মেয়েদেরকে নিয়ে। সুবোধ সরকার।।

মেয়েদেরকে নিয়ে বাজারে বহুরকমের ঠাট্টা চালু আছে, তবে তার বেশিটাই নিষ্ঠুর
আমিও খান তিনেক জানি, যেমনঃ
যে মেয়ে সহজলভ্যা তাকে বলা হয় পাপোস
যে মেয়ের বুক নেই তাকে বলে ম্যানচেস্টার
যে মেয়েরা এক মাসের জন্য জীবনে আসে তাদের বলেঃ চায়ের খুরি
অর্থাৎ ইয়ুজ অ্যান্ড থ্রো।
যে মেয়ের বয়স হয়ে এল, যৌবন যাই যাই করছে, তাদের সম্পর্কে
এক অধ্যাপক বন্ধু বলেছিলঃব্যবহার করার আগে ঝাঁকিয়ে নেবেন।
এতো নিচু মাপের ভাষা শুনে আমার গা ঘিনঘিন করে
এ সবই ওই ব্রাহ্মণের প্রভাব, মনু নামে যিনি বিখ্যাত।
ছেলেদের সম্পর্কে ঠাট্টাগুলো তেমন জোরালো নয়
বড়জোর আমরা বলিঃ উওম্যানাইজর , অর্থাৎ আলুবাবু
মেয়েরাও ছেলেদের অনেক নাম দেয় যেমন, ঘুরঘুরে পোকা
হিন্দুস্তান পাকিস্তান
অর্থাৎ যার বাছবিচার নেই
এইসব ঠাট্টার ভেতর ছেলেদের প্রশ্রয় দেবার একটা প্রবণতা থাকে
সেই ঠাকুমার কথাঃ সোনার আংটি আবার ব্যাঁকা?
মেয়েদের নিয়ে বদরসিকতা আমার ভাল লাগে না।
আমি তিন দিদির সঙ্গে মানুষ হয়েছি, সুতরাং
মেয়ে বলতে আমি বুঝি নারী
তার ৩২-৩৬-৩২ আমার বিষয় নয়
সে হয়তো সুদূর কোন নৌকার ভেতর বসে অপেক্ষা করছে
সেই নৌকো কোথায় আমি জানি না
কিন্তু আমাকে সেখানে গিয়ে পৌঁছতেই হবে।
সূর্যাস্তের আগে আমি কি পারব তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে?

ভূমিকার বিরুদ্ধে ভূমিকা। সুবোধ সরকার।। কবিতাসমগ্র ১

আমি কোন থিয়োরির গেটকিপার নই। কোনও সৌন্দর্যের দারোয়ান নই। আমার কোন অ্যাটাচি কেস নেই যে তাঁর ভেতরে একটা পর্বতমালা নিয়ে আমি বিমানে উঠে পড়ব। আমি চেয়েছিলাম কবিতাই লিখতে, একটা লোক এসে বলল, আপনি যা লিখছেন, একে কবিতা বলে না, বলে অ্যান্টি-পোয়েট্রি। সেটাই বা কী বস্তু ? সেটা বুঝতেই জীবন চলে গেল।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি আমাকে উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে পারবেন?
তিনি বললেন , শিয়োর। মিস্টার রামোকৃষ্ণের গল্পটা ধরুন। ফাইভ ব্লাইন্ড মেন অ্যান্ড দ্য এলিফ্যান্ট। যিনি পা ধরে দেখলেন, তিনি হাতিকে ঠাউরেছিলেন একটি ল্যাম্পপোস্ট। যিনি পেট ধরে দেখলেন তিনি ভাবলেন হাতি একটা বালির বস্তা। যিনি কান ধরে দেখলেন, তিনি বললেন, হাতি আসলে একটা কুলো। ব্লা ব্লা ব্লা ।

ভদ্রলোক বিদেশে পড়ান , এক কলমেই বাঘে গোরুতে জল খাওয়ান, আমি তাঁকে বললাম, আমি হাতিকে কী বলে ঠাউরেছি, আপনার কী মনে হয় ? উনি বললেন, আপনি হাতিকে ভেবেছেন ঝাঁটা। অর্থাৎ আপনি হাতির পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন , লেজটাকে ধরেছিলেন।
আপনি কি বলতে চান আমি কবিতাকে ঝাঁটা হিসেবে ব্যবহার করি? ভদ্রলোক বললেন, সে তো কিছুটা সত্যি। আপনি কোথাও ধুলো দেখলেই ঝাঁটা বের করেন, আপনি ঘুষ দেখলেই ঝাঁটা বের করেন, গুজরাত দেখলেই ঝাঁটা বের করেন, বানতলা হলেই ঝাঁটা বের করেন, কামদুনি হলেই ঝাঁটা বের করেন। কোথাও কেওরামি দেখলেই , ধুলো জমলেই আপনি প্রতিবাদের ঝাঁটা নিয়ে নেমে পড়েন।
আমি বললাম, যা বাবা , আমি কোনওদিন গেটকিপার হতে চাইনি, দারোয়ান হতে চাইনি, কিন্তু হয়ে গেলাম ঝাড়ুদার।

