আমার প্রবাসী আত্মীয়-বন্ধুদের প্রতি সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রেখে এই পোস্ট দিচ্ছি। কেউ এটাকে পারসোনালি নিবেন না, সেই আশা করতেই পারি।
বছর খানেক আগে এক কানাডা প্রবাসীর সাথে কথা হচ্ছিল। নানা কথার পরে সে যেটা বলল সেটা মনে দাগ কাটার মতো বলেই এখন পর্যন্ত মনে আছে।
কানাডা প্রতি বছর লক্ষাধিক এশিয়ান নিচ্ছে ইমিগ্রান্ট হিসাবে। ইদানীং শুনছি লাখ তিনেক ডলার ওখানকার ব্যাংকে রাখলে বা জয়েন্টভেঞ্চারে ইনভেস্ট করলে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি কনফার্ম। ২০০১ সাল থেকে গড়ে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লক্ষ থেকে তিন লক্ষ লোক কানাডা প্রবাসী হচ্ছে বিভিন্ন এশিয়ান দেশ থেকে। এইসব পশ্চিমা দেশগুলো গরীব-দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ নিজেদের অর্থনীতিতে পাম্প করে এঁদের প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছেন।
আমি অর্থনীতিবিদ নই, ব্যক্তিগত হিসাবেও যথেষ্ট কাঁচা । তবু একটা সংক্ষিপ্ত হিসাব দেওয়ার চেষ্টা করি। ধরেন ২,৫০,০০০ ইমিগ্রান্ট X US$ ৩,০০০০০= US$ ৭,৫০০০০০০০০০.০০ মানে সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার ! এইবার আপনি ওইখানে পৌঁছানোর পর ওই উন্নত দেশের নানারকম সুবিধায় চমৎকৃত হতে থাকবেন, হতেই থাকবেন।
কেননা, আপনি তো গেছেন পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি থেকে। আপনি রাস্তা দেখে , বাতি দেখে অবাক হবেন, করিৎকর্মা পুলিশের ভেঁপু শুনে অবাক হবেন। বহু শতবর্ষের লক্ষ লোকের ঘাম-রক্তের বিনিময়ে গড়া আমাদের চেয়ে শত বৎসর এগিয়ে থাকা সভ্যতার ঘি মাখন এয়ারপোর্ট থেকে নেমেই বিনা পরিশ্রমে আপনি ভোগ করা শুরু করবেন । । বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের কাছে আর বন্ধু-বান্ধবের কাছে ফোন করে নানা রকম তুলনামূলক তত্ত্ব শোনাবেন আর আমাদের দীর্ঘশ্বাস শুনে বিমলানন্দ উপভোগ করবেন।
তবে আসল শুভঙ্করের ফাঁকি ব্যাপারটা অনেকে বুঝে ফেলেন কয়েকবছরের মধ্যে । আপনারই দেওয়া টাকাপয়সায় আপনার ওয়েলফেয়ার ইনস্যুরেন্স, গাড়ি বাড়ি লোনের হ্যাপায় ওই পশ্চিমা দেশ আপনাকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াবে , আপনি তখন ধোপার গাধা– না ঘরকা , না ঘাটকা! এই দুষ্ট চক্রের বাইরে আসতে পারবেন না। আপনি ও আপনার প্রিয় পরবর্তী প্রজন্ম ওই চক্করের ভিতরে থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে চীজ বার্গার খেয়ে দিনাতিপাত করবেন। যখন বুঝবেন, ততদিনে ওই দুর্ভেদ্য চক্র ভাঙ্গার সাহস বা সামর্থ্য দুইটাই অবলুপ্ত আপনার।
একইভাবে, নন প্রোডাক্টিভ কিছু দেশ আছে, যেমন যুক্তরাজ্য বা ইংল্যান্ড। লক্ষ লক্ষ ছাত্র প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার এশিয়া থেকে নিয়ে যেয়ে ওই দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছে আর চক্করের ভিতরে পড়ছে।পড়ুক, আমার তাতে কোন আপত্তি নাই। আপনি দুধ বেচে তামাক খাবেন , নাকি তামাক বেচে দুধ খাবেন সেটা আপনার ইচ্ছা।
কিন্তু , আমার আপত্তি অন্য খানে!
কোন কোন প্রবাসী শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে ভিওআইপি সস্তা রেটে কল করে বা ফ্রী স্কাইপে, ভাইবারে, হোয়াটস অ্যাপে আধাঘণ্টা ধরে বাংলাদেশের ‘আম্লীগ বিম্পি’ নিয়া কচলা কচলি করে, আর বোঝানোর চেষ্টা করে আমরা কতিপয় ভোঁদাই আমজনতা আসলে গুপ্তকেশ উৎপাটন করছি । উপসংহারে বা গৌরচন্দ্রিকাতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় , ‘দেশটার হচ্ছে টা কি?’
কেন জানি না তাঁদের ধারনা হয়েছে , বাংলাদেশে আমরা শুয়ে বসে আর টকশো দেখে দিনাতিপাত করছি। । আর দুই বরাহ শাবকের দলকে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এনে দেশের বারোটা বাজাচ্ছি। আমরাও যে ব্যস্ত জীবন কাটাচ্ছি, অফিসের টাইমে হুদা মিছা প্যাঁচাল না পেড়ে আমরাও যে , যে যার জায়গায় পরিশ্রম করে যাচ্ছি, এটা তাঁদের বোঝানো মুশকিল। মনে হয় দুনিয়াতে তাঁরাই শুধু ব্যস্ত আর আমরা শুধু গুপ্তকেশ উৎপাটন করে আঁটি বাঁধছি ! আগে মন দিয়ে শুনতাম বা হু হা করতাম, এখন বয়সের জন্যই কীনা জানিনা। এইসব বাল ও ছালের আলাপ শুনতে আর ভালো লাগে না!
ভাইরে, আপনি থাকেন আপনার পশ্চিমা দেশের ঘি মাখন জ্যাম জেলি নিয়ে ! এই বাংলাদেশের জন্য কে কী ছিঁড়ছেন আমরা তো কম বেশী জানি। কেন খামোখা গুচ্ছের সময় নষ্ট করে আমাদের অপরাধ বোধে ভোগাতে চান? দেশের এই অবস্থা আমরা কি একা করেছি ?
প্রকাশকালঃ মার্চ, ২০১৩
সাম্প্রতিক মন্তব্য