বিজনেস ক্লাস

সারাবছরের অফিসের ট্রাভেলে হঠাৎ হঠাৎ একবার দু’বার বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড পাই, নিতান্তই মাইলেজের বদৌলতে ; তাও হয়তো কোন শর্ট ফ্লাইটে। নিম্নশ্রেণী থেকে উচ্চশ্রেণীতে উত্তরণের এই ব্যাপারটা কিন্তু আমি বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি।

সারাক্ষণ এয়ারহোস্টেস ব্যতিব্যস্ত আপনাকে নিয়ে। যেখানে ইকোনমি ক্লাসে এক গ্লাস পানি চাইলেও সময় ফেরে এরা এতো ব্যস্ত থাকে যে, পারলে ঢেলে খেতে বলে। তিনবার ডাকলে একবার আসে। খাবার শেষ করে সামনের ট্রে নিয়ে ঘণ্টা খানেক ধরে বসে থাকতে হয়, কখন পরিষ্কার করবে এই আশায়। সেই তুলনায় বিজনেস ক্লাস মানে অন্যরকম কিছু।

কিন্তু আপগ্রেড পাওয়ার পরও একটা জিনিষ আমি বুঝি আমার সাথে জেনুইন বিজনেস ক্লাসের তফাৎ ঘোঁচে না। পাশের ধবধবে পেটমোটা কোট টাই পড়া হাঁসফাঁস যাত্রীটা কিছুটা বিরক্তির চোখে তাকায় আমার দিকে, এইসব মফিজ( পড়ুন জাহিদ) ক্যামন করে যে বিজনেস ক্লাসে আসে !

স্কুল জীবনে আমাদের একটা কমন অভজার্ভেশন ছিল বড়লোকের পোলাপানদের নিয়ে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের দুজন ছেলে বা মেয়ে যদি পাশাপাশি একই পোশাক পড়েও হেঁটে যায়, আমরা ঠিকই ওদের আলাদা করতে পারতাম। খেয়াল করে দেখতাম , উচ্চবিত্ত পোলাপানের চামড়ায় একটা আলাদা মসৃণতা, ঔজ্জ্বল্য বা জেল্লা থাকে। এটা কী ঘি মাখন, চর্বিচোষ্য খেয়ে নাকি সারাক্ষণ শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি ও ঘরে থেকে, কে জানে ! আমরা কিন্তু ঠিক ঠিক টের পেতাম। আমার মনে হয়, সমাজের যে কেউ এটা টের পেয়ে যান।

আবার নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের কাউকে যতই পোশাক ও অন্যকিছু দিয়ে পালিশ করি না কেন, চামড়ার ওই জেল্লা আনা অনেক ডিফিকাল্ট! হঠাৎ বিজনেস ক্লাসে বসেও এবার আমি এইসব চিন্তা করতে করতে ঢাকায় !

প্রকাশকালঃ জুন, ২০১৩

কোভিড করোনা ও যুদ্ধাবস্থা

অনেকগুলো ছোটছোট যুদ্ধের ক্রমানুসারে আসে বড়-যুদ্ধ, মহাযুদ্ধ। উনিশ শতকে সেটার নাম হয়েছে বিশ্বযুদ্ধ। সপ্তদশ, অষ্টাদশ শতাব্দীর পুরোটা জুড়ে বিশ্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রগুলোর মাঝে যুদ্ধ লেগেই থাকত। বিশ্বব্যাপী অনেকগুলো জাতি একক কোন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ইতিহাস প্রথম বিশ্বযুদ্ধে।

বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, মানবিক বিপর্যয় এমন হয় যে সেটা মনুষ্য প্রজাতিকে দীর্ঘসময় হতবিহবল করে রাখে। ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে একটা মানবিক সমাজ গড়ায় নজর দেয় তারা। নানাধরনের হম্বিতম্বি থাকলেও , কেউ আর বোকার নতুন করে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। বিশ্বে শান্তি বজায় রাখতে সবাই মনে মনে একমত থাকে। যদিও প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে সময়-পার্থক্য সামান্যই।
তারপরেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমরা একটা দীর্ঘবিরতি পাচ্ছি। জন্ম হওয়ার পর থেকেই শুনে এসেছি; এই শুরু হল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ; এই শুরু হল আমেরিকা-সোভিয়েত রাশিয়ার পারমাণবিক যুদ্ধ। সেটা হয়নি ,আর হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
তেমনি করে সার্স, মার্স, জিকা, সোয়াইন, ইবোলার চিকন ধাক্কা পার হয়ে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছি কোভিড-19 করোনা ভাইরাসের। বিশ্বব্যাপী যে বিপর্যয়টা যাচ্ছে; সেটা পার হয়ে গেলে আমাদের প্রজন্ম আর কোন বড় বিপর্যয় ছাড়াই এই শতাব্দী পার করতে পারবে ; এইসব ভেবে আশাবাদী হতে পারেন।

প্রকাশকালঃ ২৩শে জুন, ২০২০

আমার স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য সচেতনতা

ছয় বছর বয়স পর্যন্ত মাতৃস্তন পান করেছি। এত্তো বড় হয়ে যাওয়ার পরেও বুকের দুধ কেন খেতাম, আর কীভাবে সেটা পেতাম সেটার রহস্যের চেয়ে মর্মান্তিক ছিল– কাছের আত্মীয়দের কাছ থেকে খোঁটা শোনা। অনেকদিন পর্যন্ত এই ছেলেমানুষির অপমান সইতে হয়েছে সবার কাছে। দীর্ঘদিন স্বাস্থ্যকর মাতৃদুগ্ধ পানের পরও কেন আমাকে সারাজীবন নানা অসুস্থতায় ভুগতে হয়েছে সেটাও রহস্য।

