তোতাকাহিনী।। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে।
রাজা বলিলেন, “এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।”
মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, “পাখিটাকে শিক্ষা দাও।”

রাজার ভাগিনাদের উপর ভার পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দিবার।
পণ্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই, উক্ত জীবের অবিদ্যার কারণ কী।
সিদ্ধান্ত হইল, সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি সে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশি ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার, ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।
রাজপণ্ডিতেরা দক্ষিণা পাইয়া খুশি হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে, দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল। কেহ বলে, “শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।” কেহ বলে, “শিক্ষা যদি নাও হয়, খাঁচা তো হইল। পাখির কী কপাল।”
স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকশিশ পাইল। খুশি হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ির দিকে।
পণ্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, “অল্প পুঁথির কর্ম নয়।”
ভাগিনা তখন পুঁথিলিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমাণ করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, “সাবাস। বিদ্যা আর ধরে না।”
লিপিকরের দল পারিতোষিক লইল বলদ বোঝাই করিয়া। তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।
অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরে ঝাড়া মোছা পালিশ-করার ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, “উন্নতি হইতেছে।”
লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠা-মুঠা তনখা পাইয়া সিন্ধুক বোঝাই করিল।
তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ট। তারা বলিল, “খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে, কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।”
কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, “ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।”
ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পণ্ডিতদের, লিপিকরদের, ডাকুন যারা মেরামত করে এবং মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়। নিন্দুকগুলো খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা বলে।”
জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন, আর তখনি ভাগিনার গলায় সোনার হার চড়িল।

শিক্ষা যে কী ভয়ংকর তেজে চলিতেছে, রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত।
দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ ঘণ্টা ঢাক ঢোল কাড়া নাকাড়া তুরী ভেরি দামামা কাঁসি বাঁশি কাঁসর খোল করতাল মৃদঙ্গ জগঝম্ফ। পণ্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া টিকি নাড়িয়া, মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো এবং মাসতুতো ভাই জয়ধ্বনি তুলিল।
ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, কাণ্ডটা দেখিতেছেন!”
মহারাজ বলিলেন, “আশ্চর্য। শব্দ কম নয়।”
ভাগিনা বলিল, “শুধু শব্দ নয়, পিছনে অর্থও কম নাই।”
রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমনসময়, নিন্দুক ছিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, “মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি।”
রাজার চমক লাগিল; বলিলেন, “ঐ যা! মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।”
ফিরিয়া আসিয়া পণ্ডিতকে বলিলেন, “পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।”
দেখা হইল। দেখিয়া বড়ো খুশি। কায়দাটা পাখিটার চেয়ে এত বেশি বড়ো যে, পাখিটাকে দেখাই যায় না; মনে হয়, তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন, আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই; কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশি পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখের মধ্যে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধই, চীৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ হয়।
এবারে রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দুকের যেন আচ্ছা করিয়া কান মলিয়া দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র-দস্তুর-মতো আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায় রকমে পাখা ঝট্‌পট্‌ করে। এমন কি, এক-একদিন দেখা যায়, সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলা কাটিবার চেষ্টায় আছে।
কোতোয়াল বলিল, “এ কী বেয়াদবি।”
তখন শিক্ষামহলে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি। লোহার শিকল তৈরি হইল, পাখির ডানাও গেল কাটা।
রাজার সম্বন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, “এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই।”
তখন পণ্ডিতেরা এক হাতে কলম, এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কাণ্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা।
কামারের পসার বাড়িয়া কামারগিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।

পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়া রটাইল, “পাখি মরিয়াছে।”
ভাগিনাকে ডাকিয়া রাজা বলিলেন, “ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।”
ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।”
রাজা শুধাইলেন, “ও কি আর লাফায়।”
ভাগিনা বলিল, “আরে রাম!”
“আর কি ওড়ে।”
“না।”
“আর কি গান গায়।”
“না।”
“দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।”
“না।”
রাজা বলিলেন, “একবার পাখিটাকে আনো তো, দেখি।”
পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন, সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুঁথির শুকনো পাতা খস্‌খস্‌ গজ্‌গজ্‌ করিতে লাগিল।
বাহিরে নববসন্তের দক্ষিণহাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

আমাদের প্রেম, দাম্পত্য ও পরকীয়া !

ফরমায়েশি লেখায় আমার কিছুটা অবহেলা আছে। বাবা দিবস, মা দিবস, বন্ধু দিবস, ভ্যালেন্টাইন ভালোবাসা দিবস ইত্যাদি আমি এড়িয়ে চলি। কীভাবে যেন আমার মাথায় ঢুকে গেছে যে, এসবই পুঁজিবাদের পণ্য কেনাবেচার ধান্ধা। কেনাবেচা মন্দ কিছু নয় অবশ্যই ; তবে মানুষের আদিখ্যেতা এড়িয়ে চলার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি আর কী !

জগতের নিয়মে নারীপুরুষের ভালোবাসাবাসি থাকবে। কৈশোরের বয়ঃসন্ধি পেরুলেই বিপরীত কাউকে দেখলে মন উদাস হবে, ‘কি জানি কিসেরি লাগি প্রাণ করে হায় হায়’ !—হবে। আমাদের এক বড়ভাই বলেছিল সেই ৯০-এর দশকে কয়েকমাস খানেক কিশোরীর পিছনে পিছনে হেঁটে একদিন সেই কিশোরী কী মনে করে যেন পিছন ফিরে দেখল, কে তাঁকে ফলো করছে। সেই বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল সেই কিশোরের বন্ধুরা, ‘তাকাইছে ! তাকাইছে ! দোস্ত ! ও আমার দিকে তাকাইছে !’ চিৎকারে।

