by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
গতকল্য ১৯শে জানুয়ারি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ টোনা টুনির ষোড়শ বিবাহবার্ষিকী ছিল। যথারীতি সারাদিনের কর্মস্থলের চাপে পিষ্ট হইয়া টোনার গৃহে প্রবেশ। ম্লান সম্ভাষণে সন্ধ্যার শুরু। যেহেতু, অধুনা শহর ঢাকায় আনন্দ বিনোদন উদযাপনের দুইটি মাত্র পথ খোলা রহিয়াছে। হয়, নিজ গৃহে আরো কিছু ঘনিষ্ঠজনকে ডাকিয়া ঘৃত তৈল মিশ্রিত খাদ্য দ্বারা আপ্যায়ন। অথবা আশেপাশের কোন খাদ্য সরবরাহকারী দোকানে যাইয়া গুচ্ছের অর্থ খরচ করিয়া ভক্ষণ।
গত রজনীতে টোনা টুনির বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে জনৈক শুভাকাঙ্ক্ষী করুণাবশতঃ নিমন্ত্রণ করিয়াছিল। দুই ছোট টুনটুনিকে লইয়া টোনা ও টুনি রেস্তোরাঁয় আপ্যায়িত হইতে গিয়াছিল।
কথা তাহা নহে ! প্রায় দেড়যুগের কাছাকাছি টোনা টুনির বিবাহিত জীবনে বহু ঘাতপ্রতিঘাত ও ভালোবাসার অন্তঃসলিল ধারা একইসঙ্গে বহিয়া চলিয়াছে।
বিবাহের প্রাক্বালে টোনা, টুনিকে সান্ত্বনা দিয়াছিল । যেহেতু, বিশেষ সামাজিক দিবসগুলোতে কোথা হইতে যেন টোনার কপালে রাজ্যের ঝামেলা ও জঞ্জাল আসিয়া জোটে। সেইহেতু , বিশেষ দিবসের যথাযথ প্রাপ্য, টোনা টুনিকে অন্য কোন সাধারণ দিনে উদযাপনে ক্ষতিপূরণ করিয়া দিবার প্রতিশ্রুতবদ্ধ ছিল। অদ্যাবধি, টোনা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিবার আপ্রাণ চেষ্টা করিয়া আসিতেছে। টুনিও গত্যন্তর না দেখিয়া ইহা মানিয়া লইয়াছে!
সেই শুভাকাঙ্ক্ষীর শুভকামনা জানাইবার সময়, টোনা লম্বা শ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ আমাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ এই দীর্ঘ ১৬ বছর যেমন তেমন করিয়া হইলেও সংসার তো করিতেছি!’
টুনি তদপেক্ষা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া কহিল, ‘ বরং আমাকেই বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা উচিৎ। টোনার মতো বেহিসাবি, ছন্নছাড়া, নির্বোধের সঙ্গে অদ্যাবধি ঘরসংসার করিয়া চলিতেছি বলিয়া !’
জ্যেষ্ঠা টুনটুনি মৃদু হাসিয়া মধ্যবর্তিনী হইয়া কহিল, ‘ কাহাকেও পুরস্কৃত করিবার প্রয়োজন দেখিতেছি না ! প্রতিটি দম্পতির বিবাহবার্ষিকীতেই এবম্বিধ বাক্যাবলী হইয়া থাকে !’
মনে বুঝিলাম, আমাদের সেইদিনের ছোট্ট টুনটুনি বড়ো হইয়া গিয়াছে। নহিলে , জগতের এই স্বাভাবিক সত্য সে এতো সহজে কী করিয়া বুঝিয়া ফেলিল !
প্রকাশকালঃ ২০শে জানুয়ারি,২০২০
by Jahid | Nov 29, 2020 | ছিন্নপত্র
২০০১ সালের এক বিষণ্ণ শীতের বিকালে আমরা পৌঁছালাম আমার হবু জীবনসঙ্গিনীর বাড়িতে; কুমারখালী কুষ্টিয়ায়। তারপর নানা আয়োজন উপচারের ভিতর দিয়ে সামাজিকভাবে আমাদের জীবনের শুরু।
প্রথমদিকের বিবাহবার্ষিকীর কথা মনে রাখতেন বরকনের দুই পিতামাতা। নিজের বড়ভাই-ভাবী এবং জনৈক গহনার দোকানদার ; যার কাছ থেকে গহনা কেনা হয়েছিল। প্রায়শ: ব্যাংক থেকে ফরমেটেড শুভেচ্ছা আসতো। আব্বা-আম্মা প্রয়াত হওয়ার পরে শুভেচ্ছা জানানোর জনসংখ্যা গেল কমে।
চতুর্দশী বড় কন্যা রাত বারোটায় এসে হ্যাপি অ্যানিভার্সারি জানিয়ে চমকে দিল ! বোধ করি বাকী জীবনে একজন শুভেচ্ছা-দাত্রী বাড়ল।
বাস্তবতা ১ : সত্য সবসময় সুন্দরই হয় না ; অনেকাংশে তা অশ্লীলতার সীমারেখায় ঘোরাফেরা করে ! দাম্পত্যের দেড়যুগ পরে প্রকৌশলী বন্ধুদের এক অন্তরঙ্গ আড্ডায় হা হুতাশ চলছিল।
‘দিনশেষে ঘরে ফিরে স্ত্রীর আচরণকে মনে হয় আপন বোনের মত। বিছানায় মনে হয় ভাইবোন শুয়ে আছি!’
