কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( শিল্পীজীবন )

অনেকদিন আগে ট্রেডের এক বড়ভাই কথাচ্ছলে আমাদের কর্পোরেট জীবন নিয়ে বলেছিলেন–‘ আমাদের জীবন অনেকটা সঙ্গীতশিল্পীদের মতো।

যতক্ষণ কণ্ঠে গান আছে,ধবধবে চাঁদোয়া, পরিষ্কার স্টেজ, যন্ত্রের টুং টাং , গুণমুগ্ধ শ্রোতা, হাততালি, কতকিছু! ‘কণ্ঠে গান নাই, কে শুনবে ওই মাধুর্যহীন, বেসুরো , রিক্ত শূন্য ঘর্ঘরে গলার আওয়াজ! যতক্ষণ কোম্পানির জন্য কাজ করতে পারছেন; সবই আছে !বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাজ বা যোগ্যতার কমতি হলে আপনার অবস্থা সেই রিক্ত কণ্ঠের সঙ্গীত শিল্পীর মতোই । সেইসব রাজসিক মুহূর্তগুলো তখন শুধুই স্মৃতি !

প্রকাশকালঃ ৪ঠা এপ্রিল,২০১৭

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ও বাঙালি চরিত্র

আমার বর্তমান কর্মস্থলের মালিক-পক্ষ ও প্রধান কার্যালয় সিংগাপুরে ।
বাংলাদেশীদের চরিত্রের একটা ব্যাপার নিয়ে প্রায়শ: আমার সাথে তাঁদের কথা হয়।

আমাদের সামাজিকতায় অধীনস্থ কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা সরাসরি ঊর্ধ্বতনকে কোন কথা বলতে পারে না। রুমে ঢুকে নানা রকম খাজুরালাপ করেন ; ত্যানা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে শেষে এসে আসল কথা বলেন।

আমাকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের সমস্যাটা কি, সরাসরি কেন আসল কথা বলতে পার না ? কেন অযথা সময় নষ্ট কর?’

আমি তাঁদেরকে বললাম, কেন –এটা আমিও বুঝি না। তবে এই অভ্যাস আমাদের মজ্জাগত। খাজুর করা ও ত্যানা প্যাঁচানো আমাদের জাতিগত বদভ্যাস !

প্রাসঙ্গিক ,অনেক আগে শোনা আমাদের পূর্ববঙ্গের একটা গ্রাম্য কাহিনী মনে পড়ে গেল।
চৈত্রের কাঠফাটা রোদে উঠানের দাওয়ায় বসে একলোক তামাক খাচ্ছে আর দা দিয়ে চেঁছে চেঁছে বেড়া তৈরির কাজ করছে।
ওই সময় এক পথচারী এসে পাশে বসলেন।
লোকটার পাশের ছেলেটা বলল , ‘আব্বা তুমার জন্যি আবার তামাক সাজা নিয়ে আসি।’
লোকটা বলল ‘যা সাজায়ে নিয়ে আয়।’
তো পথচারী ও ঘর্মাক্ত লোকের কথোপকথন অনেকটা এই রকম ছিল। স্মৃতি থেকে লিখছি।
পথচারী, ‘ভাই কি করতেছেন?;
তিরিক্ষি মেজাজে লোকটা খেঁকে উঠলেন, ‘দেখতেইতো পারতেছেন কি করতিছি।’
‘ভাই ওই যে ছাওয়ালটা তামাক সাজাতি গেল, সিডা কি আপনার ছাওয়াল ?’
‘আরে মরণ ! আমাক বাপ ডাইকলো কেবল, ওই ছাওয়াল আমার না তো কি আপনার?’
‘ভাই, এই বাড়ীডাও কি আপনের ?’
‘না , এই বাড়ী আমার না আপনার ! কি কতি চাচ্ছেন সুজা করে কনতো।’
‘না, মানে হাঁইটে যাচ্ছিলাম তো, ভাবলাম আপনার কাছ থেকে দুইটান তামাক খায়া যাই, একটু খাজুর করতিছিলাম আর কি।’
‘তামাক খাবেন সিডা সরাসরি কলিই তো হয়।’

তো আমাদের সিংহভাগ জনতাই ওই পথচারীর মতো। তামাক খাওয়ার কথা সরাসরি না বলে খাজুর করি, ত্যানা প্যাঁচাই।
এর মধ্যে স্বাভাবিক সৌজন্যের বিষয় আছে নিশ্চয়ই । কিন্তু এই গ্রাম্য-কাহিনী দিয়ে আমাদের বাঙালী চরিত্র যতো সহজে আপনারা বুঝবেন, আমার বিদেশী সহকর্মীদের সেটা বোঝানো সম্ভব না !

