আমরা গতানুগতিক বাঙালীরা চল্লিশ পেরুলেই অবসর জীবনের চিন্তা শুরু করে দিই। দাদা-নানাদের সময়ে তাঁদের নাকি ত্রিশ পেরুলেই এই চিন্তা আসতো আর চল্লিশ পেরুলে হজ্জ্ব সেরে তসবীহ্ গোনা।
আব্বা এই সেদিন পর্যন্তও সক্রিয় ছিলেন। কিডনীরোগে প্রতিদিনের ডায়ালাইসিস আর অসুস্থতা এমন করে জেঁকে বসেছে যে, ইচ্ছা করলেও উনি আর মিরপুর থেকে সদরঘাটের কোর্টে যেতে পারেন না। অসম্ভব দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছেন বলে শারীরিক পরিশ্রমকে উনি ভয় পান না। পেটানো শরীরের ছ ফুটের দীর্ঘদেহী আব্বাকে দেখলে এখন শিশুর মতো ন্যুব্জ মনে হয়। আমাকে দেখে অনেকেই বলেন , ভাই ব্যাম-ঠ্যাম করেন নাকি। আমি বলি, নারে ভাই, শরীরটা বাপ-মায়ের জেনেটিক্সে পাওয়া। মহল্লার অনেক মুরব্বী চাচাদেরকে দেখি যারা আব্বার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট তাঁরা আরো বছর দশেক আগেই বুড়িয়ে গেছেন। মৃত্যুর জন্য বিনীত অপেক্ষা তাঁদের।
মাস কয়েক আগে এক চীনা বংশোদ্ভূত ক্রেতা, যে কিনা সেকেন্ড জেনারেশন আমেরিকান তার সাথে কথা হচ্ছিল। বয়স প্রায় ৬৫ হবে। সে কোম্পানির এমডি, সর্বেসর্বা।
টাকা পয়সা পরিশোধ নিয়ে ঢিলেমির জন্য আমি এক পর্যায়ে বললাম, ‘কাহিনী কি ? এইটা ঝুলাইয়া রাখার মানে কি ? তুমি মালিক, তুমি বললেই তো হয়ে যায় ! ’
সে বলল, ‘আমার চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে আবার কে? তার কথাতো আগে বলো নাই।’
‘উনি আমার বাবা।’
‘বয়স কতো ?’
‘৮৯ বছর !’
‘এই বয়সে সে অফিস করে ! ’
‘না, সেই অর্থে অফিস করে না ! উনি প্রতিদিন নিয়মিত সকাল আটটায় অফিসে আসেন ঘড়ি ধরে। আমি তাঁর ব্যবসার উত্তরসূরি , সো আমার অফিসের ফিন্যান্সটা এখনো উনিই দেখেন। মাঝে মাঝে দুপুরের পরেও থাকেন , নইলে বাড়ী যেয়ে বা মহল্লাতে চ্যারিটি কিছু সংস্থা আছে সময় কাটান !’
‘উরি বাপস্ , বলো কি তুমি !’
আমার বিস্ময় প্রকাশে সে বলল, ‘ তোমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে আমাদের এইটা একটা বড়ো মানসিক পার্থক্য। তোমরা তীব্রভাবে পরকালে বিশ্বাসী। আমরা নই। আমরা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাজের ভিতরে থেকে নিজেকে মূল্যবান মনে করতে চাই।’
আসলেই তো, চারপাশে যা দেখেছি। মধ্যবিত্তের রিটায়ারমেন্ট মানে– পুরোপুরি অপাঙতেয় মূল্যহীন জীবন। ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। দুইটা রাস্তা খোলা, কবরস্থান আর মসজিদ। তসবিহ্ নিয়া মসজিদে যাওয়া আসা করো এবং সারাক্ষণ সাড়ে তিন হাত অন্ধকার কবরের কথা চিন্তা করো। মানুষ দ্রুত বুড়িয়ে যাবে না কেন ? কাজ নেই , আলো নেই, বাতাস নেই, হাসি নেই, দুরারোগ্য অসুস্থতায় সার্বক্ষণিক মৃত্যুর কথায় কে না বুড়িয়ে যায় !
কয়েক বছর আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। বড়ো কোন অসুস্থতায় না পড়লে, যতদিন পারি কাজের ভিতর থাকব। সেই কাজ অর্থকরী হোক বা সমাজকল্যাণমূলক হোক। মরার আগে মরতে চাই না। অপাঙতেয় মূল্যহীন জীবন চাই না ।
প্রকাশকালঃ ২৭শে মার্চ,২০১৩
সাম্প্রতিক মন্তব্য