কৈশোরের পরে কাঠখড় পুড়িয়ে গুচ্ছের কষ্ট করে ভালো কোথাও ভর্তি হও রে ! অনার্স কর রে, মাস্টার্স কর রে ! চাকরি খোঁজ রে, আরো কিছুদিন পরে সেই বহু আরাধ্য মধুর সমাপ্তি বিবাহ ! নিজের হাতের উপর সেই হাত। “ ‘আমি পাইলাম, ‘ আমি ইহাকে পাইলাম।’ কাহাকে পাইলাম । এ যে দুর্লভ, এ যে মানবী, ইহার রহস্যের কি অন্ত আছে। ” সেই অনুভূতি ! তীব্র রোমাঞ্চের পর নতুন প্রজন্মের আগমন। অতঃপর বহমান জীবন, সেই চাকরি, সেই ট্রাফিক, সেই গোমড়ামুখো বস আর পাশের টেবিলের উচ্চস্বরে কথা বলা সহকর্মীদের সঙ্গে সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। আবার সেই ট্রাফিক ঠেলে বাসায় এসে, দুটো নাকে মুখে দিয়েই বিছানায়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ একই রুটিন। এর মাঝে একটা বয়সের পরে দৈহিকতা নিতান্তই অভ্যস্ততার ঘেরাটোপে আটকে যায়। এই চিত্র ঢাকার বা যে কোন ব্যস্ত মহানগরের সবখানে।

২০০১ এর দিকে এক জার্মান ক্রেতার কাজ করতাম। নারী পোশাকের জন্য, Blind Date Casual এবং Blind Date Women নামের দুইটা লেবেল ছিল তাঁদের ! তো সিনিয়র ক্রেতা আমাকে বোঝালেন Blind Date শব্দটির ভিতরে এক অদ্ভুত ধরণের রোমাঞ্চ আছে, যেটা নারী ক্রেতাকে উৎসাহিত করে সেই লেবেলের পোশাক কিনতে। তখন ইউরোপে Blind Dating হয়তো খুব প্রচলিত ও মাছ-ভাতের মতো কিছু একটা। কিন্তু এখন আমাদের দেশে ল্যান্ড ফোনের যুগ থেকেই শুরু হল প্রজন্মের রোমাঞ্চ। তাঁর আগে যে চিঠির যুগ ছিল, সেখানেও ধীরগতির কিছুটা রোমাঞ্চ ছিল। আমার এক বন্ধু তখন পত্র-মিতালীর পত্রিকাগুলোতে নিজেরটা সহ অন্য কয়েকজনের চাঁদা দিয়ে ছাপাতে দিত। সেই পত্রিকায় আমাদের মূল নামের সংগে কিছুটা ছদ্মনাম জড়িয়ে দেওয়া নাম। আমার নাম ছিল সম্ভবত: অমি জাহিদ। কেন সেই নাম, মনে নাই। তবে যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রাবাসের নাম দেওয়া থাকত, দেশের নানা প্রান্ত থেকে চিঠি আসত। কাঁচা হাতে বন্ধু হওয়ার নিবেদন। বেশির ভাগ স্কুলের সেভেন এইটের মেয়ে। কিছু আসতো কলেজ থেকে। আমাদের কেউ কেউ সুন্দর নাম দেখে মেয়েদের কাছে চিঠি পাঠাতো। কেউ উত্তর দিত, কেউ দিত না।

এই সব পত্র-মিতালী নিয়ে আমাদের মজার কিছু স্মৃতি আছে, কেউ কেউ সশরীরে চলে আসত, যেহেতু হলের রুম নাম্বার সহ ঠিকানা দেওয়া থাকত।

হলের একটা মাত্র ফোন, নীচের গেস্ট রুমে, লক করা থাকত। ফোন শুধু আসত, যাওয়ার নিয়ম ছিল না। তো সেই ফোনের তার ছিঁড়ে প্যারালাল লাইন করে আরেক ফোন সেটে কথা বলার অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড হবু প্রকৌশলীদের পক্ষেই সম্ভব। আমার মনে হয়, ৯০ এর দশকের বেশিরভাগ ছাত্রাবাস হলগুলোর একই চিত্র। আমরা যখন হল জীবন শুরু করি তার কিছুদিন আগেই পঁচিশ কয়েন দিয়ে ফোন করার বক্সগুলো উঠে গেছে ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে।

ল্যান্ডফোনে অহরহ ক্রস কানেকশন হত। আমাদের বাসার ফোন নাম্বার ছিল, ৩৮৩৩৪১ ও পরে ৯০০৩৫৬৪ । কাছাকাছি নাম্বারে করেছে কেউ আর সেটা আমাদের ফোন লাইনে চলে এসেছে , সেটা প্রতিদিন তিন চারবার হতো। মাঝে-সাঁঝে ক্রস কানেকশন হতো। মানে আমি কোথাও ফোন করেছি ; হুট করে অন্য দুইজনের ব্যক্তিগত কথোপকথনের সঙ্গে আমার লাইন কানেক্টেড হয়ে যেত। হয়তো প্রেমিক-প্রেমিকা অথবা নবদম্পতি কথা বলছে। আমি আর টেলিফোন অপারেটর শুনছি সেই বিনা পয়সার বিনোদন।

এক বন্ধুর বাড়িতে ক্রস কানেকশনে কলেজ পড়ুয়া এক তরুণীর সঙ্গে কথাবার্তা, আমরা সবাই ফান হিসাবে নিলেও জনৈক বন্ধু সেই মেয়ের সঙ্গে সিরিয়াস প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে গেল। বিয়ে হয় হয় অবস্থা ! শেষে পাত্রের বাবা-মার মত না থাকায় আর হয় নি।

