ঘরকুনো হিসাবে আমার সুখ্যাতি আছে। অচেনা কারো সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলাপচারিতা করা আমার হয়ে ওঠে না। আমার অন্তর্মুখিতা নিয়ে আমার তেমন উদ্বেগ নেই। যেহেতু গার্মেন্টসের চাকরি করি , সবকিছুকে বয়স ভিত্তিক একটা সীমারেখায় ফেলে ফিরে দেখি আমার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর বিবর্তন কীভাবে হয়েছে। আধুনিক ফেসবুকের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং কেমন করে যে ঢুকে পড়লাম ! বাইরের অফিসিয়াল ট্রিপে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পরিবার ছেড়ে দুরে থাকলে এখনো হোম-সিক ও নস্টালজিক হয়ে পড়ি।
তো রক্তের আত্মীয় পরিজনের বাইরে আমার অনেকবার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর অভিজ্ঞতা আছে ! শেয়ার করে ফেলি। লেখাটা মনে হচ্ছে বড়ই হবে।
আমার বয়স যখন ০ থেকে ৫:
শত্রু সম্পত্তির তালিকাভুক্ত থাকায় আব্বাকে র্যাঙ্কিন ওয়ারীর বাড়ি ছেড়ে দিতে হলো। কিছুদিন নানাবাড়িতে বিরতি। বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে আম্মা ব্যস্ত আম্মাকে নিয়ে। নুরুন্নাহার খালা, যাকে আমি নুন্নী খালা বলতাম তাঁর সাথেই রক্তের সম্পর্কের বাইরে প্রথম সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং । খাওয়া দাওয়া , গোসল-ঘুম, সব নুন্নী খালা। আম্মাও বাঁচলেন দায়িত্ব থেকে।
গ্রামে কিছুদিন বিরতি নিয়ে আবার ঢাকার মিরপুরে চলে আসলাম আমরা। বাড়িভাড়া ঠিক হওয়ার আগের মধ্যবর্তী সময়ে বড়ফুপুর বাড়িতে । বড়ফুপুর ছোট ননদ , সম্ভবত: নন্দিনী আন্টি আমার দ্বিতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং । একরাশ চুল নিয়ে মিষ্টি চেহারার শ্যামলা নন্দিনী আন্টি। তাঁর বিয়ের কথাবার্তা চলছিল । পাত্র প্রায় ঠিক, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। আমি নন্দিনী আন্টির চারপাশে ঘুরঘুর করি। ওঁনার গল্প-আদরের ভক্ত। একদিন সাহস করে গম্ভীর মুখে যেয়ে বললাম, আন্টি আমি আপনাকে বিয়ে করব! নন্দিনী আন্টি ব্যাপারটা নিয়ে মোটেও হাসাহাসি করলেন না। ফুপুকে যেয়ে বললেন, ভাবী আমার পাত্র খোঁজার দরকার নাই ! পাত্র পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ওইখানেই শেষ।
আমার বয়স যখন বয়স ৫ থেকে ১৪:
কিছু পত্র-মিতালী পত্রিকা ছিল, টাকা দিয়ে নাম-ঠিকানা ছাপানো যায়। বিয়ারিং ডাকযোগে অনেক নামের সাথে ছাপানো নিজের নামটাও আসে। টাকা দিয়ে বই ছাড়িয়ে নিতে হয়। তো, নীলফামারীর একমেয়ের নামের প্রেমে পড়ে গেলাম। বয়স সমান সমান । সাদিয়া আফরিন। সে কী গভীর উৎকণ্ঠা আর আবেগ নিয়ে হলুদ খামের চিঠি আর তার উত্তরের প্রতীক্ষা ! বেশ কয়েকমাস পরে সে জিজ্ঞাসিল আমি কোন ক্লাসে পড়ি। সরলমনে বললাম, ক্লাস সিক্সে। তার শেষ চিঠি আসলো হিন্দি সিনেমার ভাষার আবেগে ! নেহি ! কাভি নেহি ! ‘এ হয় না, এ হতে পারে না। তোমার আমার সম্পর্ক এইখানেই শেষ , তুমি আমাকে ভুলে যাও, আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি!’ আমি তারপরে তাঁকে বহুবার চিঠি দিয়েছি, আর উত্তর আসে নি। সাদিয়া আফরিন, তুমি কোন ডাকাত ঘরের বউ হয়ে দিন কাটাচ্ছো, জানতে ইচ্ছে করে। পত্র-মিতালী দিয়া সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর প্রথম পর্ব ওইখানেই শেষ !
