by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
চারিদিকে সহকর্মীদের হৃৎপিণ্ডের সাময়িক অকৃতকার্যতার প্রাদুর্ভাব দেখিয়া টোনা অকস্মাৎ স্বাস্থ্য-সচেতন হইয়া সান্ধ্য কালীন ভ্রমণ শুরু করিল। দিন কয়েকের মধ্যে যথারীতি আরও কয়েকজন বয়স্য হন্ঠন সহযোগী জুটিয়া গেল। ইহার ফাঁকে জনৈক পদচারী জানাইলেন, ‘ভাই টোনা আপনি তো নতুন আসিতেছেন। ওই যে দেখুন একজন সুশ্রী ভদ্রমহিলা হাঁটিয়া যাইতেছেন ; তিনি প্রত্যহ হাঁটিতে আসেন এবং খুব দ্রুতগতির সহিত হাঁটেন । আজ অবধি তিনি এক সন্ধ্যাও অনুপস্থিত হন নাই।’
ঘটনার ওইখানেই সমাপ্তি।
দিন দুয়েক পরের এক সন্ধ্যায়, কি মনে করিয়া টুনিও টোনার সহিত হাঁটিতে বাহির হইল। হা কপাল ! ওই মুহূর্তেই সেই সুশ্রী ভদ্রমহিলা সম্মুখ দিয়া হাঁটিয়া যাইতেছিলেন ! টোনা সরল মনে টুনিকে স্বাস্থ্য পরিচর্যায় উৎসাহিত করিবার নিমিত্তে কহিল, ‘ওই ভদ্রমহিলাকে দেখিতেছ ; উনি প্রত্যহ হাঁটিতে বাহির হন। আজ অবধি কেহ তাহাকে অনুপস্থিত হইতে দেখেন নাই!’
টুনি বাড়ি ফিরিয়া টোনাকে কহিল ‘ পুরুষ মাত্রই পুরুষ। তুমি এতো উৎসাহে প্রত্যহ সন্ধ্যায় কেন হাঁটিতে যাও তাহা আমার কাছে এখন জলের মতো পরিষ্কার। হাঁটিতে যাওয়া তোমার বাহানা মাত্র ; আসলে তুমি যাইতেছ সুন্দরী রমণী দর্শনে। আজ হইতে তোমার সান্ধ্য ভ্রমণ বন্ধ! যাইতে হইলে প্রত্যুষে বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের সহিত হাঁটিতে যাইবে!’
অতঃপর বিরসবদন টোনা গত কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া অতি প্রত্যূষে উঠিয়া প্রাতঃভ্রমণে বাহির হইতেছে!
পাদটীকা: জগতে অনেককিছুই ঘটিবে, সকল কিছু সরল বিশ্বাসে সহধর্মীনির কাছে প্রকাশ করিয়াছেন কি মরিয়াছেন। পুরুষদিগকে স্ত্রীলোকের নিকট আজন্ম অবিশ্বাসী ও অকৃতজ্ঞের কলঙ্ক-টীকা লইয়া বাঁচিয়া থাকিতে হয় ! ইহাই রীতি !
