৯০ এর এরশাদ বিরোধী স্বৈরাচার হঠাও আন্দোলনের কিছুদিন পরেই আমাদের ব্যাচের ঢাকা কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার সীট পড়লো রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে। আমাদের অনেক প্রার্থনা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যুক্তিসঙ্গত কারণে আমাদের বোর্ড পরীক্ষা একমাস হলেও পিছবে। সে গুড়ে বালি।
দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সীট সচরাচর সরকারী বিজ্ঞান কলেজে পড়ে এবং ওখানকার শিক্ষকেরা ঢাকা কলেজের পোলাপানরে একটু স্নেহের দৃষ্টিতেই দেখেন বলে শুনেছিলাম। আমরা বেশ বিব্রত! অনেক আগে একবার রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে নাকি আমাদের সীট পড়েছিলো। তখন ওখানকার স্যাররা নাকি ঢাকা কলেজের পোলাপানের ‘হালুয়া টাইট’ করে দিয়েছিল। দুরুদুরু বুকে পরীক্ষা দিতে গেলাম। মিরপুরের মফিজ, দেড় বছরের ঢাকা কলেজের জীবনে হুদাই নাসিম বানু, আজাদ স্যারের কাছে দৌড়াদৌড়ি করেছি আর গুপ্তকেশ ছিঁড়ে আঁটি বেঁধেছি। প্রিপারেশন খুবই নড়বড়ে। পরীক্ষার মাস দুই আগে মনিপুর স্কুলের বিখ্যাত ছাত্র মুকুল ভাইয়ের কাছে গেলাম। বললাম, ভাই এই যাত্রা বাঁচান, প্রিপারেশনের যা তা অবস্থা ! উনি তখন বুয়েটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। কয়েকটা মডেল টেস্ট নিলেন, আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম তিন ঘণ্টায় ফুল অ্যানসারই করতে পারছি না ! কিছুই করার নেই, রাতদিন খেটে মাস দুয়েকের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর করে প্রিপারেশন নিলাম। তার উপরে গোঁদের উপর বিষফোঁড়া রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে আমাদের সীট !
বড়ো বড়ো গ্যালারীতে বা হলরুমে পরীক্ষা দিয়া অভ্যস্ত আমরা ব্যাপক ফাঁপরে—যেয়ে দেখি ২০ জনের বসার মতো এক রুমে আমার সীট পড়েছে। প্রিপারেশনের অবস্থা এরকম যে, সবই পারি, কিন্তু দুই সেকেন্ডের কথায় কেউ যদি একটু ধরিয়ে দেয় তো ফুল অ্যানসারটাই করতে পারি; নইলে পৃষ্ঠা ফাঁকা রেখে অন্য কোশ্চেনে যেতে হয়।
মুরব্বীরা যা বলেছিল, ঘটনা সত্য–অক্ষরে অক্ষরে সত্য। কোন এক অজ্ঞাত কারণে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের স্যাররা আমাদের উপর ব্যাপক বিলা হয়ে আছেন। তাঁদের ধারণা ,ঢাকা কলেজের এসএসসির মেধাতালিকার পোলাপানগুলা মূল বোর্ড পরীক্ষার এইচএসসি-এর প্রশ্নকর্তা স্যারদের সংক্ষিপ্ত সাজেশন পেয়েই দ্বিতীয়বারের মতো এতো ভালো রেজাল্ট করে ! ভাবখানা—‘ বহুদিন পরে পেয়েছি বাপধন এইবার দেখব ক্ষণ !’
প্রথম দুই বাংলা , ইংরেজি পরীক্ষা গেল কোনমতে। দুইজন করে স্যার ছোট্ট বিশ ফুট বাই বিশ ফুট ক্লাসরুমে , ঘাড় ঘোরানোর অবস্থা তো নাইই, ফিসফাস করারও প্রশ্নই ওঠে না ! সম্ভবত: গণিত পরীক্ষা ছিল এর পরেই। দুই পার্ট পরীক্ষার পরে দেখি আশেপাশের কয়েকজন ড্রপ। সামনে পিছনে তিন বেঞ্চের মধ্যে আমি একা পরীক্ষা দিচ্ছি । মেধাতালিকায় স্থান নেওয়া ছেলেপেলে , হয়তো পরের বার পরীক্ষা দিবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে । অন্তত: আমার রুমের এই অবস্থা ছিল। অন্য রুমের কথা জানি না। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। একবার ভাবলাম, দিই ড্রপ। পরে ভাবলাম, যা থাকে কপালে – নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরে মানুষ হয়ে ওই বিলাসিতা আমার মানায় না , তাই সেই চিন্তা বাদ দিলাম। এসএসসি তে ৯০ সালে ৮১২ পাওয়া আমি নড়বড়ে প্রিপারেশন নিয়ে, একটা কথাও না বলে, খাঁটি ভাবে পরীক্ষা দিলাম এবং শুধুমাত্র পদার্থবিজ্ঞানে লেটার নিয়া কোনমতে ৭৫১ পেয়ে ওই যাত্রা রক্ষা পেলাম। স্টার মার্ক মানে তো স্টার মার্ক– কেউ তো আর জিজ্ঞেস করবে না , কত নাম্বার নিয়া স্টার পেয়েছিস !
আমার এই ব্যাপারে কোন মনোবেদনা নাই। রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের স্যারদের মাস কয়েক অভিসম্পাত করেছি। পরে আস্তে আস্তে ভুলে গেছি। স্যাররা ঠিক কাজই করেছেন। নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিতাম— যে নাম্বারই পেয়েছি , একদম খাঁটি ! কী আর করা পাগলের সুখ মনে মনে, দিনের বেলা তারা গোনে। ওইদিকে আমার স্কুলের অন্য মেধাবীরা যারা নটরডেমে ভর্তি হয়েছিল তাঁরা চকচকে দুর্দান্ত রেজাল্ট করে বের হলো।
কিন্তু এতদিন পরে এই কথা কেন?
তৃণভোজী, গৃহপালিত, নিম্নমধ্যবিত্ত, নিরাপদ দূরত্বে থেকে লেজ নাড়ানো , এই আমার কী দরকার দেশের এতো কিছু নিয়ে চিন্তা করার ! এর চেয়ে এই ভালো আরো অসংখ্য ভেদাভেদহীন গৃহপালিত মধ্যবিত্তের মতো, সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ‘ হ্যাঁগো, আজ কী রেঁধেছো’ বলে টিভির রিমোট নিয়ে বসা– আর কতকগুলা দালালের অশ্লীল টকশো দেখে, দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলা ‘ ওগো শুন্ছো দেশটার যে কী হচ্ছে! ’
ধান ভানতে শিবের গীত গাইছি, এই কারণে—যে এই অন্তর্জালিক জগতে অসংখ্য নামের আর প্রোফাইল পিকচারের ভিড়ে , রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের বোর্ড পরীক্ষার রেজাল্টের মতো খাঁটি কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী পেয়েছি, তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। আপনারা সবাই ভালো থাকুন।
প্রকাশকালঃ মার্চ ২০১৩
সাম্প্রতিক মন্তব্য