স্কুলের শেষ বেঞ্চের ছাত্র হলেও রেজাল্ট ভালো করতাম। তো বিশেষ দিনগুলোতে ( একুশে ফেব্রুয়ারি , বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা , বিজয় দিবস ইত্যাদি ) সম্মিলিত অনুষ্ঠান হতো বয়েজ ও গার্লস সেকশন মিলে। ওই এক দুই দিনের জন্য আমরা ছেলেরা উন্মুখ হয়ে থাকতাম। অমরাবতী থেকে নেমে আসা, সাদা-ড্রেসের ফুটফুটে বালিকারা পৃথিবীর মাটিতে নেমে আসতো ! আমরা কতিপয় ময়লা জামার , স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরা খ্যাত জুলজুল করে তাকিয়ে থাকতাম ওই বালিকাদের দিকে। প্রভাতফেরীর এক মুগ্ধ সকালে এক কন্যাকে দেখে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং করতে ইচ্ছে হলও। এক সহপাঠীর সাথে শেয়ার ও করলাম। ও একটু খোঁজ-খবর নিয়া বললও, ওই কন্যা পাড়ার উঠতি মাস্তানের বোন এবং অন্য এক মাস্তানের বাগদত্তা। তৃতীয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং একবেলাতেই শেষ।
দূর থেকে যদি দেখি –নিজের পরিবারের বাইরে যে কোন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং দীর্ঘদিন ধরে রাখার তীব্র অক্ষমতা আছে আমার।
বয়স ১৪ থেকে ২১:
ঢাকা কলেজের দেড় বছর, দেড় মাসের মতো কোনদিক দিয়ে যে বেরিয়ে গেল। মাঝে মাঝে নিউমার্কেটে ইডেন সুন্দরীদের দিকে আড়চোখে তাকানো। চোখে তখন অন্য স্বপ্ন ! ‘ পড়ালেখা করে যেই গাড়ীঘোড়া চড়ে সেই ’ টাইপ আর কি। বালিকারা আমার মতো প্রেমিককে মিস করলো !
পত্র-মিতালীর দ্বিতীয় পর্ব। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় । রুমমেট ছদ্মনামে শহীদ আজিজ হলের ঠিকানা দিয়া নাম ছাপায়। প্রকৌশলের ছাত্র, হলের ঠিকানা দেখে গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে বালিকারা পত্র দেয়। বানানের বাহার আর চিঠির সৌকর্য দেখে আমরা ব্যাপক বিনোদন পাই। তো, লেজকাটা শিয়ালের মতো, রুমমেট ( সঙ্গত: কারণে নামোল্লেখ করছি না। ) তার পত্র-মিতার সাথে ফেউ হিসাবে আমাদের নামও দিত। এবং তার পত্র-মিতার অনুরোধে তার বান্ধবীদের সঙ্গে একসময় পরিচিত হলাম আমরা কয়েকজন। স্ট্রেন্থ অব ম্যাটেরিয়াল আর কার্ডিং মেশিনের ক্যাচালের মধ্যে থেকে যতদূর সম্ভব আর কী ! কোন এক পবিত্র সকালে বন্ধুর প্ররোচনায় গ্রুপ টু গ্রুপ সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর জন্য রওয়ানা দিলাম মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে। সাজু-গুজু বালিকারা- নৌকা ভ্রমণের , খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছিল। আপ্যায়ন ভালোই হলো। খটকা লাগলো অন্য জায়গায়, পত্র-মিতালী থেকে তাঁরা জীবন সঙ্গিনী হওয়ার সুখচিন্তায় মশগুল। ‘ছেড়ে দে মা , কেঁদে বাঁচি!’ পত্র-মিতালীর মাধ্যমে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর ওই পর্বের আকস্মিক সমাপ্তি !
এর পরে আসলো, ডায়াল আপ কানেকশন, ইন্টারনেটের দ্বিতীয় প্রজন্ম। শুনলাম মেসেঞ্জারে নাকি নানা দেশের তন্বী তরুণীদের সাথে কথা বলা যায়, চ্যাট করা যায়। ধৈর্য ধরে থাকলে আরো অনেক কিছু করা যায়। কীসের কি, বাসার ফোন লাইন নিয়া ডায়াল আপে গুচ্ছের টাকা খরচ করাই সার । রাতভর এই চ্যাটরুমে, সেই চ্যাটরুমে ঢুঁ মারা ; হা হতোস্মি ! সুন্দরীর নাম দেখে মেসেজ ইন বক্স করি asl? ( age, sex , location ?) হয় উত্তর আসে নামটা মেয়ের হলে কী হবে, সে আসলে ৪৫ বছরের এক বুড়া, মোটর মেকানিক্সের কাজ করে। আবারো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর চেষ্টা মাঠে মারা গেল।
চাকরির শুরুতে বন্ধু বান্ধব দূরে সরা শুরু করলো। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে ও কেউ যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমালো নিশ্চিত জীবন, কালচে সবুজ, কালচে নীল-নোটের মোহে। আমি পড়ে থাকলাম নতুন কোন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর অপেক্ষায়। হট মেইলে (ইয়াহু, হট মেইলে ) নানা রকম ক্লিপ, ছবি আদান প্রদান জমে উঠলো একসময়। হট মেইলে, কে কত হট জিনিষ আদান প্রদান করতে পারে তার প্রতিযোগিতা। উৎসাহে ভাঁটা পড়তে সময় লাগে না আমাদের । মাঝে মাঝে ফোন আসে, ‘আরে দোস্ত তুমি তো আর জিনিষ পত্র কিছুই পাঠাও না।’ ওই পর্যন্তই। ওয়ান ওয়ে সার্ভিস, আমি দুনিয়ার নেট ঘেঁটে তোমাদের পাঠাব আর তোমরা আরো চৌদ্দ জনরে পাঠিয়ে মজা নাও ! ধ্যাত! এইটাও একসময়ে একঘেঁয়েমিতে পেয়ে বসলো। এর মাঝে Hi5, Badoo মায় twitter পর্যন্ত ট্রাই করলাম। মজা পাইনা!
