘সুশিক্ষিত ব্যক্তিমাত্রই স্বশিক্ষিত।’

 

এদিকে ইন্টেলিজেন্স আর ইন্টেলেকচুয়ালের তফাৎ বুঝতে আমার কিছুটা দেরি হয়েছে। অসম্ভব বুদ্ধিমান ও অর্থনৈতিক সামাজিকভাবে সফল মানুষের কাছে গিয়ে দেখেছি, তাঁদের বুদ্ধিমত্তা আছে কিন্তু প্রজ্ঞা, ধীশক্তি নেই।

অনেকের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা থাকেনা কিন্তু প্রজ্ঞা থাকে। আমাদের সমস্যা, দুই কলম পড়েই আমরা ভাবি অনেক বুঝে ফেলেছি। এই হচ্ছে পৃথিবী। অথচ হেনরি ফোর্ডের নিরক্ষর মা তাকে সেই জগদ্বিখ্যাত কথা বলে গেছেন, ‘Whether you think you can, or you think you can’t–you’re right.” [ তুমি যদি ভাবো তুমি পারবে, অথবা তুমি পারবে না—উভয়ক্ষেত্রেই তুমি সঠিক। ] শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গী মানুষকে বহুদূর পৌঁছে দিতে পারে। জীবনে অভিজ্ঞতার উপরে কিছু নাই। অসম্ভব ভালো কোন উপদেশ বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-বঞ্চিত অথবা স্বল্প শিক্ষিত লোকের কাছেও পেতে পারেন।

তবে, এই বয়সে এসে আমার মনে হয়েছে– শিক্ষা, অশিক্ষা, বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ইত্যাদির উপরেও হৃদয়বৃত্তি সবার উপরে। কেউ শিক্ষিত, সফল হতে পারেন, সূক্ষ্ম বুদ্ধির হতে পারেন, অথবা কেউ হয়তো আপাত দৃষ্টিতে স্থূল বুদ্ধিমত্তারও হতে পারেন — কিন্তু তাঁর বড় একটা হৃদয় থাকতে পারে। তাঁকে মূল্যায়ন করুন, কারণ সে হয়তো নির্দ্বিধায় আপনার জন্যে অনেক কিছু করছে, করেছে বা বা করতে পারে অথবা সে সমাজের জন্য উপকারী।

বুদ্ধিমত্তার চেয়েও আমি সংবেদনশীল ও ইন্টেলেক্টকে বেশি মূল্যায়ন করতাম। এখন করি না। আমি এখন বোঝার চেষ্টা করি সে কতো মানবিক, উদার, উপকারী। মনে রাখবেন বুদ্ধিমান, সফল এবং ইন্টেলেক্ট লোকেরা আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর হয়ে থাকেন।

উপলব্ধি: ৮

শুধু বুদ্ধিমান লোকে আর শক্তিশালী লোক বেঁচে থাকবে অন্যেরা মরে যাবে, পৃথিবীটা মোটেও সেই নিয়মে চলে না। কয়েক হাজার বছর ধরে নির্বোধ, শুক্রাণুর ব্যাপক অপচয় হিসাবে খ্যাত বহু ব্যক্তির ক্ষমতার আস্ফালন দেখতে দেখতে আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি। অযোগ্য, দুর্বল, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের সৌভাগ্যে আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি।

বিশ্বের বিখ্যাত ধনকুবের ওয়ারেন বাফেট উভেরিয়ান লটারি (Ovarian Lottery) শব্দটিকে জনপ্রিয় করেছেন ; ব্যক্তি কখন বা কোথায় জন্মগ্রহণ করছেন সেই সৌভাগ্যের কথা বলেছেন। একজন ব্যক্তি কখন কোথায় জন্মগ্রহণ করছে সেটা তাঁর জীবনের বড় ধরণের প্রভাব রাখে। যে লোকটিকে আপনার আপাতত অযোগ্য , অথর্ব মনে হচ্ছে, কোনভাবে সে হয়তো আগেই উভেরিয়ান লটারি জিতে বসে আছে।

