ছয় বছর বয়স পর্যন্ত মাতৃস্তন পান করেছি। এত্তো বড় হয়ে যাওয়ার পরেও বুকের দুধ কেন খেতাম, আর কীভাবে সেটা পেতাম সেটার রহস্যের চেয়ে মর্মান্তিক ছিল– কাছের আত্মীয়দের কাছ থেকে খোঁটা শোনা। অনেকদিন পর্যন্ত এই ছেলেমানুষির অপমান সইতে হয়েছে সবার কাছে। দীর্ঘদিন স্বাস্থ্যকর মাতৃদুগ্ধ পানের পরও কেন আমাকে সারাজীবন নানা অসুস্থতায় ভুগতে হয়েছে সেটাও রহস্য।
আমার দৈহিক গড়ন আম্মার মতো, কিছুটা নাদুসনুদুস, ঢলঢল। সামান্য কিছুটা অবয়ব পেয়েছি আব্বার কাছ থেকে। আমার পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি উচ্চতা নিয়েও সারাজীবন সমস্ত কাজিনদের মাঝে বেঁটে দুর্নাম নিয়ে চলতে হয়েছে। আব্বা ছয় ফুট, ভাইয়া ছয় এক। ছোটটি পাঁচ ফিট দশ।
ছোটবেলায় কয়েকবার জ্বর হয়েছে, সেগুলোর স্মৃতি মনে নেই। দাঁতের সমস্যা ও দাঁতব্যথা ছিল আজীবন। সেটা সম্ভবত: নিয়মিত ব্রাশ না করার বদভ্যাসে। নানাবাড়িতে বেদেনীরা আসত। কি একটা গাছের শিকড় দাঁতের ফাঁকে রেখে দিয়ে মন্ত্রতন্ত্র পড়ত। আর পরে মুখের ভিতর থেকে শিকড় বের করে দেখাত। শিকড়ের সঙ্গে থাকত সাদাটে একধরণের পোকা। আমরা ভাবতাম দাঁতের পোকা বের হয়ে গেল আর ব্যথা করবে না। যদিও দুইদিন পরে আবার ব্যথা হতো। বহুদিন পরে জেনেছি, বেদেনীরা কলাগাছের মাঝখান থেকে ঐ সাদাটে পোকা বের করে হাতের কারসাজিতে শিকড়ে লাগিয়ে সবাইকে বোঝাত।
পায়ে ফোঁড়া হয়ে দীর্ঘদিন ভুগেছি, সেটার ক্ষতচিহ্ন আছে। আরেকবার খোসপাঁচড়া টাইপ কিছু হয়েছিল দুই পায়ে, সেটা সারাতে নাকি কয়েকবছর লেগেছে। সেটার চিহ্নও দীর্ঘদিন ছিল।
ক্লাস টু থেকে পেটের অসুখবিসুখ লেগেই ছিল। মিরপুরে আসার পর শুরু হল রক্ত আমাশা, হেন ডাক্তার নাই দেখানো হয় নাই। অবশেষে সামনের বিহারী ক্যাম্পের এক কবিরাজি ওষুধ খেয়ে সেরেছে। দুর্বল পাকস্থলী আমাকে ভুগিয়েছে বহু বহুদিন। এখনো হুট করেই ফুড পয়জনিং হয়। সবার যে খাবারে কোন সমস্যা হয় না, সেইটা আমাকে শয্যাশায়ী করে ফেলে।
স্কুলের সময়, দুপুরের টিফিনে বাসায় খেতে আসতাম। বাসা থেকে স্কুল ৩/৪ শ মিটার দূরে। বাসায় এসে কোনমতে খেয়েই আবার ছুটতাম। এই হুড়োহুড়িতে আর দুর্বিষহ গরমে জন্ডিস বাঁধিয়ে বসলাম।, স্কুল জীবনেই দুইবার জণ্ডিস। একবার সারলো দীর্ঘ বিশ্রামে। আরেকবার ক্লাস ফাইভের দিকে জণ্ডিস হল। সারে না তো, সারেই না। দিনের পর দিন , ডাকঘর অমলের মতো আমি বিষণ্ণ হয়ে বিছানায় ও গৃহবন্দী হয়ে থাকতাম। স্কুল গেছে চুলোয়। মিরপুরের সব ডাক্তার ঘেঁটেও কিছু যখন হল না, তখন আমার ছোটমা খবর পাঠালেন , তাঁর ওখানে, মানে লালকুঠিতে কোন এক ধন্বন্তরি কবিরাজ আছে। রোগীর মাথার উপরে মন্ত্রপূত বিশেষ কোন একটা গাছের শেকড়ের অথবা ডালের মালা রেখে দেন। সেই মালা আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে শরীর বেয়ে নেমে গেলেই জণ্ডিস সেরে যায়। তাই সই ! কবিরাজ এসে আমাকে একটা গাছ তলায় বসিয়ে মাথার উপরে ছোট্ট একটা শিকড়ের মালা রেখে দিল। একদিকে আমি আর আরেকদিকের বারান্দা ভর্তি উৎসুক জনতা , কী