প্রেক্ষাপট: টানবাজার , আফগানিস্তান ও নাইন-ইলেভেন এবং আমাদের অবদমিত সমাজের বাই-প্রোডাক্ট !

পুরনো প্রেক্ষাপটে লেখা, গত পরশুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণে কিছু সংযুক্তি করে আবার লিখছি। প্রতিটি ধর্ষণ পুরুষ হিসাবে আমার মাথা নত করে দেয়। আমার বোন, আমার কন্যা ও আমার নারী সহকর্মীদের দিকে আমি চোখ তুলে তাকাতে পারি না। প্রতিটি ধর্ষণ আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি পুরুষ সমাজের প্রতিভূ , এবং আমি আরেকজন নারীর জন্য নিরাপদ নই।

ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকার ও রাষ্ট্র কি কি করতে পারে ও করা উচিৎ সেটা নিয়ে আমার আলোচ্য নয়। একদিকে বিলুপ্তপ্রায় প্রগতিশীল অংশ আরেকদিকে ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে অপ্রতিরোধ্য ও বিশাল ফ্রাঙ্কেন্সটাইনের মতোও আরেক জনগোষ্ঠীর মাঝে আমরা পড়েছি উভয়সংকটে।

সমাজের মল-মূত্র, স্যানিটারি ন্যাপকিন, উচ্ছিষ্টের জায়গা ডাস্টবিন। গলিত অর্ধগলিত আবর্জনা ফেলার ও পরিষ্কার করার নির্দিষ্ট জায়গা আছে। যার প্রয়োজন সে ফেলবে, যাদের পরিষ্কার করার দরকার সে একটা সময়ে এসে পরিষ্কার করবে। যে বা যারা দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারে না, তাঁরা অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটবে। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের জীবনের অতি অপরিহার্য এই নোংরা ময়লা ফেলানোর জায়গাটা যেন নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে পুরো মহল্লায় ও রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ ছড়াতে না পারে। নির্দিষ্ট জায়গা না থাকলে আপনার ব্যবহার করা কনডম ঝুলবে পাশের বাড়ির কার্নিশে । আপনার কাজের বুয়া সবজির উচ্ছিষ্ট ফেলবে আপনার সামনের সুন্দর সাজানো বাগানে !

ময়লা খারাপ , দুর্গন্ধ খারাপ এই অজুহাতে তো ডাস্টবিন তুলে দেওয়া যাবে না। নাকি, আমরা সবাই ইউটোপিয়া নামের কল্পরাজ্য বা পবিত্র গ্রন্থে বর্ণিত সেই স্বর্গরাজ্য চাই । খেলাম কিন্তু হাগুমুতু হবে না। মেশক-আম্বরের গন্ধে ভরে থাকবে সবার উজ্জ্বল দেহ !

কয়েক বছর আগে তখন বারাক ওবামা ক্ষমতায়, অফিসের ট্রাভেলে মাঝপথে দিন কয়েকের বিরতি নিয়েছি স্কুল-বন্ধুর বাসায় । ভার্জিনিয়া, আম্রিকায়। তো এক শুক্রবার সকালে বন্ধু কন্যাকে স্কুলে নামিয়ে দেওয়ার সময় বন্ধুর স্বগতোক্তি ,স্কুলের পতাকা নামানো ক্যান মামা? কেউ মারাটারা গেল নাকি! নিউজ চ্যানেল দ্যাখ তো কাহিনী কি। আমি হু হা করে ইউটিউবে গান শোনায় মনোযোগ দিই । গাড়ীতে ওয়াই ফাই লাগানো। আমেরিকার পতাকা অর্ধনমিত কেন, সেটা জানা আমার প্রায়োরিটি না !

