by Jahid | Dec 1, 2020 | ছিন্নপত্র
আশির দশকে আধুনিক কবিতার একটা লাইন পড়েছিলাম। দুঃখিত কবির নাম মনে করতে পারছিনা। তিনি লিখেছিলেন, “ তখন আমার বয়স ছিল কম , রাতে ঘুম হতো ,আর প্রস্রাবের রং ছিল সাদা।” স্মৃতি থেকে লেখা, একটু এদিক সেদিক হতে পারে। তো, আমার শৈশবেও আমি কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাতাম আর সাদারঙের হিসু করতাম।
যখন শৈশব ছাড়ি ছাড়ি করছে, তখন কীভাবে যেন পড়ালেখার চাপ গেল বেড়ে। স্কুলে প্রথম সারিতে নাম লেখানোর ইঁদুর দৌড়ে পড়ে গেলাম।
আমার যাবতীয় শিশুসুলভ দুঃস্বপ্নের ভিতরে বেশি যেই দুঃস্বপ্ন হানা দিয়েছে বারবার, সেটা হচ্ছে পরীক্ষার হলে গেছি, খাতা পেয়ে প্রশ্ন পেয়ে কিছুই মনে করতে পারছি না। এই স্বপ্নের সিকুয়েল ছিল, কোনবার দেখতাম পরীক্ষা হল খুঁজে ফিরছি, কিন্তু নিজের রুম বা আসন খুঁজে পাচ্ছি না। এদিকে ঘড়ির কাঁটা সকাল ১০টা ছুঁইছুঁই। কোনবার দেখতাম, মাত্র একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি, অথচ স্যার বলছেন তিনঘণ্টা নাকি শেষ, খাতা জমা দিতে হবে। তখন প্রবল বেগে লেখার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। ঘুমের মধ্যেই আমি টের পেতাম কী অসহনীয় শারীরিক ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে প্রতিটা মুহূর্ত।
সে সময়ে আমার ছিল একটা তরতাজা , শক্তিশালী হৃদপিণ্ড । এখনকার মতো ধোঁয়া, ধুলোবালি ভেজাল খাওয়া হৃদপিণ্ড এরকম দুঃস্বপ্নের চাপ নিতে পারবে না। ঘুমের মধ্যেই মাইল্ড অ্যাটাক হয়ে যাবে। আমার ধারণা সবযুগের শৈশবে এই পরীক্ষাভীতি ছিল , আছে সবার ঘুম ভাঙ্গে পরীক্ষার দুঃস্বপ্ন নিয়ে।
দুঃস্বপ্নের কাছাকাছি কিছু কি বাস্তব জীবনে সত্যি ঘটে? আমার হালকার উপর ঝাপসা ঘটেছিল। স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষায় একবার সাধারণ বিজ্ঞান পড়ে গিয়ে সাময়িক দুঃস্বপ্নের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। সে আরেক কাহিনী।
আর বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে, অর্ধেক প্রশ্নের উত্তর না দিতেই দেখি সময় শেষ। খুব দ্রুত সব প্রশ্ন টাচ করে যাওয়ার বিশেষায়িত ট্রেনিং ও টেম্পারমেন্ট দরকার বুয়েটের পরীক্ষায়। মনে হয়, একটা দুইটা প্রশ্ন নিয়ে বেশি সময় নষ্ট করে ধরা খেয়েছিলাম।