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( মালিক-কর্মকর্তাদের উটপাখির আচরণ )

‘আমি কিছুতেই বুঝব না’- এইরকম প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কাউকে কিছু বোঝানো অসম্ভব। প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাধররা নিজের বোঝার বাইরে কিছু বুঝতে চান না- সে যেভাবেই তাঁদেরকে বোঝানো হোক না কেন।
বঙ্কিমের ‘ কমলাকান্তের দপ্তর’-এর কমলাকান্ত চারপাশে অজস্র।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-কে অনুল্লেখ্য রেখে বরং বছর তিরিশেক আগে আমার এক মামার কাছে শোনা পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক একটা উদাহরণ দিচ্ছি।

তো , হয়েছে কি গ্রামে এক শহরের শিক্ষিত লোক বেড়াতে গেছেন। মাঠে গিয়ে দেখেন এক চাষি হাল চাষ করছে, লাঙল- জোয়ালে দুইটা বলদ বাঁধা। চাষির সঙ্গে তার বছর আটেকের ছেলে।
কিছুক্ষণ হাল চষা দেখে শহুরে ভদ্রলোক বললেন, তোমার ডানপাশের বলদটি বেশি পরিশ্রম হচ্ছে বাঁ পাশেরটির তুলনায়। কমসময়ে ভাল ফল পেতে হলে , দক্ষতা বাড়াতে হলে, নির্দিষ্ট সময় পরপর বলদগুলোকে ডানে-বামে অদলবদল করে ফেল।

চাষি তর্ক শুরু করল। কারণ সে পুরুষানুক্রমে বহুবছর ধরে সে এই কাজই করে আসছে। এই ধরনের আজগুবি কথা আগে কেউ তাকে বলে নি।

ভদ্রলোক এক পর্যায়ে বললেন, আমি তোমাকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারি, কি করে ডানের বলদটি বেশি পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।

চাষিও তেরিয়া গলায় বলল, ঠিক আছে! আপনি যদি আমাক বুঝোতে পারেন, তাহলে ডানের বলদটা আপনাক্ আমি দিয়ে দেব।

চাষির ছোট্ট ছেলেটি পুরো ব্যাপারটা ভয়ার্ত চোখে দেখছিল।
ভদ্রলোক কেন্দ্রাতিগ বল বোঝালেন, কেন্দ্রাভিমুখী বল বোঝালেন। ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরছে বলে ডানের বলদের উপরে চাপ বেশি পড়ছে তাই পরিশ্রম বেশি হচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি নানাভাবে বোঝালেন। চাষি কিছুতেই বোঝে না।

ঘণ্টাখানেক বুঝিয়ে ক্লান্ত , ব্যর্থমনোরথ হয়ে অবশেষে হাঁটা দিলেন নিজের পথে।

লোকটি চলে যাওয়ার পরে ছোট ছেলেটি বলল, বাজান উনি যদি সত্যি তুমাক বুঝো ফেলত, তুমি কি ডানের বলদটা তাক দিয়ে দিতা ?
চাষি হেসে বলল, আরে ব্যাটা – আমি যদি না বুঝি , আমাক্‌ বুঝায় কোন্ শালা !

কর্পোরেট অবজার্ভেশন (বাংলাদেশের নবীন উদ্যোক্তাদের বর্তমান অবস্থা )

আমাদের কিংবদন্তী অর্থনীতিবিদদের কাছে ‘চাকরি নয়, উদ্যোক্তা হও!’ ‘ সামাজিক ব্যবসা’ ইত্যাদি শুনে শুনে আমার মতো কুলি মজুরদেরও মাঝে সাঁঝে জানতে ইচ্ছে করে, এতো বড় একটা প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম উদ্যোক্তা হওয়ার পথে কি করছে ! তাঁদের মৌলিক বাধা কি কি ; নবীন উদ্যোক্তাদের কি অবস্থা ? আমাদের নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা কি ?