আসার পথে গ্যাস স্টেশন, অফিস, মনোহারী দোকান সবখানেই পতাকা নামানো দেখে একবার ভাবলাম কাউকে জিজ্ঞাস করি। ভাগ্যিস করিনি ! বাসায় এসে দুপুরে খেতে খেতে বন্ধু-পত্নীর কথায় মনে পড়ে যায় আজ ১১ই সেপ্টেম্বর ( নাইন-ইলেভেন) ! দুজনেই বিব্রত বোধ করি।

কারো কোন তির্যক মন্তব্য বা মতামত পছন্দ হলে আমার দীর্ঘদিন মনে থাকে।
বছর পনেরো আগে মহল্লার পান-বিড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে এক বড়ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিল। সদ্যই টানবাজার ও কান্দুপট্টি সাফল্যের সঙ্গে উচ্ছেদ করা হয়েছে পবিত্রতার দোহাই দিয়ে ! মূলত: প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের জমি ও রাজনৈতিক দখলদারিত্বের ফাঁকে পড়ে যায় যৌনকর্মীরা । আশির দশকের শুরুতে একবার উচ্ছেদ করা হয়েছিল, নানা কারণে ধুঁকে ধুঁকে চললেও ৯৯ সালে পুরোপুরি গৃহহারা হন যৌনকর্মীরা। এরপর একে একে, নিমতলি, ইংলিশ রোড, টাঙ্গাইল সব জায়গা থেকে পতিতা-পল্লী উচ্ছেদ করা হয়।

সামাজিক গবেষণার অনেকগুলো শব্দ আছে, পুনর্বাসন, পতিতাবৃত্তি, নিরাপত্তা হীনতা ,সামাজিক অব্যবস্থা, ইসলামী অনুশাসন , দারিদ্র্য ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যেহেতু গবেষক নই, আমার চিন্তা ক্ষুদ্র একটা জায়গায় এসে ঘুরপাক খায়। উল্লেখ্য, পৃথিবীর এই আদিমতম পেশার প্রতি আমার কোন সমর্থন নেই। নিজের দেহ বিক্রি করে ক্ষুন্নিবৃত্তির চেয়ে অসম্মানের কিছু নেই।

কিন্তু শেষ বিকেলের ওই আলোচনার বিষয় ছিল, উচ্ছেদ করলেই কি নির্মূল হবে। এঁরা তো ছড়িয়ে পড়বে ঢাকা শহরের সম্ভব অসম্ভব সমস্ত জায়গায়। পরবর্তী এক যুগ আমরা দেখেছি কীভাবে পতিতাবৃত্তি নানা চেহারায় পাঁচতারা হোটেল থেকে শুরু করে, ভদ্রপল্লিতে নানা ডাইমেনশনে ছড়িয়ে পড়েছিল ।

পুঁজিবাদের কথা , গণতন্ত্রের কথা বলবেন ; আর তার উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট নিয়ে নাক সিঁটকাবেন ; কেমন করে হবে! সামাজিক সুস্বাস্থ্যের জন্য, পুঁজিবাদের বাই প্রোডাক্ট হিসাবে যৌন-ব্যবসা টিকে থাকবেই। বড়োজোর প্রাতিষ্ঠানিক যৌনকর্মীদের কে আপনি ভাসমান পতিতাবৃত্তিতে ঠেলে দেবেন! এর পরে আপনি আশা করবেন আপনার ভাই-বন্ধু-পুত্ররা তাঁদের কখনই খুঁজে পাবে না ?

আপনি কথায় কথায় গণতন্ত্রের দোহাই দেবেন, আপনি আফগানিস্তানে হামলা করবেন, ইরাকে হামলা করবেন ; ফিলিস্তানিদের গৃহচ্যুতিতে ইজরাইলকে সমর্থন দেবেন। আবার আশা করবনে , আপনার নিরাপত্তা সবসময় অ-বিঘ্নিত থাকবে ! ভীমরুলের চাকে খোঁচা দেবেন, আর তারা আপনার পরিপার্শ্বের কাউকে কে হুল ফোটাবে না ? আপনি এটাকে কতোখানি গন্ডীবদ্ধ করে রাখতে পারছেন সেটা আলোচ্য ও বিবেচ্য হওয়া উচিৎ ছিল।

