বুটজুতো। সুবোধ সরকার।।

এটাই রীতি, এটাই চলে আসছে পৃথিবীতে

পায়ের মাপে তৈরী হয় জুতো

জুতোর মাপে তৈরী হয় না পা।

রাষ্ট্র যখন এগিয়ে দেয় বুট

বলে, ‘ ঢোকাও, পায়ে ঢোকাও ’

চেঁচিয়ে বলি, ‘ ও জুতো আমার পায়ে হচ্ছে না।’

লোকটা জানলই না। সুভাষ মুখোপাধ্যায়।।

বাঁ দিকের বুক পকেটটা সামলাতে সামলাতে
হায়! হায় !
লোকটার ইহকাল পরকাল গেল !

অথচ আর একটু নীচে
হাত দিলেই সে পেত
আলাদ্বীনের আশ্চর্য- প্রদীপ,
তার হৃদয় !

লোকটা জানলোই না !

তার কড়ি গাছে কড়ি হল ।
লক্ষ্মী এলেন
রণ-পায়ে

দেয়াল দিল পাহাড়া
ছোটলোক হাওয়া
যেন ঢুকতে না পারে !

তারপর
একদিন
গোগ্রাসে গিলতে গিলতে
দু-আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে

কখন
খসে পড়ল তার জীবন-

লোকটা জানলই না !

টেবিলে অনেক বই ।। জীবনানন্দ দাশ

এইবার চিন্তা স্থির করবার অবসর এসেছে জীবনে
হৃদয় বয়স্ক হল ঢের ;
মোম জ্বলে নিভে যায় অনেক গভীর রাত হলে
অন্ধকারে একআধটা আবছা ইঁদুরের
আসা-যাওয়া টের পাই ঘরের মেঝেয়
হয়তোবা সিলিঙের ‘পরে
বাইরে শিশির ঝরে কুয়াশায়–শীতে
লক্ষীপেঁচার ডানা সজনের ডালে শব্দ করে।
টেবিলে অনেক বই ছড়িয়ে রয়েছে ;
চিন্তাগুলো যেন অনুলোম প্রতিলোম
পরস্পরের প্রতি—ঠাণ্ডা শাদা নারীর মতন
দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপে মোম—-
একটি গভীর সূত্রে প্রথিত কি হবে
বইয়ের সকল চিন্তা জীবনের সব অভিজ্ঞতা
সকল নক্ষত্র আর সময়ের অপার গতির
ইতিহাসবৃত্তান্তের আগাগোড়া কথা।
এ সব আশ্চর্য তত্ত্ব ভেবে তবু মন
অনুভব করে এই অন্ধকার ঘরে আজ কেউ
নেই, শুধু এক বিন্দু মূল্য নির্ণয়ের চেষ্টা ছাড়া।
কোনো এক দূর মহাসাগরের ঢেউ
এসে এই অন্ধকার বন্দর স্পর্শ করে চুপে
কোন্ এক দূর দিকে চলে যায়, তবে
সময়ের অন্তিম সঞ্চয়ে প্রেম করুণার বলয় রয়েছে ?
ব্যক্তির ও মানবের সফলতা হবে ?
হয়তো এই ব্রহ্মাণ্ডের অবিনাশ অন্ধকার ছাড়া
মানুষের ভবিষ্যতে কিছু নেই আর ;
সেবা ক্ষমা স্নিগ্ধতা যে আলোর মতন
মানুষের হাতে, তার বুজে –যাওয়া অন্ধ আধার
বারবার বড়ো এক পরিবর্তনীয়তার দিকে
যেতে চায়— সনাতন অন্ধকারে এ প্রয়াস ভালো ;
তবু এই পৃথিবীতে প্রেমের গভীর গল্প আছে
জীবনের রয়েছে তার ( অপরূপ ) প্রতিভাত আলো।
“অগ্রন্থিত কবিতা ।। জীবনানন্দ দাশ।”

সত্যি, আপনি বিভূতিভূষণকে মুখোমুখি দেখেছিলেন? তারাপদ রায়।।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী , অপু, দুর্গা, নিশ্চিন্দিপুর, হরিহর, সর্বজয়া, ইন্দির ঠাক্‌রুন , আম আঁটির ভেঁপু – আমার মনে হয়, আমরাই শেষ আলোড়িত প্রজন্ম । ১৯২৯ সালে লেখা এই উপন্যাস গত পাঁচ-ছয় দশক ধরে প্রতিটি শিক্ষিত বাঙালির সারাজীবনের অংশ হয়ে গেছে । কৈশোরে আমরা প্রত্যেকেই অপু বা দুর্গা। আমাদের বাবাদের কেউ কেউ হরিহর , মায়েদের কেউ সর্বজয়া !

