ভ্রমণপিপাসু মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত

পূর্ববর্তী প্রজন্মে প্রচলিত ধারণা ছিল ভ্রমণ হচ্ছে আনন্দের ও শিক্ষার। তাঁরা তীর্থযাত্রা বা পুণ্যস্থান ভ্রমণ বা কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ভ্রমণ করত । কিন্তু যাত্রাপথের ঝক্কির জন্য অনেকাংশে ভ্রমণ ছিল ক্লান্তিকর, বিরক্তিকর। আগের প্রজন্মে ভ্রমণ-বাতিকগ্রস্ত লোক ছিল না , তা নয়। আগেও ছিল, সেটা ছিল উচ্চবিত্ত ও একেবারে তরুণ সম্প্রদায়ের। এঁদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য যতোটা না ভ্রমণের জন্য ছিল –তার চেয়ে বেশি ছিল জীবনের প্রাত্যহিক বাস্তবতা থেকে পালিয়ে বেড়ানো, কর্তব্য ফাঁকি দেওয়া এবং আত্মীয় স্বজনের উৎপাত থেকে দূরে থাকার জন্য।

মূলত: আগেও যেটা চিরন্তন সত্য ছিল, এখনও আছে ; সেটা হচ্ছে , যে এক জায়গা দশবার দেখে তার দেখা হয় সম্পূর্ণ ও সম্পন্ন। আর দশটা জায়গা যে একবার করে দেখে তার দেখা হয় অসম্পূর্ণ । আর যে দশ মিনিটে একটা জায়গা দেখে তার দেখা হয় না কিছুই !

বর্তমানে আমাদের ভোগবাদী সমাজের প্রদর্শনকামী বাড়ন্ত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের বিনোদন এবং বড় মুক্তির জায়গা বছরে তিন-চারবার ভ্রমণ। আমাদের প্রাত্যহিকতায় আমরা ক্ষয়ে যাই । জীবনের নানাবিধ যন্ত্রণার মাঝে আমাদের বিনোদন ও মুক্তির দরকার ; খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার দরকার। আমাদের মন এই নাগরিক একঘেয়েমিতে শুকিয়ে যায়। ভ্রমণের আনন্দ এক পশলা বৃষ্টির মতো আমাদেরকে সতেজ করে দেয়।
পরিবারের সবাই আমরা আবার ঘুরতে যাব এই আকাঙ্ক্ষা ও আশা আমাদের বুঁদ করে রাখে ! ভ্রমণের সময় আমরা আকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা প্রায়শ:ই পাই না। কিন্তু যে আনন্দ উত্তেজনাই বোধ করি না কেন – ফিরে আসার পর আমরা সেই উত্তেজনায় আরও কিছু আরোপিত প্রলেপ দিই, সোশ্যাল মিডিয়াতে ছবি দিই। পাড়াপড়শির ঈর্ষা-কাতর চোখ আমাদের সাময়িক উত্তেজনা এনে দেয়। এর পরের দিনগুলো আমরা আবার স্মৃতিকাতর হয়ে থাকি ; প্রতিদিনের জীবিকার গ্লানিকে মেনে নিয়ে পরবর্তী ভ্রমণের পরিকল্পনা করি।

এই মানসিক অবস্থাকে ঠিক নেশার সঙ্গে তুলনা করা যায় কিনা আমি জানি না। একবার একটা ডোজের আশু উত্তেজনার বিরতিতে আসক্ত ব্যক্তি যেমন নানা সুখ-কল্পনায় মেতে থাকে, কখন আবার আরেক ডোজ পাবে। ভ্রমণবাতিকগ্রস্থ অথবা ভ্রমণপিপাসু মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্তদের হয়েছে সেই অবস্থা !