মোবাইল আসার পর, ক্রস কানেকশনের বিনোদন শেষ। নতুন প্রযুক্তির খরচ বেশি। প্রিপেইড ফোন দিয়ে , প্রেম ও রোমান্স জমে না। ৬ টাকা পার মিনিট কল চার্জ। তো সেই দুর্মূল্যের বাজারেও আমার এক বন্ধু প্রেম করত। যেখানে আমাদের সারাদিন দেশে বিদেশে কথা বলে বিল আসে ৫ হাজার টাকা। তার মাসের মাঝখানে ১৮ হাজার টাকার বিলের জন্য লাইন কেটে দেয় ! বিল পরিশোধ করে লাইন রি-কানেক্ট করে আবার তার প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলে। সেই যুগে সে কীভাবে মাসে ৩০ হাজার টাকার কথা বলতো সেটা এখনো একটা বিস্ময় বটে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে রমনা পার্ক বেশ জনপ্রিয় ও আপাত: নিরাপদ একটা ডেটিং প্লেস ছিল। কিছু অনিয়ম যে হোত না সেটা বলা যাবে না ! তবুও প্রেমিক-প্রেমিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কপোতকপোতি এসে সকালে ও বিকালে ভিড় করত রমনা পার্কে। টিএসসি-তে। আমাদের বন্ধুদের অনেকের তার হবু স্ত্রীদের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-তে। বয়স হয়ে গেছে, বলতে দ্বিধা নেই ; আমার হবু স্ত্রীর সঙ্গে আমার প্রিয় ডেটিং প্লেস ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকা। এতো সাবধানে চলার পরও ডিএমসির (ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ)-এর ব্যাচ মেটদের কাছে ধরা খেতে হয়েছে কয়েকবার। আর প্রিয় ছিল রিকশায় করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে ওকে ওঁর আগারগাঁও এর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নামিয়ে দেওয়া।

ভুলে যাওয়ার আগে বলে ফেলি, রমনা পার্ক নিয়ে আমদের সেই ৯০ সালের দিকে রসিকতা প্রচলিত ছিল।
হয়েছে কী, নানা বয়সের প্রেমিক-প্রেমিকা ও কপোতকপোতির দেখা মিলত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
মাঝেমাঝেই অনেককে আপত্তিকর অবস্থায় পাওয়া গেলে টহল পুলিশ হুমকিধামকি দিয়ে উঠিয়ে দিত।
তেমনই এক সন্ধ্যায় এক ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাকে টহল পুলিশ কিছুটা অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে গেল।তাদের কথোপকথন ছিল এইরকম:
: কি ব্যাপার , আপনারা এখানে কি করেন?
: না, মানে আমরা তো স্বামী-স্ত্রী।
: স্বামী-স্ত্রী তো বাসায় যান, এইখানে কি ?
: ইয়ে মানে, আমি একজনের স্বামী আর উনি আরেকজনের স্ত্রী !

আমার নিজের অভিজ্ঞতা না দিলে লেখাটা গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। নামোল্লেখ না করে বন্ধুদের প্রেম ও বিরহের কথা যেহেতু বলে ফেলেছি কয়েকটি।তাঁদের সবাই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে আছে, এবং নাম উল্লেখ না করায় হাঁফ ছেড়ে আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে !

২০০২/৩ হবে হয়তো। আমার বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে এবং একইসঙ্গে চাকরির সবচেয়ে বিপদসংকুল সময়ে এক তরুণী দুই-তিনদিন করে মোবাইলে ফোন দিল। মধুর ভাষিণী । সপ্তাহ খানেকের মাথায়, রমজানের সময় রিকশায় আমি আর আমার আরেক কলিগ অন্য এক অফিসের ইফতার পার্টিতে মুখরক্ষা করতে যাচ্ছি। এর মাঝে সেই তরুণীর ফোন। আগের কয়েকটা আলাপ দীর্ঘ ছিল, কেন জানি না –এই বারেরটা আর দীর্ঘ করতে ইচ্ছে করলো না।

কথা শুনে বুঝে ফেলেছিলাম যে, সে আমার অফিসের অন্য কোন তরুণী সহকর্মীর মাধ্যমে আমার ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর নিয়েছে ।
ফোনালাপের মাঝে আমি জানতে চাইলাম,আপনি আসলে কি চান ? ।
ন্যাকা গলায় উত্তর এলো ‘বন্ধু হতে চাই, আমরা কি বন্ধু হতে পারি না! ’
উল্লেখ্য, সেটা ছিল মোবাইল ফোনের যুগ, এইসব নানারকম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ফেটওয়ার্কিং ছিলনা। ছিলনা কোন ভার্চুয়াল জগত।
‘আপনি জানেন আমি বিবাহিত?’
‘জানি।’
‘তাহলে আপনার আর আমার বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বা সীমানাটা কোথায় ?’
আমি বললাম, ‘ ধরেন, আপনার সাথে আমি মাস তিন-চারেক গুচ্ছের টাকা খরচ করে ফোনাফুনি করলাম ( সেই সময় কলরেটের কথা চিন্তা করেন, ৬ টাকা/মিনিট!)
তারপর ? তারপর , কোন এক পবিত্র বিকালে আপনি আমার সঙ্গে বা আমি আপনার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করব।
তরুণী গলায় মধু ঢেলে বলল , ‘তাতো চাইতেই পারি ! পারি না ?’
‘ধরেন অফিসের এতো ঝামেলার মধ্যে সময় বের করে কয়েকদিন চাইনিজ টাইনিজ খেলাম!’
তরুণী নীরব সম্মতি জানালো , ‘হুম।’ ( মানে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে খেতে চায় ! )
‘তারপরে একটু গা ঘেঁষাঘেঁষি হবে, তারপর আরো মাস ছয়েকের মাথায় মাথায় এই সম্পর্ক হয়তো বিছানা পর্যন্তও যেতে পারে !’
তরুণী এবার কিছুটা বিব্রত মনে হলো । বলল, ‘আপনি আমার সঙ্গে এই ভাবে কথা বলছেন কেন?’
সে তখনো বোঝেনি ,আলোচনা কোনদিকে যাচ্ছে।
বললাম ‘আমার মতো একজন ব্যস্ত কামলা টাইপের মানুষ ছয়মাস বা একবছর ধরে বিবাহিত জীবনের পাশাপাশি রোমাঞ্চের জন্য এতো সময় বা অর্থ নষ্ট কেন করবে বলেন ! সেটা না করে আমরা কি পুরো ব্যাপারটাকে সংক্ষিপ্ত করতে পারি না? আপনি ঠিকানা দেন ইফতার সেরে আপনার বিছানায় চলে আসি!’
তরুণী তোতলাতে শুরু করলো।

