করোনাক্রান্তিতে আর সকলের মতোই টোনা ও টুনি তাহাদের সবেধননীলমণিদেরকে সহিত নানাবিধ কীর্তিকাহিনী লইয়া সময় অতিবাহিত করিতেছে। ইদানীং বৃহদাকার শিরঃপীড়া হইতেছে- দুই টুনটুনির অনলাইন ক্লাস। বাসায় একটা আদ্যিকালের ব্রডব্যান্ড লাইন রহিয়াছে ; রাউটার সহযোগে কয়েকজন ব্যবহার করিতাম । বড়টির জনৈক শিক্ষক আদেশ দিলেন, ভাগের ইন্টারনেটে চলিবে না ; একান্ত ব্যক্তিগত লাইন লাগিবে। ভাগের মা নাকি গঙ্গা পায় না ! ভাগের ইন্টারনেটে গতি কম । এই দুর্মূল্যের বাজারে গুচ্ছের টঙ্কা খরচ করিয়া আরেকটি সরবরাহ লাইন লইতে হইল। মাসের খরচে আরেকটি ওজন যুক্ত হইল। ছোটটির জন্য আগের লাইন।

হায় ! তাহাতেও কি সোয়াস্তি আছে ! ঝড়বৃষ্টি দূরে থাকুক, একটুখানি মেঘের গুড়গুড়ে আওয়াজে সেই ভাগের লাইন ও একান্ত ব্যক্তিগত লাইন যায় বিগড়াইয়া । সকাল আট ঘটিকায় ক্লাস। সাজিয়া গুজিয়া যন্ত্রের সম্মুখে বসিয়া দেখা গেল ইন্টারনেট লাইন বিকল। এক অনর্থক অস্বস্তিতে সরবরাহকারীদিগকে ফোন দাও রে, ডাকো রে চলিতে থাকে। এবং টুনির উত্তরোত্তর উত্তেজনা বৃদ্ধি হইতে থাকে।

অধুনা অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে অনলাইন পরীক্ষাও শুরু হইয়াছে । খরচ বৃদ্ধির আরেক প্রস্থ বুদ্ধি বাহির হইল; সরবরাহ লাইনে সমস্যা হইলে, মোবাইলের ডাটা ব্যাবহার করিয়া শিক্ষাদান সচল রাখিবার। সপ্তাহে সপ্তাহে নানা মোড়কে আবৃত ডাটা কিনিয়া তাহা ব্যাকআপ হিসাবে রাখা শুরু হইল। সেই ডাটার কিয়ৎ ব্যবহৃত হয় ; সিংহভাগ অপচিত হয় মেয়াদোত্তীর্ণ নামক ফাঁকিবাজির কারণে।

শিক্ষার খরচ ক্রমশ: বাড়িয়া যাইতে লাগিল।

দিনকয়েক আগে ছোটটির ক্লাস চলিতেছিল দিব্যি। কিয়ৎক্ষণ পার হইলে, তাহার আর্তচিৎকার ! জুম নামক বিশেষ শ্রেণীকক্ষে সে ঢুকিতে পারিতেছে না। কহিলাম, এই তো দেখিলাম কিছুক্ষণ আগেও আরেক শিক্ষিকার কক্ষে অবস্থান করিতেছিলে। অকস্মাৎ, কী হইল !

আবারও কী বালুকণা তুলিতে গিয়ে সাবমেরিন লাইন কর্তিত হইয়াছে !
আরেক কক্ষে বড়টির খবর লওয়া হইল। সে দিব্যি পাঠরত রহিয়াছে। কম্পিউটার নামক যন্ত্র বিগড়াইলে তাহাকে পুনশ্চালনা করিলে অনেক সমস্যার সমাধান হয় ; ইহা টোনা সেই আশির দশকে শিখিয়াছে। সে তাহাই করিল, হা হতোস্মি !

উত্তেজিত টুনি, অবশেষে ছোটটির সতীর্থ আরেক শিক্ষার্থিনীর মাতাকে মোবাইল সহযোগে খোঁজ লইল। সকলেই নাকি দিব্যি শিক্ষালাভ করিতেছে। শুধু ছোটটির শিক্ষা বাধাগ্রস্ত। পাঠদানের একেবারে শেষে ছোটটির সহচরীর মাতা কর্তৃক শ্রেণিশিক্ষিকাকে ধরিয়া তাহাকে কক্ষে প্রবেশ করানো হইল। সেই শিক্ষিকা অগ্নিমূর্তি ধারণ করিয়া তিরস্কার শুরু করিয়া দিলেন। তিনি নাকি তাহার সভাকক্ষে নতুন নাম দেখিয়া প্রবেশ করিতে দেন নাই। কেননা, ছোটটি —যে কীনা সদ্য পরীক্ষাহীন শিক্ষাবর্ষ কাটাইয়া তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হইয়া যারপরনাই উৎফুল্লিত ; যাহার পিতৃপ্রদত্ত নাম ‘শ্রেয়া নুসরাহ’, সেই নাম , কী কারণে যেন পরিবর্তিত করিয়া রাখিয়াছে ‘আই অ্যাম নো বডি’ ! সুতরাং শিক্ষিকার কোন কসুর নেই। তিনি সঠিক কাজটিই করিয়াছেন ; ‘আই অ্যাম নো বডি’ নামক ব্যক্তিকে শিক্ষাগৃহে অনুপ্রবেশ করিতে না দিয়া।

আমি ছোটটিকে জিজ্ঞাসা করিলাম , নাম পরিবর্তনের হেতু কি ? ( উল্লেখ্য, নাম কীভাবে পরিবর্তন করা যায়, তাহা টোনাই মাত্র দিন কয়েক আগে শিখিয়াছে। সম্ভবত: ছোটটি তাহা দেখিয়াছিল। ) সে ইংরেজদের মতো কাঁধ ঝাঁকাইল। ইহার অর্থ অনেক রকম হইতে পারে । ‘আমার ইচ্ছে !’ ‘তো ?’ ‘সমস্যাটা কি?’ ‘আশ্চর্য !’ অথবা ‘মুড়ি কিনিয়া খাও গিয়া !’

এবং যথারীতি টুনি আমার চতুর্দশ বংশলতিকা তুলিয়া শাপশাপান্ত করিতে থাকিল। কোন কুক্ষণে , এই বংশের পাল্লায় সে পড়িয়াছে ; কেন এই বংশের সন্তানেরা সহজ নিয়মে চলিতে চাহে না ; কেন এই বংশে তাহাকে শকুন্তলার ন্যায় পাঠাইয়া দিয়া তাহার হাড়মাস জ্বালানোর ব্যবস্থা করিয়াছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

উত্তরপ্রজন্মের কীর্তির জন্য আমার সকল প্রয়াত পূর্বপুরুষেরা তিরস্কৃত হইতে থাকিল। এই তিরস্কার কতোকাল অবধি চলিবে সে সর্বময়ই জানে!

[ প্রকাশকালঃ ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২০ ]