প্রকাশকালঃ ফেব্রুয়ারি,২০১৭
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
গতকল্য ১৯শে জানুয়ারি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ টোনা টুনির ষোড়শ বিবাহবার্ষিকী ছিল। যথারীতি সারাদিনের কর্মস্থলের চাপে পিষ্ট হইয়া টোনার গৃহে প্রবেশ। ম্লান সম্ভাষণে সন্ধ্যার শুরু। যেহেতু, অধুনা শহর ঢাকায় আনন্দ বিনোদন উদযাপনের দুইটি মাত্র পথ খোলা রহিয়াছে। হয়, নিজ গৃহে আরো কিছু ঘনিষ্ঠজনকে ডাকিয়া ঘৃত তৈল মিশ্রিত খাদ্য দ্বারা আপ্যায়ন। অথবা আশেপাশের কোন খাদ্য সরবরাহকারী দোকানে যাইয়া গুচ্ছের অর্থ খরচ করিয়া ভক্ষণ।
গত রজনীতে টোনা টুনির বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে জনৈক শুভাকাঙ্ক্ষী করুণাবশতঃ নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। দুই ছোট টুনটুনিকে লইয়া টোনা ও টুনি রেস্তোরাঁয় আপ্যায়িত হইতে গিয়াছিল।
কথা তাহা নহে ! প্রায় দেড়যুগের কাছাকাছি টোনা টুনির বিবাহিত জীবনে বহু ঘাতপ্রতিঘাত ও ভালোবাসার অন্তঃসলিল ধারা একইসঙ্গে বহিয়া চলিয়াছে।
বিবাহের প্রাক্বালে টোনা, টুনিকে সান্ত্বনা দিয়াছিল । যেহেতু, বিশেষ সামাজিক দিবসগুলোতে কোথা হইতে যেন টোনার কপালে রাজ্যের ঝামেলা ও জঞ্জাল আসিয়া জোটে। সেইহেতু , বিশেষ দিবসের যথাযথ প্রাপ্য, টোনা টুনিকে অন্য কোন সাধারণ দিনে উদযাপনে ক্ষতিপূরণ করিয়া দিবার প্রতিশ্রুতবদ্ধ ছিল। অদ্যাবধি, টোনা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিবার আপ্রাণ চেষ্টা করিয়া আসিতেছে। টুনিও গত্যন্তর না দেখিয়া ইহা মানিয়া লইয়াছে!
সেই শুভাকাঙ্ক্ষীর শুভকামনা জানাইবার সময়, টোনা লম্বা শ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ আমাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ এই দীর্ঘ ১৬ বছর যেমন তেমন করিয়া হইলেও সংসার তো করিতেছি!’
টুনি তদপেক্ষা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ বরং আমাকেই বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ। টোনার মতো বেহিসাবি, ছন্নছাড়া, নির্বোধের সঙ্গে অদ্যাবধি ঘরসংসার করিয়া চলিতেছি বলিয়া !’
জ্যেষ্ঠা টুনটুনি মৃদু হাসিয়া মধ্যবর্তিনী হইয়া কহিল, ‘ কাহাকেও পুরস্কৃত করিবার প্রয়োজন দেখিতেছি না ! প্রতিটি দম্পতির বিবাহবার্ষিকীতেই এবম্বিধ বাক্যাবলী হইয়া থাকে !’
মনে বুঝিলাম, আমাদের সেইদিনের ছোট্ট টুনটুনি বড়ো হইয়া গিয়াছে। নহিলে , জগতের এই স্বাভাবিক সত্য সে এতো সহজে কী করিয়া বুঝিয়া ফেলিল !
প্রকাশকালঃ ২০শে জানুয়ারি,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
আমার ১৩ বছরের বড় টুনটুনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে , সে বিয়ে করবে না! ক্লাস এইট অবধি পড়তে পড়তে, সে কীভাবে যেন টের পেয়ে গেছে—বিয়ে মানেই সামান্য কিছু সুবিধার বিনিময়ে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করা !
এদিকে এদের একমাত্র খালার বিয়ে হয়েছে বছর দেড়েক আগে। বিয়ে উপলক্ষে শাড়ি-চুড়ি-গহনা-ফটো-শুট দেখে ছোটটি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব সে ও বিয়ে করবে। মেয়েরা বিয়ে করলে সেটার যে অনেক প্রাপ্তি সেটা ৮ বছরের টুনটুনি বুঝে ফেলেছে।
ইটের খাঁচায় বড় হওয়া নাগরিক শিশু বলে, সুইমিং পুলের প্রতি ছোটটির উৎসাহ অসীম। যে কোন ভ্রমণে হোটেল বুকিং দেওয়ার আগে আমাকে খেয়াল রাখতে হয় সেখানে যেন অতি অবশ্যই সুইমিং পুল থাকে। দুপুরে হোক বা রাতে হোক, প্রতিদিন প্রতিবার পুলে নেমে সে অন্তত ৩/৪ ঘণ্টার আগে ক্ষান্তি দেয় না!