পথের পাঁচালীর শেষের কয়েক লাইন আমাদের বার বার পড়তে হয়।

“পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন – মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নিতোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতেরখেয়াঘাটের সীমানায়? তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে… দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সুর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে, জানার গন্ডি এড়িয়ে অপরিচয়েরউদ্দেশ্যে…

দিনরাত্রি পার হয়ে, জন্ম মরণ পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মনন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায়… তোমাদের মর্মর জীবন-সপ্ন শেওলা-ছাতারদলে ভরে আসে, পথ আমার তখনো ফুরোয় না… চলে… চলে… চলে… এগিয়েই চলে…

অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ…

সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমাকে ঘরছাড়া করে এনেছি!…

চল এগিয়ে যাই”

কয়েকটাদিন কবিতা নিয়ে মেতে ছিলাম। ‘দেশ ’ পত্রিকার কবিতা সংকলনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তারাপদ রায়ের কবিতাটা ভালো লেগে গেলো।

শতবার্ষিকীর ছায়াপদ্য

তারাপদ রায়

‘Ah , did you once see Shelley , plain….?’

সত্যি, আপনি বিভূতিভূষণকে মুখোমুখি দেখেছিলেন?

সাদামাটা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়?

বনগ্রাম স্টেশনে একদিন দুপুর পার হয়ে প্রায় বিকেলে ,

প্রায় ফাঁকা যশোহর লোকালে উঠে আপনি দেখলেন

ওদিকের সীটে জানালার ধারে তিনি বসে আছেন ?

অল্পদিন আগে কোথায় এক সাহিত্যসভায় দেখেছিলেন,

তাই তাঁকে চিনতে আপনার অসুবিধা হল না।

সেই হালকা-নীল কলারফাটা হাফশার্ট ,

আধময়লা মিলের ধুতি ,তাপ্পি মারা ক্যাম্বিসের জুতো ।

অনেকদিন আগের কথা

তবু মনে আছে আপনার ?

যশোহর রোড কোনাকুনি ভাবে কাটিয়ে

শিয়ালদহ চলেছে দুপুরের নিঝুম রেলগাড়ি ।

জানালার পাশে বিভূতিভূষণ, আপনার মুখোমুখি ।

রেলগাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে ধলচিতের খেয়াঘাট ,

সোনাডাঙ্গার মাঠ, পদ্মফুলে ভঁরা মধুখালির বিল,

নীলকুঠির সাহেবের আমলের তুঁতগাছ পড়ে থাকছে পিছনে ।

বিভূতিভূষণের সঙ্গে আপনি কথা বলেছিলেন ?

আশ্চর্য ! কী বলেছিলেন আপনি , সেটা মনে নেই?

বিভূতিভূষণ আপনার কথার উত্তর দিয়েছিলেন ,

কী বলেছিলেন বিভূতিভূষণ – তাও আপনি ভুলে গেছেন ?

তা হলে আপনার শুধুই মনে আছে,

চলন্ত রেলগাড়ির কামরায় জানালার পাশে,

পুরনো নীল জামা গায়ে বসে আছেন বিভূতিভূষণ ।

বিকেল গড়িয়ে পড়ছে রেলপথের পাশে

বন অপরাজিতার নীলফুলে ছাওয়া বনের মাথায় ,

পাখি ডাকছে শিরীষ-সোঁদালি বনে,

রেলগাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে সোনাডাঙ্গার মাঠ,

মধুখালির বিল, ধলচিতের খেয়াঘাট ।

অপরাহ্ণের রাঙা রোদ জানালা দিয়ে ঢুকেছে কামরায়

নীল নির্জন আকাশ পথে গাঙচিলের ডাক

বাঁশঝাড়ের মাথায় দিনের শেষ আলো

দিনরাত্রি পার হয়ে, জন্ম-মৃত্যু পার হয়ে

মাস, বার, মন্বন্তর , মহাযুগ পার হয়ে,

ঝোঁপে ঝোঁপে নাটা-কাঁটা বনকলমির ফুল

যশোহর লোকালের ফাঁকা কামরায় কাঠের বেঞ্চিতে

বসে আছেন নিঃসঙ্গ ; নির্লিপ্ত বিভূতিভূষণ ।

সত্যি, আপনার মনে আছে ?

সত্যি, আপনি দেখেছিলেন বিভূতিভূষণকে ?

আশার আস্থার আধার নিজেই মানুষ। জীবনানন্দ দাশ।। ( অগ্রন্থিত কবিতা)

এ পৃথিবী বড়ো , তবু তার চেয়ে ঢের বেশি এই

সময়ের ঢেউগুলো- অনিঃশেষ সমুদ্রের থেকে

অন্তহীন সাগরের অভিমুখে কোথায় চলেছে ।

রাত্রি আসে –রাত্রি শেষ হয়ে গেলে আলো;

আলো আরো মৃদু হ’লে তার চেয়ে বেশি

স্নিগ্ধ অন্ধকার সব—আকাঙ্ক্ষিত মেয়েটির হাতের মতন

কাছে এসে ,সংবরণ ক’রে তবু, যেন নেপথ্যের

ওপারের থেকে তার কথা বলে ।

 

অগাধ আয়ুর শিশু এরা সব ঃ এই দিন, এই রাত্রি ,

বাতাসের আসা-যাওয়া , নীল নক্ষত্রের ফুটে ওঠা,

শিশির ঝরার শব্দ , আশ্চর্য পাখির

ডিম প্রসবের সাড়া ; আবার রোদের দিন মাঘ ফাল্গুনের ;

