করোনার দিনলিপি ১

ফোন করে কেউ না কেউ জিজ্ঞেস করে, কেমন আছি।

কেমন আছি?

দিনগুলো কাটছে হাসপাতালের ডিউটির মতো।

জীবনে কয়েকবার প্রিয়জনের জন্য হাসপাতালে ডিউটি দিতে হয়েছে। মূলত: তেমন কিছু করার থাকে না ;ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরের বারান্দায়, বেঞ্চে, চেয়ারে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত গভীর হতে থাকে। মানুষের আনাগোনা কমে । সিনিয়র ডাক্তাররা চলে যায়, ডিউটি ডাক্তার যাওয়া আসা করে । হাসপাতালের ফিনাইল-ফিনাইল গন্ধ নানা ওষুধের সঙ্গে মিশে কেমন দমবন্ধ একটা গন্ধ তৈরি করে। সেই গন্ধে আমি ঠিক বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি না। দূরের আবছায়া আলো-অন্ধকারে গাছগুলো মাথা দুলিয়ে চলে। করিডোরের মৃদু আলো। হয়তো মশা থাকে , ভ্যাপসা গরম থাকে । সবকিছুর উপরে থাকে একটা অনিশ্চিত অস্বস্তি। যে অস্বস্তি আমাকে ভাবায় -আবার কী স্বাভাবিক দিন ফিরে আসবে! যে প্রিয়জন শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায় তাঁকে নিয়ে কবে ফিরতে পারব বাসায়। কবে?

সামান্য কিছুতেই বিরক্তি চলে আসে। দারোয়ান ব্যাটা ঝিমায় কেন, ওকে টাকা দিয়ে রেখেছেই বা কেন? অন্য রোগীর অ্যাটেন্ডেন্ট এতো উচ্চস্বরে কথা বলে কেন ? নার্সটা এতো বেঢপ কেন? কাউকে ডাকলে সঙ্গে সঙ্গে কাছে আসে না কেন? আমার প্রিয়জন কেমন আছে, জিজ্ঞেস করার কাউকে খুঁজে পাই না কেন? হাসপাতালে সামান্য নিয়ম কানুনও নেই কেন? কর্তৃপক্ষ এতো উদাসীন আর দায়িত্বজ্ঞানহীন ! নানা ধরণের অর্থহীন অভিযোগ আর অপ্রয়োজনীয়তায় খচখচ করে।

সারারাত হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকা মানে তো জাগতিক সব প্রয়োজনীয়তার বাইরে কর্মহীন থাকা। কিন্তু সেই কর্মহীনতা আমাকে আরো বেশি করে শুষ্ক করে, ক্লান্ত করে, অবসন্ন করে। মনে হয় আমি একটা বিস্তৃত জীবনহীনতার ভেতরে আছি। জানি , আমার আরো অনেক প্রিয়মুখ আছে, কিন্তু আমার তো ক্ষুধা আছে, তৃষ্ণা আছে। সময় বয়ে চলে, একেক মিনিট মনে হয় একেক দুঃসহ ঘণ্টার মতো। আমি না পারি কিছু খেতে , না পারি ঘুমাতে। একটা ক্ষীণ জৈবিক দুরাশা , হয়তো একসময় বাসায় যেতে পারব, গোসল করে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিতে পারব। কিন্তু আমার হৃদয়ের অংশ আমার সবচেয়ে প্রিয়জনদের কেউ শুয়ে আছে ঐ দূরের বিছানায় ; জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, আর আমি কীনা ভাবছি দুটো ভালো খাওয়ার , একটু ঘুমের ! কেমন একটা অপরাধ বোধ আচ্ছন্ন করে আমাকে । তবুও নিজের বিছানার জন্য মনটা আকুল হয়।

ভোর হয় না। কিন্তু মনে হয় , অন্য আলোর আবছায়া দেখা যায় হাসপাতালের জানালায়। পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যায় কী ! আমি বসে থাকি একা ,নতুন ভোরের অপেক্ষায় !