পরীক্ষার হলে দেরী করে পৌঁছেছি সারাজীবনে একবারই, বিসিএস পরীক্ষার প্রিলিমিনারি দিতে চেয়েছিলাম নিতান্তই শখে পড়ে। বিসিএস-এ টিকে হাতিঘোড়া হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা, সম্ভাবনা ও প্রিপ্রারেশন কিছুই ছিলনা। আমি তখন বেশ কয়েকবছর টেক্সটাইল কারখানায় চাকরি করে ওপেক্স গ্রুপের মার্চেন্ডাইজিং এ। আত্মীয়স্বজনদের আফসোস থেকে যাবে পরিবারের মেধাবী ছেলে একবার বিসিএস পরীক্ষা দিল না ! তো, সেসময় গার্মেন্টস ও শিপমেন্টের এমনই হ্যাপা, যে একঘণ্টার জন্য বাইরেও যেতে পারি না ; বড়ো স্যারেরা কেউ না থাকলে কাজের চাপে টেবিলে বসেই সিগারেট খেতাম। কে আবার কষ্ট করে রান্নাঘরের কোনায় যায়। আমার অবস্থা সেভেন ইলেভেনের দোকানগুলোর মতো ; সারাক্ষণ একটা না একটা ঝামেলা লেগেই আছে। পরীক্ষার দিন তাই, মহাখালী ডিওএইচএস ওপেক্সের অফিসে হাজিরা দিয়ে একটা স্কুটার নিয়ে সোজা ইডেন কলেজে, যেখানে পরীক্ষার সিট পড়েছে। যথারীতি পরীক্ষা শুরু হওয়ার মিনিট পাঁচেক আগে গেটে। পুলিশ ঢুকতে দেয় না। বেশ কিছুক্ষণ তর্ক করার পর, হলে গিয়ে বসলাম। দৌড়াদৌড়িতে ঘেমে নেয়ে একশেষ। প্রিপারেশন ছাড়া পরীক্ষার আর কীই বা হতে পারে। টিকলাম না।
আরেকটা দুঃস্বপ্ন বহুদিন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে আমাকে। সবসময় দেখতাম একটা বড়ো বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান চলছে, বেশ কিছুক্ষণ পরে খেয়াল করে দেখতাম, কনের পাশের বর-বেশে বিমর্ষ বদনে যে বসে আছে সে আমি ! সেটাও সমস্যা না। বিয়ের স্বপ্ন তো দেখতেই পারে ভেতো বাঙালি। সমস্যা হচ্ছে, কনের বয়স আমার চেয়ে অনেক বেশি। কোন একটা টিভি সিনেমার বয়স্কা নারীকে বধুবেশে বসে থাকতে দেখতাম। কিন্তু আমি না পারছি উঠে দৌড় দিতে ; না পারছি কবুল বলতে। কীয়েক্টাবস্থা !
আরেকটা খুব কমন স্বপ্ন ছিল, গভীর কোন অতল খাদে পড়ে যাচ্ছি। চিৎকার করছি, কিন্তু পতন থামছে না। আমার ধারণা জীবনে অনেকের কাছেই এটা সবচেয়ে কমন দুঃস্বপ্ন।
প্রায়শঃ দুঃস্বপ্ন দেখতাম অচেনা রাস্তায় পথ হারিয়ে ফেলেছি। একবার কিছু চেনা চেনা মনে হয় , হেঁটে সামনে এগিয়ে গেলেই দেখে একেবারে অচেনা কোন বনজঙ্গল রাস্তা ইত্যাদি। অথচ আমার কোথাও যেন যাওয়ার তাড়া আছে, সেটা মনে করে টেনশনে আছি আবার কাউকে জিজ্ঞেস করার মতোও পাচ্ছি না। কী যে একটা পেরেশানি।
‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ!’
শৈশব পেরিয়ে তারুণ্যে আর যৌবনে ঘুরে ফিরে একই ধরণের দুঃস্বপ্নই ছিল।
আর কর্মজীবন শুরু হওয়ার পরে তো সবরকমের স্বপ্ন দেখাই ছেড়ে দিয়েছি। ইদানীং কিছুই দেখিনা বা দেখলেও ঘুম থেকে উঠে কিছুই মনে থাকে না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে, স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙ্গল সেটা ভাবার চেয়ে ব্লাডারের প্রেসার কমিয়ে এসে , পানি খেয়ে শুয়ে পড়ার প্রবণতাই বেশি।
প্রকাশকালঃ ১০ই অক্টোবর,২০২০
by Jahid | Dec 1, 2020 | ছিন্নপত্র
আমাদের আশির দশকের শৈশবে কতো রকমের ফ্যান্টাসি ছিল !