এইবারের সপ্তাহ খানেকের থাইল্যান্ড ভ্রমণে সুইমিং পুল প্রীতির সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে, ডলফিন প্রীতি। সাফারি পার্কে, ডলফিনদের দারুণ একটা শো ছিল। আমরা বড়রাই মুগ্ধ হয়ে চিন্তা করছিলাম , কীভাবে এদের ট্রেনিং দিয়েছে এঁরা ! সবকিছু দেখে মনে হয়েছে এদের বুদ্ধিমত্তা তো মানুষের প্রায় কাছাকাছি !
যাই হোক , দেশে ফেরার আগে ছোট টুনটুনি খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে তার পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। এবং এখানে যে কোন তর্কবিতর্ক চলবে না, সেটা আমরা জানি।যতো তাড়াতাড়ি হোক, সে একটা সুইমিং পুল ও কিছু ডলফিন কিনবে! বিয়েটা এখন আর তার প্রায়োরিটি না !
by Jahid | Nov 28, 2020 | ছিন্নপত্র, সাম্প্রতিক
যাহা অবশিষ্ট ছিল ও যাহার আশংকা করিতেছিলাম তাহাই হইয়াছে ; কনিষ্ঠা টুনটুনি বিদ্যালয়ে তাহার সহপাঠিনীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা করিয়াছে। শ্রেণি শিক্ষিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবার জন্য টুনির ডাক পড়িয়াছে।
দুরালাপে কথা কহিবার সময় টুনি কনিষ্ঠা টুনটুনির বিদ্যালয়ে যাইবার প্রাক্বালে যথারীতি আমার চতুর্বিংশ পুরুষ তুলিয়া অশ্রাব্য গালি বর্ষণ করিতেছিল ! সেই প্রাচীনতম পদ্ধতিতে আমার সমগ্র গোষ্ঠিকুণ্ডলী ধৌত করিতেছিল, আমাদের বংশ খারাপ, সকলেই গোঁয়ারের মতো চলে ; ভদ্রবংশের কেহ হইলে এরূপ আচরণ কখনই করিত না , ইত্যাদি ইত্যাদি।
কনিষ্ঠার কাছ হইতে তাৎক্ষণিক যাহা উদ্ধৃত ও শ্রুত হইয়াছে ; তাহা হইতেছে এই বিশৃঙ্খলার দায়িত্ব অপরপক্ষের! কারণ অপরপক্ষই প্রাথমিকভাবে শুরু করিয়াছিল , কনিষ্ঠা শুধু তাল মিলাইয়া তাহাকে গুটি কয়েক প্রহার করিয়াছে।
আমার সমগ্র বিদ্যালয় জীবনে বোধকরি সপ্তম শ্রেণীতে পড়িবার সময়, অপাঠ্য পুস্তক( সেবা প্রকাশনী, হুমায়ূন আহমেদ ইত্যাদি) লুকাইয়া পড়িতে গিয়া শ্রেণীকক্ষে কয়েক সতীর্থ সমেত বমাল ধরা পড়িয়াছিলাম। প্রধান শিক্ষকের নিকট হইতে গৃহে লালবর্ণ পত্র গিয়াছিল। উহাই প্রথম ও উহাই শেষ।
কোন বিদ্যালয়ে , কোন শ্রেণীতে পড়িতাম , কাহাদের সহিত খেলিতাম, দলাদলি করিতাম, কাহাকে প্রহার করিতাম, প্রহৃত হইতাম; আমাদের জনক-জননী কদাপি তাহার খোঁজ রাখিতেন। জনক প্রায়শ: ভুলিয়া যাইতেন আমি বিদ্যালয়ে নাকি মহাবিদ্যালয়ে ; বিজ্ঞান না কলাবিভাগে অধ্যয়ন করিতেছি। একবারই তিনি আমার অধ্যয়ন লইয়া মাথা ঘামাইয়াছিলেন, অন্যের সু অথবা কুপরামর্শে আমাকে অর্থনীতি বিভাগ হইতে মূলোৎপাটন করিয়া বস্ত্র প্রকৌশলীতে ভর্তি হইতে বাধ্য করিয়াছিলেন। উহাই প্রথম উহাই শেষ।
স্বল্পসংখ্যক সন্তানাদি লইয়া হইয়াছে আমাদের সমস্যা, কী করিলে কী হইবে তাহা ভাবিতে ভাবিতে অভিভাবক-অভিভাবিকাদের রাত্রির সুখনিদ্রার তিরোধান ঘটিতেছে !