যাই হোক, ওই কাষ্ঠল ফোনালাপের পরে সে আর কখনো আমাকে ফোন দেয় নাই; ফোন দেওয়ার প্রশ্নও আসে না ! এবং আমার বিবাহবহির্ভূত রোমাঞ্চের ও সম্ভাব্য পরকীয়ার ওইখানেই অকাল প্রয়াণ ঘটলো !

এক পর্যায়ে আমাদের বন্ধুদের সবাই চাকরি বাকরিতে ঢুকে গেল। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে বিদেশে আবাস গড়ল। বিয়ের দশ বারো বছর পরে অনেকের আণ্ডাবাচ্চা নিয়ে তাঁদের সহধর্মিণীরা সংসারধর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পারস্পরিক সম্পর্কে একটা অভ্যস্ততা চলে আসল। একটা ছাড়া ছাড়া ভাব আর কী !
দাম্পত্যের দেড়যুগ পরে প্রকৌশলী বন্ধুদের এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় হা হুতাশ চলছিল।

‘দিনশেষে ঘরে ফিরে স্ত্রীর আচরণকে মনে হয় আপন বোনের মত। বিছানায় মনে হয় ভাইবোন শুয়ে আছি!’
এই কথার পর, আমি কিছুটা আমতা আমতা করে বললাম , ‘কিন্তু আমি তো বিয়েই করেছি মামাতো বোনকে ! আমার তাহলে কি হবে?’
আমার প্রত্যুৎপন্নমতি প্রকৌশলী বন্ধুটি গভীর উদাস কণ্ঠে বলল, ‘কী আর হবে ! মনে হবে তোরা দুই ভাই এক বিছানায় শুয়ে আছিস !’

কোন ঘরোয়া আলোচনায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বলেছিলেন, মানুষ নাকি সর্বোচ্চ তিনবার প্রেমে পড়তে পারে তার সমগ্র জীবদ্দশায়। প্রেমের উত্তেজনা বা মেয়াদ প্রতিবার ১২ বছর করে থাকতে পারে। বিয়ে হওয়ার একযুগ পরে, কীভাবে ভালোবাসা থাকে !ফিকে হয়ে আসে সব উত্তেজনা। বাৎসল্য , সামাজিকতার দমবন্ধ আঁটুনিতে বদ্ধ থাকতে হয়। সম্পর্কের নতুন করে ঝালাই মেরামতের দরকার হয়ে ওঠে এই সময়।
পুরুষেরা নাগরিক ব্যস্ততার মাঝে খুঁজে ফেরে কিছুটা রিলিফ, স্বস্তি, রোমাঞ্চ, অ্যাডভেঞ্চার, নতুনত্ব। আর বিবাহিতারা খুঁজে ফেরেন তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই প্রশংসিত চোখগুলোকে। বিয়ের পরে সন্তানাদি , স্থূলত্ব সবকিছু মিলিয়ে তাঁদের জীবন থেকেও হারিয়ে যায় সব রোমাঞ্চ। সংসার , সংসার, বাচ্চার স্কুল কোচিং রোজ সেই এক ঘেয়ে রুটিন। স্বামীরা ট্র্যাফিক ঠেলে এসে রাতের খাবার খেয়ে টিভি দেখতে দেখতে ফোঁসফোঁস নিঃশ্বাসে ঘুমিয়ে পড়েন। কারো গায়ে কারো হাত পড়লে শুনতে হয়, বিরক্ত কোর না তো , ঘুমাও ! কাল সকালে অনেক কাজ জমে আছে।

ঠিক এই সময়ে মানব-মানবী জ্যোৎস্নায় ভূত দেখে।

আমার এক বন্ধুর শেয়ার করা লেখায় দেখেছিলাম , সে লিখেছে শুরুটা নাকি এভাবে হয়!

: ভাবী, আপনি দুই বাচ্চার মা! আপনাকে দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। দেখে মনে হয়, মাত্র ইন্টার-পাশ করছেন! সিরিয়াসলি!
: মন খারাপ কেন ভাবী? ভাইয়া ঝগড়া টগড়া করলো নাকি?……. আপনার মতো এরকম একটা মানুষের সাথেও ঝগড়া করা যায়????? বিশ্বাসই হচ্ছে না!
: জন্মদিনে কি কি করলেন আপনারা? …….কি? ভাইয়ার অফিস?…..কি যে বলেন!…. আমি এরকম একটা বউ পেলে জন্মদিন উপলক্ষে এক সপ্তাহর ছুটি নিতাম!…. হাইসেন না, সিরিয়াসলি!
উল্টোদিকে ভাইদেরকেও ভাবীরা নানা প্রশংসা করে ফেলে।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জন্য প্রতিষ্ঠিত চল্লিশোর্ধ বিবাহিত পুরুষেরা যেমন অনেক নিরাপদ, ঠিক তেমনি নিরাপদ ত্রিশোর্ধ এক বা দুই সন্তানের জননী বিবাহিতারা। এই উভয়পক্ষের মনের ভিতরে প্রশংসা পাওয়ার আগুন নিভে গেলেও ধোঁয়া থেকে যায়। এলাকার ডাকসাইটে সুন্দরী, কলেজ কাঁপানো, ভার্সিটির করিডোরে ভক্ত পরিবেষ্টিত সুন্দরীরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সচিব আমলার বউ হয়ে যায়, তাঁদের না থাকে কোন নিজস্ব পরিচয় , না থাকে আশে পাশে প্রশংসার চোখগুলো ! এইসব স্পর্শকাতর বিবাহিতারা লোল পুরুষের নিরাপদ আবাস। পরকীয়ায় জড়িয়ে তার প্রেমে এখনও পুরুষকুল হাবুডুবু খাচ্ছে এটা ভেবে ভেবে , এক গভীর পরিতৃপ্তি নিয়ে ঘুমাতে যায় ঐ সুন্দরীরা। সে যে বিদুষী, রূপবতী , গুণবতী –শুধুমাত্র সংসার ধর্ম পালন করতে গিয়ে সে গৃহবন্দী হয়ে আছে , সেই ব্যাপারে সে নানা সমবেদনা আশা করে। চালাক পুরুষ মাত্রই সেই আকাঙ্ক্ষার চারাগাছে পানি দেওয়া শুরু করে। মুখোমুখি কথা বলার সক্ষমতা খুব কম লোকের থাকে, অথচ ফোনে সেটা আরেকটু সহজ। মনের অনেক কথা বলে ফেলে যায়। আর মোবাইলের যুগের পরে এখন ভার্চুয়াল অন্তর্জালের সময়ে সেই সুযোগ অনেক বেশি। মেসেঞ্জারে তো কথার ফুলঝুরি ছোটে।