প্রকাশকালঃ ১৯শে এপ্রিল,২০২০

কর্পোরেট ও করোনা সমাচার

আমাদের কর্পোরেট জগতে একটা অলিখিত নিয়ম আছে।
প্রতিষ্ঠানে কোন সুযোগ-সুবিধা চালু করার আগে অনেকবার চিন্তা করা হয়। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়, কোন না কোনভাবে যদি সেই সুবিধা না দিয়েই চালিয়ে নেওয়ার।

আসলে কোন একটা বিশেষ সুবিধা না থাকলে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে অনেকে হয়তো সমালোচনা করবে ; সেটা তেমন কোন ব্যাপার না। কিন্তু কোন সুবিধা যদি একবার পরীক্ষামূলক ভাবে চালু করা হয় , তখন সেটা সবাই মৌলিক অধিকার ও চিরস্থায়ী ভেবে বসে থাকে। হোক সেটা প্রফিট বোনাস, ইনসেন্টিভ, অল্টারনেটিভ হলিডে বা অন্য যে কোন ধরণের প্রণোদনা। একবার চালু করা সুবিধা পরবর্তীতে প্রত্যাহার করতে গেলে ব্যাপক মনমালিন্য ও হয়রানি হয়।

কয়েক শতক ধরে সারা পৃথিবীতে সকলেরই কমবেশি ছুটি ছিল। ছিল না শুধু পৃথিবীর নিজের ! গত কয়েকমাস কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রকোপে পৃথিবী নিজেই যেন কিছুদিনের ছুটি পেয়েছে। একটু জিরিয়ে নিচ্ছে, নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে।

মুশকিল হচ্ছে, হঠাৎ পাওয়া এই ছুটির ব্যাপারটা পৃথিবী যদি নিজের মৌলিক অধিকার ও চিরস্থায়ী ভেবে বসে তাহলে তো প্রতিবছর বা কয়েকবছর পরপর এই ছুটি চলতেই থাকবে !

প্রকাশকালঃ ১৬ই এপ্রিল, ২০২০

সুন্দরবনের বাঘিনী ও বানরের গল্প

বছর বিশেক আগে, মিডিয়ার রমরমা যুগের শুরু ! অবস্থা এমন যে যাই ঘটুক, যতোটুকুই ঘটুক, যেখানেই ঘটুক — সঙ্গে সঙ্গে তা মিডিয়াতে চলে আসা শুরু হয়েছে। স্কুলের অন্যতম রসিক বন্ধু ডাঃ জিল্লুর রহমান রুবেলের মুখে প্রথম শুনেছিলাম।

পুনশ্চ: চৈত্রের এই অসহনীয় গরমে সামান্য অশ্লীলতা ক্ষমার্হ !

ওই যে, সুন্দরবনের এক বাঘিনী ছিল যেটা বানরদের খুব উত্যক্ত করতো ! যখন তখন গাছের নীচে হুংকার আর নিরীহ বানর ভক্ষণ। বানরগুলোও বদের বদ ! হৈ হুল্লোড় করে হরিণ বা অন্য প্রাণীকে আগাম জানিয়ে দিত বাঘিনী আসছে।

তো, এই রকমই এক চৈত্রের দুপুরে বাঘিনী গাছের নিচে ঝিমুচ্ছে। এক পর্যায়ে গভীর ঘুম।
বদ বানরটার মাথায় চাপলো দুষ্টু বুদ্ধি। সে আস্তে আস্তে গাছ থেকে নেমে দিল বাঘিনীর পুটু মেরে।
উত্তেজনার শেষ পর্যায়ের ঝাঁকুনিতে বাঘিনীর গেল ঘুম ভেঙ্গে !

এও কি সম্ভব ? এও কি সম্ভব ? এও কি সম্ভব ? এত্তো বড় সাহস?

বানর দিল ছুট, বাঘিনী পিছু পিছু ! বানর ছুটছে, বাঘিনী ছুটছে। বাঘিনী ছুটছে, বানর ছুটছে। সুন্দরবন বড্ডো এলোমেলো। বানর ছুটছে জান বাঁচাতে , বাঘিনী ইজ্জতের সুরাহা করতে !
দৌড়াতে, দৌড়াতে, দৌড়াতে , দৌড়াতে দুপুর গড়িয়ে পড়ন্ত বিকেল। বানরের নাগাল আর পাচ্ছে না বাঘিনী।
তো পথে পড়লো ফরেস্ট অফিসারের ডাকবাংলো, ঘাসের লনের টেবিলে ধূমায়িত চায়ের কাপ, পাশে দৈনিক পত্রিকা রাখা ।
কোন এক কাজে ফরেস্ট অফিসার টেবিলে নেই। উপায়ন্তর না দেখে বানর সোজা যেয়ে চেয়ারে বসে পেপারটা মুখের উপর মেলে ধরে থাকলো।

