যাপিত জীবনের ক্লান্তি

জানি—তবু জানি
নারীর হৃদয়—প্রেম—শিশু—গৃহ—নয় সবখানি;
অর্থে নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত- ক্লান্ত করে; ”

যাপিত জীবনের ক্লান্তি আমাকে নিয়মিত বিরতিতে বিষণ্ণতায় ভুগিয়েছে। ডিপ্রেশন, অবসন্নতা, ক্লান্তি যাই বলি না কেন, আমাদের প্রাত্যহিকতার অবিচ্ছেদ্য। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমি বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার নানারকম পদ্ধতি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি।

শৈশবে আম্মা ছিলেন সবচেয়ে বড় মানসিক আশ্রয়। কৈশোরে আম্মার পাশাপাশি দিনলিপি লেখার অভ্যাস ছিল। মনের যে কোন অন্তর্গত ক্লান্তি , বেদনার ভার কমিয়ে ফেলার জন্য দিনলিপিতে সবকিছু লিখে ফেলতাম। গল্পের বইয়ের পাশাপাশি ছিল গান শোনার বাতিক । রবি শংকরের সেতার থেকে শুরু করে সোলস, ফিডব্যাক ! কলেজ জীবনে কৈশোরের অভ্যাসগুলোর পাশাপাশি নানাধরনের মোটিভেশনাল বই ও উজ্জীবক লেখা খুঁজে খুঁজে পড়তাম । প্রিয় বাক্যগুলো নিজের মত করে ডায়েরীতে টুকে রাখতাম।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়ার চাপ, দূরাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা প্রায়শ: বিষণ্ণ করতো আমাকে। ওই সময়ে পরীক্ষা, প্রিপারেটরি লিভ যাই হোক না কেন – হুট করে হল ছেড়ে বাসায় চলে যেতাম , আম্মার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার হলে ফিরে যেতাম। অনেক সময় সবচেয়ে মজার বন্ধুটিকে খুঁজে বের করে ওঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিতাম।

বিয়ের আগে ও পরের বছরগুলোতে আমার জীবনসঙ্গিনীর সঙ্গে কাটানো সময় অনেকাংশে মানসিক বিষণ্ণতা দূর করত। গত বছর দশেক ধরে দুই কন্যাই আমার বিষণ্ণতা কাটানোর মহৌষধ।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্যজন্মের তুচ্ছতা যেভাবে বুঝতে পারছি, আবার না চাইতেই পাওয়া জীবন যে কতোখানি অমূল্য তা ও বোঝার চেষ্টা করছি। অনুতাপ, অনুশোচনা যৌক্তিক-অযৌক্তিক আকাঙ্ক্ষায় সীমিত সময় দিয়ে জীবনকে উপভোগ করার তাগিদ দিচ্ছি নিজেকে।
সাময়িক বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠার জন্য বন্ধু-মহলে অন্য সবার কি কি ধরণের ব্যক্তিগত পদ্ধতি আছে , জানতে ইচ্ছে করছে। একটা খোলামেলা আলোচনা হলে মন্দ হয় না !