একটা সময়ে ঘরের নারীরা স্বামীর ব্যাপারে আস্থাশীল হয়ে পড়ে, জানে কোথায় আর যাবে! বাচ্চা কাচ্চার টানে দিনের শেষে এই খুঁটির কাছেই ফিরে আসতে হবে।

আমার এক বন্ধু বাচ্চাকে স্কুলে দিতে গিয়ে বহুদিন ধরে বাচ্চার বান্ধবীদের মায়েদের সান্নিধ্য পেয়েছিল। তার বউ জেনে যাওয়ার পরে যথারীতি নানা মানঅভিমানের পরে তাঁরা এখন প্রবাসে ঘাঁটি গেড়েছে।
আরেক বন্ধু ছিল টাইম-জোনের বিপরীতে ; তার পড়তো রাতের ডিউটি — তার রাত মানে তখন বাংলাদেশের দিন। কীভাবে কীভাবে সে নানা বিবাহিতার সঙ্গে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাতভর কথা বলে সম্পর্ক গড়ে তুলত। সেটা সে দেশে ফিরে এলে দৈহিকতায় শেষ হত। চোরের দশদিন , গৃহস্থের একদিন ! সেও বউয়ের কাছে ধরা খেয়ে এখন লাইনে চলে এসেছে।

বিয়ে করে একজন জীবনসঙ্গিনীকে পেতে আমাদের সমাজে পুরুষদের যে পরিমাণ মূল্য পরিশোধ করতে হয় সারাজীবন ধরে। সেই জীবনসঙ্গিনী ও সংসারকে আরেক রোমাঞ্চের জন্য হারিয়ে ফেলার যে সম্ভাবনা তৈরি হয় ,সেটাও বিশাল বেদনাদায়ক। আস্থার সংকট একবার হলে সেটা ফিরে আসতে সময় তো লাগেই।

বহুদিন আগে আমরা যখন একে একে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসাবে বিবেচিত হওয়া শুরু করলাম। আমার এক উচ্চপদস্থ বন্ধুর পশ্চিমা সিইও তাঁকে বলেছিল, সময় পেলেই যেন রিল্যাক্স করে ! সিইও-এর দৃষ্টিতে রিল্যাক্স মানে অনেক কিছু হতে পারে। হতে পারে সেটা জিম, ট্রাভেল, অ্যালকোহল,সেক্স, গ্যাম্বলিং, আড্ডা ইত্যাদি ইত্যাদি ! তাঁর মতে, যারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা , যাদেরকে সারাক্ষণ অনেক প্রেশারের মধ্যে কাজ করতে হয় তাঁদের যে কোন একটা সিদ্ধান্তের উপর মুলতঃ প্রতিষ্ঠানের ও একই সঙ্গে অনেক মানুষের ভাগ্য নির্ভর করে। তাই প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত যারা নেয়, তাঁদের একটু রিল্যাক্স করার, ব্যাপারটা জায়েজ আছে। তবে, মানুষ সে উচ্চপদস্থ হোক বা নিম্ন তার একঘেয়ে জীবনের রোমাঞ্চ ও অ্যাডভেঞ্চার আবশ্যক। নিম্নবিত্তদের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই হিমসিম খেতে হয়। Maslow’s hierarchy of needs হিসাব করলে নিম্নবিত্তদের সেকেন্ডারির চাহিদার দিকে নজর দেওয়ার সময় কোথায় ?

পুরনো দিনে ফিরে যাই আবার ! ৯০ এর দশকের শেষের দিকে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাচের সবাই শিক্ষা সফরে ভারতে। এক পর্যায়ে কোলকাতায়। শেষ বিকেলে গঙ্গার ধারে বেড়াতে গিয়ে এতো ঘনিষ্ঠভাবে কপোত কপোতীদের কে দেখে গাইডকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দাদা এ কী অবস্থা ! সে হাসি মুখে বলেছিল, কী করবে বলুন দাদা বলুন। সারা কোলকাতায় প্রেমিক প্রেমিকাদের বসার জায়গাই বা আছে কটা। বাদ দিন দাদা, ওদিকে তাকাবেন না !

