কীভাবে প্রথম কথা , কীভাবে ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব আজ তা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক, মনেও নেই আমার । আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার বেশ কিছুদিন পরে টেক্সটাইলে প্রথমবারের মতো সেকেন্ড শিফট শুরু, প্রশাসনিক জটিলতায় প্রথমদিকে নতুনদের সাথে একটু ব্রাত্য বা হালকা দূরত্ব থাকলেও ঠিক মাস দুয়েকের মধ্যে সবাই সবার অসম্ভব কাছের হয়ে গেলাম।ছোট্ট শহীদ আজিজ হলের আবহাওয়াই বদলে গেল ; অনেকদিন পরে একবারে প্রায় গোটা পঞ্চাশেক ছাত্রের পদচারনায়।

যদিও আমাদের সঙ্গে তৎকালীন ঢাকা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকার তেমন কেউ ছিল না, ; তবে অন্য বোর্ডের কয়েকজন ছিল। সবচেয়ে বেশী মানসিক সাদৃশ্য যেটা ছিল সবার মধ্যে, সেটা হচ্ছে একধরনের মনক্ষুন্নতা—প্রকৌশলের সবচেয়ে অভিজাত প্রতিষ্ঠান বুয়েটের ভর্তি ব্যর্থতার। হ্যাঁ, আমাদের সবাই হয়তো তথাকথিত সর্বোচ্চ মেধাবী ছিলাম না ; কিন্তু আমাদের মেধা ঠিক ফেলে দেওয়ার মতোও ছিল না। ঢাকা ও বাংলাদেশের জেলাশহরের নানাপ্রান্তের দূর্দান্ত ডাকসাইটে কয়েকজন ছাত্রের দেখা হয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে চোখে পড়ার মতো মেধাবী ছিল সুমন। টেক্সটাইলের স্পিনিং ,ডাইং- ফিনিশিং এর চাপ এড়িয়ে ওঁর গন্তব্য যে শিক্ষকতা সেটা আমাদের মনে হয়নি কখনো।

পরীক্ষা এগিয়ে এলেই খুঁজে পেলাম আমাদের ২০তম ব্যাচের সবচেয়ে আস্থাবান বন্ধুকে আতিকুজ্জামান সুমনকে। আগের ব্যাচের সেলিম ভাইয়ের নোট বেশ পপুলার ছিল, তবে তাঁর হাতের লেখা ছিল একটু বড়ো টাইপের।সেই তুলনার সুমনের হাতের লেখা ছিল শাব্দিক অর্থেই মুক্তার মতো। সুমনের নোট ছাড়া কোন পরীক্ষা উৎরানো যাবে কল্পনাই করতে পারতাম না। PL( Preparatory Leave) শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা দলবেঁধে ওঁকে তাগিদ দিতাম, দোস্ত ওই চ্যাপ্টারের নোটটা কবে শেষ করবি?

সম্ভবতঃ থার্ড ইয়ারে আমি একবার জিজ্ঞাস করলাম, সেলিম ভাইয়ের তো এই টপিক্সে একটা ভালো নোটই ছিল, তুই আবার নিজে বানাতে গেলি ক্যান। ওর উত্তর ছিল মনে রাখার মতো , পুরনো নোট আর পাঠ্যবই মিলিয়ে নিজের নোট করতে গেলে পড়া হয়ে যায়, আর নিজের লেখা নোট পড়তে বেশী ভালো লাগে,সেই সঙ্গে তোদেরও কাজে লাগে। মানুষ এতো নিঃস্বার্থ হয় কীভাবে !

ওর নোটই যে আমাদের একমাত্র পাথেয় পরীক্ষার পুলসিরাত পার হওয়ার সেটা ও ভালোভাবেই জানতো। নরমাল সাদা কাগজের ফটোকপি ভালো হয় না, তাই গুচ্ছের টাকা খরচ করে ওঁ সাদা অফসেটে পেলিক্যান কালির ইয়ুথ কলমের ঝকঝকে দূর্দান্ত লেখনীতে নোট করতো। সাদা লুঙ্গি পড়ে তকতকে টেবিলে উবু হয়ে নোট করছে সুমন, একটা চিরচেনাভঙ্গী ! বেশ ক্ষীণতনু ছিল , হাড্ডিসার চেহারা নিয়ে ঈর্ষাও ছিল আবার ঠাট্টাও করতাম সবাই। জেনেটিক্যালি ও একটু হালকা স্বাস্থ্যের ছিল। শেষ দেখায়ও ওঁকে ওই ভাবেই পেয়েছি। মনে পড়ে, আমাদের ফটোকপি করতে সুবিধা হবে বলে ও মেশিনের ডায়াগ্রামগুলোও মাঝে মাঝেই কালো কালির কলমে করতো। ওঁর নোট হাতে পাওয়া মানে ছিল ওই সেমিস্টারের অর্ধেক পড়া হয়ে যাওয়া।