সম্ভবত: ২০০৭/৮ এর পর থেকে শিল্প উদ্যোক্তাদের গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। অধুনা কয়েকবছর যাবত তা দেওয়া হচ্ছে, এবং সেই গ্যাসের লাইন নেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের কি পরিমাণ ‘ স্পিড মানি’ খরচ হচ্ছে ; সেটা শুনলে অনেকের চোখ কপালে উঠবে ! বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, আমাদের জ্বালানী সংকট, রানা প্লাজা, তাজরীন ফ্যাশন ট্র্যাজেডি আমাদের বস্ত্রশিল্পকে খোলনলচে বদলে দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে অন্যতম রপ্তানীমুখি শিল্পে নতুন উদ্যোক্তা আসার পরিমাণ গেছে কমে । নতুন টেক্সটাইলে নতুন উদ্যোক্তাদের পদচারণ নেই বললেই চলে । যা হচ্ছে, বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ ! কারো ৬ লাখ গজ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল, সে এক ধাক্কায় ১২ লাখ গজ করে ফেলছে। কারো ৩০ লাইনের কারখানা ছিল, সে কয়েকবছরে ৬০ লাইন করে ফেলছে। অসম মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অসংখ্য ছোট মাপের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝারি মাপের গার্মেন্টসগুলোর মালিকানা বড় গ্রুপগুলোর কাছে চলে গেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর আরও বৃহদায়তন হচ্ছে।

দেড় যুগ আগে আমার কর্মজীবনের শুরুতে দেখেছি , গার্মেন্টস-এর মালিকদের প্রধান উৎপাদন নির্ভরতা ছিল , কাপড় উৎপাদন করা ও সেলাই করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ব্যাক-ওয়ার্ড লিংকেজ বা অন্যান্য খুচরা পণ্যের সরবরাহ ছিল পুরোটাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছে। বোতাম, টুইল টেপ, লেবেল, সুতা, কার্টন, পলি ব্যাগ, স্ক্রিন প্রিন্ট , এমব্রয়ডারি যাবতীয় সরবরাহ ছিল ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের কাছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অনেক লোকের কর্মসংস্থান হত।এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কারখানায় সব ধরণের সার্ভিস ও ব্যাক-ওয়ার্ড লিংকেজ ইউনিট খুলে বসে আছেন।
তাহলে ঐ ক্ষুদ্র- মাঝারি উদ্যোক্তাদের কি অবস্থা ? প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে, পুরনোরা ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন । এবং ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আবহাওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা নিজেদের নৌকার পাল না তুলে ‘ আরামদায়ক’ চাকরির বলয়ে ঘুরপাক খাচ্ছেন।

টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস সেক্টর ছেড়ে অন্যদিকে আসি। স্কয়ার বা প্রাণ-আরএফএল এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানকে উদাহরণের স্বার্থে উদাহরণ হিসাবে ধরছি। স্কয়ার-এর ফার্মাসিউটিক্যালস দিয়ে ব্যবসা শুরু। পরে টেক্সটাইল, তারপরে ফুড ও বেভারেজ, কসমেটিক্স, টয়লেট্রিজ, হাসপাতাল সব। দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠতায় তাঁদের সকল পণ্য একটা ব্র্যান্ড লেবেল পেয়ে গেছে। বিশ্বাসযোগ্যতা এমন পর্যায়ে গেছে, তাঁদের পণ্য চোখ বুজে ভোক্তারা কিনে থাকে। কিন্তু এমন অনেক পণ্য ছিল, যেগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা করে বেঁচে থাকত। সেগুলোও ধীরে ধীরে স্কয়ার দখল করে নিয়েছে। সামান্য ঝাল মুড়ি বা চীনাবাদামও যদি স্কয়ারের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করে, তাহলে সাধারণ ভোক্তাদের কেউ কি আর চলতি ঝাল মুড়িওয়ালার কাছ থেকে কিনবে ?