ধর্ম সন্ত্রাসতো হাজার বছরের পুরনো ! সভ্যতা-অসভ্যতা যতদিন থাকবে, ধর্মসন্ত্রাসও থাকবে। আমেরিকা ধর্মসন্ত্রাসীদের গন্ডীবদ্ধ না করে নিজেদেরকেই অনিরাপত্তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমেরিকা তার বাজেটের বড়ো একটা অংশ ধর্মসন্ত্রাসীদের পুনর্বাসনে খরচ করলে হয়তো, টুইন টাওয়ার ধ্বসে পড়তো না।

ইউরোপও দিনের পর দিন আমেরিকার অনৈতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসে সরবে ও নীরবে সমর্থন দিয়েছে। আজ তার উত্তাপ নিজের ঘরে টের পাচ্ছে তারা। শরণার্থীর ছদ্মবেশে হয়তোবা ‘আইএস’-কেও আশ্রয় দিতে হচ্ছে !

প্রতিটা এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা চেকিং পার হই আর মনে মনে বলি, আমার দেখা পৃথিবী দুই সময়ে বিভক্ত, নাইন- ইলেভেনের আগের পৃথিবী আর নাইন-ইলেভেনের পরের পৃথিবী !

অন্যদিকে, আমাদের জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশ পরিবার বিবর্জিত হয়ে ঢাকা নামের এক কুৎসিত শহরে দিনের পর দিন আর মাসের পর মাস পার করে। আমাদের বাড়ীর দারোয়ান, রিকশাচালক, প্রাইভেট ড্রাইভার, বাস-ট্রাক-থ্রি হুইলার চালক থেকে শুরু করে দোকানের কর্মচারী ও নানা প্রান্তিক জনসংখ্যা।

আপনার কি মনে হয়, এঁরা যৌন তাড়না বিবর্জিত প্রাণী ? এছাড়া রয়েছে, উঠতি তরুণ, বখে যাওয়া অ্যাডিক্ট যুব সমাজ। আচ্ছা বাদ দেন, এঁদের ব্যাপারে আপনার সহানুভূতি নাও থাকতে পারে। আপনি তো ফেসবুকে দেশ উদ্ধার করা আর বাইরে ইমিগ্রেশনের কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকা সমাজের প্রিভিলেজড একটা অংশ। কেউ আছে, শারীরিকভাবে পঙ্গু, অতি দরিদ্র নারী বিয়ে করে তারপর যৌন কামনা মেটানোর অর্থনৈতিক অবস্থা সহসাই আসার সম্ভাবনা কম যাঁদের। তাঁদের এই কামনা-বাসনা রিলিজের কোন ব্যবস্থা কি রেখেছে আমাদের অতি-ধার্মিক সমাজ ?

সমাজকে যথাসম্ভব দুর্গন্ধ মুক্ত রাখতে হলে নোংরা ময়লা ফেলানোর জায়গাটা নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছাড়া আমি তো কোন উপায় দেখি না।

প্রকাশকালঃ ১৫ই সেপ্টেম্বর,২০১৫

ব্যবহারিক ধর্ম ও বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা

দৃশ্যপট ১:

আশির দশকে ঢাকা থেকে পূর্ববঙ্গের জেলাগুলোতে যাওয়ার সহজলভ্য রুট ছিল ঢাকা-আরিচা-গোয়ালন্দ হয়ে যাওয়া। আব্বা-আম্মার সাথে নানাবাড়ি যাচ্ছি–শৈশবের সবচেয়ে মধুর স্মৃতির একটা। লঞ্চের ভেঁপু, ঘাটের হোটেলে আব্বার সাথে বড়মাছের পেটি দিয়ে ভাত খাওয়া। হোটেলের সামনে বিশাল অ্যালুমিনিয়ামের থালায় রাখা টকটকে রঙের তরকারি। ঘাটের হোটেলের মেসিয়ারগুলোও কী যত্ন করে আমাদের বসতে দিত, প্লেট এগিয়ে দিত; শিশু হিসাবে নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হত।
খাওয়া শেষে গোয়ালন্দ স্টেশনে কুষ্টিয়া-গামী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। ট্রেন শুরু হলেই সেই আঞ্চলিক টানের হাতি-ঘোড়া মারা চিৎকার চেঁচামেচি। এখন চীনাবাদাম তো একটু পরেই ঝালমুড়ি, তারপরে সিদ্ধ ডিম। ‘এই চানাচ্চুর’ শুনে আবার খাওয়ায়। রাজ্যের হিজিবিজি খাওয়ার অবাধ স্বাধীনতা ঐ সময়টিতে।