সারা ছাত্রজীবনে ওঁর চাপে পড়েই আমি নিজের হাতে শুধুমাত্র Viscose Fiber ও Fabric Designing চাপ্টারের নোট করেছিলাম। ওঁর অনুরোধ ছিল, মামা, তুই ওই চ্যাপ্টারে নোট করে ফ্যাল, আমি ইয়ার্ন ম্যানুফ্যাকচারিং গুলো করেই সময় করতে পারছি না। ওঁর ব্যস্ততার দিকে চেয়েই ওই নোট করা এবং সারা ছাত্রজীবনে ওই প্রথম এবং ওই শেষ। কিন্তু সুমনের হাতের লেখার পাশে আমার লেখা একেবারেই মানাচ্ছিল না। পরবর্তীতে আমি আর কোন নোট তৈরীও করিনি। একটু ভালোও লাগছিল, সারাবছর আমিই শুধু সুমনের নোট পড়ি, এই প্রথম ওঁ আমার নোট ফটোকপি করছে !

গত ডিসেম্বরে ছুটি রিসোর্টে সপরিবারে দেখা ! এর পরের গেট টুগেদারগুলোতে নানা কারণে ওঁর সাথে আমার দেখা হয়নি, বা হলেও ঠিক অনেকক্ষণ কথা হয়নি। রাত্রিযাপনের ওই ছুটিতে আমার স্ত্রীর সাথে ওঁর স্ত্রীর, ওঁর কন্যাদের বাচ্চাগুলোর ও আমার বাচ্চাদের মিথষ্ক্রিয়া। মিনা( আমার সহধর্মিনী) গত দুইদিন ধরে বারবার আফসোস করছে থেকে থেকে।

হল জীবনের অফুরান অসংখ্য স্মৃতি আছে। কিন্তু ওঁর মাঝে যে সদাহাস্যময় পরোপকারী মানুষটিকে আমরা দেখেছি, পেয়েছি– নিজেরা বিলীন হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মনে রাখবো। হুট করে জার্মানিতে পড়তে চলে গেলে সম্পর্কে একটু বিচ্ছিনতা এসেছিল , পরের বছরগুলোতে সেটা আর আমি আর কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

আজ বেশী করে মনে পড়ছে বিশেষ একটা দিনের কথা !

চাকরি শুরু করার পরে আমরা যে যার কর্মক্ষেত্রে, ভীষণ ব্যস্ত। মোবাইলের যুগও তেমন করে শুরু হয়নি। ১৯৯৯ সালে ল্যান্ডফোনেই ওঁ জানালো, বহুদিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন আমরা যেন অ্যাটেন্ড করি।৪০তম সমাবর্তন, নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন আসবেন !আমার চরিত্রানুযায়ী যথারীতি এড়িয়ে যেতে চাইলেও ওঁ আমাকে বোঝাল এটা বিরাট সৌভাগ্যের সুযোগ । গ্রাজুয়েশেনের গাউন পরে সবার ছবি থাকে, আমাদেরও থাকবে। অনেকখানি ওঁর চাপে পড়েই সমাবর্তনে যাওয়া।

রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! রবীন্দ্র পরবর্তী বাঙালী নোবেল জয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নামের ছোট খাটো লোকটি যখন তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, চারিদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ! প্রাথমিক আলাপ কী ছিল মনে নেই, কিন্তু বক্তব্যের যে অংশ আমার মনে গেঁথে আছে, সারাজীবন থাকবে তা হচ্ছে তিনি জীবন ও মৃত্যুর , জীবিত ও মৃতের পার্থক্য বলছিলেন। জীবন মানে হচ্ছে বাক্য, জীবন মানে হচ্ছে শব্দ , জীবন মানেই কথামালা। আমি কথা বলছি, আমি বেঁচে আছি। বাক্যের শেষ মানেই মৃত্যু, অসীম নিস্তব্ধতা! “ বলতে পার মৃত্যু কি ভয়ঙ্কর ? সবাই যখন কথা কইবে, রইবে তুমি নিরুত্তর !” তাইতো, আমরা কথা কইছি, তুই নিরুত্তর। তোর অন্যলোকের যাত্রা শুভ হোক বন্ধু !

সমাবর্তনের দিনে আমার নিজের কোন ক্যামেরা ছিল না, ওঁর ক্যামেরায় বেশ কয়েকটি ছবি তুললো ওঁ !অনেকবার অনেকবছর ধরে ভেবেছি ওঁর কাছ থেকে ছবির কপিগুলো চেয়ে নেব। এই ১৬ বছরে আর হল কই ! থাক্‌ তোর ক্যামেরায় তোলা ছবি আমার আর লাগবে না ! তুই নিজেইতো একটা ছবি হয়ে গেলি !

প্রকাশকালঃ ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