এই প্রজন্মেও আছে নিশ্চয়, কিন্তু সেটা কখনো জানার চেষ্টা করা হয়নি। মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপড়েনে মাসের ২০ তারিখ গেলেই পাশের বাসার খালাম্মাদের কাছে ধারদেনা চাইতে হতো। আমরা একটা কিছু শখ করলাম, আর সেটা সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যাবো, সেটা এটা দুঃস্বপ্নেও ভাবতাম না।
সচ্ছল বন্ধুরা যারা ছিল, দেখতাম অমুকের চাচা আমেরিকা থেকে নতুন গান শোনার ওয়াকম্যান পাঠিয়েছে। অথবা কোন পিকনিকে দেখলাম, তার হাতে নতুন ইয়াশিকা ক্যামেরা। তার মামা পাঠিয়েছে। আমরা শাব্দিক অর্থেই জুলজুল করে সেটা চেয়ে দেখতাম।
চাওয়া আর পাওয়ার এই বিস্তর ফারাক আমাকে মাঝে মাঝে ফ্যান্টাসিতে ভোগাতো। কেন সামান্য একটা বাইসাইকেল কিনে দেওয়া যায় না? অথবা কেন একটা ক্যামেরা আমাদের কেনা হয় না? এসব অপ্রাপ্তি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বেদনা কাজ করত। আর আমাদের বিনোদন যেহেতু ছিল সিনেমা অথবা বিটিভির নাটক, সেগুলো দেখে দেখে কোন কাহিনীর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতাম।
আম্মার কাছে কিছু চেয়ে না পেলে মনে হতো , ধ্যাত্ ! কী একটা গরিবগুরবোর ঘরে এসে পড়েছি রে বাবা ! সিনেমার কাহিনীর বিশাল ধনী কেউ একদিন এসে নিশ্চয়ই বলবে, ‘আরে এই ছেলে তো আমাদের! ভুল করে এই পরিবারে চলে এসেছে ! যাই হোক একে আমরা নিয়ে যাচ্ছি।’ তারপরে সেই সাম্রাজ্যের একক অধিপতি আমি! যা চাই, তাই পাই। চেয়ে না পাওয়ার ফালতু জীবন একদিনে বদলে যাবে।
আবার ভাবতাম, এই যে আমি মহল্লার ভালো ছাত্রদের একজন; অথচ কেউ আমাকে একটু প্রশংসাও করে না ! সিনেমায় দেখায় না, পরিচয় লুকিয়ে মানুষের বাড়ি গৃহপরিচারকের কাজ করছে নায়ক। সে রকমটি করে যদি পরিচয় লুকিয়ে কোন বিশাল বড়লোকের বাড়ির কাজের ছেলে হই ; তাহলে আমার এইযে পাটিগণিত, বীজগণিতের দক্ষতা সেই বাড়ির সুন্দরী কন্যাকে হুট করে একদিন দেখিয়ে দিতে পারতাম। তারপর ধন্য ধন্য পড়ে যেতো। সবাই টের পেত, আহা , ছেলেটি তো হীরের টুকরো ! তারপর আর কী ! সেই ফ্যান্টাসি বড়লোকের একমাত্র উর্বশী কন্যার সঙ্গে প্রেম পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতাম।
কর্পোরেট চাকরির প্রথমদিকে একটা ফ্যান্টাসি ছিল কিছুদিন। এই যে, আমরা সাপ্লাই চেন ম্যানেজমেন্টের একধাপ উপরে আছি বলে কারখানার ছোটখাটো খুঁত ভুলত্রুটি বের করে খুব বাহাদুরি দেখাই। ভাবখানা, আমাদের না জানি কতো জ্ঞান গম্মি ! পরিচয় লুকিয়ে কোন ছোট্ট প্রতিষ্ঠানে, খুব ছোট একটা পদে যোগদান করতে পারি, তাহলে কী হতে পারে ! তাহলে, আমার অভিজ্ঞতা থেকে কার্যকরী জ্ঞান প্রয়োগ করে, ঠিক ঠিক উল্টোভাবে কর্পোরেট অফিসের নাদানদের নাকি দড়ি দিয়ে ঘোরাতাম !
