আমার জন্ম ৭৩ সালে পুরনো ঢাকায় র্যাঙ্কিন স্ট্রীট ওয়ারীতে।
পারিবারিক দুর্যোগে ঢাকা ছেড়ে নানাবাড়িতে থাকতে হয়েছিল বছর খানেক। আমার প্রথম স্কুল বাটিকামারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুমারখালী, কুষ্টিয়া। মাস তিনেক ওইখানেই হাতেখড়ি ; সম্ভবত: ৭৮/৭৯ সাল হবে। পরের স্কুল , মিরপুর উপশহর প্রাথমিক বিদ্যালয় ; মিরপুর ১নং বাস স্ট্যান্ড। বছর খানেক। ততদিনে আমাদের আদিবাস বিক্রি করে আমরা পুরনো ঢাকা ছেড়ে মিরপুরে চলে এসেছি। ক্লাস টু-এর মাঝামাঝি মিরপুর ১১ নাম্বারে বাসার পাশের একটা কিন্ডারগার্টেন জান্নাত একাডেমীতে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত ওখানেই। ক্লাস সিক্সে চলে আসি মিরপুর বাংলা উচ্চবিদ্যালয়, মিরপুর ১১-তে । এসএসসি দিলাম এখান থেকেই। পরে, ঢাকা কলেজ। একবছর জলাঞ্জলির কয়েকদিন কলাভবনে ইকোনমিকস-এ ! ভর্তি বাতিল করে বিজ্ঞান বিভাগের মান রক্ষা করতে কেমিস্ট্রিতে মাস ছয়েক। আবার অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রিতে মাইগ্রেট করার মুহূর্তে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ।
গ্রামের প্রথম স্কুলের তেমন কোন স্মৃতি মনে নাই। বড়মাঠ আর বিশাল বড়ই গাছের পাশে টিনের চালের স্কুল। মাঝখানে দেওয়ালের পরিবর্তে বাঁশের বেড়া। এক ক্লাসের হৈচৈ আরেক ক্লাসে পৌঁছে যায়। সেই স্কুলে কাজিনদের সঙ্গে স্কুলে গেছি কী যাই নি। রিলিফের সাদা অ্যারারুটের বিস্কুটে আর টিকা দেওয়ার ভয়ে স্কুলের জানালা দিয়ে হাপিশ হয়ে যাওয়া মনে আছে।
দ্বিতীয় স্কুল মিরপুর উপশহর প্রাথমিকের কথাও তেমন মনে নেই। বাস স্ট্যান্ডের কাছে, সারাক্ষণ রিকশা-গাড়ির প্যাঁ পোঁ আওয়াজ। বাসার কাজের লোক স্কুলে নিয়ে যেত আসত।
জান্নাত একাডেমীর কথা মনে আছে ভালোমতো। কো এডুকেশন / সহশিক্ষা ছিল। সামিনা, শাহানাজ, ইসরাত জাহান মিতুর কথা মনে আছে। ছেলেদের নাম মনে আছে কিছু, কিন্তু এই গ্রুপে এতো বেশি ছেলে যে ওরা প্রাসঙ্গিক না !
সামিনা ফার্স্ট গার্ল ছিল, আমি সেকেন্ড। সামান্য নাম্বারের ব্যবধানে প্রতিবার এই মেয়ে ফার্স্ট হত। কীভাবে যেন, এক স্যার আমাকে ছেলেমেয়ে তুলে খোঁচা দিল। আমি ক্লাস ফোরে অনেক নাম্বারের ব্যবধানে ফার্স্ট হওয়া শুরু করলাম সবাইকে পিছে ফেলে। শুরু হল আমার পড়ালেখার ইঁদুর দৌড়। পরীক্ষায় কেউ যদি ২টা রচনা পড়ে একটা কমন পায়, আমাকে পড়তে হয় ১৫টা , কারণ আমি ভাল ছাত্র। কোন রিস্কে নেওয়া যাবে না ! এই যে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার জন্য হুদাই বেশি বেশি পড়ার প্যারা এসএসসি পর্যন্ত চলল।