প্রকাশকালঃ ২৬শে মে, ২০১৭

টেবিলে অনেক বই ।। জীবনানন্দ দাশ

এইবার চিন্তা স্থির করবার অবসর এসেছে জীবনে
হৃদয় বয়স্ক হল ঢের ;
মোম জ্বলে নিভে যায় অনেক গভীর রাত হলে
অন্ধকারে একআধটা আবছা ইঁদুরের
আসা-যাওয়া টের পাই ঘরের মেঝেয়
হয়তোবা সিলিঙের ‘পরে
বাইরে শিশির ঝরে কুয়াশায়–শীতে
লক্ষীপেঁচার ডানা সজনের ডালে শব্দ করে।
টেবিলে অনেক বই ছড়িয়ে রয়েছে ;
চিন্তাগুলো যেন অনুলোম প্রতিলোম
পরস্পরের প্রতি—ঠাণ্ডা শাদা নারীর মতন
দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপে মোম—-
একটি গভীর সূত্রে প্রথিত কি হবে
বইয়ের সকল চিন্তা জীবনের সব অভিজ্ঞতা
সকল নক্ষত্র আর সময়ের অপার গতির
ইতিহাসবৃত্তান্তের আগাগোড়া কথা।
এ সব আশ্চর্য তত্ত্ব ভেবে তবু মন
অনুভব করে এই অন্ধকার ঘরে আজ কেউ
নেই, শুধু এক বিন্দু মূল্য নির্ণয়ের চেষ্টা ছাড়া।
কোনো এক দূর মহাসাগরের ঢেউ
এসে এই অন্ধকার বন্দর স্পর্শ করে চুপে
কোন্ এক দূর দিকে চলে যায়, তবে
সময়ের অন্তিম সঞ্চয়ে প্রেম করুণার বলয় রয়েছে ?
ব্যক্তির ও মানবের সফলতা হবে ?
হয়তো এই ব্রহ্মাণ্ডের অবিনাশ অন্ধকার ছাড়া
মানুষের ভবিষ্যতে কিছু নেই আর ;
সেবা ক্ষমা স্নিগ্ধতা যে আলোর মতন
মানুষের হাতে, তার বুজে –যাওয়া অন্ধ আধার
বারবার বড়ো এক পরিবর্তনীয়তার দিকে
যেতে চায়— সনাতন অন্ধকারে এ প্রয়াস ভালো ;
তবু এই পৃথিবীতে প্রেমের গভীর গল্প আছে
জীবনের রয়েছে তার ( অপরূপ ) প্রতিভাত আলো।
“অগ্রন্থিত কবিতা ।। জীবনানন্দ দাশ।”

আশার আস্থার আধার নিজেই মানুষ। জীবনানন্দ দাশ।। ( অগ্রন্থিত কবিতা)

এ পৃথিবী বড়ো , তবু তার চেয়ে ঢের বেশি এই

সময়ের ঢেউগুলো- অনিঃশেষ সমুদ্রের থেকে

অন্তহীন সাগরের অভিমুখে কোথায় চলেছে ।

রাত্রি আসে –রাত্রি শেষ হয়ে গেলে আলো;

আলো আরো মৃদু হ’লে তার চেয়ে বেশি

স্নিগ্ধ অন্ধকার সব—আকাঙ্ক্ষিত মেয়েটির হাতের মতন

কাছে এসে ,সংবরণ ক’রে তবু, যেন নেপথ্যের

ওপারের থেকে তার কথা বলে ।

 

অগাধ আয়ুর শিশু এরা সব ঃ এই দিন, এই রাত্রি ,

বাতাসের আসা-যাওয়া , নীল নক্ষত্রের ফুটে ওঠা,

শিশির ঝরার শব্দ , আশ্চর্য পাখির

ডিম প্রসবের সাড়া ; আবার রোদের দিন মাঘ ফাল্গুনের ;

সহসা বৃষ্টির রাত্রি,– হেমন্তের ঠান্ডা নিঃশব্দতা

কবের আয়ুর শিশু এরা সব ;– ম্যামথ দেখেছে।

 

 

শতাব্দীর সন্ধিপথে আজ মানুষের

আধো-আলো আধো- আশা অপরূপ অধঃপতনের

অন্ধকারে অবহিত অন্তর্যামীদের মতন ভোরের সূর্য ;

দূরতম সমুদ্রের হাওয়া এসে ছুঁয়ে কিছু ভালো ব’লে যেতে চায় ;

নগরীর বিদগ্ধ লোকেরা কথা ভেবে—ব’লে

প্রেরণা জাগাতে চায় ;

সহজ ত্যাগীরা কাজ করে ;

রক্তে দেশ অন্ধকার হয়ে পড়ে ;

কথা ভাষা স্বপ্ন সাধ সংকল্পের ব্যবহারে

মানুষেরা মানুষের প্রিয়তর না হ’য়ে শুধু দূরতর হয় ;

হৃদয় মলিন হ’য়ে যেতে থাকে ;

নিয়ন্ত্রিত জ্ঞানেরো আকাশ ঢেকে কুয়াশা বাড়ছে;