হয় কী হয়। কবিরাজ কিছুক্ষণ পরে পরে এসে মালা দেখে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই মালা বড়ো হতে থাকল আর মাথা গলিয়ে কাঁধ আর শরীর বেয়ে নেমে গেল। আমি বড়ো হয়ে অনেক ব্যাখ্যা খুঁজেছি ; যেহেতু কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নিতান্তই কম। একটা ব্যাখ্যা হতে পারে, কবিরাজ মালাটা সুতো আর খুব চিকন ডালের ছোট ছোট টুকরো দিয়ে বানিয়েছিল। সুতার গিঁঠ গুলো এমন যে ধীরে ধীরে তা খোলে আর মালাটা বড় হয়ে যায়।
দান দান তিন দান, আবার জণ্ডিস হলো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে। হলে থাকতে আমরা পানি ফুটিয়েই খেতাম, কিন্তু সারাক্ষণ কী আর সেটা চলে ! বিকালের নাস্তায় হোটেল, দোকানে-টোকানে গেলে এদিক সেদিক হতো। এবারে জণ্ডিস বেশি ভোগাল না, হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন নিলাম। এর পরে আর কখনো সমস্যা হয়নি।
বছর আটেক আগে অফিস ট্যুরে নেদারল্যান্ডে।
এক বিখ্যাত রেস্টুরেন্টে ঢুকে বিফ স্টেক অর্ডার করলাম। বলে দিলাম ওয়েল ডান। ব্যাটা ওয়েটার, সে কী বুঝল কে জানে ! খাবার সার্ভ করার পরে কেন যেন মনে হচ্ছিল ওয়েল-ডান করে নাই। ছুরি চালাতেই দেখি ভিতরে কাঁচা কাঁচা । এতো টাকার ডিনার তারপরে লেগেছিল ভয়ঙ্কর ক্ষুধা। কিছুটা খেয়ে ভিতরের তরল গোলাপি রক্তের ছিটে দেখে আর খেতে পারলাম না। ফুড পয়জনিং হয়ে গেল। ট্রাভেলে কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ কাছে রাখি। কয়েকটা ফ্লাজিল , অ্যামোডিস ছিল ; দুইদিন খেয়ে মিটিং পার করলাম।
ট্রেনে এলাম জার্মানিতে। কোনমতে হোটেলে পৌঁছে যাচ্ছেতাই অবস্থা। রুমে বা বিছানায় থাকার চেয়ে আমার সময় কাটতে লাগলে রুম লাগোয়া টয়লেটে। পরদিন মিটিং অনেক কস্টিং। অনুজ দুই সহকর্মীকে বুঝিয়ে সুজিয়ে পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু প্রধান ক্রেতা নিজেই হোটেল থেকে আমাকে পিক করল। আমি বললাম, দেখো দেশ থেকে আনা আমার ওষুধ ফুরিয়ে গেছে। ফ্ল্যাজিল , অ্যামোডিস তো বুঝবে না, তাই জেনেরিক নাম বললাম, মেট্রোনিডাজল (metronidazole) কি পাওয়া যাবে? সে গুগল করে বলল, এটা তো অ্যান্টিবায়োটিক। ওভার দি কাউন্টার পাওয়া যাবে না। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন লাগবে। আবার তুমি জার্মান নাগরিক না, যে হাসপাতালে নেব। প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে গেল। ভাষান্তর করে সব বোঝার পর আমাকে লিকুইড ওষুধ দিল ডাক্তার। দেখতে হোমিওপাথির খয়েরি বোতলের মতো । সেটা কয়েকদিন খেতে বললেন, আর বললেন বিশেষ একধরণের নোনতা রুটি খেতে। আমি তাই কিনে খেলাম, দুইদিনে সেরে উঠলাম।
