বিনয় ও অহংকার

বিনয় ও অহংকার দু’টি আচরণই এক্সট্রিম বা চরমভাবাপন্ন । ভুল বোঝাবুঝির সমূহ সম্ভাবনা ।  আমাদের সমাজে বিনয়ী ব্যক্তিকে সচরাচর শক্তিহীন ও নির্বোধ ভাবা হয়। অহংকারী, উদ্ধত লোকের সুবিধা হচ্ছে তাঁকে নির্বোধ ভাবার সুযোগ অন্যদের কম। কিন্তু এঁদের সমস্যা হচ্ছে এঁরা মানবিক হতে পারেন না। অহংবোধ তাঁদেরকে এক ভীষণ দূরত্বের নিঃসঙ্গ দ্বীপ করে রাখে।

আমার মনে হয়, বিনয় ও অহংকারের  ভারসাম্যে  মানবিকতার পরিমিতিবোধ নিয়ে চলাটাই শ্রেয়।

প্রকাশকালঃ ১১ই জুন, ২০১৯

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( ব্যর্থতার আতঙ্ক )

একজন হতাশ, ব্যর্থ লোকের সাথে অনেকক্ষণ কথা হলো আজকে। দুঃখিত পাঠক ও পাঠিকা, তিনি অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীন বলে উনাকে ব্যর্থ একজন বললাম। কারণ , আমি বা আপনি , আমাদের চারপাশের সবাই মানুষকে অর্থনৈতিক মাপকাঠি দিয়েই মাপেন।

ভদ্রলোক বছরকয়েক আগে বড়ো কর্পোরেট চাকরি করতেন, বাইপাস সার্জারিতে সহায়-সম্বল শেষ। শারীরিক অসুস্থতার দীর্ঘবিরতিতে উনি উনার চাকরিজীবনের আগের পজিশন হারিয়েছেন। এইটা খুব স্বাভাবিক । তাঁর অধস্তনরা উনাকে ফেলে চলে গেছে সামনের দিকে , বয়স ও শারীরিক কারণে নতুন চাকরি পাওয়া অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। সবাই, তাঁকে এড়িয়ে চলেন ; হুম হাম করে পাশ কাটিয়ে যান।

ভেবেছিলেন ব্যবসা করবেন। ব্যবসা করার যোগ্যতা বা মূলধন কিছুই নাই। কারো কাছে সাহায্য চাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নাই। ত্রিশঙ্কু অবস্থা । আমি নিজেও , ব্যবসার ‘ব’ ও বুঝি না। উনাকে বললাম, ‘চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে হলেও পুরনো মালিকের ওখানে জয়েন করেন , যে পজিশনেই হোক না কেন, আপনাকে দিয়া ব্যবসা হবে না। কিছুদিন চাকরি করার পরে হয়তো কোন না কোন পথ পেয়ে যাবেন।’
আমাদের কর্পোরেট জগতের সবাই, খুব ভিতরে একজন আতংকিত ব্যর্থ মানুষকে বয়ে নিয়ে চলছি। আমরা কেউ জানি না, কখন কোন পরিস্থিতিতে ওই ব্যর্থ লোকটা বের হয়ে আসবে সামনে !

প্রকাশকালঃ ৭ই জুন,২০১৩

নিজের কথা। রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত চিঠি( ছয় অগ্রহায়ণ তেরোশো পঁয়ত্রিশ)

আমার মুশকিল এই যে , আমি মন্দিরে যখন কিছু বলি তখন নিজেকেই বলি , গুরুর আসনে বসে বাইরের কাউকে বলতে পারিনে। তার ফল হয় যে বলবার কথাগুলো সহজ হয় না। সেইজন্যে আমাকে ফলাকাঙ্ক্ষাবর্জিত হয়েই কথা কইতে হয়। আমার নিজের কিছু উপকার হয় সন্দেহ নেই—কেননা চিরদিন আমি নিজেকে কথা বলেই শিক্ষা দিয়েছি।

ছয় অগ্রহায়ণ তেরোশো পঁয়ত্রিশ। নিজের কথা।। রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত চিঠি।

নিজের কথা।। রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত চিঠি

আমার বোধ হচ্চে সায়ান্সে চিঠিলেখার পাঠই একেবারে উঠিয়ে দেবে—যাকে আজ চিঠি লিখতে হয় সেদিন তাকে তার আওয়াজসুদ্ধ একেবারে সামনে হাজির করে দেবে। কিন্তু সে হলে কি ভালো হবে ?

নয় অক্টোবর উনিশশো আঠাশ। নিজের কথা।। রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত চিঠি।

হঠাৎ-দেখা।। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,
ভাবিনি সম্ভব হবে কোনোদিন।

আগে ওকে বারবার দেখেছি
লালরঙের শাড়িতে
দালিম ফুলের মতো রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে।
মনে হল, কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চারদিকে,
যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে।
থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা;
চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে।

হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে
আমাকে করলে নমস্কার।
সমাজবিধির পথ গেল খুলে,
আলাপ করলেম শুরু,—
কেমন আছ, কেমন চলছে সংসার
ইত্যাদি।
সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে
যেন কাছের দিনের ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে।
দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব,
কোনোটা বা দিলেই না।
বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায়,—
কেন এ-সব কথা,
এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ ক’রে থাকা।

আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে
ওর সাথিদের সঙ্গে।
এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে।
মনে হল কম সাহস নয়;
বসলুম ওর এক-বেঞ্চিতে।

গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
বললে মৃদুস্বরে,—
“কিছু মনে ক’রো না,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;
দূরে যাবে তুমি,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই।
তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে,
শুনব তোমার মুখে।
সত্য ক’রে বলবে তো?”

আমি বললেম, “বলব।”
বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,—
“আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে,
কিছুই কি নেই বাকি।”

একটুকু রইলেম চুপ ক’রে;
তারপর বললেম,—
“রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে।”

খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম না কি।
ও বললে, “থাক্, এখন যাও ওদিকে।”
সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে;
আমি চললেম একা।

শান্তিনিকেতন
২৪ জুন, ১৯৩৬