সহসা বৃষ্টির রাত্রি,– হেমন্তের ঠান্ডা নিঃশব্দতা

কবের আয়ুর শিশু এরা সব ;– ম্যামথ দেখেছে।

 

 

শতাব্দীর সন্ধিপথে আজ মানুষের

আধো-আলো আধো- আশা অপরূপ অধঃপতনের

অন্ধকারে অবহিত অন্তর্যামীদের মতন ভোরের সূর্য ;

দূরতম সমুদ্রের হাওয়া এসে ছুঁয়ে কিছু ভালো ব’লে যেতে চায় ;

নগরীর বিদগ্ধ লোকেরা কথা ভেবে—ব’লে

প্রেরণা জাগাতে চায় ;

সহজ ত্যাগীরা কাজ করে ;

রক্তে দেশ অন্ধকার হয়ে পড়ে ;

কথা ভাষা স্বপ্ন সাধ সংকল্পের ব্যবহারে

মানুষেরা মানুষের প্রিয়তর না হ’য়ে শুধু দূরতর হয় ;

হৃদয় মলিন হ’য়ে যেতে থাকে ;

নিয়ন্ত্রিত জ্ঞানেরো আকাশ ঢেকে কুয়াশা বাড়ছে;

মুক্ত হতে গিয়ে সুধী কেবলি রোমাঞ্চকর রূঢ় সায়েন্সের

জন্ম দেয় ; চারিদিকে অগণন মানুষের মৃত্যু তার বড়ো কাহিনীর

যবনিকাপাতের প্রাক্কালে ক্লান্তির মতো ;

তখন শতাব্দী অন্ধ—অবসন্ন—ব্যর্থ ।–

হয়তো এ পৃথিবীতে মানবের অনন্ত চারণ,

লোভ থেকে লোভে শুধু –ব্যাথা থেকে ব্যাথার ভিতরে,

ভুল থেকে উল্লোল ক্ষমতাময় ভুলের গহ্বরে;

চাঁদের কুয়াশা থেকে অঘ্রাণ রাতের

নক্ষত্রের অন্ধকারে ;-

তারপর নক্ষত্রেরা নেই।

 

 

 

 

নবীন প্রয়াণে স্পর্শে মানুষেরা একদিন চীন পিরামিড

গড়েছিল ; সূর্যঘড়ি চিনেছিল ; প্রিয়তর উজ্জ্বল সূর্যকে

দিব্য দিয়ে নগরীর ভাঙ্গা হাড়ে কেবলি গড়েছে

নতুন খিলান স্তম্ভ ফ্যাক্টরি এঞ্জিন ক্রেনঃ

এ সব বিচিত্র নীড় কুশলতা কল

সময়ের থেকে দূর বড় সময়ের কাছে

মানুষের যেই পরিচয় রেখে যায়

তা তার আবেগ বুদ্ধি উৎকণ্ঠার;-

যেন তা কল্যাণ সত্য চায় –তবু অগাধ হিংসার—

রিরংসার পাকে ঘুরে –ঘুরে ঘুরে শূন্য হয়ে যায় ;

অন্ধকার থেকে মৃদু আলোর ভিতরে

আলোর ভিতর থেকে আঁধারের দিকে

জ্ঞানের ভিতর থেকে শোকাবহ আশ্চর্য অজ্ঞানে

বারে- বারে আসা- যাওয়া শেষ ক’রে ।

 

 

 

 

চিরকাল ইতিহাসবহনের পথে

রক্ত ক্ষয় নাশ ক’রে সে এক জগতে

মানুষের দিকচিহ্ন মাঝে মাঝে মুক্ত হ’য়ে পড়ে ;

তা কোন প্রশান্তি নয় , মৃত্যু নয়, অপ্রেমের মতো নয়,

কোনো হেঁয়ালির শেষ মীমাংসার বার্তা নয়,

অচিহ্নিত সাগরের মতন তা , দূরতম আকাশের মতো ;

পেছনের পার্শ্বের দ্রুতগতি চিহ্ন ও বলয়

অন্তর্হিত হ’য়ে গেলে কূলহীন পটভূমি জেগে ওঠে

ব্যক্তি ও জাতির নাম সময়ের দিগন্তরে শেষ হ’লে

শূন্য নীল আকাশের – মহাসাগরের শূন্যে মেশে ;

চিনে নিতে পারে তার হৃদয়ের অসীম ভূগোলে

আরো শুদ্ধ আরো গাঢ় অনির্বচনীয় সম্মিলন

মানুষ ও মানুষেরঃ চারিদিকে গ্লোবমাস্টারের শব্দে

অন্তহীন অন্ধকারে হাঙর মকর মৃত্যু কুজ্‌ঝটিকায়

মৃত মূঢ় এরিয়েল ও বেতারের ব্যর্থতায়

যদিও প্রত্যাশা সব সর্বশান্ত ব’লে মনে হয়—

আশার আস্থার আধার তবু নিজেই মানুষ

মহাকাশ কিংবা মহাসাগরের চিহ্নগুলো নয়।