মিরপুর বাংলা উচ্চবিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা ক্যাম্পাস ছিল প্রায় মাইল খানেক দূরত্বে। মাঝে মাঝে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময়ে আমাদের উঠতি কৈশোরের আকুল চোখ মেয়েদের স্কুলের দিকে চেয়ে থাকত। আহা ! পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শনা পরীগুলো ঐ দালানে পড়ে। সদ্য যৌবনা এইট-নাইনের মেয়েরা বেণী দুলিয়ে স্কুলে যায় আর আসে। মেয়েদের স্কুলের মহল্লার ছেলেদের সঙ্গে প্রতিবেশী হিসাবে কোন কোন মেয়েদের পরিচয় আছে। আমরা ওদের কাছে গল্প শুনি আর হাপিত্যেশ করি। বয়েজ স্কুলে পড়লে যা হয় আর কী।তবে বছরের একটা দিন ‘ বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা’ হত ছেলেদের স্কুলের মাঠে। ওই দিন স্বর্গের সব উর্বশী , অপ্সরারা ধবধবে সাদা পোশাকে আমাদের মাঠে এসে হাজির হত। আমরা বয়েজ স্কুলের উঠতি বয়সের চ্যাংড়া পোলাপান জুলজুল করে চেয়ে থাকতাম।
বিকালে খেলার মাঠ থেকে ফিরে আসার সময়, কোন কোন ডেঁপো বন্ধু বলত ফিসফিসিয়ে, জানিস এইটা সামিনাদের বাসা, ওইটা ইভাদের বাসা, এইটা নার্গিসদের বাসা। আরে চিনলি না, ওই যে নোয়াখালীর নার্গিস বেশ দেখতে, মুকুল যার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, আর প্রতিদিন সকাল বিকাল বাইসাইকেল নিয়ে একনজর দেখার জন্য চক্কর দিচ্ছে। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওদের কথা শুনতাম। কারণ আমার সেই অর্থে কোন মেয়ে বান্ধবী ছিল না।
ক্লাস নাইনের কোচিং এ গিয়ে পরিচয় হল, অন্য স্কুলের ডাকসাইটে রূপসী নিপার সঙ্গে। গার্লস আইডিয়ালে পড়ে। দুলাভাই নামকরা ডেন্টিস্ট। স্কুলের মেয়েদের ভিতরে পরিচয় হল, সঞ্চিতা, লুসি, কান্তাদের সঙ্গে। কুল্লে এই !
পরবর্তীতে ভার্সিটি লাইফে আরও কয়েকজন সতীর্থ বান্ধবীদের সঙ্গে পরিচয়, ফারহানা হাকিম কণা ,সামিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
দুঃখের ব্যাপার এই যে, স্কুলে ৯০ সালে ছেলেদের ব্যাচে ছিলাম ১৬০ জনের মত। যাঁদের প্রায় ১৫০ জনের সংগেই খায়খাতির ছিল, এখনো কম বেশি আছে। অথচ একই স্কুলের ১৬০ জন মেয়েদের মধ্যে এখন পর্যন্ত চিনি মাত্র ১০ জনকে। কো-এডুকেশন স্কুল হলে হয়তো জীবনটা আরও মধুর, সৌকর্যময় ও অভিজ্ঞতালব্ধ হত। কী আর করা !
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়তে গিয়ে ১২০ জন ছেলেদের মধ্যে কী করে যেন দুই কিশোরীকে পেলাম। একজন নাইমা ইফফাত সুলতানা আরেকজন দেল রায়না মিত্রা। নাইমার আবার ক্যাম্পাসে আসার আগেই প্রেম ছিল সিনিয়র একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। মিত্রারও তাই।
তাহলে এই দাঁড়াচ্ছে যে, আমাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কৈশোর ও যৌবনে আমাদের নারী বন্ধুত্ব বিহীন এক শুষ্ক মরুভূমিতে কাটাতে হয়েছে।
৬ নং মহল্লার সঞ্চিতাদের ( Rahman Sanchita ) সঙ্গে পরিচয় সিক্স-সেভেন থেকেই। শহীদদের বাসায় ঈদে-পার্বণে দেখা হয়। একমাত্র সঞ্চিতার সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্ব দিনে দিনে আরও প্রগাঢ় হয়েছে। ও আমাদের একমাত্র বান্ধবী যে সম্পর্কের দাম দিতে জানে, সবধরনের রসিকতা বোঝে, আমাদের সকল বেদনার সমব্যথী। তুই তুই সম্পর্ক আজ ৩৫ বছর ধরে। ও একাই , অনেক বান্ধবী না থাকার দুঃখ ভুলিয়ে রেখেছে !