অঞ্জন দত্তের বেলা বোসের গান তখন খুব জনপ্রিয়। এমন হয়েছে, আমি সেই ২৪৪১১৩৯ নাম্বারে ফোন দিয়ে বলেছি এটা কি বেলা বোসের নাম্বার। ওপাশ থেকে হেড়ে গলায় উত্তর এলো ওটা কী একটা দোকানের ফোন নাম্বার যারা কী সব সাপ্লাই টাপ্লাই দেয়। সেই সঙ্গে আরো বলল, যে তাঁরা প্রতি সপ্তাহে এরকম কল পেয়ে থাকেন। অঞ্জন দত্তের  আমাদের সময়তো তাই গেছে, সারা ঢাকা শহরে একটা ভাল পার্ক নেই, দুদণ্ড বসে কথা বলার জায়গা নাই। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চন্দ্রিমা উদ্যানে হকারদের অত্যাচার যারা আগের দশকে প্রেমিকাকে নিয়ে গেছেন তাঁরা জানেন। এখন সেটার কোন উন্নতি হয় নি বলেই আমি জানি। প্রেমিক প্রেমিকা দেখা করছে চায়নিজ রেস্টুরেন্টে, বার্গার হাউজে, এটা কোন কথা হল !

আমার এক মামা ; সারা জীবন বয়েজ স্কুল , কলেজ, ইউনিভার্সিটি করে অবশেষে বিয়ের দেখা। তার জীবন এতোটাই নারী-বিবর্জিত ছিল যে, বিয়ে করার পর নতুন মামীর প্রতিটা বিষয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনতে পাওয়া যেত। তুমি এইটাও পার, তুমি এইটাও পার? মর জ্বালা, সে সম্ভবত: নতুন মামীর সকালের প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার ব্যাপারটাকেও বিস্ময়ের সাথে নিয়েছিল। নারী বিবর্জিত শৈশব কৈশোরের পুরুষেরা অনেক বেশি বিপদসংকুল হয়। একই ভাবে পুরুষ-বর্জিত সমাজে যে নারী বেড়ে ওঠে।

এই মধ্যবয়সে আমাদের একই সালে এসএসসি পাশ করাদের একটা সারাদেশব্যপী একটা ফেসবুক গ্রুপ হয়েছে মাস ছয়েক ধরে। আমাকে কেউ একজন অ্যাড করেছে গত ডিসেম্বরে। সিংহভাগ তরুণ-তরুণীদের বয়সটাই শুধু বেড়েছে। কৈশোরিক প্রগলভতা যায় নি। পুরনো বান্ধবীরা যারা ছিল সেই বয়সের আরাধ্য, তাঁদের অনেকেই এখন ফেসবুকের গ্রুপে। কৈশোরে যার সঙ্গে কথা বলাতো দূরে থাক, দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। তাঁদের কে ভার্চুয়াল জগতে পেয়ে আমাদের ছেলে বন্ধুদের হ্যাংলামি চোখে বাঁধে । ঠিক তেমনি, মহল্লার একসময়ের ডাকসাইটে সুন্দরীরা যাঁদের মেদ জমেছে, চোখের নীচে কালি, ছেলে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাঁরাও তাঁদের রূপমুগ্ধদের এতোদিন পরে হাতের নাগালে পেয়ে যারপরনাই আহ্লাদিত ! সেই স্কুলের দিনগুলোতে , আমাদের যখন মানসিক বয়স ১৩-১৪ তে আটকে ছিল, আমাদের বান্ধবীদের তখন প্রকৃতির নিয়মে দ্রুত বেড়ে উঠছিল হরিণীর শরীর । আমাদের বান্ধবীরা বুঝে গিয়েছিল, কী অমূল্য সম্পদের মালিক তাঁরা ! সারাক্ষণ নানা বয়সের যুবকদের আহাজারি তাঁদের দিকে ধেয়ে আসছে ! বান্ধবীদের বড় একটা অংশ তড়িঘড়ি করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত সফলদের বিয়ে-টিয়ে করে ঘরসংসারী হয়ে গেল।

আজ এতোগুলো বছর পরে , তাঁদের রূপমুগ্ধদের একসঙ্গে পেয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে তাঁদের নানা ভঙ্গীর ছবি লোডের বাহার আর লাইক গোনার হুল্লোড় শুরু হয়ে গেছে। শিকারি বিড়ালের মতো এরা ইঁদুরকে একবার ধরে আবার ছাড়ে। আবার ধরে, আবার ছাড়ে ! মারেও না , খায় ও না ! এটাই খেলার মজা । বয়স হয়েছে , কিন্তু সেই শিকারির ট্রেনিং তো আর ভুলে যায় নি সে। এর মাঝেই কেউ কেউ হয়তো ব্যক্তিগত সম্পর্ক দাঁড় করিয়ে ফেলে , সেটা কোথায় গিয়ে গড়ায় সে তারাই জানে।