দৃশ্যপট ২:

নদীর গতিপথের পরিবর্তনে ফেরিঘাট আরিচা থেকে সরতে সরতে পাটুরিয়াতে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তন হয়নি শুধু দরিদ্র চেহারার ফিনফিনে দাঁড়ির কিশোর ছেলেদের মসজিদ বা মাদ্রাসার জন্য চাঁদা তোলাটা। ঘাটের মোড়ের জ্যামে গাড়ী থামলেই , চাঁদার রশিদ বই হাতে এক বা অধিক দরিদ্র চেহারার মুসল্লি সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়।
সম্ভবত: আরিচা ঘাটের একটা নির্দিষ্ট মোড়ে আমি বছর বিশেক ধরে ছোট একটা মাইক দিয়ে মসজিদের চাঁদা তুলতে দেখেছি। আদৌ মসজিদ হয়েছে কীনা জানিনা। হয়তো বাঁশের ছাপড়ার একটা মসজিদ হয়েছে , হয়তো হয়নি ; কিন্তু আমি জানি, চাঁদার বড় অংশটাই ব্যয়িত হয়েছে পার্থিব ক্ষুন্নিবৃত্তির কাজে।

দৃশ্যপট ৩:

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরের একপ্রান্তে , মিরপুরে । কালেভদ্রে গ্রামে নানার বাড়ী। ফিনফিনে দাঁড়ির কিশোর বা বড় দাঁড়ির যুবকদের প্রাদুর্ভাব গ্রামেই বেশী ছিল। নতুন যে হুজুরটি সম্মানের সাথে বৈঠকখানায় আপ্যায়িত হচ্ছেন , সে হয়তো বছর দশেক আগেও আমার ছোটমামার স্কুলের সতীর্থ ছিল। এখন সে সবার আখিরাতের হেফাজতের পরামর্শ দিয়ে থাকে। ঐ দিকে ঢাকায় আমাদের বাসার পাশেই ছিল মসজিদ ও লাগোয়া কওমি মাদ্রাসা। বেশ অনেকবছর ধরে মহল্লার বাসাগুলো থেকে রোস্টার পদ্ধতিতে সপ্তাহের একদিন করে করে মসজিদের ইমামকে খাবার দাবার পৌঁছে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। নিজেরা যাই খাই না কেন, ইমাম-সাহেবের জন্য ঠিকই আম্মা আঁচলের বাঁচিয়ে রাখা টাকা বের করে মুরগীর ঝোল করে খাওয়াতেন। ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমান’ আর ‘ধর্মভীরু মুসলমান’। এই দুই শ্রেণীর মধ্যে বড় ধরণের তফাৎ আছে। আমাদের বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছেন ‘ধর্মভীরু মুসলমান’ !