অথবা এই যে ,সেলস আর মার্কেটিং এর জন্য বিদেশে বিদেশে ঘুরি। এমন কী হতে পারে, পরিচয় লুকিয়ে কোন ছোট্ট শাড়ির দোকান অথবা মনোহারী দোকানে সেলসম্যান হলাম। বা কোন একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ বা ছোট্ট হোটেলে বেয়ারার চাকরি করা শুরু করলাম। এটাতো সম্ভব, কে আর মানা করবে ! আমি যদি ঢাকার দূরপ্রান্তে অথবা ঢাকার বাইরের গিয়ে করি, কেউ তো আর চিনবে না যে, আমি টেক্স-ইবোর জাহিদ ! আর যদি পরিচিত কেউ যদি চিনেও ফেলে, এমনও তো হতে পারে সে আমাকে না চেনার ভাণ করে একটু বেশি বখশিশ দিয়ে চলে গেল। সেই লোক বাসায় ফিরে নিজের স্ত্রীকে আর ফোন করে বন্ধুদের বলল, ‘জানিস, জাহিদ সাহেব ছিল না, সেতো এখন এই করে চলছে, আহা !’
পশ্চিমের দেশে এটা সম্ভব।পৃথিবীর সবদেশ থেকে কতো তাবৎ বড়ো মাপের লোকেরা নিউইয়র্কে, প্যারিসে গিয়ে ট্যাক্সি চালায়, ওয়ালমার্টে বাচ্চাদের ন্যাপি বিক্রি করে।যদিও সেটা আরেক জীবনসংগ্রামের কাহিনী। ওখানে তো আর পেশার জাত্যভিমান নেই। একজন ইউনিভার্সিটি শিক্ষকের জন্যও পার্টটাইম অড জব খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।
আমাদের দেশে পরিচয় লুকিয়ে কাজ করার সুবিধা একমাত্র গোয়েন্দা সংস্থার আছে। এরশাদশাহীর আমলে তার স্বৈরাচার সামলানোর জন্য চারিদিকে ছদ্মবেশী গোয়েন্দারা ঘুরতো। হ্যাঁ ,পরিচয় লুকিয়ে কাজ করার সুবিধা আছে আমাদের সরকারী কর্মকর্তা ও মন্ত্রী আমলাদেরও। কেমন করে যেন, তারা যে আসলে ‘জনগণের সেবক’ ; সেই পরিচয় দিব্যি লুকিয়ে ফেলেছে আর সামন্ত-প্রভুদের মতো কুৎসিত থেকে কুৎসিততম আচরণ করছে আমাদের আমজনতার সাথে !
‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ!’
শৈশব পেরিয়ে তারুণ্যে আর যৌবনে আমাদের প্রজন্ম কী কী ধরণের ফ্যান্টাসিতে ভুগেছে, সেটা বোধকরি কখনই বলা ঠিক হবে না। বুদ্ধিমানদের জন্য ইশারাই যথেষ্ট!
প্রকাশকালঃ ৮ই অক্টোবর,২০২০
by Jahid | Nov 25, 2020 | শিল্প ও সংস্কৃতি, সমাজ ও রাজনীতি, সাম্প্রতিক
(পুরনো ও প্রিয় একটি লেখা, যা এই অস্বস্তিকর বাংলাদেশের জন্য সবসময় প্রাসঙ্গিক।)
আজ সকালে কন্যাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে ভাঙ্গাগাড়ীতে পুরনো সিডি খুঁজছিলাম, কিশোর কুমারের একটা বাংলা সিডিও পেলাম, চালু করতেই সেই ঐশ্বরিক দরাজ গলা বেজে উঠলো।
“তারে আমি চোখে দেখিনি , তার অনেক গল্প শুনেছি,
গল্প শুনে তারে আমি অল্প অল্প ভালোবেসেছি।।
আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন,
বইতে পারে না তারও বিবশ মন ;
ভালোবাসার ভালো কথা শুনে নাকি শিহরিয়া যায় শুনেছি।।
চোখেতে তার স্বপ্ন শুনি ভীড় করে থাকে,
মরণ শুনেছি হাতছানি দিয়া ডাকে,
বিষের আবার ভালোমন্দ কীরে যখন আমি মরতে বসেছি !!! ”
কিশোর কুমার , মান্না দে আমাদের দুই প্রজন্ম আগের হলেও এঁদের গান আমাদেরকেও মাতিয়ে রেখেছিল। বাংলাব্যান্ডের উত্থানের সমসাময়িক সময়ে ফিতা ক্যাসেটের যুগে এঁরাই ছিলেন আমাদের সবচেয়ে কাছের।
গানের লাইনটি আবার খেয়াল করুন , ‘আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন, বইতে পারে না তারও বিবশ মন !’