ঠিক কেমন মেয়েদের সঙ্গে পরকীয়ার জড়িয়ে পড়ে বিবাহিত পুরুষরা? স্ত্রীরা ভাবেন যে পরকীয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিনী হয়তো তাঁদের চেয়ে আকর্ষণীয় উদ্ভিন্ন যৌবনা , দুষ্টুমি আর গ্ল্যামারের একটা মিশ্রণ ! কিন্তু বাস্তবতা আলাদা। পরকীয়া হয় অনেকাংশে সমবয়সী পুরুষ-নারীর অথবা তার বেশি বয়সী কারো সঙ্গে । এমনকি স্ত্রীয়ের চেয়ে অনেক কম সুন্দর ও শিক্ষিতাদের সঙ্গে । কীভাবে কীভাবে যেন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিনী তার টার্গেট করা পুরুষটির মনের শূন্য জায়গাটি দখল করে নেয়। যে বিষয়গুলো নিয়ে স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘদিন কথা বলেন না। তাঁদের পয়েন্ট অভ ইন্টারেস্ট না , সেইগুলোতেই আলোচনা এগুতে এগুতে পুরুষটি খুঁজে পায় তার মানসিক অবলম্বনকে । মানসিক শূন্যতা আর ফিল ইন দি গ্যাপ থেকেই সম্পর্ক বাড়তে বাড়তে অবধারিতভাবে দৈহিকতায় যেয়ে শেষ হয়। সেটা নিয়ে কোন জড়তা থাকে না উভয়পক্ষের কারো মাঝে ।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ভাল কী মন্দ কীএসব নিয়ে মন্তব্য করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি লেখার শুরুতেই। শুধু এটুকু বলতে পারি, পরকীয়ার একপেশে মন্দ দিকের পাশাপাশি ভালো দিকও আছে। পরকীয়া নতুন করে নিজেকে ভালোবাসতে শেখায়। সারাদিন ধরে একজন পুরুষ অফিসের কর্মকর্তা, বাসায় ফিরে কারো পুত্র, কারো পিতা, কারো কাকা-জ্যাঠা, কারো স্বামী ! ঠিক একই ভাবে নারীটির পরিচয় কারো মা, কারো কন্যা, কারো চাচী-ফুফু, কারো স্ত্রী ! সমাজের আরোপিত পরিচয়ের বাইরে আর কোন পরিচয় থাকা সম্ভব না। সেই নারী ও পুরুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে সব ব্যাপারে অনেক সচেতন ও সাবধানী হয়ে যায়, নিজেকে আরো বেশী করে গুছিয়ে তোলেন। দাম্পত্যের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি মেলে। আবার একটা অপরাধ বোধ থেকে নিজের জীবনসঙ্গী অথবা জীবনসঙ্গিনীর ব্যাপারে ভালোবাসা বেড়ে যায়, সম্পর্কের উন্নতি হয়। সবচেয়ে বড়কথা নিজেকে নতুন করে ভালোবাসা শুরু করে পুরুষ ও নারী !

বলাই বাহুল্য, পরকীয়ার সম্পর্ক ঠিক কতদূর যাবে, কোথায় থামতে হবে সেটা অংশগ্রহণকারীদের পূর্ব অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে ! একই কর্মকাণ্ডে একজন দিব্যি সংসার করে চলেছেন ; তো আরেক জনের সংসার ভেঙ্গে একাকার। একটা সম্পর্কের বিনিময় মূল্য কতোখানি দিতে হচ্ছে সেটাই তাঁদের আগামীর পথ নির্ধারণ করে দেয়। । সামান্য অথবা অসামান্য রোমাঞ্চ-অ্যাডভেঞ্চারের বিনিময়ে আপনি কী কী পেতে পারেন অথবা কী কী হারাতে পারেন, সেই হিসাব আপনার নিজস্ব।

সবার জন্য ভালোবাসা দিবসের অগ্রিম শুভেচ্ছা !

প্রকাশকালঃ ৭ই ফেব্রুয়ারি,২০২০

দার্শনিক ডায়োজেনিসের গল্প

টু হুম ইট মে কনসার্ন !

” দার্শনিক ডায়োজেনিসের আমলে যিনি রাজা ছিলেন, তাঁর নাম ডেনিস। রাজাকে তোষামোদ করতেন না বলে ডায়োজেনিসের জীবন ছিল অত্যন্ত ভোগবিলাসহীন। জীবনযাপন করতেন একেবারে সাধারণ মানুষের মতো। কিন্তু তাঁর সমসাময়িক অ্যারিস্টিপাস নামের আরেক দার্শনিক রাজাকে তোষামোদ করতেন বলে মালিক হয়েছিলেন প্রচুর বিত্তবৈভবের। একদিন খাওয়ার সময় ডায়োজেনিসকে শুধু শাক দিয়ে রুটি খেতে দেখে অ্যারিস্টিপাস ব্যঙ্গ করে বললেন, ‘আপনি যদি রাজাকে তোষামোদ করে চলতেন, তাহলে আজ আর আপনাকে শুধু শাক দিয়ে রুটি খেতে হতো না।’
জবাবে ডায়োজেনিস হেসে বললেন, ‘আর আপনি যদি শাক দিয়ে রুটি খাওয়া শিখতেন, তাহলে আজ আর আপনার রাজাকে তোষামোদ করে চলতে হতো না।’

ছোটগল্পের চেষ্টা

মাথার কাছের জানালা , হাস্নুহেনা গাছ ছিল একটা । হাত দিয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ছোঁয়া যায়। ছোট খালা বললো, ‘ যে রকম গন্ধ, দেখিস সাপ আসবে!’ ঢাকার শহরে সাপ ? মানুষই টিকতে পারে না !

তবু মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে একবার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তাকাতাম যদি সাপ দেখা যায় ! মনটা হু হু করতো, কিংবা গভীর রাতে বিষণ্ণ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
আসলে, হাস্নুহেনা গাছ আর সাপ পর্যন্ত ঠিক আছে । পরের গুলো আমার লেখকস্বত্বার আরোপিত আবেগ ! এর পরে ধরেন, আমি আমার আশে পাশের সবার চরিত্র বিশ্লেষণ করে টক-ঝাল কিছু শুরু করলেই একটা ছোট গল্প হয়ে যেতে পারে!

মুশকিল হচ্ছে, আমি সেই ছোট্টবেলায় বিছানায় হিসু করতাম এবং গভীর রাতে আমার ঘুম আগেও ভাঙ্গে নাই, এখনো ভাঙ্গে না !ছোট গল্প? দিল্লি দূর অস্ত !