প্রকাশকালঃ ২রা নভেম্বর,২০১৬

কর্পোরেট অবজার্ভেশন (জব ডেসক্রিপসন)

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে Job Description বা Job Responsibilities–ব্যাপারটি সূর্যালোকের মত স্পষ্ট ও আবশ্যকীয় হলেও সবচেয়ে অবহেলিত একটা বিষয়। নিয়োগ-দাতা ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দেন না । BDJobs ঘেঁটে আরও কয়েকটি বিজ্ঞপ্তি থেকে Job Responsibilities কপি-পেস্ট করে দেন। আবার যিনি চাকুরিপ্রার্থী, কোন একটি নতুন পজিশনে যোগদান করতে যাচ্ছেন তারও বিষয়টি নিয়ে অনেকাংশে স্পষ্ট ধারণা থাকে না ।

বেশ কয়েকবছর টেক্সটাইল ফ্যাক্টরির প্রোডাকশনে কাজ করে , নানা কারণে মার্চেন্ডাইজিং-এ চলে এসেছিলাম। কীভাবে কীভাবে BEXIMCO নামের সমুদ্র থেকে OPEX নামের মহাসমুদ্রে এসে পড়লাম, সে গল্প আরেকদিন ! ওখানে গিয়ে অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল, অসমবয়স্ক বন্ধু-স্থানীয় কলিগকে জিজ্ঞেস করলাম, কারখানার মার্চেন্ডাইজিং এর Job Responsibilities কী কী ! সে খুব গম্ভীর মুখ করে বলল , ‘ শোন্‌ ! মার্চেন্ডাইজারদের ক্ষেত্র-বিশেষে ডিমপাড়া ছাড়া সবকাজই করতে হতে পারে!’ আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘ মানে কি ?’ সে তার পূর্বতন কারখানার নানা অম্লমধুর অভিজ্ঞতার কথা বলল। তার ক্যারিয়ারের শুরুতে তাকে প্রায়শ: কারখানার মালিকের বাসায় বাজারও পৌঁছে দিতে হয়েছে ! আমি যারপরনাই হতাশ হলেও ; সৌভাগ্যক্রমে OPEX গ্রুপের কাজের সময়টিতে আমাকে অতদূর নামতে হয়নি !

মূল প্রসঙ্গে আসি। কেন জানিনা, গালভারী কিছু টাইটেলের মাঝে আমাদের কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার “Job Description বা Job Responsibilities” আলোহীন ছায়ায় অপুষ্ট হয়ে থাকে। এবং বছর-শেষের দেনাপাওনা বা বেতনবৃদ্ধির ব্যাপারগুলো যখন মুখোমুখি চলে আসে, ভুল বোঝাবুঝির শুরু হয় তখনই । ‘ব্যবসা খারাপ’ এটা-তো প্রথম গৎবাঁধা বুলি। এরপর আসে আরও গভীর উচ্চমার্গের কথাবার্তা। মালিকপক্ষ কর্মচারীকে বোঝান, আসলে তাদের এক্সপেকটেশন ছিল ‘ওইটা’ ! ‘সেইটা’ আবার আলোচ্য কর্মচারীটি পূরণ করতে পারে নাই অথবা লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেননি। ‘আরও ভালো ব্যবসা হওয়া উচিৎ ছিল’ বা ‘Could have been better! ‘ – টাইপ কথাবার্তা ! ভালোর কী আর শেষ আছে ! ওইদিকে কর্মচারীও সারাবছর কী কী ধরণের কাজে ব্যস্ত ছিলেন , কতখানি পরিশ্রম আর বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন তার স্মৃতি হাতড়ান। সারাবছরের পুণ্য ,ছোটখাটো দুয়েকটা Discount বা Claim-এর পাপে কাটাকাটি হয়ে যায় ! মালিক-পক্ষের সামনে হাস্যকর ভাবে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করতে হয় যে, শুধুমাত্র বাজারে তার ইজ্জত রক্ষার জন্য হলেও কিছু বেতন বৃদ্ধি করা দরকার !