মুক্ত হতে গিয়ে সুধী কেবলি রোমাঞ্চকর রূঢ় সায়েন্সের

জন্ম দেয় ; চারিদিকে অগণন মানুষের মৃত্যু তার বড়ো কাহিনীর

যবনিকাপাতের প্রাক্কালে ক্লান্তির মতো ;

তখন শতাব্দী অন্ধ—অবসন্ন—ব্যর্থ ।–

হয়তো এ পৃথিবীতে মানবের অনন্ত চারণ,

লোভ থেকে লোভে শুধু –ব্যাথা থেকে ব্যাথার ভিতরে,

ভুল থেকে উল্লোল ক্ষমতাময় ভুলের গহ্বরে;

চাঁদের কুয়াশা থেকে অঘ্রাণ রাতের

নক্ষত্রের অন্ধকারে ;-

তারপর নক্ষত্রেরা নেই।

 

 

 

 

নবীন প্রয়াণে স্পর্শে মানুষেরা একদিন চীন পিরামিড

গড়েছিল ; সূর্যঘড়ি চিনেছিল ; প্রিয়তর উজ্জ্বল সূর্যকে

দিব্য দিয়ে নগরীর ভাঙ্গা হাড়ে কেবলি গড়েছে

নতুন খিলান স্তম্ভ ফ্যাক্টরি এঞ্জিন ক্রেনঃ

এ সব বিচিত্র নীড় কুশলতা কল

সময়ের থেকে দূর বড় সময়ের কাছে

মানুষের যেই পরিচয় রেখে যায়

তা তার আবেগ বুদ্ধি উৎকণ্ঠার;-

যেন তা কল্যাণ সত্য চায় –তবু অগাধ হিংসার—

রিরংসার পাকে ঘুরে –ঘুরে ঘুরে শূন্য হয়ে যায় ;

অন্ধকার থেকে মৃদু আলোর ভিতরে

আলোর ভিতর থেকে আঁধারের দিকে

জ্ঞানের ভিতর থেকে শোকাবহ আশ্চর্য অজ্ঞানে

বারে- বারে আসা- যাওয়া শেষ ক’রে ।

 

 

 

 

চিরকাল ইতিহাসবহনের পথে

রক্ত ক্ষয় নাশ ক’রে সে এক জগতে

মানুষের দিকচিহ্ন মাঝে মাঝে মুক্ত হ’য়ে পড়ে ;

তা কোন প্রশান্তি নয় , মৃত্যু নয়, অপ্রেমের মতো নয়,

কোনো হেঁয়ালির শেষ মীমাংসার বার্তা নয়,

অচিহ্নিত সাগরের মতন তা , দূরতম আকাশের মতো ;

পেছনের পার্শ্বের দ্রুতগতি চিহ্ন ও বলয়

অন্তর্হিত হ’য়ে গেলে কূলহীন পটভূমি জেগে ওঠে

ব্যক্তি ও জাতির নাম সময়ের দিগন্তরে শেষ হ’লে

শূন্য নীল আকাশের – মহাসাগরের শূন্যে মেশে ;

চিনে নিতে পারে তার হৃদয়ের অসীম ভূগোলে

আরো শুদ্ধ আরো গাঢ় অনির্বচনীয় সম্মিলন

মানুষ ও মানুষেরঃ চারিদিকে গ্লোবমাস্টারের শব্দে

অন্তহীন অন্ধকারে হাঙর মকর মৃত্যু কুজ্‌ঝটিকায়

মৃত মূঢ় এরিয়েল ও বেতারের ব্যর্থতায়

যদিও প্রত্যাশা সব সর্বশান্ত ব’লে মনে হয়—

আশার আস্থার আধার তবু নিজেই মানুষ

মহাকাশ কিংবা মহাসাগরের চিহ্নগুলো নয়।

 

কুড়ি বছর পরে ।। জীবনানন্দ দাশ

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি
আবার বছর কুড়ি পরে-
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে-
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে- তখন হলুদ নদী
নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়- মাঠের ভিতরে!
অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর,
ব্যস্ততা নাইকো আর,
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়
পাখির নীড়ের থেকে খড়
ছড়াতেছে; মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর শিশিরের জল!

