বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গেলাম বছর বিশেক পরে গত ২৪শে আগস্টে। কেন্দ্রের ৯০ ব্যাচের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সতীর্থ কয়েকজনের সাথে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে স্যারের ছোট্টরুমে মুখোমুখি । মূলতঃ প্রবাসী সতীর্থ খাদিজা ও শাহনীলাই আড্ডার উদ্যোক্তা। স্যারের সঙ্গে ওরা যোগাযোগ রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে।

আমার কাছে কেন্দ্র আর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার সমার্থক। ফোনে ফোনে ও কেন্দ্রের নতুন ছাদে চা-পুরি খেতে খেতে সতীর্থদের করজোড়ে অনুরোধও করলাম , আমার এই দীর্ঘ নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশের ব্যাপারটা স্যারের সামনে চেপে যেতে ; বা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে । ভয় ছিল , স্যার যদি আমার আলস্য দেখে বিরক্ত হয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত ‘ ধ্যাত !’ বলে বসেন , তবে লজ্জার শেষ থাকবে না ! আসলে পড়াশুনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে কখন যে কলেজ কর্মসূচী , প্রাক-মৌলিক , মৌলিক ছেড়ে কেন্দ্রচ্যুত হয়ে গেলাম মনেই নেই ! একবার তার ছিঁড়ে গেলে যা হয়, সে আর লাগে না জোড়া।

এতো অনুরোধের পরেও , কয়েকটি বাক্যের কথপোকথনের পরেই , একজন মনে করিয়ে দিল, স্যার , জাহিদ বিশ বছর পরে কেন্দ্রে এসেছে ! স্যারের চিরকালীন প্রশ্রয়মাখা হাসিমুখের অভ্যর্থনাই পেলাম মনে হল। হাঁফ, ছাড়লাম, পুরনোদের মাঝে মিশে যেতে পেরে। এতোদিন পরেও আমার মতো অভাগার ব্যাপারে স্যারের সহানুভূতিতে মুগ্ধ ! আসলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক চিরকালীন।অনেক দূর থেকেও শিক্ষক যেমন টের পেয়ে যান জনারণ্যে কে তাঁর ছাত্র ; ঠিক তেমনি করেই ছাত্রটিও মুহুর্তেই পুনঃআবিষ্কার করে শিক্ষকের প্রতি চিরকালীন শ্রদ্ধার সম্পর্কটিকে । তবে, তাঁকে ( মানে ওই শিক্ষককে হতে হয় , মানবিক ও উদ্বুদ্ধকারী)। যে শিক্ষক ছাত্রের গায়ে বেতের বাড়ি, অকথ্য শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা দেওয়া ছাড়া কিছু করেন নাই ; মস্তিষ্কের উপরে , হৃদয়ের উপরে দাগ ফেলতে পারেন নাই, তাদের কথা আলাদা। কোন ছাত্রই তাদের দীর্ঘদিন মনে রাখনি। শিক্ষকতা তাদের কাছে ক্ষুন্নিবৃত্তির একটা উপায় মাত্র ছিল। আমার স্কুল জীবনে ও কলেজ জীবনে এরকম দায়সারা গোছের শিক্ষক নিতান্ত কম ছিল না। এখন আরো বেড়েছে।

প্রবাসী বন্ধুদের (খাদিজা,শাহনীলা) সাথে স্যারের আন্তরিক সম্পর্ক দেখে ঈর্ষান্বিতই হলাম ! এঁরা দূর লন্ডন ও কুয়েতে থেকেও কী গভীর মমতায় , কী শুদ্ধ শ্রদ্ধায় স্যারের সাথে যোগাযোগ রেখেছে। আর আমি বাংলামোটর থেকে মাইল দশেক দূরে মিরপুরে থেকেও কেন্দ্র , স্যার সবকিছু থেকে থেকে সহস্র মাইল দূরে !