পবিত্র আরবী ভাষা শিক্ষার জন্য আমাকেও মহল্লার মাদ্রাসায় যেতে হয়েছে ! কিন্তু মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে আলিফ জবর আ, বে জবর বা করে করে আমপারা পর্যন্ত আসতে আসতেই বোর্ডের বৃত্তি পরীক্ষা চলে আসল। আমার পবিত্র ভাষা শিক্ষার ওইখানেই সমাপ্তি। পাশাপাশি বসে আরবী পড়ার সময় আমার মাথায় যখন টম অ্যান্ড জেরী, থান্ডার ক্যাটস ঘুরতো ; আমার পাশে বসা নিম্নবিত্ত অপুষ্ট ছেলেটার মাথায় হয়তো তখন ঘুরতো দুপুরের খাবারের চিন্তা ,মাদ্রাসার রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গরমমসলা তরকারির গন্ধ। একটা অনতিক্রম্য সামাজিক-আর্থিক-মানসিক দূরত্বে বেড়ে ওঠা আমাদের।

উচ্চ-মধ্যবিত্ত কাছের এক বন্ধুর দুইভাই-দুইবোনের সবচেয়ে ছোটভাইটিকে মাদ্রাসায় দেয়া হয়েছিল। যথারীতি ব্যবসায়ী বাপ-দাদার আখিরাতের সুরাহা করার আশায়। ঘরোয়া নানা উৎসবে ছোটভাইটি আমাদের সঙ্গে সব ব্যাপারে তাল মিলিয়ে চললেও ওর সেই সাদা জোব্বা আর দাঁড়ি নিয়ে কোথায় যেন একটা দূরত্ব থাকত ! দিনে দিনে সেটা বেড়েই গেছে আর কমেনি !

মূল প্রসঙ্গে আসি।

মাদ্রাসার ব্যাপারে আমার কোন বিদ্বেষ ছিলনা বা নেই। কিন্তু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্‌র ‘লালসালু’ র সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরে কেন জানি মনে হয়েছে বাংলাদেশে ধর্মের আধ্যাত্মিকতা বা স্পিরিচুয়ালিটির চেয়ে এর ভিক্ষাবৃত্তির ব্যবসাটা অনেক বেশী শক্তিশালী । গরীব ঘরের ছেলেটি মাদ্রাসায় পড়ার সুযোগ পেলে অন্তত তাঁর নিজের খাওয়া পড়ার চিন্তা থাকে না। এমনকি মধ্যবিত্তের যে ছেলেটি স্কুলের পড়াশোনায় একটু দুর্বল তাকেও আর আখিরাতের লোভে মাদ্রাসায় দিয়ে দেওয়ার একটা রেওয়াজ ছিল।
আমার কাছে মনে হয়েছে এই ফিনফিনে দাঁড়ির হুজুরদেরকে সামাজিকভাবে খাইয়ে দাইয়ে আমরা একটা ভিক্ষুকশ্রেণিই তৈরি করে চলেছি। কোনরকম কায়িক পরিশ্রম ছাড়া শুধু ধর্মীয় অনুশাসন- আচারের চর্চা বজায় রাখার জন্য , সমাজের এতো বড় একটা কর্মক্ষম অংশকে আমরা অকর্মণ্য পঙ্গু করে চলেছি। এই ভিক্ষাবৃত্তি আমার ভালো লাগেনি কখনোই।

এই মধ্য যৌবনে এসে জঙ্গিবাদের উত্থান বা হেফাজতের উত্থানে আমি মর্মাহত হয়েছি। আমার ভিতরে কিছুটা বিতৃষ্ণা এসেছে, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই । বহুবছর ধরে আমাদের বাড়ির কোরবানির চামড়ার টাকা মহল্লার মাদ্রাসায় দেওয়া হত।গত বছর পাঁচেক আগে থেকে আব্বা-আম্মা বেঁচে থাকতেই তাঁদের অনুমতিক্রমে সেটা এখন দেওয়া হয় দরিদ্র আত্মীয়দের।