আমার দৈহিক গড়ন আম্মার মতো, কিছুটা নাদুসনুদুস, ঢলঢল। সামান্য কিছুটা অবয়ব পেয়েছি আব্বার কাছ থেকে। আমার পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি উচ্চতা নিয়েও সারাজীবন সমস্ত কাজিনদের মাঝে বেঁটে দুর্নাম নিয়ে চলতে হয়েছে। আব্বা ছয় ফুট, ভাইয়া ছয় এক। ছোটটি পাঁচ ফিট দশ।

ছোটবেলায় কয়েকবার জ্বর হয়েছে, সেগুলোর স্মৃতি মনে নেই। দাঁতের সমস্যা ও দাঁতব্যথা ছিল আজীবন। সেটা সম্ভবত: নিয়মিত ব্রাশ না করার বদভ্যাসে। নানাবাড়িতে বেদেনীরা আসত। কি একটা গাছের শিকড় দাঁতের ফাঁকে রেখে দিয়ে মন্ত্রতন্ত্র পড়ত। আর পরে মুখের ভিতর থেকে শিকড় বের করে দেখাত। শিকড়ের সঙ্গে থাকত সাদাটে একধরণের পোকা। আমরা ভাবতাম দাঁতের পোকা বের হয়ে গেল আর ব্যথা করবে না। যদিও দুইদিন পরে আবার ব্যথা হতো। বহুদিন পরে জেনেছি, বেদেনীরা কলাগাছের মাঝখান থেকে ঐ সাদাটে পোকা বের করে হাতের কারসাজিতে শিকড়ে লাগিয়ে সবাইকে বোঝাত।

পায়ে ফোঁড়া হয়ে দীর্ঘদিন ভুগেছি, সেটার ক্ষতচিহ্ন আছে। আরেকবার খোসপাঁচড়া টাইপ কিছু হয়েছিল দুই পায়ে, সেটা সারাতে নাকি কয়েকবছর লেগেছে। সেটার চিহ্নও দীর্ঘদিন ছিল।
ক্লাস টু থেকে পেটের অসুখবিসুখ লেগেই ছিল। মিরপুরে আসার পর শুরু হল রক্ত আমাশা, হেন ডাক্তার নাই দেখানো হয় নাই। অবশেষে সামনের বিহারী ক্যাম্পের এক কবিরাজি ওষুধ খেয়ে সেরেছে। দুর্বল পাকস্থলী আমাকে ভুগিয়েছে বহু বহুদিন। এখনো হুট করেই ফুড পয়জনিং হয়। সবার যে খাবারে কোন সমস্যা হয় না, সেইটা আমাকে শয্যাশায়ী করে ফেলে।

স্কুলের সময়, দুপুরের টিফিনে বাসায় খেতে আসতাম। বাসা থেকে স্কুল ৩/৪ শ মিটার দূরে। বাসায় এসে কোনমতে খেয়েই আবার ছুটতাম। এই হুড়োহুড়িতে আর দুর্বিষহ গরমে জন্ডিস বাঁধিয়ে বসলাম।, স্কুল জীবনেই দুইবার জণ্ডিস। একবার সারলো দীর্ঘ বিশ্রামে। আরেকবার ক্লাস ফাইভের দিকে জণ্ডিস হল। সারে না তো, সারেই না। দিনের পর দিন , ডাকঘর অমলের মতো আমি বিষণ্ণ হয়ে বিছানায় ও গৃহবন্দী হয়ে থাকতাম। স্কুল গেছে চুলোয়। মিরপুরের সব ডাক্তার ঘেঁটেও কিছু যখন হল না, তখন আমার ছোটমা খবর পাঠালেন , তাঁর ওখানে, মানে লালকুঠিতে কোন এক ধন্বন্তরি কবিরাজ আছে। রোগীর মাথার উপরে মন্ত্রপূত বিশেষ কোন একটা গাছের শেকড়ের অথবা ডালের মালা রেখে দেন। সেই মালা আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে শরীর বেয়ে নেমে গেলেই জণ্ডিস সেরে যায়। তাই সই ! কবিরাজ এসে আমাকে একটা গাছ তলায় বসিয়ে মাথার উপরে ছোট্ট একটা শিকড়ের মালা রেখে দিল। একদিকে আমি আর আরেকদিকের বারান্দা ভর্তি উৎসুক জনতা , কী হয় কী হয়। কবিরাজ কিছুক্ষণ পরে পরে এসে মালা দেখে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই মালা বড়ো হতে থাকল আর মাথা গলিয়ে কাঁধ আর শরীর বেয়ে নেমে গেল। আমি বড়ো হয়ে অনেক ব্যাখ্যা খুঁজেছি ; যেহেতু কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নিতান্তই কম। একটা ব্যাখ্যা হতে পারে, কবিরাজ মালাটা সুতো আর খুব চিকন ডালের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে বানিয়েছিল। সুতার গিঁঠ গুলো এমন যে ধীরে ধীরে তা খোলে আর মালাটা বড় হয়ে যায়।
দান দান তিন দান, আবার জণ্ডিস হলো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে। হলে থাকতে আমরা পানি ফুটিয়েই খেতাম, কিন্তু সারাক্ষণ কী আর সেটা চলে ! বিকালের নাস্তায় হোটেল, দোকানে-টোকানে গেলে এদিক সেদিক হতো। এবারে জণ্ডিস বেশি ভোগাল না, হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন নিলাম। এর পরে আর কখনো সমস্যা হয়নি।