আমার কবিতা হয়ে উঠল সহজ, আমি ছন্দে না লিখে গদ্যে লিখে যেতে লাগলাম। যে গদ্য কবিরা ফেলে দেন আমি সেই সেই গদ্য কুড়িয়ে নিলাম।যে গল্প বাদ দিয়ে কবিরা লেখেন, আমি সেই গল্প ফিরিয়ে আনলাম আমার কবিতায়। ফলে আমার কবিতা পরে কিছু লোকে বুঝতে পারল, কিছু কবি তাতে রেগে গেল। তাঁরা বললেন, কবিতা বোঝা গেলে সেটা আর কবিতা থাকে না। আমি মন খারাপ করে বসে থাকলাম। মন খারাপ করে কী করব? দশ বছর ধরে মন খারাপ করে বসে থাকা যায় না।আবার উঠে দাঁড়িয়ে লিখতে শুরু করলাম যে লেখা আজও লিখে চলেছি। সম্প্রতি চিন্ময় গুহ আনন্দবাজার-এ লিখেছেন যে ফরাসিতে প্রবাদ আছে, ‘ যা স্বচ্ছ নয়, তা ফরাসি নয়।‘ এতদিন বাদে সান্ত্বনা পেলাম, যাক আমি তাহলে গোপনে গোপনে ফরাসি। অথচ স্বচ্ছ লেখার অপরাধে আমি এতদিন গঞ্জনা সয়ে এলাম।

বুটজুতো। সুবোধ সরকার।।

এটাই রীতি, এটাই চলে আসছে পৃথিবীতে

পায়ের মাপে তৈরী হয় জুতো

জুতোর মাপে তৈরী হয় না পা।

রাষ্ট্র যখন এগিয়ে দেয় বুট

বলে, ‘ ঢোকাও, পায়ে ঢোকাও ’

চেঁচিয়ে বলি, ‘ ও জুতো আমার পায়ে হচ্ছে না।’

বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ ।। সুবোধ সরকার

রূপমকে একটা চাকরি দিন– এম-এ পাস, বাবা নেই
আছে প্রেমিকা সে আর দু-এক মাস দেখবে, তারপর
নদীর এপার থেকে ওপারে গিয়ে বলবে , রূপম,
আজ চলি

তোমাকে মনে থাকবে চিরদিন।
রূপমকে একটা চাকরি দিন, যেন কোন কাজ
পিওনের কাজ হলেও চলবে।

তমাল বাবু ফোন তুললেন, ফোনের অন্য প্রান্তে
যারা কথা বলেন
তাদের যেহেতু দেখা যায় না, সুতরাং তারা দুর্জ্ঞেয় ।
তমালবাবু মামাকে বললেন , রূপমের একটা চাকরি দরকার।
মামা বললেন কাকাকে, কাকা বললেন জ্যাঠাকে ,
জ্যাঠা বললেন
বাতাসকে ।

মানুষ জানলে একরকম, কিন্তু বাতাস জানলে
প্রথমেই ছুটে যাবে দক্ষিণে , সে বলল দক্ষিণের অরণ্যকে
অরণ্য বলল আগুনকে , আগুন গেল আলিমুদ্দিন স্ট্রীটে
আলিমুদ্দিন ছুটলো নদীকে বলার জন্য,
নদী এসে আছড়ে পড়ল
উপকূলে, আসমুদ্র হিমাচল বলে উঠল ;
রূপমকে একটা চাকরি দাও , এম-এ পাস করে বসে আছে
ছেলেটা

কয়েকমাস বাদের ঘটনা, আমি বাড়ি ফিরছিলাম সন্ধেবেলায়
গলির মোড়ে সাত-আটজনের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ালাম
জল থেকে সদ্য তুলে আনা রূপমের ডেডবডি
সারাগায়ে ঘাস, খড়কুটো, হাতের মুঠোয়
ধরে থাকা একটা এক টাকার কয়েন ।
পাবলিক বুথ থেকে কাউকে ফোন করতে চেয়েছিল, রূপম?
ভারত সরকারের এক টাকার কয়েনের দিকে আমার চোখ
সারা গায়ে সবুজ ঘাস, ঘাস নয়, অক্ষর
এম-এ পাস করতে একটা ছেলেকে যত অক্ষর পড়তে হয়
সেই সমস্ত ব্যর্থ অক্ষর ওর গায়ে লেগে আছে।

একটা ছেলেকে কেন আপনারা এম-এ পড়ান , কোন আহ্লাদে
আটখানা
বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন ? তুলে দিন
এই কথাগুলো বলব বলে ফোন তুললাম পবিত্র সরকারের
ফোন বেজে উঠল,ফোন বেজে চলল,
ফোন বেজেই চলল
২০ বছর ধরে ওই ফোন বেজে চলেছে , আরো কুড়ি বছর
বাজবে।

বাতাস বলছে অরণ্যকে, অরণ্য চলেছে নদীর দিকে
নদী উপকূল থেকে উপকূলে আছড়ে পড়ে বললঃ
রূপমকে একটা চাকরি দিন।
কে রূপম ?
রূপ আচার্য , বয়স ২৬, এম-এ পাস
বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ আছে।