ঐদিকে প্রাণ-আরএফএল এর মূল পণ্য সম্ভবত: ছিল, একদিকে তরল পানীয় অন্যদিকে হেভি-লাইট মেশিনারিজ, নলকূপ ইত্যাদি। এখন তাঁরা সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ার থেকে শুরু করে সামান্য বালতি,বদনা পর্যন্ত উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। হাস্যকর হলেও সত্য, প্লাস্টিকের বদনা খুবই ছোট মাপের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা করে থাকতেন। যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্লাস্টিকের বদনা, বালতি তৈরি করত তাঁর ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া এখন গত্যন্তর নেই । ব্র্যান্ড ইমেজে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অনেক পিছিয়ে আছে। পেপার ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার রমরমা বিজ্ঞাপনে সবকিছুই ব্র্যান্ডিং ও বিক্রি করা সম্ভব।

বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রচলিত পণ্য ছাড়াও ছোটখাটো সবরকম পণ্যের বাজার যেভাবে দখল করা শুরু করেছে; দেখে শুনে মনে হচ্ছে , সেই দিন আর বেশি দুরে নেই, কয়েকটি বড় কর্পোরেশন বাংলাদেশের তাবৎ পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকবেন। পুঁজি বাজার ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিজ্ঞাপনে নৈতিকতা পকেটে পুরে ফেলেছেন আমাদের বড় উদ্যোক্তারা।

আবার ফিরে আসি আমাদের টেক্সটাইল ও বস্ত্র খাতে। কেন নতুন উদ্যোক্তাদের দেখা নেই ?কেন এঁরা নতুন শিল্প স্থাপনে উৎসাহী হচ্ছেন না ?

প্রথমত: বড় উদ্যোক্তারা ছোটদের ডি-মার্কেটিং করছেন। বড় মাছ, পুকুরের সব ছোটমাছকে খেয়ে ফেলছে।

দ্বিতীয়ত: ব্যাংক নতুন উদ্যোক্তাদের আগের মতো সহায়তা করছে না। ব্যাংক নিরাপদ বিনিয়োগে বড় ঋণ-খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে আবার নতুন করে ঋণ দিচ্ছে। আর আমাদের অসংখ্য মেধাবী বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকেরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না , তাঁদের চাকরি বাজার ও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন আদৌ সম্ভব কীনা, হলেও সেটা কীভাবে ! তৃতীয়ত: (এটি আমার ব্যক্তিগত মতও বটে)—ব্রিটিশ কেরানি-নির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা আমাদের অগুনতি কেরানী তৈরি করছে। শত শত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে আমাদের বেশি দরকার – হাজার হাজার কারিগরি শিক্ষা নির্ভর শিক্ষালয়। যেখানে, একজন তরুণকে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী ,আমাদেরকে মানসিক প্রতিবন্ধী করে ফেলছে। একটা চেয়ার ও টেবিলের বসার সুযোগের জন্য আমাদের সকল সম্ভাবনা জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত ।

বাংলাদেশ সরকারের ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু মাস্টার প্ল্যান হয়তো আছে। আমি জানি না । নানা ধরনের ফান্ড থাকে , এসএমই ( Small Medium Entrepreneur) ঋণ থাকে। সেটা কতখানি সঠিক জায়গায় পৌঁছায় , সে ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ অমূলক নয়। এবং প্রতিবছরে ওই ফান্ডের যথোপযুক্ত ব্যবহার হয় কিনা , সেটার কোন তথ্য কারো জানা নেই।

কিছুদিন আগে , বিশাল শিল্পকারখানার মালিক এক বড়ভাইয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি নিজেও চাইতেন, ছোট ছোট স্ক্রিন প্রিন্টিং কারখানা , লেবেল, পলি , টুইল টেপ, বাটন , কার্টন ফ্যাক্টরি ফ্যাক্টরি চালু থাক। কিছু লোকজন উদ্যোক্তা হোক। মুশকিল হচ্ছে, তাঁর অভিজ্ঞতা এই ব্যাপারে খুবই তিক্ত ! তিনি হয়তো ভালো মানের সুতা দিয়েছেন তাঁর টুইল টেপ করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু , ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অতি লোভে , মাঝপথেই গাড়ীসহ সেই ভালো মানের সুতা বিক্রি করে দিয়েছেন। পরে, দুনিয়ার উচ্ছিষ্ট খোলা বাজারের সুতা কিনে তাঁর টুইল টেপ বানিয়ে দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় গুণগত মানে তাঁর গার্মেন্টস ফেল করেছে।