বছর আটেক আগে অফিস ট্যুরে নেদারল্যান্ডে।

এক বিখ্যাত রেস্টুরেন্টে ঢুকে বিফ স্টেক অর্ডার করলাম। বলে দিলাম ওয়েল ডান। ব্যাটা ওয়েটার, সে কী বুঝল কে জানে ! খাবার সার্ভ করার পরে কেন যেন মনে হচ্ছিল ওয়েল-ডান করে নাই। ছুরি চালাতেই দেখি ভিতরে কাঁচা কাঁচা । এতো টাকার ডিনার তারপরে লেগেছিল ভয়ঙ্কর ক্ষুধা। কিছুটা খেয়ে ভিতরের তরল গোলাপি রক্তের ছিটে দেখে আর খেতে পারলাম না। ফুড পয়জনিং হয়ে গেল। ট্রাভেলে কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ কাছে রাখি। কয়েকটা ফ্লাজিল , অ্যামোডিস ছিল ; দুইদিন খেয়ে মিটিং পার করলাম।

ট্রেনে এলাম জার্মানিতে। কোনমতে হোটেলে পৌঁছে যাচ্ছেতাই অবস্থা। রুমে বা বিছানায় থাকার চেয়ে আমার সময় কাটতে লাগলে রুম লাগোয়া টয়লেটে। পরদিন মিটিং অনেক কস্টিং। অনুজ দুই সহকর্মীকে বুঝিয়ে সুজিয়ে পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু প্রধান ক্রেতা নিজেই হোটেল থেকে আমাকে পিক করল। আমি বললাম, দেখো দেশ থেকে আনা আমার ওষুধ ফুরিয়ে গেছে। ফ্ল্যাজিল , অ্যামোডিস তো বুঝবে না, তাই জেনেরিক নাম বললাম, মেট্রোনিডাজল (metronidazole) কি পাওয়া যাবে? সে গুগল করে বলল, এটা তো অ্যান্টিবায়োটিক। ওভার দি কাউন্টার পাওয়া যাবে না। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন লাগবে। আবার তুমি জার্মান নাগরিক না, যে হাসপাতালে নেব। প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে গেল। ভাষান্তর করে সব বোঝার পর আমাকে লিকুইড ওষুধ দিল ডাক্তার। দেখতে হোমিওপাথির খয়েরি বোতলের মতো । সেটা কয়েকদিন খেতে বললেন, আর বললেন বিশেষ একধরণের নোনতা রুটি খেতে। আমি তাই কিনে খেলাম, দুইদিনে সেরে উঠলাম।

একবার সেকেন্ড ইয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার আগে মহল্লায় পক্স, প্রতিবছর মে মাসে হয়। আম্মা আমাদের ঠাণ্ডা জায়গায় থাকতে বলেন, শীতল থাকতে বলেন, করলা ভাজি খাওয়ান। সবচেয়ে বড় ব্যাপার নিজেরাও সাবধানে থাকি, সময়মত খাই। গোসল করি। কিন্তু সেটা আমার ছোট-ভ্রাতা শোনে না। ও পড়ে স্কুলে । ফিরেই ব্যাগ ফেলে দৌড় দেয় খেলতে। আম্মার হাজার বারণেও কাজ হয় না।যথারীতি পক্স বাঁধিয়ে আনল। প্রথমে তিনদিনের মাথায় সেরে উঠল ; ওর পরে বড়ভাই, সে ভুগল এক সপ্তাহের মতো। অবশেষে বাড়ীর শেষ অভিযাত্রী হিসাবে আমার জীবনে বসন্ত এলো। মে-জুনের বিভীষিকাময় গরম। আর আমার রুমের ছাদ ছিল টিনের। সকাল না গড়াতেই চিটচিটে গরমে রুমের প্রতিটা আসবাবপত্র উষ্ণ হয়ে উঠত। বিছানার চাদর হয়ে উঠত গরম। আমার সারা শরীর জুড়ে টসটসে ফোস্কার মতো পক্স। আমি সেই বীভৎস গরমে টিনে চালের রুমে পাক্কা এক মাসের বেশি পক্স নিয়ে জেরবার হলাম। শরীরের হেন জায়গা ছিল না , পক্স হয়নি । সংক্রমণ যাতে না ছড়ায় , সেজন্য আমি সারাদিন রুমে। শুয়ে শুয়ে সময় কাটত না। শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাতাম আর আর যাকে ইচ্ছে তাকে অভিশাপ দিতাম। অভিশাপের বেশির ভাগ আমার অনুজের দিকেই ধাবিত হত। বসন্ত চলে গেল রেখে গেল সারা শরীর জুড়ে তার স্মৃতিচিহ্ন।

অধুনা টুকটাক জ্বরজারির প্রকোপ ছাড়া বেশিরভাগ সংক্রামক ব্যাধি থেকে মুক্ত ছিলাম।
তারপরেও ডেঙ্গু আর চিকনগুনিয়ার সময় এলেই সাবধানে থাকতাম। বেশ কয়েকবছর কোনরকমে পার পেলেও চিকনগুনিয়া ২০১৭ সালে ছুঁয়ে গেল। শুধু প্যারাসিটামল আর বিশ্রামে জ্বর চলে গেলেও ক্লান্তি গেল না। ভয়ংকর ক্লান্তি। প্রতিদিন সকালে উঠে দেহটাকে বয়ে নেওয়া, প্রাতঃকৃত্য সারা, জামাকাপড় পড়ে অফিসে যাওয়া, সবকিছুতেই আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। যে আমি প্রত্যেক হাঁটতে যেতাম, সেই আমি এতো লিথার্জিক হলাম যে টানা বছর দেড়েক সবরকম শারীরিক ব্যায়াম থেকে দূরে থাকলাম।