বাঘিনী ইতিউতি তাকিয়ে সোজা যেয়ে বানরটাকেই ফরেস্ট অফিসার ভেবে, মৃদু বিনীত গলায় জিজ্ঞেস করলো, ‘স্যার এই দিক দিয়ে কি একটা বানরকে যেতে দেখছেন?’
পেপারের পিছন থেকে গম্ভীর গলার উত্তর আসলো, ‘কোন বানরটা, যেইটা একটু আগে এই বনের বাঘিনীর পুটু মেরেছে?’
বাঘিনী ভীষণ দুঃখে মর্মাহত গলায় বলে উঠলো, ‘স্যার এই খবর কি পেপারেও চলে আসছে?

প্রকাশকালঃ ১১ই এপ্রিল,২০২০

নারী।। হুমায়ুন আজাদ ( ১৯৯২) আলোচনা

“প্রতিটি সংস্কৃতি চায় ছেলেরা হবে সক্রিয় বা আক্রমণাত্মক , আর মেয়েরা হবে নিষ্ক্রিয়, অন্তর্মুখি বা আত্মসমর্পণাত্মক ; তাই ছেলেরা হয় মাস্তান আর মেয়েরা থাকে একটি রন্ধ্র নিয়ে বিব্রত। এটি যে সাংস্কৃতিক ব্যাপার, তা স্বীকার না ক’রে পিতৃতন্ত্র মনে করে পুরুষের পৌরুষ বাস করে তার একটি ঝুলন্ত নির্বোধ প্রত্যঙ্গে ও তার নিচের থলের ভেতরের একজোড়া অণ্ডকোষে। ”
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )

তাঁকে কেন বাংলাদেশের প্রধান প্রথাবিরোধী লেখক বলা হয়—উপরের কয়েকটা লাইন সেটা জাস্টিফাই করার জন্য যথেষ্ট মনে হয় আমার কাছে। এই বলার ভঙ্গী এখনকার ফেসবুক সেলিব্রেটিদের কারো কারো আছে হয়তো। কিন্তু তাঁর সময়ে এটা ছিল কল্পনাতীত।

বাইবেলের হিতোপদেশ বলেছে, “ পরকীয়া স্ত্রীর ওষ্ঠ হইতে মধু ক্ষরে, তাহার তালু তৈল অপেক্ষাও স্নিগ্ধ” ; এঙ্গেলস (১৮৮৪, ২২৬) বলেছেন, “ মৃত্যুর মতোই ব্যাভিচারের কোন চিকিৎসা নেই।”
বিয়ের সুখ কেমন? এঙ্গেলস বলেছেন, “ একপতিপত্নী বিবাহের উত্তম দৃষ্টান্তগুলির গড়পড়তা ধরলেও তা পরিণত হয় এক নিরেট একঘেঁয়েমির দাম্পত্য-জীবনে, যাকে বলা হয় দাম্পত্য সুখ।” এ বিয়ে পরিণত হয় এঙ্গেলসের মতে, স্থূল বেশ্যাবৃত্তিতে, বিশেষ করে স্ত্রীর বেলা। স্ত্রী আর পতিতা কি এক? এঙ্গেলস বলেছেন, “স্ত্রীর সঙ্গে সাধারণ পতিতার পার্থক্য এইটুকু যে সে ফুরনের মজুরের মতো নিজের দেহ ভাড়া খাটায় না,পরন্তু সে দেহটা বিক্রি করে চিরকালের মতো দাসত্বে ।”
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )

আমি বিবাহ/বিয়ে নামের এই সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা রাখি। আমি হুমায়ুন আজাদের ও এঙ্গেলসের সাথে দ্বিমত পোষণ করি , কিন্তু এঁদের মতামতকে অগ্রাহ্য করতে পারি না।

রবীন্দ্রনাথ , রুশো-রাসকিনদের মতোই, পুরুষতন্ত্রের মহাপুরুষ ; এবং প্রভাবিত ছিলেন ওই দুজন,ও আরো অনেককে দিয়ে। রোম্যানটিক ছিলেন তিনি, এবং ছিলেন ভিক্টোরীয়; নারী, প্রেম ,কবিতা,সমাজ, সংসার, রাজনীতি, জীবন এবং আর সমস্ত কিছু সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলেন তিনি পশ্চিমের রোম্যানটিকদের ও ভিক্টোরীয়দের কাছে; এবং সে-সবের সাথে মিশিয়ে চিয়েছিলেন তিনি ভারতীয় ভাববাদ বা ভেজাল। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার মৌলিকতা খুবই কম; তাঁর সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক চিন্তার সবটাই বাতিল হওয়ার যোগ্য।
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )

“ রবীন্দ্রনাথের সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক চিন্তার সবটাই বাতিল হওয়ার যোগ্য। ” এতো স্পর্ধিত উচ্চারণ আমি আর কারো মুখে শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। সত্যি বলতে কী , এখানে আমি হুমায়ুন আজাদের রবীন্দ্র বিদ্বেষে মর্মাহত ।

প্রেম ও কাম পরস্পরসম্পর্কিত, দুটিই নারীপুরুষের জীবনের বিশেষ পর্বে প্রবলভাবে দেখা দেয়, যদিও জীবনে দুটির গুরুত্ব সমান নয়। প্রেম স্বল্পায়ু, মানুষ প্রেমে বাঁচে না, জীবনে প্রেম অপরিহার্য নয় ; প্রেম বিশেষ বিশেষ সময়ে কোনো কোনো নরনারীর জীবনে জোয়ারের মতো দেখা দেয়, তাতে সব কিছু – অধিকাংশ সময় তারা নিজেরাই—ভেসে তলিয়ে যায়; তবে আজীবন মানুষ বাস করে নিষ্প্রেম ভাঁটার মধ্যে। প্রেম তীব্র আবেগ, তা ঝড় জোয়ার বন্যার স্রোত ঘুর্ণির মতোই ; ওগুলোর মতোই প্রেমও দীর্ঘস্থায়ী নয়, এবং বার বার দেখা দিতে পারে। ———-প্রেমের থেকে কামের আশ্লেষের আয়ু অনেক বেশী ; কাম দোলনা থেকে কবর চিতা পর্যন্ত বেঁচে থাকে। অপ্রেম জীবন দশকপরম্পরায় যাপন করে মানুষ, অধিকাংশের জীবনেই কখোনই প্রেমের ছোঁয়া লাগে না ; কিন্তু কামহীন জীবন অসম্ভব। যাদের কাম অচরিতার্থ, যারা সঙ্গী পায় না কামের, তারাও একান্ত কামযাপন করে। প্রেম বলতে গত আড়াইশো বছর ধরে পশ্চিমের পৃথিবী যা বোঝে , এবং পশ্চিম থেকে ঋণ করে আমরা যা বুঝি এক শতাব্দী ধরে, তা রোম্যানটিকদের আবিষ্কার।
পুরোনো পৃথিবীতে প্রেম ছিলোনা ; আজ আছে একটি বড়ো কিংবদন্তি হয়ে। যে- আবেগ প্রেম নামে নরনারীর মনে জেগে ওঠে বিপরীত লিঙ্গের কারো জন্যে, কিশোরতরুণের কাছে যা রক্তমাংসের অনেক ওপরের কোন স্বপ্ন বলে মনে হয়, তা আসলে মাংসের জন্য মাংসের সোনালী ক্ষুধা।
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )

আমার জন্য বহুশ্রুত, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার প্রায়শঃ বলে থাকেন আমি বহুবার শুনেছি। ‘প্রেম এমনই এক তীব্র আবেগ যা এভারেস্টের চূড়ার মতো; সেখানে একই সময়ে একজনই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। একসঙ্গে দুজনের জায়গা হয়না সেখানে!’

