বিনয় ও অহংকার

আমার মনে হয়, বিনয় ও অহংকার দু’টি আচরণই এক্সট্রিম বা চরমভাবাপন্ন । ভুল বোঝাবুঝির সমূহ সম্ভাবনা । বিনয়ী ব্যক্তিকে সচরাচর শক্তিহীন ও নির্বোধ ভাবা হয়। অহংকারী, উদ্ধত লোকের সুবিধা হচ্ছে তাঁকে নির্বোধ ভাবার সুযোগ অন্যদের কম। কিন্তু এঁদের সমস্যা হচ্ছে এঁরা মানবিক হতে পারেন না। অহংবোধ তাঁদেরকে এক ভীষণ দূরত্বের নিঃসঙ্গ দ্বীপ করে রাখে।

এর মাঝামাঝি মানবিকতার পরিমিতিবোধ নিয়ে চলাটাই শ্রেয়।

[প্রকাশকাল: ১৭ই জুন,২০১৩ ]

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( কর্পোরেট আতঙ্ক )

একজন হতাশ, ব্যর্থ লোকের সাথে অনেকক্ষণ কথা হলো আজকে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীন বলে উনাকে ব্যর্থ একজন বললাম।কারণ , আমার চারপাশের সবাই মানুষকে অর্থনৈতিক মাপকাঠি দিয়েই মাপেন। ভদ্রলোক বছরকয়েক আগে বড়ো কর্পোরেট চাকরি করতেন, বাইপাস সার্জারিতে সহায়-সম্বল শেষ। শারীরিক অসুস্থতার দীর্ঘবিরতিতে উনি উনার চাকরিজীবনের আগের পজিশন হারিয়েছেন। এইটা খুব স্বাভাবিক । তাঁর অধস্তনরা উনাকে ফেলে চলে গেছে সামনের দিকে , বয়স ও শারীরিক কারণে নতুন চাকরি পাওয়া অনেকটা জটিল হয়ে গেছে। সবাই, এড়িয়ে চলেন। হুম হাম করে পাশ কাটিয়ে যান।

ভেবেছিলেন ব্যবসা করবেন। ব্যবসা করার যোগ্যতা বা মূলধন কিছুই নাই। কারো কাছে সাহায্য চাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নাই। ত্রিশঙ্কু অবস্থা । আমি নিজে , ব্যবসার ‘ব’ ও বুঝি না। উনাকে বললাম, ‘চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে হলেও পুরোনা মালিকের ওখানে জয়েন করেন , যে পজিশনেই হোক না কেন, আপনারে দিয়া ব্যবসা হবে না। কিছুদিন চাকরি করার পরে হয়তো কোন না কোন পথ পেয়ে যাবেন।’

আমাদের কর্পোরেট জগতের সবাই, খুব ভিতরে একজন আতংকিত ব্যর্থ মানুষকে বয়ে নিয়ে চলছি। আমরা কেউ জানি না, কখন কোন পরিস্থিতিতে ওই ব্যর্থ লোকটা বের হয়ে আসবে সামনে !

[ প্রথম প্রকাশ ৭ই জুন,২০১৩ ]

স্বগতোক্তিঃ অনিশ্চয়তা।

কিছুদিন আগে কলিগের পারিবারিক ঝামেলার ইস্যুতে  ঢাকার জজকোর্ট পাড়ায় যেতে হয়েছিল। ঘর্মাক্ত , বিষণ্ণ কয়েক ঘণ্টায়  মলা-ঢ্যালা-চিংড়ী উকিল পেরিয়ে অবশেষে সিনিয়র উকিলকে পেলাম। অসংখ্য সারিবদ্ধ আলোবাতাসহীন  খুপরি ঘরের মতো চেম্বার! সরুগলিতে সিনিয়র উকিলের চেম্বারের  ঠিক সামনেই একটা কসাইয়ের দোকান। লাল-লাল-গোলাপি ছিলে রাখা সারিসারি ছাগল-ভেড়া-খাসি ঝুলছে। নীচেই কয়েকটা ছাগল বেঁধে রাখা, অপেক্ষমাণ । আমি মোবাইলে ছবি তুলি না সচরাচর। তোলা উচিৎ ছিল। দৃশ্যটার আপেক্ষিক তাৎপর্য ওই মুহূর্তের জন্য ও  হয়তোবা সবসময়ের জন্যই আছে। ঝুলে থাকা সহযাত্রীর মাংসপিণ্ডের পাশে বসে নিশ্চিন্তে ঘাস চিবানো, জাবর কাটা। চরম আশাবাদ, নৈরাশ্য, অনুদ্বিগ্নতা, নির্লিপ্ততার  দারুণ একটা মিশ্রণ। ওই যে , সিনেমায় থাকে না , সিম্বোলিক শট্‌। মোমবাতি কাঁপতে কাঁপতে নিভে যাওয়া। দুইটা পাখি পাশাপাশি ঠোঁটে ঠোঁটে। অর্থটা  দর্শকের কাছে খুব স্পষ্ট, আলাদা ব্যাখ্যা লাগে না !