এবছর রোজার শেষপ্রান্তে মে মাসে শ্বশুরকে নিয়ে ডায়ালাইসিসের জন্য হাসপাতালে। ক্যান্টিন বন্ধ। পাশের নামকরা বিরিয়ানির দোকান থেকে বিরিয়ানি নিয়ে আসা হল। তিনজন খেলাম, কারো কিছু হলো না ; আমার হল ফুড পয়জনিং।

সেটা সপ্তাহ খানেক ভোগাল। এই খাই সেই খাই, কোনভাবেই কিছু হচ্ছিল না বলে ডাক্তারের পরামর্শে আবার সেই অ্যান্টিবায়োটিক ডোজ।

আমি সবকিছুতেই অতিরিক্ত স্পর্শকাতর। সবাই সামান্যতে পার পেয়ে গেলেও , আমি ধরা খেয়ে যাই। শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দুর্বল। প্রায় অকেজো দাঁতের পাশাপাশি , জণ্ডিসে লিভার, ধূমপানে ফুসফুস। আব্বা-আম্মা, ভাইয়ার উচ্চ রক্তচাপ ডায়াবেটিকে কিডনি ফেল । আমার হৃদপিণ্ড ভেবেছিলাম কাজ করছে ঠিকঠাক। গত জানুয়ারি থেকে জানা গেল সেটাতেও ঝামেলা পাকিয়ে বসে আছি। এখন নিয়মিত ওষুধ খেতে হচ্ছে।

কয়েকদিন ধরে মনে হচ্ছে, করোনা থেকে যতোই পালাই ; এটা সবাইকে স্পর্শ করবেই। আজ না হোক কাল, কাল না হোক পরশু। আগস্টে না হোক, অক্টোবরে। ডিসেম্বরে না হোক জানুয়ারিতে। আমি ভয় কাটিয়ে উঠেছি। হবেই যেহেতু, নিজেকে যতদূর পারি প্রস্তুত রাখি যুদ্ধ করার জন্য। জীবনের এতোগুলো ধাক্কা যেহেতু কাটিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি, এ যাত্রায়ও পার পেয়ে যাব আশা করছি।

প্রকাশকালঃ ২৩শে জুন,২০২০

খুশবন্ত সিং এর জোকস

বহুদিন আগে এক বাঘ জঙ্গল থেকে লোকালয়ে চলে এসে ধীরে ধীরে মানুষখেকো হয়ে গেল।
গ্রামবাসীরা ভয়ে অস্থির। সবাই একত্রিত হয়ে আলাপ-আলোচনা করছিল, কী করে এই অবাঞ্ছিত বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

এক সাহসী শিখ সর্দার গোঁফে তা দিয়ে, হাতের পেশী ফুলিয়ে বলল, ‘আমি একাই এই মানুষখেকো বাঘকে মারব।

আমাকে শুধু একটা গরুর ছাল এনে দাও। আর মনে রেখো ,আজ রাতে কেউ যেন বাইরে বের না হয়। তোমরা সবকিছু আমার উপর ছেড়ে দাও।’

তো , সেই রাতে গরুর ছদ্মবেশে শিখ সরদার বাঘের টোপ হিসাবে অপেক্ষা করতে লাগল।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছিল ।
হঠাৎ গ্রামবাসী শুনল, কেউ গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করছে ।

সবাই শব্দের উৎসস্থলের দিকে ছুটে গিয়ে দেখতে পেল বাঘ মারতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ শিখ মাটির উপরে পড়ে আছে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থান দিয়ে রক্তপাত হচ্ছে।
একজন তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার ? তুমি কি বাঘটাকে মারতে পেরেছ ?’
ইতোমধ্যে কিছু উৎসাহী গ্রামবাসী চিৎকার করা শুরু করে দিল, ‘সরদারজি জিন্দাবাদ, সরদারজি জিন্দাবাদ !’

‘চুপ করো ! তোমরা সবাই বিশ্বাসঘাতক ! বেঈমান!’
সে গর্জন করে উঠলো, ‘আগে আমাকে বলো, ওটা কার ষাঁড় ছিল? কার ষাঁড় আজ দড়ি ছিঁড়ে পালিয়েছিল ?’

প্রকাশকালঃ ২৫শে মে, ২০২০

রাজকুমার হিরানি। সাক্ষাৎকার

রাজকুমার হিরানি : জীবনে থামতে জানতে হয়

পিকে (২০১৪) ও থ্রি ইডিয়টস (২০০৯) ছবির জন্য আলোচিত রাজকুমার হিরানি। হিরানি পরিচালিত অন্য দুটি চলচ্চিত্র মুন্নাভাই এমবিবিএস (২০০৩) ও লাগে রাহো মুন্না ভাই (২০০৬)। তাঁর জন্ম ১৯৬২ সালের ২০ নভেম্বর ভারতের নাগপুরে। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন চলচ্চিত্রকে।