বিয়ে ও সংসার আজো নারীর জন্য প্রধান পেশা হয়ে আছে, প্রতিক্রিয়াশীলতা যেভাবে প্রবল হচ্ছে তাতে অচিরেই তা আবার একমাত্র পেশা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। সমাজ নারীকে আজো হতে বলে সুগৃহিনী ও সুমাতা, তাঁর কাছে দাবী করে সতীত্ব ও পাতিব্রত্য। ————–নারীর গর্ভধারণ একান্ত পাশবিক কাজ। নারীকে কি চিরকালই ধারণ করে যেতে হবে গর্ভ, পালন করে যেতে হবে পশুর ভুমিকা? গর্ভবতী নারী দেখতে অনেকটা গর্ভবতী পশুর মতো, দৃশ্য হিসাবে গর্ভবতী নারী শোভন নয়, আর গর্ভধারণ নারীর জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। একদিন হয়তো গর্ভধারণ গন্য হবে আদিম ব্যাপার বলে, মানুষ বেছে সন্তানসৃষ্টির বিকল্প উপায় ; তখন গর্ভধারণই নারীত্ব বলে মনে হবে না। নারী গর্ভধারণে আনন্দ পায় না। পুরুষতন্ত্রের শিক্ষার ফলে নারী আজো মনে করে গর্ভধারণেই তাঁর জীবনের সার্থকতা, কিন্তু এটা তা নয়। অধিকাংশ নারী এখনই গর্ভধারণপ্রক্রিয়া থেকে রক্ষা পেলে আনন্দে তা গ্রহণ করবে ; গর্ভবতী হওয়ার মধ্যে জীবনের কোনো সার্থকতা, মহত্ত্ব, পুণ্য নেই। একসময় নিয়ত গর্ভিনী থাকাই ছিল নারীর কাজ ; এখন গর্ভের সংখ্যা কমেছে, তাতে ক্ষতি হয়নি, বরং সমাজরাষ্ট্র এই চায়। আমূল নারীবাদীরা মনে করেন মানবপ্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নারীর নয়, পুরুষকে উদ্ভাবন করতে হবে সন্তানসৃষ্টির বিকল্প পথ; এবং কয়েক শো বছর পর গর্ভধারণ যে আদিম পাশবিক কাজ বলে গণ্য হবে তাতে সন্দেহ নেই।
——- নারীর ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করে নিতে হবে নিজেকেই। পুরুষ তার ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করবে না। নারীর ভবিষ্যৎ মানুষ হওয়া, নারী হওয়া নারী থাকা নয়।
হুমায়ুন আজাদ ( নারী ১৯৯২ )

হুমায়ুন আজাদের বিশাল ক্যানভাসের “ নারী ” গ্রন্থটি আমার মোটেও মৌলিক কিছু মনে হয় নি। এটি মূলতঃ নারীবাদী আন্দোলনের ধারাবাহিকতার অসংখ্য গ্রন্থের একটি সম্মীলন । লেখক গ্রন্থপঞ্জীতে প্রায় আড়াইশো বিভিন্ন ভাষার বইয়ের তালিকা দিয়েছেন, যেগুলো তাঁকে পড়তে হয়েছে, গবেষণা করতে হয়েছে দিনের পর দিন ; এই ব্যাপারটা আমাকে মুগ্ধ করেছে।

পুরো গ্রন্থের যে বিশেষ দিকগুলো আমাকে নাড়া দিয়েছে আমাকে আলোড়িত করেছে আমি তারই পুনরাবৃত্তি করলাম মাত্র।

প্রকাশকালঃ এপ্রিল, ২০১৫

রাজকুমার হিরানি। সাক্ষাৎকার

রাজকুমার হিরানি : জীবনে থামতে জানতে হয়

পিকে (২০১৪) ও থ্রি ইডিয়টস (২০০৯) ছবির জন্য আলোচিত রাজকুমার হিরানি। হিরানি পরিচালিত অন্য দুটি চলচ্চিত্র মুন্নাভাই এমবিবিএস (২০০৩) ও লাগে রাহো মুন্না ভাই (২০০৬)। তাঁর জন্ম ১৯৬২ সালের ২০ নভেম্বর ভারতের নাগপুরে। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও তিনি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন চলচ্চিত্রকে।

আপনার জীবনাদর্শ কী? জীবনে বহুবার আমি এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। কখনোই প্রকৃত উত্তর খুঁজে পাইনি। আমরা আসলে কেউই জানি না আমরা কেন এই ধরাধামে এসেছি। মানুষ বাঁচে কত দিন? বড়জোর ষাট, সত্তর কিংবা আশি বছর? প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনি যদি মনে করেন জীবনটা খুবই সংক্ষিপ্ত, তাহলে দেখবেন, জীবনটাকে আপনি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা প্রায় সবাই মনে করি, আমাদের হাতে প্রচুর সময় রয়েছে, জীবনের আয়ু সংক্ষিপ্ত নয়।

তাই আমি মনে করি, আমাদের প্রতি মুহূর্তে মনে করা উচিত, এ পৃথিবীতে আমাদের সময় খুব, খুব সামান্য। আজ থেকে ৫০ অথবা ৭৫ বছর পর কেউ হয়তো আমাকে আর চিনবে না। তো এসব চিন্তা করে ঘুম নষ্ট করার দরকার কী! এসব নিয়ে আমি মোটেও মাথা ঘামাই না। আমাদের প্রয়োজন টাকা, আমাদের প্রয়োজন সম্পদ, কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, এসব অর্জনেরও একটা সীমা আছে। আমি মনে করি, মানুষের জীবনে সত্যিকার অর্থে দুটি সমস্যা আছে—এক. স্বাস্থ্য ও দুই. দারিদ্র্য।

