ক্লাস সিক্সে থাকতে পড়েছিলাম, ‘Live your life in a way ; so you don’t have to hide your diary!’ ‘জীবনকে এমনভাবে যাপন করুন, যাতে আপনার ডায়েরী লুকোতে না হয়!’
স্কুলজীবনে কিভাবে কিভাবে যে দিনলিপি বা ডায়েরী লেখার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল কে জানে ! সুবিধা ছিল ছোট্টমনের ব্যকুল কথাগুলো পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারতাম। মনের ভার কমে যেত।সেদিন দেখি কাঁচা হাতের লেখায় কয়েকটা ডায়েরী এখনো বুকশেলফের কোনায় পড়ে আছে। উল্টেপাল্টে দেখলাম, পড়াশোনার কথা, পরীক্ষার কথার সঙ্গে কিছু ছড়া-কবিতাতে ভরা। উচ্চমাধ্যমিকে উঠে পড়াশোনার চাপ ও নানাবিধ কারণে দিনলিপিতে আর ফিরে যাওয়া হয়নি।
মিরপুরের আমাদের বাড়ীটি ছিল খানিকটা লঙ্গরখানার মত। আব্বা এবং আম্মা দুজনেই ছিলেন গ্রামের বাড়ীরে সঙ্গে ঢাকার একমাত্র যোগসূত্র। ঐদিকে বড়মামা ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। প্রশাসনিক নানা কাজে দলবলসহ ঢাকার ছোটবোনের বাড়ীতে আসতেন। নিকট ও দূরসম্পর্কের আত্মীয়রাও আসতেন বিদেশ-গামী কাউকে বিদায় দিতে। কেউ আসতেন শুধুমাত্র ঢাকা শহর দেখতে। এয়ারপোর্ট দেখার সঙ্গে সঙ্গে শিশু-পার্ক , বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা ছিল অন্যতম বিনোদন-স্থান। চিড়িয়াখানা আমাদের বাসা থেকে মাইল তিনেক দূরে , সুতরাং আমাকে গাইডের ভূমিকা নিতে হত। অসংখ্যবার চিড়িয়াখানা যেতে যেতে এমনটি হয়েছিল, আমি চোখ বুজে হেঁটে হেঁটে বলে দিতে পারতাম বানরের খাঁচার ডানপাশ দিয়ে কত পা গেলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের খাঁচা।
মেহমানদের অগ্রাধিকারে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হয়তো নিজের বিছানা তাঁদেরকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে ফ্লোরিং করতে হত। মেহমান থাকলে খুশীই হতাম। সকালের নাস্তায় রুটির জায়গায় পাকোয়ান ডালডা ভাজা পরোটা, হালুয়া,ডিমভাজা, গরুর মাংস ইত্যাদি।নাস্তা শেষে আম্মার হাতের সেই অসাধারণ দুধ চা। মেহমানের বিদায়ের আগের দিন একপ্রস্ত পোলাও মাংসের ফিস্ট অবধারিত! ওই সময়ে যেহেতু ডায়েরী লেখার অভ্যাস ছিল, হয়তো মেহমানের উৎপাত নিয়ে কিছু একটা বেফাঁস লিখে রেখেছিলাম নিতান্তই ব্যক্তিগত স্বগতোক্তি হিসাবে। অন্যের ব্যক্তিগত দিনলিপি পড়াটা অভদ্রতা সেটা আমি জানতাম ; আমার বড়মামা জানতেন না বা মানতেন না। উনি সেই ডায়রি অন্য সবাইকে পড়ে শুনিয়ে সে এক কেলেঙ্কারি !
ফেসবুককে কিছুটা সাম্প্রতিক তথ্যের মুচমুচে ম্যাগাজিন, কিছুটা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, কিছুটা লিটল ম্যাগাজিনের সুস্বাদু সাহিত্যের এবং সর্বাংশে ব্যক্তিগত দিনলিপির একটা সম্মিলিত রূপ মনে হয়। আমি ব্যক্তিগত দিনলিপির স্বগতোক্তির জায়গাটা ওইভাবেই প্রকাশ করি, যাতে স্বচ্ছতা থাকে বিব্রত না হতে হয়।
মূলত: মনুষ্য চরিত্র তেমন দুর্বোধ্য নয়। সামাজিকতার আত্মপ্রকাশে সে চাইবে সবচেয়ে সুশ্রী পোশাক, চেহারা ও আচরণে নিজেকে প্রকাশিত করতে। সেই রঙিন আলোর হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় আড়ালে ভঙ্গুর, একাকী,রিক্ত,ব্যর্থ-পরাজিত মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল !
প্রকাশকালঃ ২৩শে নভেম্বর,২০১৬
সাম্প্রতিক মন্তব্য