আপনার জীবনাদর্শ কী? জীবনে বহুবার আমি এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। কখনোই প্রকৃত উত্তর খুঁজে পাইনি। আমরা আসলে কেউই জানি না আমরা কেন এই ধরাধামে এসেছি। মানুষ বাঁচে কত দিন? বড়জোর ষাট, সত্তর কিংবা আশি বছর? প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনি যদি মনে করেন জীবনটা খুবই সংক্ষিপ্ত, তাহলে দেখবেন, জীবনটাকে আপনি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা প্রায় সবাই মনে করি, আমাদের হাতে প্রচুর সময় রয়েছে, জীবনের আয়ু সংক্ষিপ্ত নয়।

তাই আমি মনে করি, আমাদের প্রতি মুহূর্তে মনে করা উচিত, এ পৃথিবীতে আমাদের সময় খুব, খুব সামান্য। আজ থেকে ৫০ অথবা ৭৫ বছর পর কেউ হয়তো আমাকে আর চিনবে না। তো এসব চিন্তা করে ঘুম নষ্ট করার দরকার কী! এসব নিয়ে আমি মোটেও মাথা ঘামাই না। আমাদের প্রয়োজন টাকা, আমাদের প্রয়োজন সম্পদ, কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, এসব অর্জনেরও একটা সীমা আছে। আমি মনে করি, মানুষের জীবনে সত্যিকার অর্থে দুটি সমস্যা আছে—এক. স্বাস্থ্য ও দুই. দারিদ্র্য।

আপনি দেখবেন, যারা জ্যোতিষীর কাছে যায়, তারা জানতে চায় তাদের টাকাপয়সা কিংবা সম্পদ হবে কি না, তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে কি না ইত্যাদি। কারণ জীবনের শেষ বেলায় এক সকালে উঠে আপনার মনে হবে, আপনার দেখভাল করার মতো কেউ আছে কি না। আর তখনই আপনার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে।
আমি মনে করি, আমি সব সময় ও রকমটাই ভাবি। এটা কিছুটা বংশগত ব্যাপারও বটে। আমি সৌভাগ্যবশত এমন এক পরিবারে জন্মেছি যে পরিবারটা খুব একটা ধনী ছিল না। তবে বাবা চিন্তা-চেতনায় ছিলেন যথেষ্ট আধুনিক।

একবার আমাকে খুব ভয় দেখানো হলো। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে জানলাম, শরীরের কোনো একটা অংশ ঠিকঠাকমতো কাজ করছে না। চিকিৎসক বললেন, পরিবারের কাছে ফিরে যান, আপনি খুব শিগগিরই জটিল রোগে আক্রান্ত হবেন। চাপের মধ্যে ভালো কাজ করা মানে অনেকটা সংগ্রাম করার মতো। আমি সব সময় চেষ্টা করি এই ‘মানসিক চাপ’ বিষয়টাকে পাত্তা না দিতে।

বিলিয়ার্ড খেলোয়াড় গীত সিতাই একবার আমাকে বলেছিলেন, তিনি একবার থাইল্যান্ডে ফাইনাল খেলা খেলছিলেন। তাঁর প্রতিপক্ষের নাম ছিল সম্ভবত ওয়াত্তানা। এই খেলোয়াড় প্রচুর পয়েন্ট নিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই একটা খেলায় হেরে গেলেন এবং তারপর একের পর এক হারতে লাগলেন। স্বাভাবিকভাবেই গীত তখন খুব অবাক হয়েছিলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ব্যাপার কী? উত্তরে ওয়াত্তানা বলেছিলেন, আমি মনে করি, আমি সেই খেলায় অবশ্যই জিততাম। কিন্তু আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল পুরস্কারের টাকার দিকে। আমি ভাবছিলাম, পুরস্কারের টাকা পেলে আমার বাবার জন্য একটা বাড়ি কিনব। এই ভাবনা আমাকে কিছুটা বিভ্রান্ত করেছিল। আমি তখন কিছুটা নার্ভাস বোধ করছিলাম। কিছুতেই খেলায় মনঃসংযোগ করতে পারছিলাম না এবং যার ফলে আমার প্রতিপক্ষ খেলাটায় জিতেছিল।
গীতের এই গল্প থেকে আমি শিখেছিলাম, আপনি কী করছেন, তার লক্ষ্য ঠিক রাখা খুবই জরুরি।

আমি সম্প্রতি ক্রিস্টোফার নোলানের একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি কোনো মুঠোফোন ব্যবহার করেন না। এমনকি তাঁর কোনো ই-মেইল আইডিও নেই। প্রতিদিন আপনি নাছোড় বান্দার মতো অন্তত ২০ হাজার মানুষের মনোযোগ চান। কিছু মানুষ এ বিষয়টিকে উপভোগ করতে পারে, তবে কিছু মানুষ মনে করে এটা এক ধরনের চিত্তবিনোদন। তো এ কথা বললাম এ জন্য যে আমাকে বিরক্ত করার কেউ নেই, না ফোন, না কোনো মানুষ। কিন্তু যখন আপনি একটু একটু করে পরিচিত হয়ে উঠবেন, তখন অনেক কিছুই আপনার পিছু লাগবে। জগতে চিত্তবিনোদনের অনেক উপাদান আছে। আপনাকে কর্মে সফল হতে হলে ওই সব থেকে অবশ্যই নিজেকে দূরে রাখতে হবে।