দৃশ্যকল্পটি কেমন? যৌবন ছল্কে পড়ছে, উদ্ভিন্ন বাঁকগুলো আপনাকে মুগ্ধ করছে।
যদিও আমি আমার কন্যাকে স্কুলের গেটে নামিয়ে অপেক্ষারত , তারপরেও ভণ্ডামি না করে বলতে পারি, আমার ‘পুরুষ-চোখ’ কিন্তু ঠিক ঠিকই অতিক্রম কারিণী সকলের , যাঁদের যৌবন ছল্কে যাচ্ছিল তাদের দেখছিল।
বর্তমানের একাধারে নারীদের উপর নিরবচ্ছিন্ন যৌন নিপীড়নের হেডলাইন দেখতে দেখতে আমি বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত। পুরুষ হিসাবে আমি লজ্জিত। মনোবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নানা কুইক রেন্টাল টোটকা দিয়ে এই ভয়াবহ অসুস্থতা থেকে উঠে আসার পথ , উত্তরণের বাৎলাচ্ছেন।
কিন্তু আমার মনে হয়, পুরোপুরি উৎপাটন করা সম্ভব না হলেও এই অসুস্থতার সার্বিক নিরাময় সম্ভব। এবং সেটা শুধুমাত্র শৈশবে সঠিক যৌন শিক্ষার মাধ্যমে।
বালককে বুঝতে হবে, সে শিশ্ন-ধারী মানুষ ঠিক আছে, কিন্তু বালিকা শিশ্ন-হীন দ্বিতীয় লিঙ্গের দুর্বল কেউ না। বালককে নারীর মাহাত্ম্য বোঝাতে, নারীর মর্যাদা শেখাতে খুব বেশী সময় লাগারতো কথা না। বালকের মা আছে, বোন আছে, অন্য শ্রদ্ধেয়া আত্মীয়ারা আছেন। তাঁদের উদাহরণ দিয়ে তাকে নারীর মর্যাদা শেখাতে হবে।
রহস্যময় দৈহিক বাঁক নিয়ে যে নারী সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সে একজন মানুষ এবং তোমার চেয়েও অধিকতম মানুষ। বংশগতির ধারা বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুনরুৎপাদনের বিশাল শারীরিক যন্ত্রণার দায়িত্ব প্রকৃতি তাঁকে দিয়েছে। বালককে বুঝতে হবে , বোঝাতে হবে নারী শুধুমাত্র স্তন ও যোনীর সমষ্টি একটা ভোগের বস্তু নয় !
পরিবারের কাছ থেকে শিক্ষাটা পেলে ভাল। নইলে শিক্ষায়াতনে। পরিবারের একজন পুরুষকে দেখলে প্রথমেই আমরাতো তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করি না !
পোশাক, জুতা, আর্থিক-সামাজিক অবস্থা হেন তেনর পরে তার বিশাল বপু বা স্থূলত্ব নিয়ে কথা হয়।
কিন্তু একজন নারীকে দেখলে কেন প্রথমেই তাঁর স্তন ও নিতম্বের দিকে জুলজুলে নজর যাচ্ছে ? সমস্যাটা কোথায় ? তাঁর অন্যসব বৈশিষ্ট্য কেন আলোচিত হয় না ? একজন কিশোরী , তরুণী আমার সামনে এসে প্রথমেই কেন তাঁর বুক আঁচল বা ওড়না দিয়ে ঢাকাঢাকি করা শুরু করে দেয়। কী তাঁকে ভীত করে তোলে, যে সামনের পুরুষটির ( হোক সে কিশোর, তরুণ , মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ) সামনে সে ঠিক নিরাপদ বোধ করে না ! কে তাঁর মনে এই অ-নিরাপত্তা ঢুকিয়ে দিয়েছে?