৯০ সালে ঢাকা কলেজে স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। বিলাসী পড়াতেন মনে আছে! আমাদের উন্মুখ হৃদয়ে স্যারে একটা বক্তৃতাই যথেষ্ট ছিল চিরকালীন ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক গড়ে তুলতে।

এতোদিন পরে, কেন্দ্রে যাচ্ছি, রাস্তা একটাই জানি। এও শুনেছি, কেন্দ্র নাকি অনেক উঁচু ইমারতে পরিণত হয়েছে। আমাদের সেই ছিমছাম সুরঞ্জনা , সামনে ঘাসের লন, লনের শেষে বৃদ্ধ আম গাছ, কিছুই নাকি নেই। কেন্দ্রের নতুন বিল্ডিং এর ব্যাপারে আমি আরেক সতীর্থ ডন আজাদের সাথে একমত পোষণ করলাম!কেন্দ্র তার রোম্যান্টিক মৃদুমন্দ খোলস ছেড়ে বের হয়ে এসেছে। ওঁর ভাষায় কেন্দ্রের চেহারা বৈপ্লবিক ও আগ্রাসী হয়েছে (Revolutionary and Aggressive ) ! এইটার দরকার ছিল।

সায়ীদ স্যার কিন্তু আগের মতোই আছেন।

কলেজ কর্মসূচীর মাধ্যমে ১৯৯০ বা ৯১ থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সাথে আমাদের পরিচয়। কারো কারো স্কুল থেকেই হয়তোবা। স্যারের আলোকচ্ছটায় মুগ্ধ কৈশোরের অনেকেই এখন চল্লিশোর্ধ। যদিও পেশা ও জীবিকার বৈচিত্র্যে আমরা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু কেন্দ্রমুখী প্রাণের টান রয়ে গেছে সবার । এমন একটা উন্মুখ সময়ে স্যারের সাথে আমাদের পরিচয় ! তাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের জীবনে অবিচ্ছেদ্য । ঘন্টা খানেকের আড্ডায় স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গেল! আড্ডার শুরুতেই মনে হয়নি, এতোটা স্মৃতিমেদুরতা থাকবে, এইভাবে আমরা কয়েকজন ফিরে যাবো আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোতে। স্যার কলেজ কর্মসূচির সময়েও অনভিজ্ঞ তারুণ্যের প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন তাচ্ছিল্য ছাড়া, জ্ঞানবিজ্ঞানের যে কোন আলোচনায় আমরা স্যারের বয়স্য বিবেচিত হতাম বলে মনে আছে।

স্যারের সাথে একদিনের আড্ডা মানেতো এক দশকের ইন্সপিরেশন !স্মৃতিতে ধুলো পড়ার আগেই , আড্ডাটাকে দিনলিপির মতো করে লিখে রাখলাম। পরে এই পুরনো অ্যালবামের পাতা উল্টাতে ভালোই লাগবে!

দীর্ঘ বিরতিতে আলোচনার নতুন বিষয় ছিল আমাদের সন্তানদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা। আমরাও কয়েকজন জয়া আপা( স্যারে কনিষ্ঠা) ও লুনা আপার( জ্যৈষ্ঠা ) ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। কথার মাঝেই , আলোচনা শুরু হল

বার্ধক্য, অসুস্থতা, মৃত্যু নিয়ে। মৃত্যুর মতো একটা ভয়ংকর বিভীষিকা দানবের মতো হা করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের কলকাকলিমুখর জীবনের সামনে, এইটুকুই ! মৃত্যু নিয়ে স্যারের আর কোন কথা ছিল না।

মৃত্যু থেকে লাফ দিয়ে চলে গেলেন রোমান্টিসিজমে। কয়েক শতক আগেও আমদের সাহিত্যে, জীবনে কোথাও রোমান্টিকতা ছিলনা। এই উপমহাদেশের জীবন ছিল নিতান্তই জৈবিক , অন্নবস্ত্র বাসস্থান , যুদ্ধ, যৌনতা, সন্তান উৎপাদন এইতো ! ষষ্ট শতকের কালিদাসের মেঘদূত নিয়ে কথা ওঠালেন স্যার। নির্বাসিত বিরহী যক্ষে তাঁর ভালোবাসা পৌঁছে দিতে চায় মেঘের মাধ্যমে। এইটুকু ছাড়া পুরো বর্ণনায় প্রিয়ার দেহের বাঁক , কামনা আর হুতাশন। শারীরিকতা বা দৈহিকতাই প্রধান। রোমান্টিকতা নেই । সেই আমরাই একসময় , সংস্কৃত ইতিহাস থেকে উঠে এসে রোমান্টিকতায় ভেসে যাচ্ছি।

স্যারের পর্যবেক্ষনে মানুষ সর্বোচ্চ তিনবার প্রেমে পড়তে পারে তার সমগ্র জীবদ্দশায়। প্রেমের উত্তেজনা বা মেয়াদ প্রতিবার ১২ বছর করে থাকতে পারে। বিয়ে হওয়ার একযুগ পরে, কীভাবে ভালোবাসা থাকে !ফিকে হয়ে আসে সব উত্তেজনা। বাৎসল্য , সামাজিকতার দমবন্ধ আঁটুনিতে বদ্ধ থাকতে হয়। আমরা সবাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, আমাদের সবার বিয়ের মোটামুটি কমবেশী বারো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে !

এক বন্ধুতো মন্তব্য করেই ফেলল, স্যার এইজন্যই সব কিছু পানসে পানসে লাগছে। রোমাঞ্চ নেই, বড্ডো একঘেয়েঁমি ! হাসির একটা হুল্লোর উঠলো ছোট্ট রুমটাতে।

ইংল্যান্ডে কোন একটা প্রাচীন স্থাপনা দেখার প্রসঙ্গ আসতেই , আলোচনা অজন্তা, ইলোরাতে চলে গেল। স্যারের মুখের সৌকর্যময় বর্ণনা শুনতে শুনতে আমার নিজেরই ইচ্ছা করছিল, অজন্তা ও ইলোরা দেখতে।

কেন্দ্রের পুরোনোদের ছাত্র-ছাত্রীদের কথা উঠলো, ডাঃ আব্দুন নুর তুষার ভাইয়ের ব্যাপারে স্যার বললেন, ছেলেটা মেধাবী, কেন আরো উপরে যেতে পারছে না বলতো ? নিজেই উত্তর দিলেন, কারণ ও অলস ! আরো পরিশ্রমী হলে ও অনেকদূর যেতে পারত।

নতুন সরকারের নানামুখী কাজের পাশাপাশি পুরনো আমলের যোগাযোগ মন্ত্রী নাজমুল হুদার প্রসঙ্গ উঠল। সম্ভবতঃ নতুন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেবের খলিফা হারুন-অর-রশীদের মতো সরে জমিনে ফিল্ড ট্রিপের অভ্যাস থেকেই নাজমুল হুদার কথা উঠেছিল। তারও অভ্যাস ছিল হুট করে পথে নেমে নিজে নিজেই সরেজমিনে শো অফ করা ; বাহাদুরি দেখানো। তো স্যার একদিন নাজমুল হুদাকে বললেন, এইটা তার করা ঠিক হচ্ছে না। কারণ নেতা কেন সম্মুখসমরে যাবে? নেতার হাতে কেন তরবারী থাকবে? কোন কারণে একজন সাধারণ জনগণ যদি নেতাকে বা মন্ত্রীকে একটা চড়ও মেরে বসে, মানসম্মান কী আর উঠে আসবে ?

ব্রাহ্মণ্য নিয়ে , কৌলিন্য বা এলিটিজম নিয়ে, যতোই দ্বেষ থাকুক না কেন, স্যার নিজেকে, শিক্ষকদেরকে সমাজের ব্রাহ্মণ হিসাবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন । সেদিনও দিলেন। জাতভেদে যারা লেখাপড়ায় ব্যস্ত, সমাজের মাথা তারাতো ব্রাহ্মণই । ব্রাহ্মণ মাথা চালাবে। যুদ্ধ করবে ক্ষত্রিয় । বৈশ্য করবে ব্যবসা। শূদ্র বাকী তুচ্ছ কাজগুলো। দাবার বোর্ডে রাজা স্বয়ং যুদ্ধ করেন না। যুদ্ধ করে অন্যরা। তরবারীর এক খোঁচায় রাজা ঠুস্‌ করলেতো যুদ্ধই শেষ !

সরকার থেকে কেন্দ্র ডেমরা বা গেণ্ডারিয়াতে একটা জমি পেয়েছে। ঐখানে স্থাপনার জন্য দশ কোটি টাকার একটা আবেদন করে বসে আছেন কবে থেকে। স্যারের ইচ্ছা একটা মিলনায়তন বা প্লাজা টাইপকরে কেন্দ্রের কিছু অর্থসংস্থান করা। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীগুলোর খরচ, স্কুল কর্মসূচির খরচ, প্রকাশনা ইত্যাদি দিনে দিনে বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে ! ঘুরে ফিরে আত্মীয়তন্ত্রের কথা চলে আসলো, শত শত কোটি টাকা হাপিস হয়ে যাচ্ছে , কিন্তু শিক্ষার জন্য দশকোটি মানেই দ্বারে দ্বারে ঘোরা।

(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য )

প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর ২০১৫