অধুনা Yearly Business Target, Business Growth, Target Achievement , Appraisal বহুবিধ গালভারী টার্মের প্রচলন হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ঐ পর্যন্তই ! বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মালিক-পক্ষকে কে কীভাবে তৈল-সিক্ত করবে এবং বোঝাতে পারবে , সে সারাবছর সে কী করেছে এবং আরও কী করা সম্ভব !আসলে এই তেল বা প্রেজেন্টেশনের অনেকাংশে নির্ভর করে বেতনবৃদ্ধি, গাড়ীবাড়ি ইত্যাদি । আর, কেউ যদি ভাবে, সে তার সাধ্যমত চেষ্টা করেছে এবং সেটার শতভাগ নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হয়ে বছর শেষে সঠিক বেতন বৃদ্ধি বা প্রণোদনা পাবেন ; তাহলে সে আমার মতোই নির্বোধ ! ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচরাচর সেটা হয় না। সম্ভবত: উচ্চমাধ্যমিক বা ডিগ্রীতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘ তৈল’ নামের প্রবন্ধটি পাঠ্য ছিল। তেল যে সমাজজীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তাঁর মতো এতো মধুর করে বাংলা সাহিত্যে কেউ প্রকাশ করতে পারেন নি । এক বন্ধুর কাছে শোনা। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বয়োবৃদ্ধ মালিককে তার এক কর্মচারী নাকি অভূতপূর্ব উপায়ে তৈল-সিক্ত করছিলেন । তো , বৃদ্ধ মালিক এক পর্যায়ে মৃদু হেসে বলেছিলেন , ‘আঁরে তেল দিস্‌ না রে ; তেল আঁরে ও ধরে!’ ( আমাকে তেল দিস না, তেল আমাকেও ধরে !) সুতরাং আপনি যতো বড় মালিক বা কর্মকর্তা হন না কেন , তেল আপনাকে ধরবেই ! মনে রাখবেন, তেল কর্পোরেট জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ( সময় হলে , নেট ঘেঁটে ‘তৈল’ প্রবন্ধটি পড়ে নিতে পারেন। )

আমার কর্মজীবনে আমি হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। নিজের যোগ্যতা নিয়ে আমার গভীর সন্দেহ আছে ! আমার পূর্বতন Boss -রা একে একে সবাই, আমার অযোগ্যতা হাতেকলমে ও অর্থনৈতিক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন। এর উপরে আছে আমার বিখ্যাত আলস্য ! সুতরাং ঘনঘন প্রতিষ্ঠান বদলানোর সৌভাগ্য হয়নি আমার। কর্পোরেট অভিজ্ঞতা যাই বলিনা কেন,ঘুরেফিরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। আলতোভাবে বলতে হবে ; নতুবা কাছের বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষীরা বা পাঠকেরা সহজেই বুঝে ফেলবেন ! কর্মজীবনে কোন এক প্রতিষ্ঠানের ক্রান্তিকালে, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে নতুন অবস্থানে ফিরে আসতে হয়েছিল আমাকে। ক্রান্তিকালীন সময়ে যা হয়, রীতিমত যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি। কেউ কাউকে বিশ্বাস করেনা ; সহকর্মীদের মাঝে নানারকম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব । তো মালিকের অনেক অপ্রিয় কাজ করার জন্য ‘ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলোর’ মত কাউকে না কাউকে দরকার । চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে? মালিক বা নবীন অ্যাডমিন ভরসা পাচ্ছেনা সেটা হ্যান্ডেল করতে। নতুন লোক রিক্রুট করতে হবে ? সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ কাউকে দরকার ছিল সেই মুহূর্তে! মাত্রই একটা স্বৈর যুগের অবসান হয়েছে। নতুন অনেক নিয়ম তৈরি করতে হচ্ছে। নানা ধরণের ম্যানুয়াল, ইন্সপেকশনের ফরম্যাট সংশোধন। সাপ্লায়ারদের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্কের ঝালাই ; সে এক দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। ঐ কাজ করতে গিয়ে আমার প্রায় আড়াই-তিন বছর চলে গিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানের বিশাল জাহাজের পালে বাতাস লেগে সেটি বাজারে সুনামের সঙ্গে আবার চলা শুরু করল। আমি ধরে নিয়েছিলাম যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে আমি আমার সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করেছি । প্রতিষ্ঠানকে একটা কিনারায় নিয়ে আসা এবং ঐ মুহূর্তে মালিক পক্ষের জন্য ও প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল আমার অবদান। মুশকিল হচ্ছে, সবকিছু ঠিক হয়ে যাওয়ার পরে, সেই প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পড়ে গেলাম আমি । অতঃপর সবদিক সবার থেকে গেলাম পিছিয়ে। কেননা , দুটো সহজ ব্যাপার আমি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম , যেটি আমার এক সুহৃদ অগ্রজ ঝাঁকি দিয়ে মনে করিয়ে দিলেন।