বাদ দিই, তাত্ত্বিক আলোচনা। সাহস বা দুঃসাহস করে যদি আমার প্রজন্মের যৌন শিক্ষার ইতিহাস আলোচনা করি , তাহলেও কী কিছুটা ধারনা পাওয়া যাবে না !
অন্য সকলের মতোই আমারও কৈশোরের অসহনীয় বয়ঃসন্ধির একাকীত্ব, দেহের অনাকাঙ্ক্ষিত বেড়ে ওঠা ছিল। ছিল মন খারাপ করা বিকেলবেলা। নিজেকে অপাঙতেয় , তুচ্ছ , অবহেলিত ভাবার দুঃসহ দিনরাত্রি। আমি মোটামুটি নজরে পড়ার মতো ভালো ছাত্র ছিলাম। পরিবারের ও শিক্ষকদের আলাদা একটা এক্সপেকটেশনের ভার আমাকে বইতে হতো। কিন্তু আমিও তো একটা কিশোর। আমার যে ছেলে বন্ধুটি , মেয়েদের স্কুলের সামনে যেয়ে সদ্য কিশোরীদের উদ্ভাসিত চাহনি, রহস্যময় বাঁক দেখে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গল্প করতো ,তাতে আমার মনটাও তো হু হু করে উঠতো।
সে ছিল এক কল্পনার রাজ্য। যদিও আমার শারীরিক মানসিক বৃদ্ধির সমানুপাত বৃদ্ধির পরিমাপ নিয়ে আমার পরিবারে দ্বিধা আছে।আমার মানসিক বৃদ্ধি শরীরের তুলনায় শ্লথ। আমি স্তন্যপায়ী ছিলাম ৬ বছর বয়স পর্যন্ত। এবং কেন জানিনা , আম্মাও আমার অত্যাচারকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন অতোগুলো বছর। বছর পাঁচেক পর্যন্ত আমার বেড়ে ওঠা নানাবাড়ি কুষ্টিয়াতে। অস্পষ্ট আবছা মনে আছে, হয়তো স্মৃতিতেই পুনঃ-নির্মিত হয়ে আছে। গ্রামের বাচ্চারা ছিল যৌনতার ব্যাপারে অকালপক্ব । সহচর-সহচরী খেলার সাথীদের হঠাৎ বাল্যবিবাহ, তাঁদের যৌনতার অভিজ্ঞতার নিষিদ্ধ আলোচনা তাদেরকে পাকিয়ে দেয়। কোনটা শিশ্ন, যোনি, স্তন, কোনটার কী কাজ, সেটা আমাদের সময়ে আমাদের গ্রামের খেলার সাথীরা ভালোই বুঝতো। পুরোপুরি নাগরিক হতে হতে ৭৯ সাল। প্রতি ঈদে পার্বণে নানাবাড়ি যেতে হোত, যৌন জ্ঞানের পার্থক্যটা তখন চোখে পড়ার মতো ছিল । মোরগ-মুরগী বা কুকুরের সংগমে আমার বিন্দুমাত্র উৎসাহ না থাকলেও গ্রামের শিশুদের জন্য সেটা ছিল নিষিদ্ধ আনন্দ।
বছর সাতেক থেকে তেরো চৌদ্দ পর্যন্ত সেই অর্থে আমার যৌন চেতনা ছিলনা। অন্তত: আমার কিছুই মনে নেই।ক্লাস ফাইভে আমার সহপাঠিনী মিতু প্রেম করা শুরু করলো বা অধুনা যেটাকে বলে ক্রাশ খেল অপু নামের জনৈক নবম শ্রেণীর উদীয়মান গায়কের সঙ্গে। ওইটা আমার মনে আছে।
