by Jahid | Nov 24, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
বৃহদাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বা গ্রুপ অভ কোম্পানি গুলোতে কোন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে চাকরীচ্যুত করতে হলে বা মানে মানে বিদায় করতে হলে একেক কোম্পানি একেকরকম নিয়ম মেনে চলে। টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে চাকরি করার সময় দেখেছি— যখনই প্রোডাকশন ও কারখানা থেকে বড় কোন কর্মকর্তাকে হেড অফিসে ডেকে কোন পোস্টিং দেওয়া হয় ; আমরা বুঝে ফেলতাম ‘অমুক স্যার’ আর বেশীদিন নেই গ্রুপে।
আবার, অনেক কোম্পানিতে বেতন বোনাসের বাইরেও প্রত্যক্ষ অবহেলার পরিমাণ এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে, তিনি যতদূর সম্ভব ইজ্জত নিয়ে কেটে পড়েন। কোন কোম্পানিতে মালিকপক্ষ সম্ভাব্য টার্গেটেড ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টের লোকজন নিয়ে আলাদা মিটিং করা শুরু করেন, তাকে না জানিয়েই।
আরও মোক্ষম উপায় মালিকপক্ষের কাছে আছে ; সেটা হচ্ছে সম্ভাব্য ব্যক্তিকে তাঁর কাজের দক্ষতার সঙ্গে মিল নেই, এইরকম ফালতু কিছু কাজের দায়িত্ব দিয়ে বসিয়ে রাখা। সরকারি চাকুরীতে OSD ( Officer on Special Duty) করে রাখার মত আর কী !
সবচেয়ে মোক্ষম ও কার্যকর উপায় হচ্ছে, সম্ভাব্য ব্যক্তির চেয়ে অনভিজ্ঞ সহকর্মী বা তাঁর অধস্তন অযোগ্য ব্যক্তিকে পদন্নোতি দিয়ে দেওয়া। এই অপমান মূলত: কোন সুস্থ লোকের পক্ষে হজম করা সম্ভব হয় না।
যাই হোক, এক যুগ আগে আমিও অনেকটা এইরকম একটা সিচুয়েশনের মুখোমুখি হয়েছিলাম। কোনভাবেই কিছু যখন হচ্ছিল না , তখন রাগে দুঃখে ক্ষোভে তৎকালীন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মালিকপক্ষের আস্থাভাজন বসকে গিয়ে এই চুটকি শোনালাম। পরিশেষে প্রশ্ন করলাম, ‘ আপনি আসলে আমাকে নিয়ে কি করতে চাচ্ছেন ?’
যদিও উত্তর মেলেনি কখনই !
সেই চুটকি আবারও সবার সঙ্গে শেয়ার করছি, যৎসামান্য খিস্তি ক্ষমার্হ হবে আশা রাখি।
ঘটনা ব্রিটিশ আমলের।
মহল্লা প্রধান বা সর্দাররা জাতে ওঠার জন্য ঘরে বন্দুক রাখতেন। নতুন সর্দার যথারীতি দোনলা বন্দুক কিনলেন। কিনে রেখে দিলে তো হবে না ! ‘ ছিকার-ঠিকার না করলে — মহল্লা বুঝব ক্যাম্থে, বন্দুক কিনবার লাগছি !’
তো , সর্দার যাবেন পাখী শিকারে। সন্দেহ থাকতেই পারে, নতুন সর্দারের বন্দুক চালানোটা ঠিকমত জানা আছে কী নেই। ঢাকার আশেপাশে তখন অসংখ্য জলাভূমি এবং অতিথি পাখীর আনাগোনা। শীতের শেষ, অস্বস্তিকর চিটচিটে রৌদ্রের শুরু। অনেক আয়োজন করে কাক-ডাকা ভোরে নৌকা ও মাঝিকে নিয়া সর্দার পাখী-শিকারে বের হলেন। এই জলা, সেই জলা, পাখীর আর দেখা নাই। মাঝি চূড়ান্ত বিরক্ত। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল। ধীরেধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। হঠাৎ দূরে ঘাস, লতা-পাতার আড়ালে একটা বক দেখা গেল। মাঝি খুব সাবধানে বৈঠার আওয়াজ না করে আস্তে আস্তে নৌকা এগিয়ে নিয়ে চলছে।
শ’ খানেক হাত দূরে ।
মাঝি: ‘ গুলি করেন ছর্দার সাব।’
সর্দারঃ ‘ আরেকটু আউগাইয়া যা !’