আমার সহকর্মীর সাথে বহুদিন আগে কথা হচ্ছিল আমাদের এই অনুৎপাদনশীল কওমি মাদ্রাসা-শিক্ষিতদের জনগোষ্ঠী নিয়ে। সহকর্মী তাঁর শিক্ষক পিতার প্রসঙ্গে কথা উঠলে চমৎকার কিছু কথা বলেছিলেন, মনে গেঁথে আছে। সহকর্মীর বাবা দীর্ঘদিনের মফঃস্বলের শিক্ষকতা ও মাদ্রাসা-শিক্ষিত মৌলভিদের উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলার দারুণ একটা সমাধান বলেছেন। আমার ভালো লেগেছে। আমি জানি তাঁর এই মতের সাথে অনেকে দ্বিমত পোষণ করবেন। কিন্তু এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। বহুভাবে বলেও কওমি মাদ্রাসায় আধুনিক শিক্ষার কারিকুলাম কোন সরকার এস্টাব্লিশ করতে পারেন নাই। চারিদিকে যে ধর্মীয় আবহাওয়া বেড়ে উঠছে ভবিষ্যতেও সেটার কোন সম্ভাবনা দেখছিনা।

সহকর্মীর শিক্ষক বাবা একটু রিভার্স চিন্তা করেছেন ।
আসলে এই মাদ্রাসার হুজুর ও ইমামদের উপরে আমাদের সামাজিক ধর্মীয়-জীবন কতখানি নির্ভরশীল, কোথায় কোথায় তাঁদের ছাড়া চলেই না সেটা তিনি আগে চিহ্নিত করেছেন।

মৃতব্যক্তির দাফন ও জানাজা।

আপনি কম বা বেশী ধার্মিক যাই হোন না কেন , মৃত্যু আপনাকে বাধ্য করবে ধর্মের হেফাজতকারীদেরকে ডেকে আনতে। কারণ আপনি মুসলমান হলেও আপনার কোন ব্যবহারিক জ্ঞান নেই দাফন-কাফনের। সুতরাং মৃত্যুর এই বিষাদময় উৎসবে এঁদের বিকল্প নেই। পুরো প্রক্রিয়াটিতে, গোসল করানো, কাফন পড়ানো, কবরে নামানো, কুলখানির দিনের দাওয়াত। পরবর্তীতে কোরআন খতম, ফকির-মিসকিন আত্মীয়দের খাওয়ানো, দোয়া করা প্রতিটা ক্ষেত্রেই এঁদের সরব উপস্থিতি, অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে। আপনাকে নত হতে হয়, আপনার চিরপ্রস্থানকারী পিতা মাতার আখিরাতের সুরাহা করতে হয়।

কিন্তু আপনি যদি এই প্রক্রিয়াটি নামাজ শিক্ষার মতো স্কুলেই শিখে ফেলতেন?

আপনার জন্য ব্যাপারটা অনেক সহজ হত না ? আপনি তাসবীহ রুকু পড়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারছেন আর এইটা শিখতে সমস্যা কি? এটা তো আমাদের মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য একটা সমাপ্তি।

আর আছে, কোরবানি দেওয়া, নামাজের ইমামতি করা , মিলাদ পড়ানো, মৃতব্যক্তির আত্মার শান্তিতে মোনাজাত করা ইত্যাদি।
এখন , বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্যতামূলক ইসলাম ধর্ম শিক্ষা আছে দশম শ্রেণী পর্যন্ত।
সেখানে, ১০০ নাম্বারের পুরোটাই লিখিত না রেখে। ৫০ নম্বর ব্যবহারিক রাখা হোক।
কীভাবে মৃতব্যক্তিকে গোসল করাতে হবে, কীভাবে জানাজার নামাজ পড়াতে হবে, কোরবানি কীভাবে করতে হবে, নামাজের ইমামতি কীভাবে করতে হবে সবকিছুর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারিক পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকুক।

সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ যখন এই ধর্মের ব্যবহারিক অনুশাসন ও আচারগুলো ভালোমতো প্র্যাকটিস করবে, তখন এই অনুৎপাদনশীল মাদ্রাসা শিক্ষিতদের উপরে নির্ভরতা কমে যাবে। ভিক্ষাবৃত্তি ত্যাগ করে কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হোক এই জাতি।
কেননা আমাদের যেতে হবে অনেকটা পথ !

[ প্রকাশকালঃ ৩১শে আগস্ট,২০১৬ ]