প্রথমত: আমার মূল পরিচয় হচ্ছে –আমি মার্কেটিং বা সেলস্‌ এর লোক। দিনশেষে মালিক পক্ষ ব্যবসা চাইবে, মুনাফা খুঁজবে, বাকীসব অনাবশ্যক ! ব্যাপারটা অনেকটা এরকম –ধরুন আপনি সঙ্গীত বা চিত্রশিল্পী, যুদ্ধের সময়ে রাইফেল কাঁধে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে দ্রুততার সাথে আবার আপনার নিজের জগতের ফিরে আসতে হবে। আপনি কৃষক হলে মাঠে, জেলে হলে নদীতে। তা না করে, আপনি যদি যুদ্ধস্মৃতি রোমন্থন করেন এবং আশা করেন যে, ক্রান্তিকালীন যোদ্ধার পরিচয়ে আপনার বাকী জীবন চলে যাবে—তাহলে তো হবে না ! যাই হোক! মূল পরিচয়ের বাইরে গিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি যখন দিনরাত এক করে ছুটছি ; সেই সময় আমার অন্য সহকর্মীরা যার যার ডিপার্টমেন্টের ব্যবসা বাড়িয়েছেন। এবং যথারীতি মালিকপক্ষের কাছ থেকে যাবতীয় সুযোগসুবিধা কড়ায়গণ্ডায় বুঝে নিয়েছেন। কর্পোরেট ভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে আমি গেলাম পিছিয়ে। আমার সহকর্মীরা নিজের পরিচয়ে, নিজের Job Responsibilities নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, ক্রেতাকে সময় দিয়েছেন, ট্রাভেল করেছেন , ব্যবসা বাড়িয়েছেন । তাদের এনে দেওয়া নগদ মুনাফায় মালিক খুশী হয়েছেন; তাদেরকেও সাধ্যাতীতভাবে অফিসিয়ালি ও আনঅফিসিয়ালি লভ্যাংশ দিয়ে খুশী রেখেছেন। ক্রান্তিকালীন সময়ে মার্কেটিং বা সেলস এর থেকেও অ্যাডমিনিস্ট্রিটিভ বা কোম্পানি রিকন্সট্রাকশনের কাজ যে অনেকবেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল ; মালিক পক্ষ তা দিব্যি ভুলে বসে আছেন এবং আমার মনে হয় কর্পোরেট জগতের এটাই স্বাভাবিক নিয়ম!

দ্বিতীয়ত: সেই অগ্রজ বন্ধুটি আমাকে আরও মনে করিয়ে দিলেন–এমন কোন কাজে নিজেকে সারাক্ষণ ব্যস্ত রাখবেন না যেটা মালিক যে কোনও সময় প্রতিস্থাপন করতে পারেন । যেমন অ্যাডমিনিস্ট্রিটিভ কাজ ! এডমিনের কাজ মালিক যে কোন সময় টেক-ওভার করতে পারেন। ইচ্ছে হলেই, একদিনেই তিনি নিজে অথবা তার বংশধর বা নিকটাত্মীয়কে দিয়ে পুরো কোম্পানির অ্যাডমিন ও ম্যানেজমেন্ট বুঝে নিতে পারেন। আপনি মুহূর্তেই গুরুত্বহীন হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু , আপনি যখন মার্কেটিং , সেলস অথবা টেকনিক্যাল কোন কাজে জড়িয়ে আছেন, আপনার নিজের আসল পরিচয়ে টিকে আছেন–আপনাকে এতো সহজে মালিক পক্ষ প্রতিস্থাপন করতে পারবেন না। সুতরাং অবস্থাভেদে সময়ের প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের জন্য যে কাজই করেন না কেন, নিজের মূল পরিচয় ভুলে যাবেন না ।