একই কথা অন্যসব বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য, এঁরা যে দামে কাজ ছোটদেরকে দেয়। তাঁরা যদি সঠিক উপাদান ব্যবহার করত তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা না। কিন্তু, কিছু অতিলোভী দ্রুত মুনাফা কামী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কৃতকর্মের দায় নিতে হচ্ছে অন্য সবাইকে। প্রায়শই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ভেজাল ও নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করে বড় প্রতিষ্ঠানকে বিপদে ফেলে দেয়। অনেকবার দেখেছি, সামান্য সুতা, বোতাম, কার্টন, টুইল টেপ, স্ক্রিন প্রিন্ট ফ্যাক্টরির গুণগত মানের সমস্যা অথবা সরবরাহে দেরী হওয়ার গার্মেন্টস মালিককে ডিসকাউন্ট ও এয়ার শিপমেন্টের জরিমানা গুনতে হয়েছে।

দ্রুত বড়লোক হওয়ার ও অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পড়ে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় প্রতিষ্ঠানের ভরসা হারিয়েছেন। এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কারখানার অভ্যন্তরেই সব ছোট ব্যাক ওয়ার্ড লিংকেজ করে ফেলেছেন। কেননা, তাঁরা তাঁদের মিলিয়ন ডলারের শিপমেন্ট সামান্য কয়েক পয়সার অ্যাকসেসরিজের জন্য হুমকির মুখে ফেলতে চান না।

এই দুষ্টচক্র থেকে কীভাবে বের হওয়া সম্ভব , সেটা নিয়ে কী ধরণের গবেষণা হওয়া উচিৎ সেটা জানার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে আলোচনা।

প্রকাশকালঃ ১০ই মার্চ, ২০১৭

কর্পোরেট অবজার্ভেশন ( অভিনয় দক্ষতা )

পরিশ্রম, কাজের দক্ষতা, নিষ্ঠা, দায়িত্বজ্ঞান, দূরদর্শিতা, নিয়মানুবর্তিতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি গুণাবলী কর্পোরেট ঊর্ধ্বতনদের প্রাথমিক যোগ্যতা। এই গুণাবলী না থাকলে একটা অবস্থানে কেউই পৌঁছুতে পারেন না ! এই আবশ্যকীয়র পাশাপাশি মানুষ হিসাবে একজন ঊর্ধ্বতন কিভাবে তাঁর পরিপার্শ্বে বিচরণ করেন ও তাঁর আচরণের স্বল্প দীর্ঘমেয়াদী ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া কীভাবে অধস্তনদের উপরে পড়ে সেটা আজকের আলোচ্য।

মানবিক আবেগ আর কর্পোরেট আবেগের সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। মানবিক আবেগ নিজের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে দেখানো যায়। কিন্তু প্রায়শ: একটা নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলে সেই আবেগগুলো কর্পোরেট হয়ে যায়। কর্পোরেট আবেগ ও তার প্রকাশভঙ্গী যতোটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিৎ ছিল , তা ততোখানি গুরুত্ব পায় নি । প্রতিষ্ঠানে ঊর্ধ্বতনদের তাঁদের অবস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবেগ ও তার প্রকাশভঙ্গীর ভারসাম্যের ব্যাপারটা শিখে নেওয়া উচিৎ । একই পরিস্থিতিতে একজন ঊর্ধ্বতন ও একজন মধ্যম সারির কর্মচারীর প্রকাশভঙ্গী আলাদা হওয়া উচিৎ। সেটা না হলে প্রতিষ্ঠানে বড় ধরণের সমস্যা তৈরি হয়। একজন দক্ষ ঊর্ধ্বতনের যদি তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর মতো সোজা বাংলায় ‘ ছোটলোক’- এর মতো আচরণ হয় তাহলে মুশকিল!