আপনি দেখবেন, যারা জ্যোতিষীর কাছে যায়, তারা জানতে চায় তাদের টাকাপয়সা কিংবা সম্পদ হবে কি না, তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে কি না ইত্যাদি। কারণ জীবনের শেষ বেলায় এক সকালে উঠে আপনার মনে হবে, আপনার দেখভাল করার মতো কেউ আছে কি না। আর তখনই আপনার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে।
আমি মনে করি, আমি সব সময় ও রকমটাই ভাবি। এটা কিছুটা বংশগত ব্যাপারও বটে। আমি সৌভাগ্যবশত এমন এক পরিবারে জন্মেছি যে পরিবারটা খুব একটা ধনী ছিল না। তবে বাবা চিন্তা-চেতনায় ছিলেন যথেষ্ট আধুনিক।

একবার আমাকে খুব ভয় দেখানো হলো। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে জানলাম, শরীরের কোনো একটা অংশ ঠিকঠাকমতো কাজ করছে না। চিকিৎসক বললেন, পরিবারের কাছে ফিরে যান, আপনি খুব শিগগিরই জটিল রোগে আক্রান্ত হবেন। চাপের মধ্যে ভালো কাজ করা মানে অনেকটা সংগ্রাম করার মতো। আমি সব সময় চেষ্টা করি এই ‘মানসিক চাপ’ বিষয়টাকে পাত্তা না দিতে।

বিলিয়ার্ড খেলোয়াড় গীত সিতাই একবার আমাকে বলেছিলেন, তিনি একবার থাইল্যান্ডে ফাইনাল খেলা খেলছিলেন। তাঁর প্রতিপক্ষের নাম ছিল সম্ভবত ওয়াত্তানা। এই খেলোয়াড় প্রচুর পয়েন্ট নিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই একটা খেলায় হেরে গেলেন এবং তারপর একের পর এক হারতে লাগলেন। স্বাভাবিকভাবেই গীত তখন খুব অবাক হয়েছিলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ব্যাপার কী? উত্তরে ওয়াত্তানা বলেছিলেন, আমি মনে করি, আমি সেই খেলায় অবশ্যই জিততাম। কিন্তু আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল পুরস্কারের টাকার দিকে। আমি ভাবছিলাম, পুরস্কারের টাকা পেলে আমার বাবার জন্য একটা বাড়ি কিনব। এই ভাবনা আমাকে কিছুটা বিভ্রান্ত করেছিল। আমি তখন কিছুটা নার্ভাস বোধ করছিলাম। কিছুতেই খেলায় মনঃসংযোগ করতে পারছিলাম না এবং যার ফলে আমার প্রতিপক্ষ খেলাটায় জিতেছিল।
গীতের এই গল্প থেকে আমি শিখেছিলাম, আপনি কী করছেন, তার লক্ষ্য ঠিক রাখা খুবই জরুরি।

আমি সম্প্রতি ক্রিস্টোফার নোলানের একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তিনি কোনো মুঠোফোন ব্যবহার করেন না। এমনকি তাঁর কোনো ই-মেইল আইডিও নেই। প্রতিদিন আপনি নাছোড় বান্দার মতো অন্তত ২০ হাজার মানুষের মনোযোগ চান। কিছু মানুষ এ বিষয়টিকে উপভোগ করতে পারে, তবে কিছু মানুষ মনে করে এটা এক ধরনের চিত্তবিনোদন। তো এ কথা বললাম এ জন্য যে আমাকে বিরক্ত করার কেউ নেই, না ফোন, না কোনো মানুষ। কিন্তু যখন আপনি একটু একটু করে পরিচিত হয়ে উঠবেন, তখন অনেক কিছুই আপনার পিছু লাগবে। জগতে চিত্তবিনোদনের অনেক উপাদান আছে। আপনাকে কর্মে সফল হতে হলে ওই সব থেকে অবশ্যই নিজেকে দূরে রাখতে হবে।

