খেয়াল করলাম আমার ষষ্ঠ শ্রেণী পড়ুয়া জ্যেষ্ঠা কন্যার টিভি আসক্তি হয়েছে। বছর দুয়েক আগেও কার্টুন চ্যানেল প্রীতি ছিল। কারো বুদ্ধিতে কীভাবে যেন সবকটি কার্টুন চ্যানেল ব্লক করে দিয়েছিলাম দুই কন্যার মানসিক স্বাস্থ্যের স্বার্থে।
কৈশোরে পা দিয়ে ও স্কুলের বন্ধুদের প্রভাবে ,এখন নতুন আসক্তি ইংরেজি মুভি চ্যানেল ও ভারতীয় কয়েকটি চ্যানেলে। সপ্তাহ দুয়েক আগে বসলাম ওকে নিয়ে । বোঝানোর চেষ্টা করলাম কেন এই টিভি আসক্তি খারাপ।আমাদের টিভি আসক্তি জন্মানোর সুযোগ ছিল না। কারণ ৯০-৯১ সাল পর্যন্ত একমাত্র বিটিভি ও মাঝে সাঁঝে বাঁশের অ্যান্টেনায় সিলভারের হাঁড়িপাতিল লাগিয়ে দূরদর্শনের কয়েকটা চ্যানেলই ছিল সম্বল।
স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পরে , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনসার্ট দেখতে যাচ্ছিলাম দুই বন্ধু। রিকশাওয়ালা যথারীতি সদ্য পতিত এরশাদের পরিত্যক্ত বাসভবনে কত অগুনতি নগদ টাকা পাওয়া গেছে সেটার বর্ণনা দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে সে বলল, এরশাদের বাড়িতে নাকি কি এক অ্যান্টেনা আছে, যেটা দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অনুষ্ঠান দেখা যায়। এরশাদ ব্যাটা অনেক ধড়িবাজ ছিল– ইত্যাদি ইত্যাদি। বিষয়টি আমাদের কাছেও বিস্ময়কর ছিল।
সম্ভবত: মাস কয়েকের ভিতরেই বিটিভি আনুষ্ঠানিকভাবে সিএনএন ও বিবিসি চ্যানেলের ঘণ্টাখানেকের অনুষ্ঠান প্রচার করা শুরু করল। আমাদের অনেকে সেই ফালতু নিউজ চ্যানেলে ‘ল্যারি কিং শো’ ‘ফ্যাশন শো’ দেখে মুগ্ধ। তবে বিবিসি চ্যানেলের ডকুমেন্টারিগুলো আগেও যেমন টানত এখনো সেইরকম উপভোগ্য মনে হয়। এরপরে বানের জলের মতো মহল্লায় ঘরেঘরে চলে আসল স্যাটেলাইট আর ডিস অ্যান্টেনা। গুচ্ছের চ্যানেলের ছড়াছড়ি। এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় !
আমি নিজে বছর দশেক আগেই বেডরুম থেকে টিভি বিদায় করেছি। পরিবারকে একান্ত কিছুটা কোয়ালিটি টাইম দিতে হলে টিভিকে বিদায় দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। সারাদিন কর্মব্যস্ততার পরে এসে এই চ্যানেল সেই চ্যানেল করতে করতে খামোখাই রাত গভীর হয়ে যেত। পরেরদিন কাজ করার পুরো জীবনীশক্তি অবশিষ্ট থাকত না। এই এক চ্যানেলে কিছুক্ষণ, আরেক চ্যানেলে আরো কিছুক্ষণ লাফঝাঁপ করার প্রবণতা সময়ের অপচয়ের সঙ্গে সঙ্গে মনোযোগ শক্তির একটা বড় ক্ষতি করে ফেলে। বাসার একটি মাত্র টিভি ডাইনিং –লিভিং রুমে ঝুলে আছে। আমি বাড়ি ফিরে খাওয়ার সময়েও টিভি বন্ধ রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করি। ২৪ ঘণ্টায় একবারই একসঙ্গে বসে খাওয়ার সুযোগ হয়। সারাদিনের জমে থাকা কথাবার্তা বলাটা প্রয়োজনীয়। টিভি চালু থাকলে খেতে খেতেও দেখা যায়, কারো মুখের দিকে তাকিয়ে কথা না বলে, সবাই মাথা ঘুরিয়ে টিভির দিকে ফিরে ফিরে চাচ্ছে। ব্যাপারটা আমার কাছে অসহ্য লাগে।
মেয়েকে পুঁজিবাদ, ক্যাপিটালিজম না বুঝিয়ে সহজ করে বোঝালাম অসংখ্য অর্থহীন টিভি মিডিয়ার বিনোদনের মূল উদ্দেশ্য যতোখানি না মানুষকে বিনোদিত করা– তার চেয়েও বেশি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের। সেটা করতে গেলে দর্শককে টিভির সামনে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখতে হবে। মিডিয়ায় যারা আছেন, তাঁদের মেধা আমাদের সাধারণের চেয়ে অবশ্যই বেশি। বাংলাদেশের গড় আই কিউ ৮২ এর কাছাকাছি; ধরে নিচ্ছি আমার আই কিউ ১০০। এখন যারা অনুষ্ঠান বানাচ্ছেন তাঁদের গড় আই কিউ সাধারণের চেয়ে বেশি। নানাভাবে তাঁদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে, দর্শককে ধরে রাখার, আসক্ত করে ফেলার ; কেননা এই মিডিয়া মেধাবীদের জীবিকা নির্ভর করছে দর্শককে আসক্ত করে উপার্জনের উপরে।
সিংহভাগ চ্যানেলের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেই আমি অবলীলায় বলতে পারি, টিভির এ পাশে বসে থাকা দর্শকের খুব সামান্যই অবকাশ থাকে নিজের চিন্তা ক্ষমতা প্রয়োগ করার। নির্জীব মাদকাসক্তের মতো পুষ্টিহীন, ঝকমকে অলীক জগতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমূল্য সময়ের অপচয়।
কন্যাকে বইয়ের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার জন্য স্বপক্ষে কিছু যুক্তি দাঁড় করালাম। বোঝালাম, বই অনেক বেশি সজীব একটা ব্যাপার। একজন ভালো লেখকের যতো মেধাই থাকুক তাঁর মূল চেষ্টা থাকে প্রকাশিত , উদ্ভাসিত হওয়ার; তাঁর সামান্যই চেষ্টা থাকে আসক্ত করার। একটা ভালো বইয়ের সঙ্গে পাঠকের মিথষ্ক্রিয়া থাকে সরাসরি। লেখকের কল্পনার জগতের সঙ্গে পাঠকের নিজের কল্পনার জগতের সম্মীলন ঘটে। কন্যা কিছুটা বুঝলো মনে হয়। গত কয়েকমাসে কয়েকদিন কিছুক্ষণের জন্য শুধু ইংরেজি মুভি চ্যানেল দেখতে দেখেছি।
এখন টিভির সামনে ওকে দেখলেই আমি মনে করিয়ে দিই , অ্যাডিকশন না তো? সে মৃদু হেসে টিভি থেকে সরে যায়।
প্রথম প্রকাশঃ ১৮ই এপ্রিল, ২০১৭
সাম্প্রতিক মন্তব্য