এই কর্পোরেট আবেগের বহিঃপ্রকাশকে অনেকেই অভিনয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। আমার নিজের কথা বলি। আমার কয়েকজন ঊর্ধ্বতন আমাকে সরাসরি পয়েন্ট-আউট করে বলেছেন, আমার কর্পোরেট অভিনয় দক্ষতা নাকি খুবই নিম্নশ্রেণীর। আমি কোন একটা ব্যাপারে অখুশি হলে, আমার চেহারায় মুহূর্তেই সেটা ফুটে ওঠে। আমার ঊর্ধ্বতনরা সহজেই আমাকে ‘পড়ে’ ফেলতে পারেন। They can easily read me ! অথচ আমার সতীর্থ অনেক কর্মকর্তাকে দক্ষ অভিনেতার মত দিনের পর দিন অভিনয় করে যেতে দেখেছি। সবচেয়ে ভণ্ড, দুশ্চরিত্র, অর্থ-লোলুপ, ক্ষমতা-লোভী, স্বার্থপর , হীন বসের সামনেও তাঁদেরকে দিনের পর দিন হাত কচলে নতজানু হতে দেখেছি। ঊর্ধ্বতনের খুব নিম্নশ্রেণীর রসিকতায় উচ্চকিত হাসিতে ফেটে পড়তে দেখেছি। বিনিময়ে আমার সতীর্থদের পদন্নোতি ও নগদ নারায়ণ সবই মিলেছে। আমি থেকে গেছি ওই সৌভাগ্য থেকে যোজন যোজন দূরত্বে ! ওই কর্পোরেট অভিনয় আমাকে দিয়ে কখনো হয়নি; এখন এই শেষ বয়েসে এসে নতুন করে অভিনয় দক্ষতা বাড়ানোয় সচেষ্ট হতে ইচ্ছেও করে না আর !

কর্পোরেট অভিনয় বলি বা আবেগের প্রকাশ বলি ; সেটা কিন্তু নানা শ্রেণীর হয়। আমি- আপনি সারাক্ষণ অভিনয় করে চলেছি, পাশের মানুষের সঙ্গে, বসের সঙ্গে, চাকরি-প্রার্থীর সঙ্গে, এমনকি স্ত্রীর সঙ্গে, ভাইবোন বা বাবা-মার সঙ্গেও। কিন্তু মনে রাখতে হবে , দর্শক বুঝে আপনাকে অভিনয় ডেলিভারি করতে হবে ! তৃতীয় শ্রেণীর দর্শকের জন্য যেমন প্রথম শ্রেণীর অভিনেতা ও অভিনয় দক্ষতার প্রয়োজন নেই। এর বিপরীতে প্রথমশ্রেণীর দর্শকের সামনে তৃতীয় শ্রেণীর অভিনয় একেবারে অশ্লীল ও কদর্য হয়ে ওঠে !

আবেগ প্রকাশের যেহেতু কোন বাঁধাধরা নিয়ম বা ম্যানুয়াল নেই ; তাই আমরা ধরে নিই সেটা ব্যক্তি তাঁর পরিবার,পরিবেশ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্জন করে আসবে। কেউ কেউ শিখে আসেন , অনেকে শেখেন না এবং শিখতেও চান না ; হয়তো তাঁদের শেখার দরকারও নাই ! সুযোগের সময়োচিত সদ্ব্যবহার করে অল্পসময়ে ক্ষমতার এমন একটা জায়গায় কেউ কেউ পৌঁছে গেছেন যে ; তাঁদের আচরণের ভুলত্রুটি নিয়ে কথা বলার অবকাশ কম। আবার এটাও ঠিক , আবেগ সেটা মানবিক হোক আর কর্পোরেট হোক –মানুষ যেখানে আছে, সেখানেই রাগ, ঘৃণা, বিদ্বেষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ,তাচ্ছিল্য, অবহেলা, উচ্চম্মন্যতা, হীনমন্যতা, ভয়, লোভ, দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা, অহংকার, আত্ম-প্রেম, ইত্যাদি থাকবেই। সেটা মাল্টিপারপাস কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে , পাইকার বাজার বা সেনাবাহিনী সবজায়গায় প্রায় একই রকমের ! আমার স্বল্পমেয়াদী জীবনে কেন জানি মনে হয়েছে , একজন মানুষ আসলে খুব কম সময়েই তাঁর মৌলিক অর্জিত চরিত্র থেকে বের হয়ে আসতে পারে। নানা চাপে তাপে তাঁর পারিবারিক অর্জিত চেহারা বের হয়ে আসে। সেটা প্রায়শ: মানবিক কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দৃষ্টিকটু-রকমের স্বার্থপরতায় আচ্ছন্ন।