ক্লাস সিক্সে স্কুলের পরিবর্তন। স্কুল পরিবর্তনের পরে , নতুন স্কুলের পোলাপানের সঙ্গে এলোমেলো সখ্যতা গড়ে উঠল। ফার্স্ট বয় থেকে লাস্ট বয় সবাই আমার বন্ধু ছিল। সবাই আমাকে আপন করে নিল।
বাসায় মামা চাচা ও গ্রামের আত্মীয়স্বজন অপর্যাপ্ত। দুই বেডরুম,ডাইনিং বাসাতে মাসের বেশীরভাগ দিন আমাকে নিজের বিছানা ছেড়ে দিয়ে ফ্লোরিং করতে হোত। দেশের বাড়ির কেউ না কেউ, হয় চিকিৎসা নয় এয়ারপোর্ট বা চিড়িয়াখানা দেখতে বাড়িতে জিইয়ে থাকত।
বাসায় মামা , চাচা কেউ না কেউ যাওয়া আসার মধ্যে থাকতোই। তাদের ফিসফিসে নারীদেহ নিয়ে কথাবার্তা কানে বাজতো। হ্যাঁ, নারীর নগ্নদেহের ছবি একটা শিরশিরে অনুভূতি এনে দিত। মামা-চাচাদের কারো না কারো অসাবধানে বিছানার তোষকের তলায় ফেলে রাখা নিউজপ্রিন্ট ছাপার পর্ণ পত্রিকা হাতে পড়লো। বেশ কয়েকদিন লুকিয়ে লুকিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলাম। সম্ভবত: অর্ধ-নগ্ন ছবির একসেট প্লেয়িং কার্ডও লুকিয়ে লুকিয়ে কিছুদিন দেখেছিলাম। তো, প নামের এক নতুন স্কুল-বন্ধু স্বমেহনের ব্যাপারটা কেমন করে যেন মাথায় ঢুকিয়ে দিল। আমি জানি না, আমার সব বন্ধুদের সবাই, হয়তো নিজে নিজেই স্বমেহনের আনন্দ পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু, এটা কেই আমরা একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করতাম না। এর মাঝে কেউ কেউ স্বমেহন যে খারাপ তা বলে তীব্র অপরাধ-বোধ ঢুকিয়ে দিল। এটা খুব খারাপ, পাপ হবে, শরীর শুকিয়ে খারাপ হয়ে যাবে, স্মৃতিশক্তি নষ্ট হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্লাস সেভেন বা ক্লাস এইট পর্যন্ত যৌনমিলনের ব্যাপারে আমার জ্ঞানের পরিধি ছিল এই যে, শারীরিক মিলনে পুরুষাঙ্গ ও নারীর পায়ুপথ ব্যবহৃত হয়। অবশ্য এইটের শেষের দিকে ক্লাসের অভিজ্ঞ ডেঁপো ছেলেদের জ্ঞান বিতরণে মানব-মানবীর শারীরিক মিলনের সব কিছু সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল !
