মানুষ চায় তার সৃষ্টিকে ভবিষ্যৎ বংশধরদের মধ্যে সম্প্রসারিত করে দিতে। এই জন্যই শিক্ষাদানের রীতি প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু পরিচিত জ্ঞানকে হস্তান্তর করার, বা শিক্ষাদান ব্যাপারটির, কোনো বিশেষ স্বয়ংসম্পূর্ণ তাৎপর্য নেই; এর তাৎপর্য সম্পূর্ণরূপেই নির্ভর করে নিজের সৃষ্টিকে মানুষ ভবিষ্যৎ বংশধরদের নিকট কতটা গুরুত্বের সঙ্গে পৌঁছে দিতে চায় তার ওপর। ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে কী হস্তান্তর করতে হবে, তা নির্ধারিত হয় সৃষ্টির মূল্যের দ্বারাই, অর্থাৎ যে-সৃষ্টি যথার্থই মূল্যবান তাই মানুষ পৌঁছে দিতে চায় ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে। শিক্ষকতার কাজটি সাধারণত শৈল্পিক কাজ বলে গণ্য হয় না। শৈল্পিক কাজের গুরুত্ব যথার্থভাবেই আরোপিত হয় সৃষ্টির ওপর—যাকে বলা হয় শিল্পসৃষ্টি।
শৈল্পিক (এবং বৈজ্ঞানিক) সৃষ্টি তাহলে কী?
শৈল্পিক (এবং বৈজ্ঞানিকও) সৃষ্টি হচ্ছে এমন একটি মানসিক ক্রিয়া যা অস্পষ্টভাবে উপলব্ধ অনুভূতিকে (বা চিন্তাকে) এমন স্পষ্টতার মধ্যে নিয়ে আসে যে, সেই অনুভূতি বা চিন্তা অন্য মানুষের মনের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে।
সৃষ্টির প্রক্রিয়া যেহেতু মানুষের মধ্যেই বর্তমান, সুতরাং আমরা প্রত্যেকেই অন্তরের অভিজ্ঞতা দ্বারা তা উপলব্ধি করতে পারি; তার সংঘটন বর্ণনা করা যায় এ-ভাবে: কোনো ব্যক্তি হঠাৎ হয়তো এমন কিছু কল্পনা বা অস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে বসেন যা তাঁর কাছে সম্পূর্ণ নতুন, অপরিচিত ও অশ্রুত বলে মনে হয়। এই নতুন বিষয়টি তাঁর মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তিনি সেই উপলব্ধিকে সাধারণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অন্যের নিকট তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এই প্রয়াসের এক পর্যায়ে বিস্ময়ের সঙ্গে তিনি দেখতে পান, যা তাঁর কাছে স্পষ্ট তা তাঁর শ্রোতাদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও নতুন। তিনি তাঁদের কাছে যে-বিষয়ের কথা বলেন তা তাঁরা সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেন না। অন্যদের থেকে এই বিচ্ছিন্নতা বৈসাদৃশ্য, বা যাকে বলা যায় অমিল—তা প্রথমে তাঁকে পীড়া দেয় এবং নিজের উপলব্ধির সত্যতা আরও গভীরভাবে যাচাই করে ঐ ব্যক্তি পুনরায় চেষ্টা করেন, তিনি যা দেখেছেন, অনুভব করছেন কিংবা উপলব্ধি করছেন তা অন্য কোনো উপায়ে অন্য মানুষদের কাছে প্রকাশ করতে। কিন্তু দেখতে পান, এই লোকেরাও তাঁর ঈপ্সিত বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে পারছেন না, কিংবা তিনি তা যে-ভাবে উপলব্ধি বা অনুভব করেছেন সে-ভাবে তাঁরা তা উপলব্ধি করতে পারছেন না, কিংবা তিনি তা যে-ভাবে উপলব্ধি বা অনুভব করেছেন সে-ভাবে তাঁরা তা উপলব্ধি বা অনুভব করেন না। তখন ঐ ব্যক্তি এমন ধরনের একটি আত্মসন্দেহের দ্বারা পীড়িত হন যে, হয় তিনি যা কল্পনা করছেন বা অস্পষ্টভাবে অনুভব করছেন তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই, নতুবা বাস্তব অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও অন্যেরা তা দেখতে কিংবা অনুভব করতে পারছেন না। এই সন্দেহের অবসানকল্পে তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা করেন তাঁর আবিষ্কারকে এমন স্পষ্টতা দান করতে যেন তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা করেন তাঁর আবিষ্কারকে এমন স্পষ্টতা দান করতে যেন তাঁর উপলব্ধ বিষয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর নিজের কিংবা অন্য কারও কোনো সন্দেহ না থাকে। যখন এই স্পষ্টতাদান সমাপ্ত হয় এবং ঐ ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে, তিনি যা দেখেছেন, উপলব্ধি করেছেন, বা অনুভব করেছেন, তার অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণভাবে নিঃসন্দেহ, তখনই দেখা যায় অন্যেরা তা তাঁরই মতো করে উপলব্ধি এবং অনুভব করতে পারছেন। তাঁর কাছে ও অন্যদের কাছে যা অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ছিল তাকে নিজের ও অন্যদের কাছে স্পষ্ট ও সন্দেহাতীত করার এই প্রয়াসই হলো মানুষের আত্মিক সৃষ্টিপ্রবাহের সাধারণ উৎস। আমরা শিল্পকর্ম বলে যাকে অভিহিত করি—যা মানুষের মনের দিগন্তকে সম্প্রসারিত করে এবং ইতিপূর্বে অনুভূত ও অগোচর বিষয়কে মানুষের অনুভূতি ও গোচরের মধ্যে নিয়ে আসে—তারও উৎস এই প্রয়াস। (অংশ)
আবুল কাসেম ফজলুল হক অনূদিত
সূত্র: লিয়েফ্ তলেস্তায় প্রয়াণ-শতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ/ সংকলন ও সম্পাদনা: হায়াত্ মামুদ (বাংলা একাডেমি, ২০১৩)
সাম্প্রতিক মন্তব্য