পঞ্চাশ হাত দূরে–
মাঝি: ‘ গুলি করেন ছর্দার সাব।’
সর্দার: ‘আরেকটু আউগাইয়া যা !’
এমন করতে করতে বিশ হাত দূরে গিয়ে অবশেষে সর্দার বন্দুক তাক করলেন ।
মাঝি: ‘এইবার গুলি করবার লাগেন, বক তো উইড়া যাইব গা।’
সর্দার: ‘ আরেকটু আউগাইয়া যা’।
তিতবিরক্ত হয়ে মাঝি সর্দারকে: ‘ ছর্দার সাব, আপনারে এউগা কথা জিগাই?’
বন্দুকে চোখ রেখেই সর্দার বললেন: ‘ জিগা।’
মাঝি: ‘ সত্যি কইরা কন্ তো, আপনে হালায় বক রে গুলি করবেন, নাকি বকের পুঁটকি মারবেন?’
[ প্রকাশকালঃ ২৮শে সেপ্টেম্বর ,২০১৬ ]
by Jahid | Nov 24, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালাম-এর সেই বিখ্যাত উক্তি বহুশ্রুত ও সবার জানা। “ Love your job, but don’t love your company , because you may not know when your company stops loving you.”
অনেকেই ব্যাপারটাকে নেগেটিভলি ব্যবহার করেন ; এতে করে মালিক-কর্মচারী দূরত্ব বেড়ে যায়। আমি যেহেতু আশাবাদী লোক, তাই আশার কথা বলি। মূলত: এই ব্যাপারটিকে যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যায় , সেটা বছর পনের আগে আমার প্রতিষ্ঠানের সিইও এক ঘরোয়া মিটিং-এ আমাদের কয়েকজনকে বলেছিলেন। উনি এখন আর আমাদের দৈনন্দিন ব্যবসায় জড়িত নন। ভাল লেগেছিল, তাই মনে আছে।
আসলে আপনি যেখানে কাজ করছেন সেই কাজকে এনজয় করার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে আনুগত্য এবং ‘Good-feeling’ থাকতে হবে। পরিবারের সঙ্গে আপনার কথোপকথন সকালে ঘণ্টাখানেক আর রাতে বাড়ী ফিরে সর্বোচ্চ ঘণ্টাদুয়েক। অথচ খেয়াল করে দেখেন, জাগ্রত আপনাকে পরিবারের চেয়ে আপনার কর্মস্থলে তিনগুণ বেশী সময় দিতে হচ্ছে ! আবার, নিজের সম্পূর্ণটা দিতে না পারলে কী করে বুঝবেন আপনার সঠিক সম্ভাবনা কতখানি বা আপনার পক্ষে কতদূর যাওয়া সম্ভব ! নিজের কর্মদক্ষতা বাড়লে আপনার সুনাম যেমন বাড়বে, প্রতিষ্ঠানেও আপনার অবস্থান শক্ত হবে। একই সঙ্গে মার্কেটেও আপনি পরিচিত হয়ে উঠবেন।
একজন মালিক হিসাবে তিনি আমাদেরকে তাঁর কোম্পানির জন্য শতভাগ দিতে বলেছিলেন ; একইসঙ্গে আমাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন মার্কেটে নিজের একটা স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে। নিজের নেটওয়ার্কিং স্কিল, কমিটমেন্ট, পাবলিক রিলেশন, সততা, দক্ষতা দিয়ে নিজের একটা ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করা আবশ্যক ! আমি অনেকসময় দেখেছি , কিছু দক্ষ কর্মকর্তা ও ম্যানেজার পরিশ্রম দিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের চেয়েও নিজের নামকে বড় করে ফেলেছেন। একসময় দেখা যায় , মার্কেটে তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠানকে চেনে সবাই। বলেন , অমুক সাহেবের তমুক প্রতিষ্ঠান।
জানি সবাই উচ্চাকাঙ্ক্ষী হবে না । কিন্তু এই লেখা তেমন কারো চোখে পড়লে, সে নিশ্চয় চেষ্টা করবে এবং সফলও হবে ! আশা করতে দোষ কী !