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের কোন একটা বইয়ে অনেকটা এইরকম একটা দৃশ্যপট ছিল , সাপে ব্যাঙ ধরেছে। অর্ধেক শরীর সাপের মুখের ভিতরে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। একটা পতঙ্গ উড়ে যাচ্ছে সামনে দিয়ে, ব্যাঙটা খপ্‌ করে জিভ বাড়িয়ে দিল। যতক্ষণ জীবন ততক্ষণ উপভোগ! আমিতো আশাবাদই  দেখি।

টাইটানিক যখন ডুবে যাচ্ছিল, হাজারো যাত্রীর জীবনের সর্বোচ্চ অনিশ্চয়তার চরম আতঙ্কের  মাঝেও  কিছু লোক কিন্তু তাঁদের গিটার, বাঁশী নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে সঙ্গীতে মগ্ন ছিল। বিদায় হে যাত্রীসকল, বিদায়। বেঁচে থাকুন বা চলে যান, যাত্রা শুভ হোক !  হ্যাঁ , অনেকে বেঁচে গেছেন, অনেকে  অসহনীয়  যন্ত্রণায় বরফ-শীতল অতলান্তিকে বিলীন হয়ে  গেছেন, তাঁদের সবার প্রতিই আমার সমবেদনা। আমাকেও  যদি বেছে নিতে বলা হয়, আপনি কী করতেন। আমিও সবার মতোই একটা কিছু নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতাম। কিন্তু, ওই কয়েকজনের দিকে আমি সারাটাজীবন ঈর্ষা নিয়ে তাকিয়েই থাকবো।  থাকুক না কিছু বোকা নির্বোধ মানুষ যারা সবার চিন্তার বাইরে চিন্তা করতে পারেন সবার কাজের বাইরে কাজ করতে পারেন !

[ প্রথম প্রকাশঃ ১৯শে মে, ২০১৫ ]

স্বগতোক্তিঃ একেকটা মানুষ মানে একেকটা আলাদা আলাদা পৃথিবী!

আমার কাছে মনে হয় , একেকটা মানুষ মানে একেকটা আলাদা আলাদা পৃথিবী। একেকটা আলাদা ভুবন। আলাদা আলাদা সৌরজগতের মতোই বিশেষ কেউকেউ আবার আলো দিয়ে উজ্জ্বল করে রাখে চারপাশ। যে বয়সেরই হোক না কেন , পরিবারের কারো অকালমৃত্যুই সহ্যাতীত কষ্টের। কিন্তু, যখন পরিবারের মেরুদণ্ড উপার্জনক্ষম কারো মৃত্যু হয়। শুধু শারীরিক ও মানসিক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুরো পরিবারটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। অন্ধকার নেমে আসে ওই সৌরজগতে !
হ্যাঁ ,জীবন থেমে থাকে না। এই মুহূর্তে আমার অকাল-প্রস্থানেও কারো হয়তো কিছু যাবে আসবে না। আমি হয়তো এই পৃথিবীর কাছে কেউ নই, কিন্তু আমার প্রিয়জনের কাছে আমিই তাদের পৃথিবী।