প্রকাশকালঃ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ছবির দেশে, কবিতার দেশে।। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

“একদিন এই পৃথিবীর আর কিছুই থাকবে না
শুধু এক অন্ধ অবস্থান , যেখানে শুধু
বিভ্রান্ত দিন আর রাত্র ঘোরে-
বিশাল আকাশের নীচে যেখানে ছিল অ্যান্ডিজ পর্বতমালা
সেখানে একটিও পাহাড় নেই, এমনকি একটা গিরিখাতও না
পৃথিবীর সমস্ত প্রাসাদ ও বাড়িগুলোর মধ্যে
শুধু টিকে থাকবে একটিমাত্র বারান্দা
এবং এই বিশ্বের মানব-জাতির মানচিত্রে
শুধু একটা বিষাদ , যার মাথায় আচ্ছাদন নেই।
ভূতপূর্ব আটলান্টিক সাগরের চিহ্ন থাকবে
বাতাসের সামান্য লবণাক্ত স্বাদে
একটা মায়াময় উড়ন্ত মাছ জানবে না
সমুদ্র কেমন দেখতে ছিল।
১৯০৫ সালের এক কুপেতে বসে
(চারটা চাকা আছে কিন্তু রাস্তা নেই)
অতীতকালের তিনটি যুবতী কন্যা
তখনো রয়ে গেছে, কিন্তু শরীর নেই, শুধু বাষ্প,
জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকবে বাইরে,
আর ভাববে প্যারিস বেশী দূর নয়
তারা প্রশ্বাসে নেবে বাতাসের দুর্গন্ধ
যাতে গলা বন্ধ হয়ে আসে।
একদা যেখানে অরণ্য ছিল , সেখানে ভেসে উঠবে
একটা পাখির গান , কেউ তাকে
দেখতে পাবে না , ধরতে পারবে না, শুনতেও পাবে না–
শুধু ঈশ্বর শুনবেন মন দিয়ে এবং বলবেনঃ
‘আরে ! এ যে একটা বউ কথা কও’!

জুল সুপরভাই (ফরাসী কবি)
( জন্ম উরুগুয়েতেঃ দক্ষিণ আমেরিকায় , কবি জীবন অতিবাহিত ফ্রান্সে )

সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার নাকি রবিবার?

পতিত স্বৈরাচার লেজেহোমো এরশাদ আমাদের সময়ের কুখ্যাত ভিলেন। আকাঙ্ক্ষিত শাস্তি না পেলেও – লেজুড়বৃত্তি, উঞ্ছবৃত্তি করে তার শেষের দিনগুলো কাটছে, এই ভেবে আমরা সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করি।

কিন্তু একটা ব্যাপারে এই ভণ্ডকে আমি এখনো অভিসম্পাত করি ; ধর্মের ধোঁয়া তুলে সাপ্তাহিক ছুটি রবিবার থেকে শুক্রবার করে দেওয়া। ৯০ এর পরের এই ২৮ বছরেও কোন সরকারের সাহস হয়নি স্পর্শকাতর কিন্তু অযৌক্তিক ব্যাপারটিকে পুনরুদ্ধার করার।

তৃতীয় বিশ্বের রফতানি নির্ভর দেশের সংশ্লিষ্ট একটা সেক্টরে গত দুই-যুগ ধরে প্রিয়জনের সান্নিধ্য ছেড়ে সম্ভাব্য মধুরতম কিছু সময় শুক্রবারের অনিচ্ছুক অফিসে বিলিয়ে যাচ্ছি।

প্রকাশকালঃ ২রা জুলাই,২০১৯

ওড়াউড়ির দিন [প্রথম খণ্ড: আমেরিকা] ।। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

ওড়াউড়ির দিন [প্রথম খণ্ড: আমেরিকা] ।। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।
প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি বইমেলা ২০১০