[ প্রকাশকালঃ ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ]
by Jahid | Nov 24, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
আমার পড়াশোনা শুরু থেকেই বিজ্ঞানবিভাগে। ম্যানেজমেন্টের উপর নামকা ওয়াস্তে একটা অখ্যাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খুবই ‘হালকার উপর ঝাপসা’মানের একটা MBA ডিগ্রী আছে। তাও সেটার সার্টিফিকেট গত একযুগ ধরে পড়ে আছে সেই ইউনিভার্সিটির কোন এক জং ধরা ক্যাবিনেটে ; আমার সুবিখ্যাত আলস্যের কারণে ওটা আর তুলতেও যাই নি
তো ‘Trial and Error’ , সেই বিখ্যাত মৌলিক পদ্ধতিতে আমার ম্যানেজমেন্ট শেখার হাতেখড়ি । প্রতিমুহূর্তেই শেখার আবশ্যকতা আছে এবং জীবন্ত মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে গেলে যা হয়–একজনের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, আরেকজনের ক্ষেত্রে সেটা ভীষণভাবে ব্যর্থ ! সবকিছু বিবেচনা করে এখন পর্যন্ত ‘Situational Leadership’ বা ‘Situational Management’ সবগুলোর একটা সম্মিলিত রূপ মনে হয়েছে।
আরেকটা ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি খুব কার্যকর, বহুল প্রচলিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় আমাদের দেশে । ম্যানেজমেন্টের ভাষায় এটাকে Autocratic Management বলা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমি এটার নাম দিয়েছি Spider Management বা ‘মাকড়শা ম্যানেজমেন্ট’।
ধরুন , একজন মেধাবী লোক একটা কোম্পানির মালিক অথবা একজন সিইও বা ম্যানেজার। তার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই। এই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্ন থেকেই আছেন এবং ছোট্ট প্রতিষ্ঠানে বাকী লোকেরা তার চেয়ে কম মেধাবী। এবং যে কোন পরিপ্রেক্ষিতে অন্যকেউ যেই সিদ্ধান্তই দিক না কেন, ঐ মেধাবী মালিকের বা ম্যানেজারের সিদ্ধান্ত পরীক্ষিতভাবে সবচেয়ে কার্যকর !
তো, হয় কী , ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের সবধরনের সিদ্ধান্তের একচ্ছত্র অধিকারী হয়ে বসেন তিনি ! এক পর্যায়ে দেখা যায় রিসিপশনের চেয়ার টেবিলের রং , কার্পেট , কাপ-পিরিচ থেকে টয়লেটের কমোড কেনার সিদ্ধান্তও তাকে দিতে হয়। সকলেই ব্যাপারটাকে মেনে নেয়। সবাই তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। কোম্পানির সর্বোচ্চ মঙ্গলের জন্য ব্যক্তিটিকে এককভাবে সাধুবাদ দেওয়া হয়। আর ঐ ব্যক্তি নিজেকে ধীরে ধীরে কোম্পানির অন্যান্য আসবাবপত্রের মতো নিজেকে অপরিহার্য করে ফেলে।
ব্যাপারটা মাকড়শার মতো অনেকটা। একটা মাকড়শা তার জালের ঠিক কেন্দ্রে থেকে মুখ দিয়ে , পেট দিয়ে , হাত দিয়ে পা দিয়ে চারপাশ আঁকড়ে থাকে। অনেক সময় সেই স্কুলপাঠ্যের লোভী স্বার্থপর মাকড়শার মতো হয়, চারদিকের টানে নিজেকে একসময় ছিঁড়েখুঁড়ে ধ্বংস করে ফেলে সে। কর্মজীবনে এই মাকড়শা মালিক বা ম্যানেজারদের মুখোমুখি হতেই হবে আপনাকে। আমাদের চারপাশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ম্যানেজাররাই এই পদ্ধতিতে চলতে চান। কেন চান , সে গল্প আরেকদিন হবে।