প্রত্যেকের বোঝা উচিত, ‘প্রয়োজন’ ও ‘লোভের’ মধ্যে পার্থক্য কী। আপনার জানা উচিত, ঠিক কোন জায়গাতে আপনাকে থামতে হবে এবং এটাও জানা উচিত, ‘আর নয়, বহুত হয়েছে’ কথাটা কখন বলতে হবে। অনিশ্চয়তা আপনাকে খতম করে দিচ্ছে? পৃথিবীর সবেচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তির দিকে তাকান, তিনিও বলবেন, ভয় লাগে, কখন সব শেষ হয়ে যায়! আপনি যদি এই অনিশ্চয়তার ভয় কাটাতে পারেন, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।

অনেকেই আপনাকে খারাপ মানুষ মনে করতে পারে। কিন্তু আপনি নিজেকে কখনোই খারাপ মনে করেন না। এটা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। এ বিষয়টি প্রথম মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল বোমান ইরানি, যখন আমরা একসঙ্গে মুন্না ভাই এমবিবিএস বানাচ্ছিলাম তখন। বিষয়টি নিয়ে বোমানের সঙ্গে অনেক বিতর্ক হয়েছে আমার। এরপর থেকে আমি যখন আমার ছবির কোনো চরিত্রের কথা ভাবি, তখন কখনোই সেই চরিত্রকে ‘ভিলেন’ হিসেবে ভাবি না। কারণ সে তাঁর জীবনে তো ‘হিরো’। নিজের জীবনে মানুষ কখনো নিজেকে ‘খলনায়ক’ হিসেবে দেখে না। সে কখনোই ভাবে না যে সে একজন খারাপ মানুষ।

সুতরাং এখন আপনি বুঝতেই পারছেন, আমরা আমাদের মাথার ভেতর আসলে গল্প তৈরি করি, ভিলেন বানাই।
কিছুদিন আগে মুম্বাই ইউনিভার্সিটির উপাচার্যের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি বলেন, ক্লাসরুমভিত্তিক শিক্ষার দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের বাচ্চাদেরও হাতে পৌঁছে গেছে আইপ্যাড, আইফোন। এ যন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে ভালো শিক্ষক।

থ্রি ইডিয়টস দেখার পর কত মানুষ আমার কাছে এসেছে, আমি তা বলে বোঝাতে পারব না। তারা বলেছে, তাদের মধ্যে কত গলদ আছে! আমি আপনাকে বলতে পারব না যে কত প্রকৌশলী আমার কাছে এসেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘আমরা ভুল পেশায় আছি। আমরা এখন কী করব? আমরা এ পেশা ছাড়তেও পারি না। ভয় লাগে, কারণ এটাই যে আমাদের উপার্জনের পথ। কেউ কেউ অবশ্য ছেড়েও দিচ্ছেন। কিছু চিকিৎসকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তাঁরা তাঁদের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।’

উপাচার্য মহাশয় সেদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ আছে। শিক্ষাব্যবস্থার বদল প্রয়োজন। কিন্তু এটা বদলাতে সবাই ভয় পায়। যেদিন আমরা এই ভয় থেকে মুক্ত হতে পারব, সেদিনই সত্যিকার পথ খুঁজে পাব।’

আমার মনে হয়, জীবনে সফল হওয়ার জন্য যেকোনো একটা বিষয় প্রয়োজন। কিন্তু মানব সম্প্রদায় হিসেবে আমরা বরাবরই আমাদের জীবন ও মনকে উদ্ভট পথে পরিচালিত করি। বেঁচে থাকার জন্য কিছু অর্থ উপার্জন করুন। দ্যাটস অ্যানাফ!

যাহোক, আমি শিক্ষা নিয়ে কথা বলছিলাম। বলছিলাম যে আমরা আসলে বাস করি কয়েক হাত ঘুরে আসা জ্ঞানের মধ্যে। বিষয়টি আর একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। যখন একটি পশু মারা যায়, সে আসলে মারাই যায়। পশুদের এমন কোনো প্রজন্ম নেই যারা তাদের জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সরবরাহ করতে পারে। কোনো পশুই বই লিখতে পারে না, যে বই বছরের পর বছর অন্য প্রাণীরা পড়তে পারে, কিন্তু মানুষ পারে। তাই মানুষের জ্ঞান আসলে ‘সেকেন্ডহ্যান্ড নলেজ!’

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে মারুফ ইসলাম। প্রথম আলো, ১৮ই জানুয়ারি, ২০১৫

কোভিড কিংবা ছিনতাইয়ের কাহিনী

টেক্সটাইলের চাকরি ছেড়ে সদ্য গার্মেন্টসের মার্চেন্ডাইজিং-এ ঢুকেছি। ওপেক্স গ্রুপে। মিরপুর ১১ নাম্বারের বাসা থেকে কোনভাবে ১০ নং গোলচত্বরে পৌঁছে সহজলভ্য যানবাহন ছিল শেয়ারের সিএনজিতে সৈনিক ক্লাবে নামা । পাশেই মহাখালী ডিওএইচএসের ২৮ নাম্বার রোডে ছিল ওপেক্স-এর হেড অফিস।

৯৯ সালের কথা বলছি ; সন্ধ্যা হোক, রাত হোক বাসায় ফিরে আসার সময়টাতেও সেই একই উপায়। মিরপুর ১৪ নাম্বার থেকে মিরপুর ১০নং গোলচত্বরের রাস্তা সারাটা দিন বেশ ব্যস্ত থাকলেও সন্ধ্যার পর ঐ রাস্তার স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে কেমন যেন থমথমে হয়ে যেত। কোন বড় বাস ঐ রাস্তায় চলত না। রিকশা, সিএনজি আর মাঝে মাঝে কিছু প্রাইভেট কার।