এই কথার পর, আমি কিছুটা আমতা আমতা করে বললাম , ‘কিন্তু আমি তো বিয়েই করেছি মামাতো বোনকে ! আমার তাহলে কি হবে?’
আমার প্রত্যুৎপন্নমতি প্রকৌশলী বন্ধুটি গভীর উদাস কণ্ঠে বলল, ‘কী আর হবে ! মনে হবে তোরা দুই ভাই এক বিছানায় শুয়ে আছিস !’
বাস্তবতা ২ : অনেক আগে শোনা, স্মৃতি থেকে লিখছি।
এক ডাক্তারের ডাক পড়েছে শীতের গভীর রাতে। বহু কষ্টে লেপের ভিতরে থেকে বেরিয়ে রোগীর বাসায়। কিছুক্ষণ রোগীকে দেখে তিনি বললেন, ‘আপনাদের আত্মীয়স্বজন যে যেখানে আছেন খবর পাঠান, আসতে বলেন!’
রোগীসহ সবাই বুঝে গেলেন, আর বেশি সময় নেই ! যথারীতি সবাইকে খোঁজ দেওয়া হল।
সবাই এলে, উৎসুক কেউ একজন জানতে চাইলেন, ‘রোগীর অবস্থা কি খুব খারাপ ! আর কতক্ষণ সময় আছে ?’
ডাক্তার ব্যাগ গোছাতে গোছাতে বললেন, ‘না, না রোগী একদম সুস্থ, কোন আশংকা নেই!’
‘তবে যে আপনি সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে ডেকে পাঠালেন !’
ডাক্তার হাই তুলতে তুলতে বললেন, ‘এই গভীর রাতে এইরকম একটা আনন্দের সংবাদ আমি একা একা সেলিব্রেট করব, সেটা কী ঠিক হবে ! তাই সবাইকে ডাকা, সবাই মিলে সেলিব্রেট করেন !
ডাক্তার বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলেন।
তো, বাস্তব জগতের ৩/৪ জন মাত্র আমাদের বিবাহবার্ষিকীর কথা মনে রাখে।
অথচ, আমি চলছি এক অদ্ভুতুড়ে অন্তর্জালিক ভার্চুয়াল জগতের ভিতর দিয়ে। যেখানে বাস্তব মানুষগুলোর চেয়ে বেশি সময় কাটছে এঁদের সঙ্গে। আমি সারাদিন ধরে এঁদের নানা ঢংয়ের নানা ধরণের সেলিব্রেশনের ছবিতে লাইক কমেন্ট করি। বিবাহ বার্ষিকী, অন্নপ্রাশন , হাতেখড়ি, প্রথম স্কুলে যাবার দিন, বাচ্চার জিপিএ ফাইভ, প্রথম প্রপোজালের দিন, প্রথম ব্রেকাপের দিন, বাচ্চার প্রতিটি জন্মদিন ও স্কুলের প্রতিটি সাফল্যের সেলিব্রেশন,তাঁদের মামাতো , কাকাতো ফুফাতো, জ্যাঠাতো ভাইবোনের সব সাফল্যের সেলিব্রেশনে আমি অংশগ্রহণ করে থাকি। একই ভাবে, তাঁদের রক্তদানের ছবি, হাসপাতালের বেডে শুয়ে আহা উঁহু গেলামরের সেলফির ছবিতে ; শ্বশুর, চাচা, বাবা, ফুফা, ভাইবোন, কাকা কাকী, মামা মামী জগাই মাধাই সবার মৃত্যু সংবাদে স্যাড ইমো দিই, সমবেদনা জানাই।
তো আমার সেই কাছের ভার্চুয়াল বন্ধুবান্ধবীদের কাছ থেকে আমার জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক বেদনাঘন দিনের ১৯তম বার্ষিকীতে কিছু সমবেদনা তো আশা করতেই পারি। যদিও সব লাইক কমেন্টস ভার্চুয়াল হবে। আমি যেমন কাউকে একগোছা গোলাপ কখনো পাঠাইনি, কী করে আশা করি আমি পাব !
অতঃপর কোন এক গোধূলি বেলায় আমার প্রয়াত আম্মার কথা প্রসঙ্গে আমার সহধর্মিণীকে বলেছিলাম, ‘ জানো, আম্মা আমার জীবনের দুইটা অসাধারণ ভালো কাজ করেছে।
সে জিজ্ঞেস করল কি কি ?
প্রথমটি, আমাকে এই অসাধারণ পৃথিবীতে এনে। তাঁর প্রতি এই কৃতজ্ঞতা আমৃত্যু থাকবে।
দ্বিতীয়টি , তোমাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসাবে পছন্দ করে। তুমি না থাকলে, আমি কোথায় ভেসে যেতাম।
প্রথম কথায় তাঁর কোন রিঅ্যাকশন ছিল না।
দ্বিতীয় কথায় আমার সহধর্মিণী অবিশ্বাসের সরু চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। আমি বুঝে গেলাম , নারীর বিশ্বাস অর্জন কোন পুরুষের পক্ষে একজীবনে সম্ভব না !
প্রকাশকালঃ ১৯শে জানুয়ারি,২০২০
সাম্প্রতিক মন্তব্য