দেশের জন্যে এই ব্যাকুলতা প্রবাসীদের মধ্যে যে কতখানি প্রবল একটি গল্প শুনিয়ে তা বোঝানোর চেষ্টা করি। আগেই বলেছি, বিদেশে বাস করা সম্পন্ন ও সচ্ছল বাঙালিদের মধ্যে এই ব্যাকুলতা যতখানি তার চেয়ে এ অনেক বেশি পৃথিবীর নানান প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শ্রমিক শ্রেণীর গরিব অসহায় মানুষের মধ্যে । সচ্ছল মানুষদের মনকে জন্মভূমি যে কখনও সখনও উতলা করে না তা নয়। কিন্তু গাড়ি বাড়ি বিলাস বৈভবে ঝল-মল করা তাদের জীবনে সে পিছুটান বড় কিছু নয় । তাছাড়া ইচ্ছা করলেই তো তারা মাঝেমধ্যে দেশে এসে ঘুরে যেতে পারে। তারা তা যায়ও। তাই বিদেশে থাকলেও দেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার কষ্ট তাদের প্রবল নয়। কিন্তু গরিব প্রবাসীদের ব্যাপারে ঘটনাটা আলাদা। আদম ব্যাপারিদের খপ্পরে পড়ে জমি-বাড়ি বিক্রি বা বন্ধক দিয়ে নামমাত্র রোজগারের আশায় অচেনা দূর বিদেশের পথে পাড়ি জমায় তারা। শুধু পায়ের তলায় একচিলতে মাটির জন্যে, ছোট্ট একটু নিরুদ্বেগ ভবিষ্যতের জন্যে এক নিষ্ঠুর আর বৈরী পৃথিবীর সঙ্গে উদয়াস্ত লড়াই করে বছরের পর বছর জীবনকে তারা নিঃশেষ করে। হয়তো এসবই তারা করে সন্তান, স্ত্রী, বাপ-মা ভাই বা বোনের মুখে সামান্য একটুকরো হাসি ফোটানোর জন্যে। দূরদেশের নির্মম আবহাওয়া বা ঝলসানো রোদের ভেতর শরীর আয়ু ক্ষয় করে আমনুষিক শ্রমে তাদের জন্য দূর প্রবাস থেকে এরা বছরের পর বছর টাকা পাঠায়। সেই টাকা দিয়ে তার ভাইয়েরা বাজার থেকে চড়া দামে মাছ-মাংস কিনে নবাবী হালে দিন কাটায়, চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে ফুর্তিতে সময় গুজরান করে। ভাইয়ের পাঠানো টাকায় তার জন্যে জমি কেনার বদলে অনেক সময় গোপনে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেয়। এমন খবর ও কম শোনা যায় না যে এদের অনুপস্থিতির সুযোগে এদের পাঠানো টাকায় দামি গয়না শাড়ি পড়ে এদের স্ত্রীদের কেউ কেউ পরপুরুষের সঙ্গে ফষ্টি-নষ্টি চালায়—তবু এই মানুষগুলো তাদের মুখ স্মরণ করেই হাজারো শৌখিন জিনিশে বড় বড় ব্যাগ-বস্তা ভর্তি করে বাড়ি ফেরে। প্রিয় পরিজনহীন নিঃসঙ্গ প্রবাসে তাদের ফেলে আসা দেশ, মানুষ, বন্ধু আর আত্মীয়ের মুখ তাদের কাছে স্বপ্নের তুলিতে আঁকা ছবির মতো রমণীয় লাগে। দেশের জন্য স্বপ্ন আর আকুলতা নিয়ে কেটে যায় তাদের হতচ্ছাড়া প্রবাসী জীবনের ভারাক্রান্ত মুহূর্ত।