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে বেশ কয়েক বছর ধরে, ‘ইয়েস, নো, ভেরি গুড’ টাইপ কথাবার্তা বাংলিশে লেখা বা কিছু ছবি আপলোড করা। কিন্তু অভ্র দিয়া বাংলা শিখলাম মাত্রই গত নভেম্বরে ২০১৩ তে । নিজের ভাষায় কথা বলার, ভাবপ্রকাশের চেয়ে মধুর কিছু আছে কিনা জানিনা। গত কয়েকমাসে ফেসবুকিং , মতের আদানপ্রদান। নাম না জানা তরুণ তরুণীদের সাথে মত বিনিময়। ঢাকা কলেজের শেষপ্রান্তে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কয়েকটা বছর ছিল তরতাজা কিছু সমমনার সাথে দুর্দান্ত সময়। কিন্তু, সপ্তাহে সপ্তাহে মিরপুর টু বাংলামোটর , আমার সুবিখ্যাত আলস্য নিয়া সম্ভব না। এরপরে দীর্ঘ সময় , নতুন কিছু শোনাতে পারে এই রকম কোন গোষ্ঠীর সাথে ইন্টার অ্যাক্ট হয়নি আমার। পেশাগত কারনেই সম্ভবও ছিল না। ফেসবুক সেই সুযোগ করে দিল।
মাঝে মাঝে ফেসবুকের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং ভার্চুয়াল সময়ক্ষেপণ ভালো লাগে না ! খুব কাছের কিছু মানুষ মতপার্থক্যের জন্য দূরে সরে যায় ! পরিবারের লোকজন বলে, দেশোদ্ধারের জন্য ছাপোষা এই আমিই কেন? আর কেউ নাই ? সে জন্য মাঝে মাঝে ডুব দিই সবরকম নেটওয়ার্কিং থেকে।নিজেকে কতটুকুই বা চিনি ? কিন্তু যেটুক চিনি , আন্দাজ করি, আমি ফেসবুকের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং- এও বেশীদিন হয়তো নেই !
সিক্স সেভেনে পড়ার সময় সাদা ড্রেসের স্কুলবালিকা দেখলেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে যেতো। পরিবারের এক্সপেকটেশন আর পড়াশুনার বেদম চাপে চ্যাপ্টা আমি– ওই বিষণ্ণ হওয়া পর্যন্তই ! বয়েজ স্কুল, বয়েজ কলেজ, বয়েজ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং( উল্লেখ্য, আমাদের ব্যাচে ৮০ জনের মধ্যে মেয়ে ছিল মাত্র দু’জন ; এঁরাও আমাদের সঙ্গে চলতে চলতে টমবয় টাইপ হয়ে গিয়েছিল– গালিগালাজ করতো, তুই তুকারি করতো ! ) নারী বিবর্জিত পরিপার্শ্বে জীবন হয়েছিল শুস্কং কাষ্ঠং । ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে , তেমন কারো সাথে প্রেম করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা চেপে যেতে হয়েছিল সঙ্গত কারণেই ! পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই , শুরু হলো চাকরি আর ক্যারিয়ারের চাপ। চাকরিজীবী ব্যাচেলর কলিগ-বন্ধুদের কাছে ভাবী-বিষয়ক পরকীয়ার রগরগে বর্ণনা শুনতাম। ইস্ ভাবী টাইপ বা আন্টি টাইপ কারো সাথে যদি পরকীয়া করা যেতো ! শুকাতে শুকাতে শুকাতে — অবশেষে সেই আরাধ্য প্রেম, দীর্ঘ(!) বছর দুয়েকের প্রেমের পর বিয়ে। ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েটি আমার জীবনে। ওই একটি মাত্র নারীর কাছ থেকে , তাঁর বয়স পরিবর্তনের সাথে সাথে ভার্সিটি পড়ুয়ার ভালোবাসার পরে এখন ভাবী টাইপ বিনোদন পাচ্ছি ! আন্টি টাইপ বিনোদনও পাবো আশা রাখি ! আর আমি — সেই ১৪ বছরেই থমকে আছি !
প্রকাশকালঃ মার্চ, ২০১৩
সাম্প্রতিক মন্তব্য