আমার জন্ম ঢাকায়, বেড়ে ওঠাও । মহল্লায় পাশের রোডে আওয়ামীলীগের জাতীয় পর্যায়ের নেতা থাকে। দুই রোড পরে থাকে ঢাকার সেই সময়ের বিখ্যাত ছাত্রনেতা। বড়ভাইয়ের বন্ধুরা কেউ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা, তো কেউ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা। অনেকের সঙ্গে চেহারায় পরিচয়। ‘এই তুমি সাজুর ভাই না ?’ ‘এই তুমি উকিল সাহেবের ছেলে না?’ ছোটখাটো মস্তানি, ছিনতাই এগুলোকে আমি ও আমাদের প্রজন্মের কেউ গোনায় ধরতাম না। আমাদের গায়ে ঢাকার শহরের কেউ টোকা দিয়ে পার পেয়ে যাবে, এটা ভাবতেই পারতাম না।তখন, সবে মোবাইল ফোন সহজলভ্য হয়ে উঠছে। বেতন পেতাম ৮,৭০০ টাকা ; একমাসের বেতনের টাকা দিয়ে নকিয়া ৩১১০ সেট কিনলাম, সঙ্গে গ্রামীণ ফোনের প্রিপেইড কানেকশন। উফ ! সেই ৬ টাকা প্রতি মিনিট কলরেটের যুগ ; ভ্যাট সহ ৬টাকা ৯০ পয়সা ! ফোন হয়ে গেল জীবনের চেয়েও প্রিয়। বারবার প্যান্টের সঙ্গে মুছি, আর পকেটে ঢুকিয়ে রাখি। দিনে তিনবার করে রিং টোন চেঞ্জ করি। সারাদিনে পিএম, কিউসি আর কিউসি ম্যানেজারদের ফোন আসে । হবু স্ত্রীর সঙ্গে সপ্তাহে একবার কথা হয় কী হয় না।

তো ঐ সময়ে একদিন সন্ধ্যায় সৈনিক ক্লাবের কাছে এসে শেয়ারের সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছি। সন্ধ্যার কিছুটা সময় সুপার পিক আওয়ার থাকে। একসঙ্গে এতো লোক কোথা থেকে এসে যে হাজির হয় ! একটা বাহন মোড় ঘুরতে না ঘুরতেই সেকেন্ডের দশভাগের একভাগ সময়ে সেটা ভরে যায়। হুস করে সেটা চলে যাওয়ার পরে অপেক্ষা। কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে হাঁটা ধরে, কচুক্ষেতের মোড় থেকে রিকশা নেওয়ার চিন্তা করে। ফিরতি যাত্রীরা কোনমতে একটা পা বাইরে রাখতে না রাখতেই, দুই পাশ দিয়ে অন্য যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে উঠে পড়ছে।

আমি মিনিট দশেক অপেক্ষা করে একটা ফাঁকা সিএনজি আসতে না আসতেই দৌড় দিয়ে উঠে পড়লাম। দুইপাশ থেকে কাঁধে ব্যাগসহ আরো দুই অফিস যাত্রী উঠে পড়ল। ড্রাইভারের পাশে আরেকজন । ক্যান্টনমেন্ট পার হয়ে , ১৪ নম্বরের মোড় পার হতেই দুইপাশ থেকে দুই আরোহীর চাপ অনুভব করলাম। বাঁ পাশের জন আমার কোমরে লোহার রড বা পিস্তলের মতো কিছু একটা দিয়ে খোঁচা দিয়ে ফ্যাঁসফেঁসে গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই কোথায় আছেন?’ এদিক সিএনজি চলছে এখনকার পুলিশ কোয়ার্টার, পার হয়ে সামনের ন্যাম বিল্ডিং এর পাশে এসে পৌঁছেছি। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বুঝে ফেলেছে আমি ছিনতাইকারীর পাল্লায় পড়েছি। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, আমাকে ! শেষ পর্যন্ত আমাকে ছিনতাইকারী ধরল ! তাও আমার নিজের এলাকা মিরপুরে, যেখানকার অলিগলি তস্যগলি আমার চেনা! আমি সত্য মিথ্যা মিশিয়ে বললাম , ‘গার্মেন্টসে কাজ করি। ওপেক্স কারখানার ফ্লোরে।’

কথা বলতে বলতেই , ডানপাশের লোকটা একটা ক্ষুর বের করে আমার গলায় ধরল। ঐ রাস্তায় স্ট্রীটলাইট ছিল না। নির্মাণাধীন বিল্ডিংগুলোর ঝাপসা আলোতে ক্ষুরটা আরো চকচক করছিল। বলল, ‘বুঝতেই তো পারছেন আমরা কারা।’ পুরো সময়টাতে আমার দুই হাত তাঁদের পিঠ দিয়ে চেপে ধরে আমার মানিব্যাগ বের করে টাকা গুণে ফেলল । আর অন্য পকেট থেকে আমার সেই সখের নকিয়া মোবাইল বের করে জিজ্ঞেস করল, ‘মোবাইল কার ?’ আমি কী মনে করে বললাম ‘কারখানার মোবাইল, আমাকে ব্যবহার করতে দিয়েছে।’ আমি সবচেয়ে ভয় পাচ্ছিলাম যদি মোবাইলটা নিয়ে নেয়। এতো শখের মোবাইল আমার ! কিন্তু আশ্চর্য ! ছিনতাইকারীরা মোবাইলটা শার্টের বুক পকেটে ঢুকিয়ে প্রায় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিল।