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৭

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( কর্পোরেট শ্রেণিবৈষম্য )

পৃথিবীর আর সব সাধারণ শ্রেণিবৈষম্যের মতই কর্পোরেট জগতেও ক্ষমতাবান, মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত ও ক্ষমতাহীন শ্রেণি আছে। আমাদের তৃতীয় বিশ্বের সংস্কৃতি অনুযায়ী ক্ষমতাবানদের সীমিত কয়েকজন ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করেন এবং বেশির ভাগ ক্ষমতাবানেরা সুযোগ পেলেই অপব্যবহার করেন।

যে কোন কারণেই হোক না কেন, ক্ষমতাবানদের ব্যাপারে ক্ষমতাহীনদের একটা চিরস্থায়ী ঈর্ষা কাজ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঠিক যে যে কাজগুলো আপাত: দৃষ্টিতে তাদের কাছে দৃষ্টিকটু অসহনীয় মনে হচ্ছে ; কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া- আমি নিশ্চিত ক্ষমতা পেলে ক্ষমতাহীন ব্যক্তিটি ওই একই কাজগুলো অবলীলায় করবে! এটা একটা চক্রের মতো, ‘যে যায় লংকায় সেই হয় রাবণ ’- টাইপ আর কী!
ক্ষমতাহীনের সান্ত্বনার জায়গা হচ্ছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা বা অভিসম্পাত দেওয়া যাতে ক্ষমতাবানদের মধ্যে যারা অহংকারী , আস্ফালনকারী ছিল , তাঁরা খুব দ্রুত কোন একদিন যেন ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। প্রার্থনা করে এবং তাঁদের জীবদ্দশায় সেটা দেখে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। আসলে এ ছাড়া ক্ষমতাহীনদের আর বেশী কিছু করারও থাকে না। ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে ৬৩৮ বার হত্যা-প্রচেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি ৫০ বছরে শাসনের শেষে ২০০৮ সালে অবসরে যান। পরবর্তীতে ৯০ বছর বয়সে গত ১৬ সালের নভেম্বরে বার্ধক্যজনিত কারণে স্বাভাবিক মৃত্যু।

ক্ষমতাহীনের প্রার্থনা ও আকাঙ্ক্ষা দেখে আমার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বহুল পঠিত ও আলোচিত ‘দেবদাস’ উপন্যাসের কথা মনে পড়ে। উপন্যাসে ট্র্যাজেডির নায়ক দেবদাস। প্রধান নায়িকা একদিকে পার্বতী অন্যদিকে চন্দ্রমুখী । আমার দৃষ্টির প্রক্ষেপণ এঁদের মধ্যে প্রেমের ক্ষমতা কার বেশী ছিল সেই দিকে নয়। সেটা বহুবার কলেজ ,বিশ্ববিদ্যালয় ও নানা ভাষার সিনেমার পর্দায় প্রস্ফুটিত হয়েছে। আমি বরং আমার পাঠককে কর্পোরেট দুনিয়ার ক্ষমতাহীনের আকাঙ্ক্ষা ও তার পরিণতি নিয়ে কিছু কথা বলি।

বিচ্ছেদের সময়ে পার্বতী দেবদাসকে বলেছিল, তাঁকে ছাড়া সে বাঁচবে না। পার্বতী ও চন্দ্রমুখীর ত্রিভুজ প্রেমে ত্রিশঙ্কু হয়ে বেচারা দেবদাসের মর্মন্তুদ মৃত্যু হয়। তাঁর অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী তাঁর স্বেচ্ছাচারিতা আর অতিরিক্ত মদ্যপান। আর হ্যাঁ , পার্বতীও বাঁচেনি ! সম্ভবত: পার্বতী মারা গিয়েছিল, আশি বছরের অশীতিপর বৃদ্ধা হয়ে, গুচ্ছের সন্তানাদি ও নাতি নাতনি রেখে !

কি মনে করে, বহুদিন পরে উপন্যাসটাও একটু নেড়ে চেড়ে দেখলাম। উপন্যাসের শেষে শরৎচন্দ্রের কয়েক লাইন পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়ঃ
“এখন এতদিনে পার্বতীর কি হইয়াছে, কেমন আছে জানি না। সংবাদ লইতেও ইচ্ছা করে না। শুধু দেবদাসের জন্য বড় কষ্ট হয়। তোমরা যে-কেহ এ কাহিনী পড়িবে, হয়ত আমাদেরই মত দুঃখ পাইবে। তবু যদি কখনও দেবদাসের মত এমন হতভাগ্য, অসংযমী পাপিষ্ঠের সহিত পরিচয় ঘটে, তাহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও। প্রার্থনা করিও, আর যাহাই হোক, যেন তাহার মত এমন করিয়া কাহারও মৃত্যু না ঘটে। মরণে ক্ষতি নাই, কিন্তু সে সময়ে যেন একটি স্নেহকরস্পর্শ তাহার ললাটে পৌঁছে-যেন একটিও করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ দেখিতে দেখিতে এ জীবনের অন্ত হয়। মরিবার সময় যেন কাহারও একফোঁটা চোখের জল দেখিয়া সে মরিতে পারে।”
পাঠকের মনোবাসনা পূর্ণ হতো যদি, দেবদাসের সঙ্গে সঙ্গে বা কাছাকাছি সময়ে পার্বতীরও মৃত্যু হোত।

সেটা আসলে হয় না। হয় না বলেই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস এতো জনপ্রিয়। পার্বতীর সমস্ত জীবনের রঙ রূপ রস ভোগ করে বৃদ্ধা হয়ে মৃত্যুর মধ্যে মহিমা নেই ; নেই সাধারণ পাঠকের বা জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
আমাদের কর্পোরেট পৃথিবীতে ক্ষমতাধর কেউ কেউ থাকেন। তাঁদের ক্ষমতা , বৈধ-অবৈধ বিপুল সম্পত্তির প্রাচুর্য নিয়ে অনেকের ঈর্ষা আর কানাঘুষা থাকে। তাঁদেরকে ক্ষমতাহীনরা পছন্দ করেন না সঙ্গতঃ কারণে। আকাঙ্ক্ষা করেন, প্রার্থনা করেন তাঁদের সাম্রাজ্যের পতন হোক, তাঁদের আস্ফালনের সমাপ্তি ঘটুক।

হ্যাঁ, ঘটে ! তাঁদের সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটে ! তাঁদেরও বয়স হয়, ক্ষমতা কমে যায়। কিন্তু সেই দীর্ঘ মেয়াদ শেষে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে সান্ত্বনা পাওয়ার কিছু থাকে না

প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