২০১৬ সালের স্কুলের ৫০ বছর পুর্তির রি-ইউনিয়নে ও তারপরে নতুন করে পরিচয় হল আরও কয়েকজনের সঙ্গে। আমরা অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, আমাদের এই স্কুল বান্ধবীদের অনেকেই তাঁদের ন্যাকামো ও অন্য সীমাবদ্ধতাসহ আটকে আছে সেই ক্লাস নাইনের মানসিকতায়। হতে পারে , এদের কারো কারো খুব কম বয়সে বিয়ে হয়ে গিয়ে অসময়ে সন্তানের লালনপালনের চাপে শুষ্কংকাষ্ঠং হয়ে গেছে। এদের কারো সন্তান ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। কেউ মেয়ে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করছে। আর সেখানে আমাদের ছেলেবন্ধুদের ছানাপোনা সবে প্রাইমারী- সেকেন্ডারি স্কুলে হামাগুড়ি দিচ্ছে । পুরনো স্কুল বন্ধুদের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হয়ে বান্ধবীরা নানা আদিখ্যেতায়, বাচালতায় মেতে উঠল। কিন্তু কোথায় যেন তার ছেঁড়া মনে হল।
ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন করে ভাইবার, মেসেঞ্জার পেয়ে নানা পুরনো কথার, পুরনো স্মৃতি ঝলসে উঠল। কে কার বাড়ির সামনে ঘোরাফেরা করত , কবে কোথায় ধরা খেয়েছে এই সব আর কী। কিন্তু সঞ্চিতা ও জাহাঙ্গীর নগরের ফারহানা হাকিম কণা ( Farhana Kona ) ছাড়া অন্য বান্ধবীদের রসবোধ সামান্য অথবা নেই। সামান্য ঠাট্টা ফাজলামোকে ন্যাকামো ও আদিখ্যেতার দিকে নিয়ে যায়। মুশকিল হচ্ছে, আমাদের কাছে সঞ্চিতা বন্ধুত্বের মানকে এমন একটা স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে গেছে, অন্যদের সঙ্গে আর ফ্রিকোয়েন্সি মিলল না।
এর মাঝে আমাদের পারিবারিক গেট টুগেদারে স্বামীসহ বান্ধবীরা ও সস্ত্রীক আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হল। খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা বার্ডে আমাদের ঝটিকা সফর হল। সঞ্চিতা-তুষার ভাইয়ের সঙ্গে দারুণ কিছু ঘোরাফেরা হল।( তুষার ভাই সঞ্চিতার হাজব্যান্ড, আরেক রসিক মানুষ )। আমি সঞ্চিতাদের বাসায় আছি, অথবা কোন রিসোর্টে কয়েক বন্ধু সহ সঞ্চিতা তুষার ভাইদের গ্রুপের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছি– এটা আমাদের স্ত্রীরা জানলে নিশ্চিন্ত থাকে। ভাগ্যিস, এই মেয়েটা ছিল, নইলে আমাদের স্ত্রীদের কাছে আমাদের সকল স্কুল বান্ধবীরা ন্যাকা ও ইমম্যাচিউর হিসাবেই চিহ্নিত হত।
যদিও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আমার পরিচয় হয়েছিল অসাধারণ কিছু বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে। যাদের অনেকেই এখন উদীয়মান লেখকের কাতারে আছে। কেউ কেউ সাংবাদিকতা ও অন্য মিডিয়াতে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। বান্ধবীদের অপ্রাপ্তিটাকে ওঁদের সঙ্গে সময় কাটালে ভুলে যেতে হয়।
ধান ভানতে শিবের গীত ! মোদ্দা কথা ডিজিটাল যুগে নতুন করে একটা গ্রুপে কেউ আমাকে অ্যাড করেছে ‘সারাবাংলা ৯০-৯২’ গ্রুপ। এখানে এসে আমি ঠিক সঞ্চিতার মানসিক বয়সের লেভেলের অনেক বান্ধবীকে হুট করে পেয়ে গেলাম। জানিনা আমাদের এই পরিচয় ও আড্ডা ভার্চুয়ালই থাকবে কীনা, অথবা কোনদিন কারো সঙ্গে কোন গেট টুগেদারে দেখাসাক্ষাৎ হবে কীনা। আমি নিজেকে বড্ডো বেশি সৌভাগ্যবান মনে করছি ; কারণ বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ আর সেমি-বয়েজ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির বঞ্চনাকে গ্রুপের অসংখ্য উদারমনা সমবয়সী বান্ধবীরা সুদে আসলে পুষিয়ে দিল। বন্ধুরা তো আছই, কিন্তু বান্ধবীরা তোমাদের জন্য আবারো অনেক ভালোবাসা ও শুভকামনা।
সাম্প্রতিক মন্তব্য