বৈষয়িক জীবনের ম্যারাথন রিলে রেসে অনেক এগিয়ে থাকা লোকটি হয়তো তাঁর পিতা ও পরিবারের কাছ থেকে ব্যাটনটি যখন পেয়েছেন; তখন হয়তো আপনার পিতা সেই স্টেডিয়ামের দর্শক-সারিতেই পৌঁছায়নি। নিয়তির পরিহাসে প্রাপ্ত ব্যক্তিটির যাপিত সৌভাগ্যের ব্যাপারটি যদি আপনি সদয় বিবেচনায় আনেন, আপনার মানসিক স্থৈর্য বাড়বে বৈ কমবে না।

(Ovarian Lottery: Ovarian Lottery is a thought experiment popularized by Warren Buffet. It stresses the importance of luck and the influence of when/where we are born in this world on our life outcomes.)

উপলব্ধি: ৭

তর্কে কেউ নাকি জেতে না। আমরা যাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ের তর্ক বলি ; সেটাকে অনেকে বড় আঙ্গিকে ‘বিতর্ক’ বলেন। আমি প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের কথা বলছি না। আমি বলছি, প্রাত্যহিক জীবনের সহকর্মীর সঙ্গে, বন্ধুর সঙ্গে, ভিন্নমতের, ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের কারো সঙ্গে যে তর্কগুলো আমরা করে থাকি– হতে পারে সেটা ফেসবুকে, হতে পারে মুখোমুখি অথবা অন্য কোন প্ল্যাটফর্মে—সেটার কথা।

ব্যক্তি পর্যায়ের তর্কগুলো অনেকাংশে ‘কুতর্কে’ পর্যবসিত হয়। আমি যেটা বুঝেছি, একজনের সচেতন উপলব্ধি আরেকজনকে দেওয়া খুব মুশকিল। এই ধরাধামে আবির্ভূত মহামানবের বাণী হাজার বছর পার হয়েও মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি ; আর আমি-আপনি তো নস্যি সেক্ষেত্রে। মজার ব্যাপার , সাধারণ মানুষের প্রবণতা হচ্ছে, যেভাবেই হোক তর্কে জেতা। জেতার জন্যে তাঁরা মূলক, অমূলক, ভিত্তিহীন, জানা-অজানা নানা বিষয়কে রেফারেন্স হিসাবে হাজির করেন। কবেকার কোন ‘টক-শো’-তে কোন অধ্যাপক কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কি বলেছিল সেটার কথা বলেন। কবেকার কোন প্রাগৈতিহাসিক বিলুপ্ত পুস্তকে কী কী বলা আছে সেটার কথা বলেন।

কিন্তু তর্ক সচরাচর কোন সমঝোতায় পৌঁছায় না। আমার তো মনে হয়, এই ধরণের তর্কে জিতে যাওয়ার একটা সান্ত্বনামূলক অবস্থায় পৌঁছাতে যে পরিমাণ শ্রম ও শক্তি অপচয় করবেন; সেটা না করে মৃদু হেসে নিশ্চুপ থাকা অনেকাংশে মঙ্গলজনক। যোগ্য তার্কিক না হলে আমি কখনই নিজের শক্তিক্ষয় করিনা।

ব্যক্তি তাঁর পরিবার, শিক্ষায়তন, কর্মস্থল ও পরিপার্শ্বের সাহচর্যে সুদীর্ঘ অনেক বছর ধরে কিছু রুচি, যুক্তি, অযুক্তি, সংস্কার, কালচার নিয়ে বেড়ে ওঠে; তাকে কোন নতুন মতবাদ, মতাদর্শ শুনিয়ে লাভ নেই—যদি না সে নিজে থেকে সেটা আপনার কাছ থেকে শুনতে চায়!