খিদে। সুবোধ সরকার।।

মানুষর পেটে দু’রকম খিদে থাকে
একটা দিনের বেলার, একটা রাতের বেলার
একটা পেটের একটু উপরে, একটা একটু নীচে
খিদে পেলে গোলাপ খাওয়া যায় না
এত দাঁত আমাদের, একটা শক্ত কিছু চাই।
দিনের বেলা খিদে যখন মাথায় ওঠে
তখন বাপ মা ঠিক থাকে না
যাদের কখনও খিদে পায় না তারা ঠিক বুঝতে পারবে না।
তিনদিন বাদে একটা লোক একথালা ভাত পেয়েছে , খেতে দিন।
আপনারা যারা খেতে পান
আপনারা যারা খেতে পান না , তাদের একটাই পার্থক্য
একজন দেয়াল টপকে গোলাপ বাগানে ঢোকে মেয়েলোকের জন্য
একজন দেয়াল ফাটিয়ে বেরিয়ে আসে দুটো ভাতের জন্য
নক্ষত্রখচিত আকাশ গরিবের জন্য নয়, তার
দিনের বেলা খিদে রাতের বেলার খিদে একাকার হয়ে গেছে
তার একটাই চিন্তা পরের দিন ছেলেমেয়েদের সে কী খেতে দেবে?

ডিম। সুবোধ সরকার।।

প্রথম ডাক্তার বললেনঃ ‘ আপনার বেবি তা হলে ন’মাসে পড়ল
ডিম সেদ্ধ করে হলুদ কুসুম খেতে দেবেন।’
দ্বিতীয় ডাক্তার ভালো করে ওজন নিয়ে শান্ত স্বরে বললেনঃ
‘ডিমের যে অংশটা সাদা ,প্রতিদিন দু’চামচ করে খাওয়াবেন।’
প্রথম ডাক্তার বললেনঃ
‘ডিম সেদ্ধ করার নিয়ম আছে, গরম এক বাটি জলে
ডিমটা ছেড়ে দিয়ে তুলে নেবেন।’
দ্বিতীয় ডাক্তার বললেনঃ
‘ডিম সেদ্ধ করার নিয়ম আছে
দশ মিনিট ভাল করে ফোটাবেন।’
হামাগুড়ি দিয়ে উলটোদিক থেকে ছুটে আসা
আমার ন’মাসের পুত্রের দিকে
অসহায় তাকিয়েছিলাম,
সে আমাদের ভাষা বুঝতে শেখেনি, তবু বললামঃ
ডিম সম্পর্কে মানবসভ্যতায় এখনও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি
কিন্তু পরমুহূর্তেই আমার মনে হল বাক্যটা ভুল
ডিম নয়, ডাক্তার সম্পর্কে মানবসভ্যতায় এখনও সঠিক সিদ্ধান্ত
আমরা নিতে পারিনি।

স্বামীরা কীরকম হবে। সুবোধ সরকার।।

যেতে পারে
অন্য মেয়ের কাছে, তবে রাত আটটার মধ্যে
তাকে বাড়ি ফিরতে হবে।
খেতে পারে
তবে বেশী নয়, বড় জোর তিন পেগ, কিন্তু পা যেন
ঠিক থাকে টেবিলের তলায়।
দেবতা টেবতা নয়
স্বামী হবে পাইন গাছের মতো ঋজু , বলবান
অনেক অনেক টাকা, কিন্তু টাকার ওপর
কোন লোভ থাকবে না।
আমি ভাবছিলাম অন্য কথা
কেরোসিন লাইনে মার খেয়ে ফিরে আসে যেসব স্বামীরা
হাফপ্যান্ট পরা পুলিশের হাতে মার খেয়ে ফিরে আসে যেসব স্বামীরা
ন্যাশনাল হাইওয়ে থেকে মার খেয়ে ফিরে আসে যেসব স্বামীরা
কাদাজল মেখে হাতে জুতো নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে যেসব স্বামীরা
তারা কীরকম হবে?
তারা কিন্তু রাত্রে নিদ্রিত স্ত্রীর পাশে শুয়ে
স্বপ্ন দেখে ডানা কাঁটা পরি
হারে-রেরে-রেরে
তারাভরা অঘ্রান নিশীথে
সিংহের পিঠে বসে তাঁরা শহরে ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে।

