গত কয়েক সপ্তাহে কয়েকটা বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজিরা দিতে হয়েছে। ঢাকার বিয়েতে বছর বিশেক আগে খাবার মেনু যা ছিল, এখনো তাই ; শুধু রোস্টের মুরগী দেশী থেকে ফার্মের হয়েছে, বাকী আগের মতোই।
নতুন যে ব্যাপারটি চোখে পড়ল বা আমাদের প্রজন্মের হিসাবে খানিকটা দৃষ্টিকটু লাগল, তা শেয়ার করতে সমস্যা দেখি না। আমাদের প্রজন্মের বিয়েতে লাজুক অবনত নববধূ ছিল অনুষ্ঠানের একটা সৌন্দর্য। অধুনা, নববধূদের আগ্রাসী আচরণে আমি একবার খুশিও হলাম আবার পুরনো মূল্যবোধের মানুষ বলেই হয়তো কিছুটা মর্মাহতও হলাম। বিয়ের আসরে নববধূরা এতো স্বচ্ছন্দে তাঁদের সদ্য-প্রাপ্ত স্বামীর সঙ্গে খোলামেলা কথা বার্তা বলছিল, হেসে গড়িয়ে পড়ছিল ; যেচে সবার সঙ্গে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল – তা দেখে মনে হচ্ছিল এঁদের মনে হয় বছর দশেকের প্রেমের পরে বিয়ে। অথচ আমি খুব ভালোভাবে জানি, এঁদের পারস্পরিক পরিচয় দুই-তিনদিনেরও কম।পুরোটাই অ্যারেঞ্জড্ ম্যারেজ !
আমাদের সময়ে প্রেমের বিয়েগুলোতেও নববধূরা লোক দেখানোর জন্য হলেও হাপুস নয়নে কেঁদেকেটে দামী মেকআপ নষ্ট করে ফেলত। সেই হিসেবে কান্নাকাটির পর্বের সমাপ্তি আমি অর্থনৈতিক হিসাবে সাশ্রয়ী বিবেচনা করছি। এখনকার বিয়ের আসরে বর-কনের মধ্যে বরটিকেই বড্ড চুপচাপ, মৃদু , ম্লান, ত্রস্ত ও বলির পাঁঠা মনে হয়েছে।
জীবনসঙ্গিনী প্রাপ্তির তীব্র ব্যাকুলতা আমার আগের প্রজন্মে কেমন ছিল সেটা আমার আম্মার মুখে শোনা একটা ‘রিয়েল লাইফ’ ঘটনা দিয়ে শেষ করি।
আম্মার গ্রামে বা আশে পাশে কোথাও এক দরিদ্র চাষির মেয়ের সঙ্গে আরেক কৃষিজীবী কামলা চাষির বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হয়েছে। হবু শ্বশুর আর হবু জামাতা দু’জনই সকালে চাষের কাজে যায়। মেয়ের বাবা বিয়ের তারিখ ঠিক করতে একটু সময় নিচ্ছিলেন। হয়তো ফসল তোলা, বা আর্থিক অনটনের ব্যাপার ছিল। এখন ব্যাকুল হবু জামাতার তো আর তর সইছে না। প্রতি সকালে দেখা হলে কুশলাদি বিনিময়ের পরেই তার মৃদু ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হয়ে যায়। তারিখ কবে ঠিক করছেন, দেরী হচ্ছে কেন , এইসব। এইরকম কয়েকদিন হওয়ার পরে শ্বশুর খুব বিরক্ত হয়ে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলেছিলেন,
” রাখো রে বাপু ! বল্লিই তো হয় না ; আমার তো একটা গোছগাছ আয়োজনের ব্যাপার আছে, নাকি ? তোমার আর কি ! তুমি তো বাপু নিবের পারলিই শুইবের পারো ! ( তুমি তো বাপু, নিয়ে যেতে পারলেই শুতে পার !) ”
পুরুষ-শাসিত সমাজে ব্যাকুলতা প্রকাশের ব্যক্তিটি পরিবর্তিত হচ্ছে বলে ভালই লাগছে! আবার আধুনিক নববধূদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে , এঁদের সবার সেই চাষি হবু জামাতার চেয়েও অবস্থা শোচনীয় । কোনমতে বিয়েটা হলেই শুতে পারবে সেইটাই হয়তো সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে রাখছে তাঁদের ; সৌজন্য-সামাজিকতার লেশমাত্রও চোখে পড়ছে না !
প্রকাশকালঃ ২৬শে ডিসেম্বর,২০১৬
সাম্প্রতিক মন্তব্য