কিন্তু পড়াশোনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা , কৈশোরের একাকীত্ব স্বমেহনের দিকেই ঠেলে দিয়েছিল আমাকে ও আমাদেরকে।
এসএসসি পরীক্ষার পরপরই আমরা ঘোষণা দিয়ে বড়ো হয়ে গেলাম। এখন আমরা সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরতে পারব। আমরা কলেজ ছাত্র। এবং ‘জ’ নামের এক বন্ধুর বাড়িতে আমাদের প্রথম দলবেঁধে পর্ণ-ছবি দেখা। ঢাকা কলেজে ভয়ঙ্কর মেধাবী মেধাতালিকার বন্ধুদের ছড়াছড়ি। আমরা মিরপুরের ছেলেপেলে ছিলাম নিতান্ত মফস্বলী মফু । গভর্নমেন্ট ল্যাব: বা ধানমণ্ডি বয়েজের পেন্টিয়াম ভার্সনের পোলাপানের কাছে আমরা ছিলাম ডজ মুডের কম্পিউটার। একদিন কেউ একজন আমাদের মিরপুরবাসীকে জিজ্ঞাস করলো আমরা বাংলা পর্ণ বা চটি পড়েছি কীনা। নেতিবাচক উত্তর পেয়ে সে বললো , তোরা তো এখনও শিক্ষিতই হস্ নাই, আয় তোদের শিক্ষিত করি। তো ওই চটি পড়ে আমরা অদ্ভুতুড়ে কিছু পশ্চিমবঙ্গীয় যৌনাঙ্গের ও মিলন পদ্ধতির নাম শিখলাম। বেশীরভাগ পুস্তিকা বটতলায় ছাপানো, নীলক্ষেত উত্তম ভাঁড়ারঘর ছিল সকল কলেজ-গামী ছাত্রদের কাছে।
আমার ধারনা, আমাদের মানসিক গঠনে, ওই সামান্য তথ্য বিকৃতি তেমন দীর্ঘমেয়াদী ছাপ ফেলতে পারে নাই। সমাজ ও পরিবারের এক্সপেকটেশনের চাপ আমাদেরকে অনেকটা একমুখী করে রেখেছিল( স্বমেহনের ব্যাপারটা ছাড়া। পরবর্তীতে আমি পড়াশোনা করে কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারি, স্বমেহন অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। পাপ আর স্বাস্থ্যভঙ্গের ভুল বিকৃত তথ্য যদিও আমার কৈশোরের একটা অংশ বিষময় করে দিয়েছিল। )
বয়েজ স্কুলে পড়লেও নানা কারণে কোচিং ও মহল্লার ভালো ছাত্র হওয়ার বদৌলতে সতীর্থ সমবয়সী বান্ধবী ছিল। কিন্তু ওদের মানসিক পরিপক্বতা ছিল আমার বা আমদের চেয়ে বছর দশেক এগিয়ে। সম্পর্কটা ছিল নিতান্তই বড়বোন-ছোটভাই টাইপের। বিকৃতিহীন স্বাস্থ্যকর।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির জীবনে নতুন করে কোন তাত্ত্বিক বা ব্যবহারিক জ্ঞানের সম্ভাবনা ছিল না।
যথারীতি কয়েকজন প্লেবয় বন্ধু ছিল, যাদের ব্যবহারিক জ্ঞান ওই পর্ণ-পত্রিকার গল্পের চেয়েও উত্তেজক ছিল। তারা তাদের যৌন অভিজ্ঞতার কথা বলত। আমরা অবদমিত মন নিয়ে তাদের রোমাঞ্চের ও মৈথুনের শীৎকার শুনতাম ও দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। তারপরে তো বিবাহিত জীবন, ‘দারা পুত্র পরিবার , তুমি কার কে তোমার !’
স্কুলকলেজের ডেঁপো বন্ধুদের কেউ কেউ, ভিড়ের বাসে আরেকজনের সাথে ধাক্কা খেয়েছে বা ধাক্কা না খেয়েই কল্প গল্প বানিয়ে বলেছে এটা বোঝা মুশকিল ছিল । যৌনতার ব্যাপারে ওই বয়সটা ছিল, সবকিছু বিশ্বাস করার, হা করে শোনার।
আমাদের প্রজন্মের মধ্যবিত্ত পরিবারের বেড়ে ওঠা অ্যাভারেজ একটা ছেলের যৌন-জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেকটা আমার মতোই। ছোটখাটো ভুল তথ্য ,স্বমেহন বা পর্ণ ছাড়া আমি কোন বিকৃতি দেখিনা।
কিন্তু এর মাঝে মধ্যবর্তী নতুন একটা বিকৃত প্রজন্ম এসেছে ; যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের শ্লীলতাহানি করছে, বা মাইক্রোবাসে তরুণীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করছে, তাদেরকে আমি চিনি না। দুর্ভাগ্য, এই বিকৃতদের সাথেই প্রতিমুহূর্ত বসবাস করতে হচ্ছে আমাকে আমাদেরকে !
[ প্রকাশকালঃ ১৪ই জুন,২০১৫ ]
সাম্প্রতিক মন্তব্য