প্রত্যেকের বোঝা উচিত, ‘প্রয়োজন’ ও ‘লোভের’ মধ্যে পার্থক্য কী। আপনার জানা উচিত, ঠিক কোন জায়গাতে আপনাকে থামতে হবে এবং এটাও জানা উচিত, ‘আর নয়, বহুত হয়েছে’ কথাটা কখন বলতে হবে। অনিশ্চয়তা আপনাকে খতম করে দিচ্ছে? পৃথিবীর সবেচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তির দিকে তাকান, তিনিও বলবেন, ভয় লাগে, কখন সব শেষ হয়ে যায়! আপনি যদি এই অনিশ্চয়তার ভয় কাটাতে পারেন, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।

অনেকেই আপনাকে খারাপ মানুষ মনে করতে পারে। কিন্তু আপনি নিজেকে কখনোই খারাপ মনে করেন না। এটা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। এ বিষয়টি প্রথম মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল বোমান ইরানি, যখন আমরা একসঙ্গে মুন্না ভাই এমবিবিএস বানাচ্ছিলাম তখন। বিষয়টি নিয়ে বোমানের সঙ্গে অনেক বিতর্ক হয়েছে আমার। এরপর থেকে আমি যখন আমার ছবির কোনো চরিত্রের কথা ভাবি, তখন কখনোই সেই চরিত্রকে ‘ভিলেন’ হিসেবে ভাবি না। কারণ সে তাঁর জীবনে তো ‘হিরো’। নিজের জীবনে মানুষ কখনো নিজেকে ‘খলনায়ক’ হিসেবে দেখে না। সে কখনোই ভাবে না যে সে একজন খারাপ মানুষ।

সুতরাং এখন আপনি বুঝতেই পারছেন, আমরা আমাদের মাথার ভেতর আসলে গল্প তৈরি করি, ভিলেন বানাই।
কিছুদিন আগে মুম্বাই ইউনিভার্সিটির উপাচার্যের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি বলেন, ক্লাসরুমভিত্তিক শিক্ষার দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের বাচ্চাদেরও হাতে পৌঁছে গেছে আইপ্যাড, আইফোন। এ যন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে ভালো শিক্ষক।

থ্রি ইডিয়টস দেখার পর কত মানুষ আমার কাছে এসেছে, আমি তা বলে বোঝাতে পারব না। তারা বলেছে, তাদের মধ্যে কত গলদ আছে! আমি আপনাকে বলতে পারব না যে কত প্রকৌশলী আমার কাছে এসেছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘আমরা ভুল পেশায় আছি। আমরা এখন কী করব? আমরা এ পেশা ছাড়তেও পারি না। ভয় লাগে, কারণ এটাই যে আমাদের উপার্জনের পথ। কেউ কেউ অবশ্য ছেড়েও দিচ্ছেন। কিছু চিকিৎসকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তাঁরা তাঁদের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।’

উপাচার্য মহাশয় সেদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ আছে। শিক্ষাব্যবস্থার বদল প্রয়োজন। কিন্তু এটা বদলাতে সবাই ভয় পায়। যেদিন আমরা এই ভয় থেকে মুক্ত হতে পারব, সেদিনই সত্যিকার পথ খুঁজে পাব।’

আমার মনে হয়, জীবনে সফল হওয়ার জন্য যেকোনো একটা বিষয় প্রয়োজন। কিন্তু মানব সম্প্রদায় হিসেবে আমরা বরাবরই আমাদের জীবন ও মনকে উদ্ভট পথে পরিচালিত করি। বেঁচে থাকার জন্য কিছু অর্থ উপার্জন করুন। দ্যাটস অ্যানাফ!

যাহোক, আমি শিক্ষা নিয়ে কথা বলছিলাম। বলছিলাম যে আমরা আসলে বাস করি কয়েক হাত ঘুরে আসা জ্ঞানের মধ্যে। বিষয়টি আর একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। যখন একটি পশু মারা যায়, সে আসলে মারাই যায়। পশুদের এমন কোনো প্রজন্ম নেই যারা তাদের জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সরবরাহ করতে পারে। কোনো পশুই বই লিখতে পারে না, যে বই বছরের পর বছর অন্য প্রাণীরা পড়তে পারে, কিন্তু মানুষ পারে। তাই মানুষের জ্ঞান আসলে ‘সেকেন্ডহ্যান্ড নলেজ!’

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে মারুফ ইসলাম। প্রথম আলো, ১৮ই জানুয়ারি, ২০১৫