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি- কুড়ি বছরের পার,-
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!
হয়তো এসেছে চাঁদ মাঝরাতে একরাশ পাতার পিছনে
সরু-সরু কালো-কালো ডালপালা মুখে নিয়ে তার,
শিরীষের অথবা জামের,
ঝাউয়ের- আমেরঃ
কুড়ি বছরের পরে তখন তোমারে নাই মনে!

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার-
তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!
তখন হয়তো মাঠ হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে-
বাবলার গলির অন্ধকারে
অশ্বত্থের জানালার ফাঁকে
কোথায় লুকায় আপনাকে!
চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে-
সোনালি সোনালি চিল- শিশির শিকার ক’রে নিয়ে গেছে তারে-
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!

ঊনিশশো চৌত্রিশের।। জীবনানন্দ দাশ।

একটা মোটরকারখটকা নিয়ে আসে।

মোটরকার সব-সময়েই একটা অন্ধকার জিনিস,

যদিও দিনের রৌদ্র-আলোর পথে

রাতের সুদীপ্ত গ্যাসের ভিতর

আলোর সন্তানদের মধ্যে

তার নাম সবচেয়ে প্রথম।

একটা অন্ধকার জিনিস :

পরিষ্কার ভোরের বেলা

দেশের মটরশুঁটি-কড়াইয়ের সবুজ ক্ষেতে-মাঠে হাঁটতে হাঁটতে

হঠাৎ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছি

লাল সুরকির রাস্তার ভিতর দিয়ে

হিজলগাছ দুটোর নিচে দিয়ে

উনিশশো চৌত্রিশের মডেল একটা মোটরকার

ঝকমক করছে, ঝড় উড়িয়ে ছুটেছে;

পথ ঘাট ক্ষেত শিশির সরে যেতে থাকে,

ভোরের আলো প্রতিকূল যুক্তির বিরুদ্ধে কোণের বধূর মতো

সহসা অগোচর

মাঠ নদী যেন নিশ্চেষ্ট,

সহসা যেন প্রতীজ্ঞা হারিয়ে ফেলে,

এই মোটর অগ্রদূত,

সে ছুটে চলেছে

যেই পথে সকলের যাওয়া উচিত;

একটা মোটরকারের পথ

সব সময়েই আমার কাছে খটকার মতো মনে হয়েছে,

অন্ধকারের মতো।

স্ট্যান্ডে

শহরের বিরাট ময়দানের পুবে পশ্চিমে-ফুটপাথের পাশে

মোটারকার;

নিঃশব্দ।

মাথায় হুড

ভিতরের বুরুশ-করা গভীর গদিগুলো

পালিশ স্টিয়ারিং-হুইল হেডলাইট;

কী নিয়ে স্থির?

কলকাতার ময়দানের একটা গাছ অন্য কিছু নিয়ে স্থির,

আমি অন্যকিছু নিয়ে স্থির;

মোটরের স্থিরতা একটা অন্ধকার জিনিস

একটা অন্ধকার জিনিস :

রাতের অন্ধকারে হাজার-হাজার কার হু-হু করে ছুটছে

প্যারিসে-নিউইয়র্কে-লন্ডনে-বার্লিনে-ভিয়েনায়-কলকাতায়

সমুদ্রের এপার ওপার ছুঁয়ে

অসংখ্য তারের মতো,

রাতের উল্কার মতো,

মানুষ-মানুষীর অবিরাম সংকল্প আয়োজনের অজস্র আলেয়ার মতো

তারাও চলেছে;

কোথায় চলেছে, তা আমি জানি না।

একটা মোটরকারের পথ- মোটরকার

সবসময়ই আমার কাছে খটকার মতো মনে হয়েছে,

অন্ধকারের মতো।

আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;

আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,

পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।

জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা

অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না :

আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ

হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে

নক্ষত্রের নিচে।

“ঊনিশশো চৌত্রিশের” (জীবনানন্দ দাশ।)