আমি কয়েক রকম ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কাজ করেছি, এখনো করছি। তবে মোটা-দাগে যেটাকে আমরা বলি নিয়ন্ত্রিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ সেটা হাতে গোনা কয়েকজনের ছিল। অমায়িক, যুক্তিবাদী, পরিমিতি বোধসম্পন্ন , নিয়ন্ত্রিত আবেগী ছিলেন কয়েকজন। বদমেজাজি ছিলেন মাত্র একজন। তাঁর মধ্যে সেটারও পরিমিতিবোধ ছিল। ওই যে বললাম, এর মাঝখানে কয়েকজন ছিলেন, দুর্বোধ্য গিরগিটির মতো! ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানোর অলৌকিক গুণের শক্তিমত্তা ছিল এঁদের। কেউ কেউ ছিলেন জিঘাংসাপরায়ণ। কেউ কেউ ছিলেন গিরগিটি ও হিংস্রতার মিশেল।যতখানি বদমেজাজি হলে জিঘাংসাবৃত্তির সাময়িক প্রশমন ঘটতে পারত , তাঁরা সেই পরিমাণে মেজাজি ছিলেন না। মূলত: বদমেজাজি ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কাজ করার অসুবিধার পাশাপাশি প্রধান সুবিধা হচ্ছে, এঁদের তাৎক্ষণিক আবেগ প্রশমিত হলে ব্যাপারটা তাঁরা ভুলে যান। আপনি আবার নতুন করে সব কিছু শুরু করতে পারবেন এঁদের সঙ্গে। কিন্তু মাঝামাঝি মিশ্রিত বিরল গোত্রটি ভয়ঙ্কর ! যাঁদের ক্রোধ কুটিলতাকে অতিক্রম করতে পারে না। আপনার বিশেষ কোন কাজ, প্রকাশভঙ্গী না প্রতিক্রিয়ার উপর উনি কতোখানি ক্রুদ্ধ, উনি সেটা আপনাকে তাৎক্ষণিক-ভাবে টের পেতে দেবেন না। এঁরা এঁদের জিঘাংসা পুষে রাখেন মনের গহীন কালোগহ্বরে ! সরীসৃপের মতো বেড়ে ওঠা সেই জিঘাংসার ছোবল দুর্বল অসতর্ক মুহূর্তে ছোবল দিয়ে বসে নিরীহ অধস্তনদের। সেই বিষে আমি অনেক কর্পোরেট কর্মকর্তাকে মৃতপ্রায় হয়ে বেঁচে থাকতে দেখেছি।

ওই বিশেষ শ্রেণীর সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আপনাকে তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করে চলা শিখতে হবে। নয়তো তাঁদের বিজয়-রথের চাকায় আপনার ছোট-প্রাণ কখন পিষ্ট হয়ে যাবে আপনি টেরই পাবেন না !
আমার এক ঊর্ধ্বতন পেয়েছিলাম ক্যারিয়ারের শুরুতে। তাঁর অভিনয় দক্ষতা নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বলতাম , ভদ্রলোক কেন যে চলচ্চিত্রে গেলেন না ! শুধুমাত্র কর্পোরেট অভিনয়ের যদি কোন অস্কার পুরষ্কার থাকত ; আমি নিজে অস্কার নমিনেশনের জুরি বোর্ডকে রিকমেন্ড করতাম তাঁকে অন্তত: একটা লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার জন্য ! তিনি যেমন মুহূর্তেই কাউকে দেখে হেসে গলে পড়তে পারতেন ; পর মুহূর্তেই আরেকজনের ব্যাপারে তাঁর ভয়ঙ্কর বীভৎস চেহারা দেখা যেত। আবার কিছুক্ষণ পড়ে তিনি যখন তাঁর ঊর্ধ্বতনের সামনে যেতেন ; তাঁর বিনয়ী আচরণ ও অভিনয় দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতাম !

সকল সতীর্থ ,অনুজ কর্পোরেট কর্মকর্তাদের আরও অভিনয় দক্ষতা বাড়ুক। যারা দর্শক-শ্রেণীতে আছেন, তাঁরা মঞ্চের আলোয় এসে অভিনয় করার সুযোগ পান, এই শুভকামনা।