দীর্ঘমেয়াদি মুশকিল হয় অন্যখানে। একজন মানুষ যতো দক্ষ বা সিদ্ধান্তগ্রহণে পারঙ্গম হন না কেন; সিদ্ধান্তগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার গুণগত মান কমতে থাকে। একজন দক্ষ ডাক্তার দিনে একটা অপারেশন করলে যে গুণগত মান পাওয়া যাবে ; ১০টা করলে সেক্ষেত্রে ছোটখাটো বা বড় ধরণের ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ! যে মালিক বা ম্যানেজার সপ্তাহে ১০টি বড় ধরণের সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, ধরে নিচ্ছি তার এফিসিয়েন্সির মান শতকরা ৯৫ ভাগ। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি যখন ১০০ টা সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন বা দিতে বাধ্য হচ্ছেন, তার এফিসিয়েন্সি কমে যাচ্ছে । ধরুন, তা নেমে হয়ে গেল ৯০ ভাগে। এখন ২০০টি সিদ্ধান্ত হলে, ২০টি দুর্বল সিদ্ধান্ত বা ভুল সিদ্ধান্ত অনেকাংশে প্রতিষ্ঠানের জন্য বা কর্মচারীদের জন্য নিদারুণ ক্ষতিকর হতে পারে।
কিন্তু এই দুষ্টচক্র থেকে ঐ ব্যক্তি বের হয়ে আসতে পারেন না কোনভাবেই। নিজের জালে নিজে এমনভাবে আটকে যান যে– না পারেন ছিঁড়তে, না পারেন বের হতে, না পারেন কাউকে বলতে। নিজের পরিবারপরিজন থেকে ধীরে ধীরে সরে যান ; পরিবারও তাকে ছাড়া দিব্যি চলতে শিখে যায়।
আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, ‘মাকড়শা ম্যানেজমেন্ট’ ছোট প্রতিষ্ঠানের উত্থানের জন্য দারুণ কার্যকর একটা পদ্ধতি। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠান যখন ২০ জন থেকে ২০০ বা ২০০০ জনের হয়ে যায় ; তখন তা থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে, সেটা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, দুইজনের জন্য চরম অমঙ্গলকর !
[ প্রকাশকালঃ ২৩শে সেপ্টেম্বর , ২০১৬ ]
by Jahid | Nov 24, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
ম্যানেজমেন্ট চালানোর অসংখ্য পদ্ধতি আছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পন্থা আবিষ্কৃত হচ্ছে। প্রচলিত জনপ্রিয়তম পদ্ধতি হচ্ছে অধীনস্থ সাথে একটু দূরত্ব রেখে হুকুম করে বা ডিরেক্ট করে সবকিছু ম্যানেজ করা । অধুনা ইন্টারনেটের বহুল মোটিভেশনাল স্পিকারদের কল্যাণে কোচিং ম্যানেজমেন্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠছে । ম্যানেজার এখানে সফল কোচের মতো হাতেকলমে সবকিছু দেখিয়ে দেন, মোটিভেট করেন, কর্মচারীদের কাছ থেকে তাদের সর্বোচ্চটি আদায় করে নেন। খুব বিরলভাবে আছে ডেলিগেশন ম্যানেজমেন্ট। অসামান্য কিছু ম্যানেজার আছেন যারা দায়িত্ব এমনভাবে পরবর্তীদেরকে ডেলিগেট করেন যে, কিছুদিন পরে উনি নিজেকে সবার কাছে অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেন। এতে করে প্রতিষ্ঠানের লাভ হয়, সেকেন্ড জেনারেশন তৈরি হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানে । পাঠ্যপুস্তকের বিস্তীর্ণ পড়াশোনায় নানাধরনের পদ্ধতি বাস্তবে কিছুটা-তো অবশ্যই কাজে আসে; নইলে আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কেন !
কিন্তু মাঝেমাঝে এমন কিছু জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে প্রচলিত কোন নিয়মই আর কাজ করে না। আপনি ম্যানেজার মালিক যাই হন না কেন, দিব্যি দেখতে পাচ্ছেন – ঘটনাতে এমন প্যাঁচ লেগেছে ! একেবারে ল্যাজেগোবরে অবস্থা — ম্যাজিক ছাড়া কোনভাবেই ঐ বিপদ থেকে উত্তরণের কোন উপায় নেই। দুর্ভাগ্যবশত: আপনি জাদুকর জুয়েল আইচ বা পিসি সরকার নন , যে ছুঃ মন্তর দিয়ে সমস্যার সমাধানের কোন উপায় বাৎলে দেবেন। এটাকে অনেকসময় আমরা বলি বটলনেক (Bottleneck ) সিচুয়েশন। হুট করে গিটঠু খোলার কোন চান্স থাকে না ।
অথচ সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, আপনি কোন একটা পথ দেখাবেন । আমি আমার জীবনে ব্যক্তিগত ভাবে সাংঘাতিক মেধাবী ও ক্যারিসমাটিক কয়েকজন মালিক ও ম্যানেজারকে দেখেছি, যারা সমস্যারে কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালেই কীভাবে যেন সবকিছু ঠিক হয়ে যেতো !