“TO THE WORLD YOU MAY NOT BE SOMEONE; BUT TO SOMEONE YOU ARE THE WORLD! “
আমার কন্যারা হয়তো একটু অনাদর অবহেলায় বেড়ে উঠবে। হয়তো প্রথম প্রথম সপ্তাহে একবার , পরে দুই সপ্তাহে একবার খাবারের প্লেটে আমিষ পড়বে। হয়তো একটা ডিম চার ভাগ করে খেতে হবে। আমার প্রয়াণে আমার উপর নির্ভরশীল লোকগুলো কেউ না খেয়ে হয়তো মারা যাবে না– কিন্তু যে চিরস্থায়ী মানসিক অর্থনৈতিক বিকলাঙ্গতার অসহায় মুহূর্ত পার করতে থাকবে তারা , সেটা কল্পনা করতেও আমার সারা মস্তিষ্কে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে।
সাভারের একটা নির্মম হত্যাকাণ্ডে কতোগুলো আলাদা পৃথিবীর প্রস্থান, আলো নিভে গেল কতো পরিবারের, কতো আলাদা আলাদা সৌরজগতের ।

[ প্রথম প্রকাশঃ ২৫শে এপ্রিল,২০১৩ ]

স্বগতোক্তিঃ নাছোড়বান্দা মাছির মতো চিন্তারাশি!

নাছোড়বান্দা মাছির মতো চিন্তারাশি বারবার ঘুরে ফিরে আসে ! নিজের তুচ্ছতার কথা ভাবি ; এই চিন্তারাশিকে লিপিবদ্ধ করে কী লাভ ! হ্যাঁ প্রকাশিত হওয়ার আনন্দ আছে বৈকি ! আবার ভাবি, মহাকালের কাছে আমি যতো অকিঞ্চিৎই হই না কেন, আমার সময়টুকুতে আমার এই যে বেঁচে থাকা, চারপাশের প্রবাহিত , যাপিত জীবন আমার কাছে কোনভাবেই তুচ্ছ হতে পারে না। আমার কাছে তার মূল্য আছে বলেই জীবন নিরর্থক নয় ; বেঁচে থাকাকে এখনো এতো ভালবাসি !

স্বগতোক্তিঃ দান, অনুদান

আমি বিশ্বাস করি  মানবিক কিছু গুণাবলী যেমন  দান, ক্ষমা ও পরিতৃপ্ত হওয়ার জন্য পরিমাণ নয় , মূলতঃ মানসিক যোগ্যতাই সবচেয়ে বড়ো ফ্যাক্টর ! নিকট অতীতে  নিতান্তই  পারিবারিক কিছু অম্লমধুর  অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার  । সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দেওয়ার পিছনে , খুব সহজ একটা  ব্যাখ্যা ছিল প্রত্যেকের । সহানুভূতির কয়েকটা কথার পরে, তাদের মূলকথা হতো —আমার  যদি অমুকের মতো টাকা থাকতো,  তাহলে আমি নিশ্চয়ই কিছু দান বা সহযোগিতা করতাম ! কিন্তু , যে দুর্মূল্যের বাজার, ইত্যাদি ইত্যাদি  ইত্যাদি!

 

 

আবার  এমন কিছু হৃদয়বান  দেখেছি যিনি  তাঁর সঞ্চিত অর্থের  পরিমাণের তোয়াক্কা করেননি। সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন  । গাণিতিক অনুপাতে  উদাহরণ দিই ।   ধরুন, আমার  যদি পকেটের  ১০০ টাকা থেকে  ১০ টাকা সহযোগিতা করার মানসিকতা না থাকে;  তাহলে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা থাকলেও আমি  কাউকে  ১০ হাজার টাকা সহযোগিতার চিন্তা করবো না !   যে হৃদয়বান   মাত্র ১০ হাজার  টাকার ১০% অবলীলায় দান করতে পারছেন ও করছেন  ; মূলতঃ  তাঁর মানসিকতা আছে বলেই করতে পারছেন ! আর ‘ দুর্মূল্যের বাজার’-এর  আমি , একই সমানুপাতে  ১০ লাখ টাকার ১০% , মানে  ১ লাখ টাকাতো  দূরে থাক,  ন্যূনতম  ১% হিসাবে ১০ হাজার টাকার চিন্তাও করতে পারছি না !

 

বহুদিন আগে, এক নেপালি সহপাঠী বলেছিল , আদমি রহিস (ধনী) রুপিয়াসে নেহি হোতি ; দিল্‌ সে হোতি  হ্যায় ! সহযোগিতার  জন্য  সঞ্চিত সম্পদের পরিমাণ নয় ;  হৃদয়ের আয়তন এবং  মানসিক যোগ্যতাই বড় ফ্যাক্টর !

 

 

[ প্রথম প্রকাশঃ ১০ই নভেম্বর, ২০১৫ ]