by Jahid | Nov 27, 2020 | ছিন্নপত্র
প্রত্যহ সন্ধ্যায় কেন শহর ঢাকায় এতো দুর্বিষহ যানজট হইতেছে, আর কেনই বা আমি টোনার গৃহে প্রত্যাবর্তনে রাত্রি হইয়া যাইতেছে তাহা বোধগম্য নহে !
ইদানীং রাত্রির আহারের পরে কিঞ্চিৎ কাল বোকা-বাক্সের দিকে চাহিতে না চাহিতেই চক্ষু মুদিয়া আসে।
কয়েক দিবস পূর্বে, শ্রান্ত হইয়া গৃহদ্বারে করাঘাত করিতেই টুনি অগ্নিমূর্তি হইয়া কহিল, আজও যদি জ্যেষ্ঠা টুনটুনিকে উহার বিদ্যালয়ের পাঠ না দেখাইয়া আকস্মিক নিদ্রা যাও ; তাহা হইলে তোমার একদিন কি আমার একদিন! আহার সারিয়া টুনটুনির কাছে বসিয়া আবিষ্কার করিলাম, সে সবকিছুই অল্পবিস্তর পড়িয়াছে গভীরতায় যাইতে পারিতেছে না। উহাকে চুম্বক, চৌম্বকীয় শক্তি ও পৃথিবীর উত্তর দক্ষিণ মেরু বুঝাইতে বুঝাইতে আমি ক্রমশ: সম্মুখ-পানে ঢুলিতে লাগিলাম। আধো জাগরণে স্বপ্ন দেখিতে লাগিলাম–আমার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করিয়াছি , দেহ ক্ষীণকায় হইয়াছে। অধিক গতিতে হাঁটিতে হাঁটিতে বিমানের মতো আমি শূন্যে ভাসিয়া উড়িতে পারিতেছি। কিছুক্ষণ উড়িয়া আবার পদব্রজে চলিতেছি আবার উড়িতেছি! দূরত্ব অতিক্রম করা আমার কাছে সহজসাধ্য।
আহা ! মনে অসীম শান্তি বিরাজ করিতে লাগিল। ভাবিলাম , এক্ষণে মিরপুর হইতে উত্তরার কর্মস্থলে যাইবার জন্য আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়া থাকিতে হইবে না। টুনটুনিকে বাসায় আসিয়া শিক্ষাদান করিতে পারিব, টুনির অশ্রাব্য তিরস্কার শুনিতে হইবে না !
কিন্তু মুহূর্ত-মধ্যে জ্যেষ্ঠা টুনটুনির ধাক্কায় নিদ্রা টুটিয়া স্বপ্নভঙ্গ হইল ! সে স্মিতহাস্যে কহিল, নিজের শয্যায় গিয়া নিদ্রা যাও পিতা। তোমার এমত সঙ্গিন অবস্থা মাতা টুনির চোখে পড়িলে অনর্থক লঙ্কাকাণ্ড হইবে !
পুনরায় নিদ্রা যাইতে যাইতে পার্শ্ববর্তী টুনিকে বলিতে শুনিলাম , অধুনা ‘মুখ-পুস্তিকায়’ এতো পুনঃপ্রচার করিতেছ কেন ? আরো গভীর নিদ্রায় তলাইয়া যাইতে যাইতে কহিলাম, শহর ঢাকার এমত অবস্থার আশু পরিবর্তন না হইলে নতুন কিছু লিখিবার অবকাশ কোথায় ? যানজটও শেষ হইবে না ; আমারও ডানা গজাইবে না ; অবসন্ন দেহ ও মন লইয়া নতুন কিছু লেখালেখির অবসরও বোধ করি পাইব না !
সে কি বুঝিল কে জানে !
প্রকাশকালঃ ৩০শে মার্চ,২০১৭
সাম্প্রতিক মন্তব্য