আমি ভাবতাম কাজের দিনে সকালে উঠে জীবন প্যারাময় মনে হয় কেন? নানাবিধ বঞ্চনা ও অপ্রাপ্তি সেলুলয়েডের ফিতার মতো মনে ভেসে উঠতে থাকে ! কারণ কি? কথা প্রসঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে দেখলাম, এই প্যারাময়তা তাঁদের সকলের।শুধু শুধুই নিজেকে ব্যতিক্রম ভেবে বসেছিলাম।

দিন-কয়েক আগে একটা গবেষণাপত্রে জানতে পারলাম -মানুষের মস্তিষ্ক প্রতিদিন তার গতকালের চিন্তার আশি-ভাগ পুনরাবৃত্তি করে। গবেষণা-ভেদে মানুষের মস্তিষ্ক ৬০০০ চিন্তা করে। অন্য কয়েকটি গবেষণায় এই চিন্তারাশিকে ১০ গুণ বাড়িয়ে ৬০ হাজার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। আমার কাছে, মনে হয় ৬ হাজার চিন্তার সংখ্যাটা অনেক-বেশি বাস্তবসম্মত। এর অর্থ হচ্ছে, ৮ ঘণ্টার ঘুম বাদ দিলে বাকী ১৬ প্রতি মিনিটে মানুষ ৬.৫ টি চিন্তা করছে। কারো ৭ ঘণ্টা ঘুম হলে তার চিন্তার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে হবে ৬৪০০ টির মতো।

পরেরদিন , গতকালের পুরনো আশি ভাগ চিন্তার সঙ্গে নতুন চিন্তা যুক্ত হবে। আমাদের প্যারাময়তার কারণ গতদিনের ওই ৮০ ভাগ রিপিটেশন। ফ্রয়েড বলেছিলেন, স্বপ্ন নিয়ে। হাঁস নাকি ঘুমানোর সময়ে শামুকের স্বপ্ন দেখে। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই, সারাদিন যা চিন্তা করছি সেটাই রাতে স্বপ্ন হয়ে আসে। পরেরদিন সেই চিন্তার পুনরাবৃত্তি।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই মনে হয়, আবার অফিস বা কর্মক্ষেত্র, আবার ট্র্যাফিক জ্যাম, ধুলাবালি, করপোরেট সরীসৃপদের সঙ্গে সাপ-লুডু, আবার সেই একই ক্যাঁচক্যাঁচ। প্রাত্যহিকতার সঙ্গে চিরন্তন গভীর কিছু বোধ, মানে নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা তো থাকছেই। এগুলো সম্মিলিতভাবে আমাদের সকালবেলাটাকে কাবু করে ফেলে।
বোধকরি এজন্যেই সব ধর্মে সকালবেলার প্রার্থনাকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতি-ভোরের তাহাজ্জুদ, ফজর নামাজ থেকে শুরু করে প্রাণায়াম, সূর্য-তপস্যা, ধ্যান কতো কিছু দিয়ে ধর্ম মানুষকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে। সকালের প্রার্থনা ও শারীরিক কসরত দিয়ে এলোমেলো মস্তিষ্ককে একটা সিগন্যাল পাঠানো হয় যে, আজকে যা কিছু হোক তোমার শরীর অথবা সর্বমঙ্গলময় সৃষ্টিকর্তা সুরক্ষা দেবে, একটা শারীরিক মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলা আর কী ।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যখন ছুটি কাটাতে যায়; কয়েকদিনের টানা বিনোদিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় বুঁদ হয়ে থাকে মানুষ। তখন ভোরবেলা উঠে জীবন প্যারাময় মনে হয় না। কারণ আগের-দিন থেকেই মানুষের একটা প্রস্তুতি থাকে আনন্দে থাকার। প্রার্থনার কোন প্রয়োজন হয় না। গতদিনের আনন্দময় চিন্তার ৮০ ভাগ পুনরাবৃত্তিতেও সে কাবু হয় না।
সুতরাং যারা প্রাত্যহিক কাজের ভিতরে আছেন, অথবা প্রাত্যহিক গ্রাম, মফঃস্বল বা নাগরিক জীবনে চলমান আছেন, সকালের প্যারাময়তা তাকে আচ্ছন্ন করবে, বিধ্বস্ত করবেই। সেই বিস্রস্ততাকে সহনীয় করার জন্যে মানুষের প্রার্থনা আবশ্যিক। অথচ সেই একই যন্ত্রণাদগ্ধ, অনিশ্চিত, নিরাপত্তাহীন মানুষটি যখন বিনোদনের মাঝে থাকে তখন কিন্তু তার আর দুর্বল হয়ে প্রার্থনানত হওয়ার সম্ভাবনা যায় কমে। অথবা যিনি বা যারা সামাজিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জায়গায় নিজের প্রতিদিনকে বিনোদনের জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছেন, তাঁদেরও দিনের শুরুটি ৮০ ভাগ চিন্তার পুনরাবৃত্তিতেও বড় কোন প্যারাময়তা ও প্রার্থনা-নির্ভরশীলতার প্রয়োজন পড়ে না।

হয়তো আরো অন্য কোন মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে, সে গবেষণার দায়িত্ব তো আর আমার না। আমি বড়জোর আমার যাপিত জীবনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে পারি। পাঠক-পাঠিকা মিলিয়ে দেখতে পারেন।

প্রথম প্রকাশঃ ৭ই অক্টোবর,২০২২