এমনি একদল দুঃখী মানুষের সঙ্গে বছর তিনেক আগে দেখা হয়েছিল, দুবাই এয়ারপোর্টে। সেবারও আমেরিকা থেকে ফিরছিলাম। দুবাইয়ে প্লেন পাল্টে ঢাকার প্লেনে উঠছি। বোর্ডিং কাউন্টারে গিয়ে দেখি ফ্লাইটে বিদেশি নেই বললেই চলে। কাউন্টারজুড়ে গিজগিজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের নানা-জায়গা থেকে জড়ো হওয়া ঘরমুখো বাঙালি শ্রমিকের দল। বুঝলাম, এদের নিয়মিত আনা-নেওয়ার জন্যেই এমিরেটস, ইতিহাদ, কাতার বা কুয়েত এয়ারলাইন্সের এত ঢাকা-মুখো ফ্লাইট। এদের কেউ তিন বছর, কেউ চার বছর , কেউ এমনকি পাঁচ বছর পর দেশে ফিরছে, সবার সঙ্গে বিরাট বিরাট বাক্স-পেটরার ভেতর কেনাকাটা করা সাধ্যমতো জিনিশপত্র। প্রিয়জনদের জন্যে কেনা এই জিনিশগুলো তাদের হাতে তুলে দেওয়ার স্বপ্নে তাদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। দেশের জন্যে কী ব্যাকুলতা আর স্বপ্ন তাদের চোখে। উদ্বেল হৃদয় দিয়ে ফ্লাইটের পাঁচ ঘণ্টা আকুতি সময়টুকু সহ্য করার শক্তিও যেন তারা হারিয়ে ফেলেছে। যেন পারলে দুবাইয়ে প্লেনে উঠেই সরাসরি ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে যায়। কথা বলে বোঝা গেল এদের অধিকাংশই লিখতে পড়তে পর্যন্ত জানে না। আমার পাশেই বসেছিলেন থ্রি পিস স্যুট পরা ডাকসাইটে এক ভদ্রলোক। কিছুক্ষণ আলাপের পরে একগাল বিগলিত হাসির সঙ্গে হাতের ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের কাগজদুটো আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ভাবলাম , আমার ওগুলো দরকার ভেবেই হয়তো আমাকে দিচ্ছেন। বললাম, আমার আছে। লাগবে না।

‘একটু ফিলাপ কইরা দিবেন স্যার?’ মুখে দাঁত বের করা বিগলিত হাসি। কী আশ্চর্য ! এরকম একজন স্যুটপরা পুরোদস্তুর ডাঁটপাটওয়ালা ভদ্রলোক লিখতে পর্যন্ত জানেন না ? কিন্তু না, এমন বাঙালি একজন দুজন না, হাজারে হাজারে পাবেন মধ্যপ্রাচ্যের মতো পৃথিবীর নানা দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের ভিড়ে।

কথায় কথায় জানলাম তিনিও একজন শ্রমিক। বাড়ি সিলেট, রিয়াদে কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। প্রথমে এসেছিলেন বসরায়, ইরাকে। সেখানে যুদ্ধের তাড়া খেয়ে আরবে পাড়ি জমিয়েছেন।

তার ফর্ম ফিলাপ শেষ হতেই, আরেকটা হাত এগিয়ে এলো সামনের দিক থেকে। তারটা শেষ হতেই দেখি চারপাশ থেকে ডজনখানেক হাত আমার দিকে এগিয়ে আছে। সব হাতেই একই ফর্ম। সবাই যে ভদ্রভাবে অনুরোধ করছে তা-ও না। অনুরোধ করার ভাষাও অনেকের জানা নেই। এ ধরণের দেহাতী মানুষের পক্ষে কী করেইবা তা সম্ভব?
‘এই যে , দেন তো, আমারডা ফিলাপ কইরা দেন।‘
মনে হয় হুকুম করছে।
দুঃখী এই লোকগুলোর জন্য মমতায় মনটা ভরে উঠল। প্লেনযাত্রার পুরো সময়টা এদের ফর্ম ফিলাপ করে চললাম। এদিকে বাংলাদেশ এগিয়ে আসছে। প্লেনভর্তি লোকগুলোর মধ্যে টানটান উত্তেজনা। কখন আসবে বাংলাদেশ। কেন আসছে না। চেহারায় তাদের আগ্নেয় উগ্রতা। সবার কথাবার্তার বিষয় একটাইঃ বাংলাদেশ। ঘরে ফেরার আগ্রহ আনন্দে উত্তেজনায় যেন ফেটে পড়ছে সবাই।