মেয়েদেরকে নিয়ে। সুবোধ সরকার।।

মেয়েদেরকে নিয়ে বাজারে বহুরকমের ঠাট্টা চালু আছে, তবে তার বেশিটাই নিষ্ঠুর
আমিও খান তিনেক জানি, যেমনঃ
যে মেয়ে সহজলভ্যা তাকে বলা হয় পাপোস
যে মেয়ের বুক নেই তাকে বলে ম্যানচেস্টার
যে মেয়েরা এক মাসের জন্য জীবনে আসে তাদের বলেঃ চায়ের খুরি
অর্থাৎ ইয়ুজ অ্যান্ড থ্রো।
যে মেয়ের বয়স হয়ে এল, যৌবন যাই যাই করছে, তাদের সম্পর্কে
এক অধ্যাপক বন্ধু বলেছিলঃব্যবহার করার আগে ঝাঁকিয়ে নেবেন।
এতো নিচু মাপের ভাষা শুনে আমার গা ঘিনঘিন করে
এ সবই ওই ব্রাহ্মণের প্রভাব, মনু নামে যিনি বিখ্যাত।
ছেলেদের সম্পর্কে ঠাট্টাগুলো তেমন জোরালো নয়
বড়জোর আমরা বলিঃ উওম্যানাইজর , অর্থাৎ আলুবাবু
মেয়েরাও ছেলেদের অনেক নাম দেয় যেমন, ঘুরঘুরে পোকা
হিন্দুস্তান পাকিস্তান
অর্থাৎ যার বাছবিচার নেই
এইসব ঠাট্টার ভেতর ছেলেদের প্রশ্রয় দেবার একটা প্রবণতা থাকে
সেই ঠাকুমার কথাঃ সোনার আংটি আবার ব্যাঁকা?
মেয়েদের নিয়ে বদরসিকতা আমার ভাল লাগে না।
আমি তিন দিদির সঙ্গে মানুষ হয়েছি, সুতরাং
মেয়ে বলতে আমি বুঝি নারী
তার ৩২-৩৬-৩২ আমার বিষয় নয়
সে হয়তো সুদূর কোন নৌকার ভেতর বসে অপেক্ষা করছে
সেই নৌকো কোথায় আমি জানি না
কিন্তু আমাকে সেখানে গিয়ে পৌঁছতেই হবে।
সূর্যাস্তের আগে আমি কি পারব তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে?

ভূমিকার বিরুদ্ধে ভূমিকা। সুবোধ সরকার।। কবিতাসমগ্র ১

আমি কোন থিয়োরির গেটকিপার নই। কোনও সৌন্দর্যের দারোয়ান নই। আমার কোন অ্যাটাচি কেস নেই যে তাঁর ভেতরে একটা পর্বতমালা নিয়ে আমি বিমানে উঠে পড়ব। আমি চেয়েছিলাম কবিতাই লিখতে, একটা লোক এসে বলল, আপনি যা লিখছেন, একে কবিতা বলে না, বলে অ্যান্টি-পোয়েট্রি। সেটাই বা কী বস্তু ? সেটা বুঝতেই জীবন চলে গেল।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি আমাকে উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে পারবেন?
তিনি বললেন , শিয়োর। মিস্টার রামোকৃষ্ণের গল্পটা ধরুন। ফাইভ ব্লাইন্ড মেন অ্যান্ড দ্য এলিফ্যান্ট। যিনি পা ধরে দেখলেন, তিনি হাতিকে ঠাউরেছিলেন একটি ল্যাম্পপোস্ট। যিনি পেট ধরে দেখলেন তিনি ভাবলেন হাতি একটা বালির বস্তা। যিনি কান ধরে দেখলেন, তিনি বললেন, হাতি আসলে একটা কুলো। ব্লা ব্লা ব্লা ।

ভদ্রলোক বিদেশে পড়ান , এক কলমেই বাঘে গোরুতে জল খাওয়ান, আমি তাঁকে বললাম, আমি হাতিকে কী বলে ঠাউরেছি, আপনার কী মনে হয় ? উনি বললেন, আপনি হাতিকে ভেবেছেন ঝাঁটা। অর্থাৎ আপনি হাতির পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন , লেজটাকে ধরেছিলেন।
আপনি কি বলতে চান আমি কবিতাকে ঝাঁটা হিসেবে ব্যবহার করি? ভদ্রলোক বললেন, সে তো কিছুটা সত্যি। আপনি কোথাও ধুলো দেখলেই ঝাঁটা বের করেন, আপনি ঘুষ দেখলেই ঝাঁটা বের করেন, গুজরাত দেখলেই ঝাঁটা বের করেন, বানতলা হলেই ঝাঁটা বের করেন, কামদুনি হলেই ঝাঁটা বের করেন। কোথাও কেওরামি দেখলেই , ধুলো জমলেই আপনি প্রতিবাদের ঝাঁটা নিয়ে নেমে পড়েন।
আমি বললাম, যা বাবা , আমি কোনওদিন গেটকিপার হতে চাইনি, দারোয়ান হতে চাইনি, কিন্তু হয়ে গেলাম ঝাড়ুদার।

আমার কবিতা হয়ে উঠল সহজ, আমি ছন্দে না লিখে গদ্যে লিখে যেতে লাগলাম। যে গদ্য কবিরা ফেলে দেন আমি সেই সেই গদ্য কুড়িয়ে নিলাম।যে গল্প বাদ দিয়ে কবিরা লেখেন, আমি সেই গল্প ফিরিয়ে আনলাম আমার কবিতায়। ফলে আমার কবিতা পরে কিছু লোকে বুঝতে পারল, কিছু কবি তাতে রেগে গেল। তাঁরা বললেন, কবিতা বোঝা গেলে সেটা আর কবিতা থাকে না। আমি মন খারাপ করে বসে থাকলাম। মন খারাপ করে কী করব? দশ বছর ধরে মন খারাপ করে বসে থাকা যায় না।আবার উঠে দাঁড়িয়ে লিখতে শুরু করলাম যে লেখা আজও লিখে চলেছি। সম্প্রতি চিন্ময় গুহ আনন্দবাজার-এ লিখেছেন যে ফরাসিতে প্রবাদ আছে, ‘ যা স্বচ্ছ নয়, তা ফরাসি নয়।‘ এতদিন বাদে সান্ত্বনা পেলাম, যাক আমি তাহলে গোপনে গোপনে ফরাসি। অথচ স্বচ্ছ লেখার অপরাধে আমি এতদিন গঞ্জনা সয়ে এলাম।