একবার সেকেন্ড ইয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার আগে মহল্লায় পক্স, প্রতিবছর মে মাসে হয়। আম্মা আমাদের ঠাণ্ডা জায়গায় থাকতে বলেন, শীতল থাকতে বলেন, করলা ভাজি খাওয়ান। সবচেয়ে বড় ব্যাপার নিজেরাও সাবধানে থাকি, সময়মত খাই। গোসল করি। কিন্তু সেটা আমার ছোট-ভ্রাতা শোনে না। ও পড়ে স্কুলে । ফিরেই ব্যাগ ফেলে দৌড় দেয় খেলতে। আম্মার হাজার বারণেও কাজ হয় না।যথারীতি পক্স বাঁধিয়ে আনল। প্রথমে তিনদিনের মাথায় সেরে উঠল ; ওর পরে বড়ভাই, সে ভুগল এক সপ্তাহের মতো। অবশেষে বাড়ীর শেষ অভিযাত্রী হিসাবে আমার জীবনে বসন্ত এলো। মে-জুনের বিভীষিকাময় গরম। আর আমার রুমের ছাদ ছিল টিনের। সকাল না গড়াতেই চিটচিটে গরমে রুমের প্রতিটা আসবাবপত্র উষ্ণ হয়ে উঠত। বিছানার চাদর হয়ে উঠত গরম। আমার সারা শরীর জুড়ে টসটসে ফোস্কার মতো পক্স। আমি সেই বীভৎস গরমে টিনে চালের রুমে পাক্কা এক মাসের বেশি পক্স নিয়ে জেরবার হলাম। শরীরের হেন জায়গা ছিল না , পক্স হয়নি । সংক্রমণ যাতে না ছড়ায় , সেজন্য আমি সারাদিন রুমে। শুয়ে শুয়ে সময় কাটত না। শারীরিক যন্ত্রণায় কাতরাতাম আর আর যাকে ইচ্ছে তাকে অভিশাপ দিতাম। অভিশাপের বেশির ভাগ আমার অনুজের দিকেই ধাবিত হত। বসন্ত চলে গেল রেখে গেল সারা শরীর জুড়ে তার স্মৃতিচিহ্ন।
অধুনা টুকটাক জ্বরজারির প্রকোপ ছাড়া বেশিরভাগ সংক্রামক ব্যাধি থেকে মুক্ত ছিলাম।
তারপরেও ডেঙ্গু আর চিকনগুনিয়ার সময় এলেই সাবধানে থাকতাম। বেশ কয়েকবছর কোনরকমে পার পেলেও চিকনগুনিয়া ২০১৭ সালে ছুঁয়ে গেল। শুধু প্যারাসিটামল আর বিশ্রামে জ্বর চলে গেলেও ক্লান্তি গেল না। ভয়ংকর ক্লান্তি। প্রতিদিন সকালে উঠে দেহটাকে বয়ে নেওয়া, প্রাতঃকৃত্য সারা, জামাকাপড় পড়ে অফিসে যাওয়া, সবকিছুতেই আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। যে আমি প্রত্যেক হাঁটতে যেতাম, সেই আমি এতো লিথার্জিক হলাম যে টানা বছর দেড়েক সবরকম শারীরিক ব্যায়াম থেকে দূরে থাকলাম।
এবছর রোজার শেষপ্রান্তে মে মাসে শ্বশুরকে নিয়ে ডায়ালাইসিসের জন্য হাসপাতালে। ক্যান্টিন বন্ধ। পাশের নামকরা বিরিয়ানির দোকান থেকে বিরিয়ানি নিয়ে আসা হল। তিনজন খেলাম, কারো কিছু হলো না ; আমার হল ফুড পয়জনিং।
সেটা সপ্তাহ খানেক ভোগাল। এই খাই সেই খাই, কোনভাবেই কিছু হচ্ছিল না বলে ডাক্তারের পরামর্শে আবার সেই অ্যান্টিবায়োটিক ডোজ।
আমি সবকিছুতেই অতিরিক্ত স্পর্শকাতর। সবাই সামান্যতে পার পেয়ে গেলেও , আমি ধরা খেয়ে যাই। শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দুর্বল। প্রায় অকেজো দাঁতের পাশাপাশি , জণ্ডিসে লিভার, ধূমপানে ফুসফুস। আব্বা-আম্মা, ভাইয়ার উচ্চ রক্তচাপ ডায়াবেটিকে কিডনি ফেল । আমার হৃদপিণ্ড ভেবেছিলাম কাজ করছে ঠিকঠাক। গত জানুয়ারি থেকে জানা গেল সেটাতেও ঝামেলা পাকিয়ে বসে আছি। এখন নিয়মিত ওষুধ খেতে হচ্ছে।
কয়েকদিন ধরে মনে হচ্ছে, করোনা থেকে যতোই পালাই ; এটা সবাইকে স্পর্শ করবেই। আজ না হোক কাল, কাল না হোক পরশু। আগস্টে না হোক, অক্টোবরে। ডিসেম্বরে না হোক জানুয়ারিতে। আমি ভয় কাটিয়ে উঠেছি। হবেই যেহেতু, নিজেকে যতদূর পারি প্রস্তুত রাখি যুদ্ধ করার জন্য। জীবনের এতোগুলো ধাক্কা যেহেতু কাটিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি, এ যাত্রায়ও পার পেয়ে যাব আশা করছি।
প্রকাশকালঃ ২৩শে জুন,২০২০
সাম্প্রতিক মন্তব্য