এখন আরেকটা স্বল্প-মেধাবী কিন্তু কার্যকর পদ্ধতির কথা বলি ; সেটা দিয়েও অনেক বুদ্ধিমান মালিক-ম্যানেজারকে জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরিত হতে দেখেছি বহুবার। যেহেতু আমি ও আপনি উভয়েই জানি যে , আমাদের চারপাশে ক্যারিসমাটিক ম্যানেজার বা মালিকের অভাব আছে । সুতরাং ক্ষেত্র-বিশেষে দ্বিতীয় পদ্ধতিটা মন্দ নয়।
এসব ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সোজা একটা কথা বলে দিলেই কাজ হয়।
‘আমি জানিনা কীভাবে করবেন, কিন্তু অমুক সময়ের ভিতরে এটা করতেই হবে। কয়জন মিলে, কী কী রিসোর্স লাগবে, কীভাবে করবেন সেটা আমার দেখার বিষয় না।’
এই পদ্ধতিতে কী কাজ হয়? আলবৎ হয় ! আসলে , গভীর সমস্যায় পড়লে অধীনস্থরা অনেক সময় হাল ছেড়ে দেয়। ‘বসেরা-তো জানেই কতখানি সমস্যা, আমি নতুন করে কী করতে পারি।’ সে তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ না করে কমফোর্ট জোনে থাকতে চায় ।
খেয়াল করে দেখবেন , পশ্চিমাদেশের বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে, বিশেষ করে তরুণ খেলোয়াড়দের মোটিভেট করার জন্য একটা কথা ঘুরে ফিরে বলা হয় “ When someone pushes his/her limits, he/she can reach their maximum potential !” ঠিক একইভাবে কাউকে বিপদসীমার উপরে এক্সট্রিম লেভেলে ঠেলে পাঠিয়ে দিলে, ভয়ংকর প্রেশার বা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন সে ম্যাজিক দেখাতে পারে।
তবে লক্ষণীয় এই যে, এই ‘পদ্ধতি’ সারাবছরে একবার বা দুইবারের বেশী প্রয়োগ করা উচিৎ নয়। ঘন ঘন এক্সট্রিম প্রেশার মালিক বা ম্যানেজারকে অধীনস্থদের কাছে ক্লিশে করে ফেলে !
[ প্রকাশকালঃ ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ]
by Jahid | Nov 24, 2020 | কর্পোরেট অবজার্ভেশন
শ্রেণিবিন্যাসে ক্ষমতার অধঃক্রম অনুসারে নীচের নিয়মটি খাপছাড়া রকমের কার্যকরী।
বুঝিয়ে বলছি। ধরুন একটা বিশাল শিল্প প্রতিষ্ঠানের মূল মালিকের পরেই আছেন কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার ডিরেক্টর, তাদের নীচে আছেন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ; ক্রমান্বয়ে জেনারেল ম্যানেজার, ডিজিএম, অপারেশন ম্যানেজার, প্রোডাকশন ম্যানেজার, এপিএম , ফ্লোর সুপারভাইজার, লাইন ইনচার্জ, অপারেটর, লেবার ইত্যাদি ইত্যাদি। অথবা আপনি একটা ছোট সংসারের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ‘গিন্নী’ । আপনার নিম্নবর্তী শ্রেণীতে আছে দারোয়ান, ড্রাইভার, কাজের বুয়া ইত্যাদি।
শ্রেণীবিন্যাস অনুসারে ঊর্ধ্বতর শ্রেণীর কাছে নিম্নতর শ্রেণী/শ্রেণীসমূহের কিছু ন্যায্য ও অন্যায্য দাবী-দাওয়া সবসময় থাকে। পুঁজিবাদী পৃথিবীতে কেউ সহজে সন্তুষ্ট হতে পারে না। চাহিদার শেষ নাই । হয়তো পুঁজিবাদই তা হতে দেয় না। ক্ষেত্র বিশেষে ঊর্ধ্বতর শ্রেণিকে নিম্নতর শ্রেণীর ন্যায্য দাবী মেনে নিতে হয়, নেগোশিয়েশন হয়। উভয়পক্ষের ছাড় দিয়ে একটা সমঝোতায় আসে। ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান এগিয়ে চলে। কিছুদিন পরে আবার নতুন করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি নিম্নতর শ্রেণীকে ঠেলে দেয় নতুন দাবী-দাওয়া উত্থাপনে !