সামনের টিভি পর্দায় প্লেনের ছুটে চলার ছবি চোখে পড়ছে। আরব সাগরের ধার দিয়ে করাচির পাশ কাটিয়ে দিল্লি কানপুর পেরিয়ে প্লেন এখন বিহারের ওপর। এখনও অন্তত ঘন্টাখানেক বাকি। যাত্রীরা অস্থির বেসামাল । উত্তেজনায় যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। কোথায় বাংলাদেশ। কোথায় তুমি? মাতৃভূমি, তুমি কতদূর! অধিকাংশ লোকই মানচিত্র চেনে না। বুঝতে পারছে না ঠিক কোনখানে আছে। হঠাৎ জানালার পাশ থেকে কে একজন চিৎকার করে উঠলঃ ঐ যে ! ঐ যে ।

তার ব্যগ্র চিৎকার সারা প্লেনে যেন কেঁপে কেঁপে বেড়াতে লাগল। সবাই যেন এই মুহূর্তটির জন্যেই অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ প্লেনের ভেতর ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। প্লেনভর্তি প্রায় সব লোক, একসঙ্গে দাঁড়িয়ে হুড়মুড় করে জানালার ওপর ঝুঁকে কী যেন আঁতিপাঁতি খুঁজছে। গলায় শুধু একটায় চিৎকার—কৈ? কৈ ? ( কোথায় আমার দেশ—ভাই, সন্তান, জীবনসঙ্গী , বাপ, মা, কোথায় তোমরা? ) প্লেনভর্তি এতগুলো লোক পাগলের মতো উঁকিঝুঁকি দিয়ে শুধু বাংলাদেশ দেখার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ গোটা প্লেনভর্তি লোক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলে যে বিমানের বিপদ হতে পারে সে জ্ঞান নেই এই লোকগুলোর। বিমানবালা আর পুরুষ ক্রুরা ধমক দিয়ে চিৎকার করে পাগলের মতো দুই হাতে টেনে-হিঁচড়ে ঘাড় চেপে তাদের বসানোর চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু জানালা থেকে তাদের ফেরানো সোজা নয়।প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ এমনি এক জ্বলন্ত রূপসী। আমাদের কাছে এর কতটুকু ?
+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-+-

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের এই ভ্রমণকাহিনীর সময়কাল সম্ভবত: ২০০০ সালের আশেপাশে। স্যারের অনেক বক্তৃতা তাঁর লেখায় আছে। অনেক ঘরোয়া আলোচনায় তা আবার নতুন করে তা উঠে আসে। পিনাকী ভট্টাচার্য্যের ( Pinaki.Bhattacharyya) ২০১৮ সালের শেয়ার করা একটা ভিডিও পোস্ট থেকে স্যারের ঘরোয়া বক্তৃতাটি নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। সেজান মাহমুদ (Sezan Mahmud ) থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ফেসবুক সেলিব্রেটি এই প্রসঙ্গে আক্রমণাত্মক পোস্ট দিয়ে কুৎসিত অশ্রাব্য গালাগালির সুযোগ করে দিয়েছেন ফেসবুকের আমজনতাকে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়ার কলেজ কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করেছিলাম। ঢাকা কলেজে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আমার শিক্ষক ছিলেন। মূল লেখাটিতে প্রবাসী শ্রমিকদের ব্যাপারে তাঁর গভীর মমতার প্রকাশ। কিন্তু ফেম-সিকার সেলিব্রেটিরা কোনভাবে গুণীজনকে তাচ্ছিল্য করার সামান্যতম সুযোগ হারান না।

আমি পুরো ব্যাপারটিতে মর্মাহত। মূল লেখাটি দাড়ি-কমাসহ পুনর্লিখন করেছি গভীর হতাশা থেকে। যদিও সেলিব্রেটিদের ক্ষমাপ্রার্থনা আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি আমার !

প্রকাশকালঃ ১৩ই জুন, ২০১৯