এবং ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে নামার ঠিক আগ মুহূর্তে আমার চোখে মলম বা জামবাক কিছু একটা ঘষে দিল। বলল ‘পিছনে তাকাবেন না।’ আমি নীচে হুমড়ি খেতে খেতে টাল সামলালাম কোনমতে। চোখে তীব্র জ্বালা-পোড়া । রাস্তা কোনদিকে, ফুটপাত কোনদিকে ঠাহর করতে পারছিলাম না। ভয়ংকর যন্ত্রণা । একটু দুরেই রাড্ডা বারনেন হাসপাতালের পাশের মুদিদোকান থেকে দুজন কাছে এসেই বুঝল কি হয়েছে। মনে হলো এরা প্রায়ই এসব দেখে অভ্যস্ত। একজন দয়া করে পানি এনে দিল, পানির ছিটা দিতে দিতে, কিছুটা চোখ খুলেই ভাইয়াকে ফোন দিলাম। বললাম ‘ছিনতাই হয়েছে । বেশী টাকা ছিল না , ৩১৫ টাকার মতো ছিল, ৭টাকা ফেরত দিয়ে রেখে বাকী টাকা নিয়ে গেছে।’ বাসায় গেলাম না, মহল্লার আড্ডায় গেলাম।

মহল্লার বন্ধুরা আমাকে শুকরিয়া করতে বলল। কারণ আমার যে গাঁট্টাগোট্টা স্বাস্থ্য, আমার মত লোকেরা নাকি প্রায়ই গাঁইগুঁই করে, প্রতিহত করতে যায় ছিনতাইকারীদের এবং ছিনতাইকারীরাও তাদেরকে ধাওয়া করতে যাতে না পারে সেজন্য এই টাইপের লোকেদের হালকা(!) পাঁড় মেরে যায়। গত কয়েক সপ্তাহে হাসপাতালে এরকম হালকা পাঁড় দেওয়া যাত্রীদের কয়েকজনের অকালপ্রয়াণও ঘটেছে। আমাকে যে শুধু মলম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে সে আমার কপাল। বড়ভাইদের দিয়ে থানা পুলিশ করলে কী কী হতে পারে সেটা বিবেচনা করা হল। কারণ, ওই সময়ে ঢাকার রাস্তা ভাসমান ছিনতাইকারী ভরে গিয়েছিল। শোনা গেল ঐ রুটের ছিনতাইকারীরা কোন নির্দিষ্ট নেটওয়ার্কের না। এদেরকে ধরার চেষ্টা করা প্রায় দুঃসাধ্য। একই রুটে কেউ দুই তিন মাসের ভিতরে আর ফিরে আসে না। আর টাকার পরিমাণ যেহেতু সামান্য এবং আমার সাধের মোবাইল ছিনতাই হয় নি ; তাই সবার উপদেশ ছিল ছিনতাই নিয়ে থানাপুলিশ আর কেন্দ্রীয় নেতাদের না জড়ানোই ভাল।
যথারীতি রাত করে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।

সারাক্ষণ শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছিল, আমার ছিনতাই হয়ে গেল ! আমার !!!

পুরো ব্যাপারটায় একটা সূক্ষ্ণ অপমান ছিল, মনে হচ্ছিল কেউ আমাকে প্রকাশ্যে অপমান করেছে, যা আমি কোনভাবেই নিতে পারছিলাম না। রাতের খাবার ভালোমতো খেতে পারলাম না। কয়েকদিন কেমন যেন একটা অপমানের আবরণ আমাকে ছেয়ে থাকল। এর ফাঁকে আমি মনে মনে অনেক ধরণের চিন্তা করতাম ; সৈনিক ক্লাবে দাঁড়িয়ে ঐ দুই ছিনতাইকারীকে খুঁজতাম। ব্যাপারটা ভুলে যেতে প্রায় ছয়মাস লাগল।আমার সারাজীবনে ছিনতাই, হাইজ্যাক একবারই হয়েছে! ওই প্রথম, ওই শেষ !

প্রতিদিন করোনা ভাইরাসের ক্লিপ আর সাবধানবানী দেখতে দেখতে আজকে বহুবছর আগের ছিনতাইয়ের কথা কেন মনে পড়ল, বোঝার চেষ্টা করছিলাম।

আসলে কিছু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা নিজের জীবনেও যে ঘটতে পারে ; সেটা আমাদের কল্পনাতেও থাকে না। ঘটে গেলে, গভীর শোকে, দুঃখে, বেদনায় ক্ষোভে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। মিডিয়াতে প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত আর মৃত্যু-সংখ্যা আমাদের অনিশ্চিত, আতঙ্কিত করছে ; কিন্তু মনের গভীরে একটা আশা — অন্যের হলে হবে , আমার কী আর হবে ! আমার প্রিয়জন আর আমি এ যাত্রায় সুস্থই থাকব। এই আশাবাদ একদিক দিয়ে মন্দ না ! আবার অন্যদিক দিয়ে এই অর্থহীন আশাবাদ , অসাবধানতাতে কেউ যদি জীবনে প্রথমবারের মতো কোভিড-19 আক্রান্ত হয়েই যায় ; সেটাও তো তার জন্য শেষবারের মতো হতে পারে ! ছিনতাইকারীর স্মৃতিচারণ করতে পারছি ; অবহেলা, অসাবধানতায় কোন কাহিনী হয়ে গেলে –ফিরে আসার সুযোগ নাও তো থাকতে পারে!

প্রকাশকালঃ ২রা এপ্রিল,২০২০