অনেকসময় ঊর্ধ্বতর শ্রেণী ভেবে বসে, ট্রায়ালভিত্তিতে বা পরীক্ষামূলক ভাবে সীমিত সময়ের জন্য ( কয়েকমাস বা এক বছরের ) একটা সুবিধা দেওয়া যাক। পরে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী না হলে ‘সুবিধা’-টা তুলে নেওয়া যাবে ! সেটা হতে পারে, সাপ্তাহিক একদিন ছুটির পাশাপাশি অল্টারনেটিভ আরেকদিন দিনে ছুটি কাটানোর সুযোগ ; হতে পারে দুপুরের ফ্রি লাঞ্চ ; কর্মচারীদের ড্রপ অ্যান্ড পিক অথবা প্রফিট বোনাস , মহার্ঘভাতা ইত্যাদি।
ওই যে প্রথমেই বলেছি, ব্যাপারটা খাপছাড়া ও হাস্যকর মনে হলেও , একটা সুবিধা একবার দেওয়ার পরে, নিম্নতর শ্রেণী যখন সেটা উপভোগ করা শুরু করে – পরবর্তীতে সেটা তুলে নিতে গেলে ভয়ংকর অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায় ! মূলত: মানুষের চরিত্রই এমন যে , একটা ন্যায্য-অন্যায্য বা অযাচিত সুযোগে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সে ধরেই নেয় সেটা তাঁর অধিকার, জন্মজন্মান্তরের পাওনা।
রফতানিমুখি গার্মেন্টস শিল্পে জড়িত ট্রেডিং অফিসগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটি দেড়দিন হয়ে থাকে। সেটা শুক্র –শনি অথবা শনি-রবি মিলিয়ে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে দুইদিন সাপ্তাহিক ছুটির পক্ষে। ঢাকার বেশ কয়েকটি বড় সোর্সিং ও ট্রেডিং অফিসের সাপ্তাহিক ছুটি দুইদিন এবং তারা সবকিছু ম্যানেজ করে দিব্যি ব্যবসা করছে। অনেক অফিসে হাফ-ডে নামে যে ছুটিটা আছে, আমি সেটার ঘোরতর বিরোধী। আমি জানি , সাপ্তাহিক ছুটি সারাদেশে রবিবার হলে এই সমস্যা হত না । মাঝখানের একদিন হাফ-ডে অফিস খোলা না থাকলে পশ্চিমা ক্রেতা , ট্রেডিং অফিস, ব্যাংক এবং কারখানাগুলোর মধ্যে প্রায় ৩ দিনের কম্যুনিকেশন গ্যাপ পড়ে যায়। সেটিও কারো কাম্য নয়।
আবার আধাবেলা অফিসে গুচ্ছের মূল্যবান বিদ্যুৎ , সিস্টেম সাপোর্ট , এসির বাতাস দুপুর-বিকাল পর্যন্ত চালিয়ে যে কার্যোদ্ধার হয় তা মূলত: ঘণ্টাখানেকের কাজ। কেউ বোধহয় দ্বিমত করবেন না যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের মধ্যে আধাবেলা অফিসের দিনে তাড়াহুড়ো থাকে — তাড়াতাড়ি কাজ শেষে বাসায় গিয়ে লাঞ্চ করার ! সুতরাং সকাল ৯:০০ টায় ঢুকে দুপুর ১:০০ টায় বের হয়ে যাওয়ার মাঝখানে কাজের কাজ হয় সামান্যই !
আমি যে প্রতিষ্ঠানে কামলা খাটি , সেখানে ট্রায়াল বেসিস অল্টারনেটিভ শনিবার ছুটির প্রস্তাব এসেছিল। নানাকারণে আমি দ্বিমত পোষণ করি এই ট্রায়াল বেসিস সুবিধার । আমার কথা খুব স্পষ্ট ছিল — দিতে হলে ঘোষণা দিয়ে একেবারে দিতে হবে। কয়েকমাস দিয়ে এই সুবিধা উঠিয়ে নেওয়ার কোন মানে হয়না।
প্রতিটা ঊর্ধ্বতর শ্রেণীর কাছে নিম্নতর শ্রেণীর যেকোনো ন্যায্য বা অন্যায্য দাবী থাকুক না কেন—একবার সেটা দিয়ে, পরবর্তীতে তুলে নেওয়া মূলত: অপ্রয়োজনীয় অসন্তোষের সৃষ্টি করে । সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদে সেটার প্রভাব কী কী হতে পারে ভেবে দেখা উচিৎ।
[ প্রকাশকালঃ ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ]
সাম্প্রতিক মন্তব্য