প্রসঙ্গ শিক্ষা ও বিভেদ

[সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: আমার পক্ষে অনেক গবেষণা করে কিছু লেখা মুশকিল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমি আমার প্রজন্মের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যা উপলব্ধি করেছি, দেখেছি তাই বলার চেষ্টা করি। অনেক রেফারেন্স বই ঘেঁটে ভারী ভারী লেখকের নাম দিয়ে প্রবন্ধ লেখা আমার সাধ্যাতীত। লেখা বড় হয়ে গেছে, তবে আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। ]

ছোটবেলা থেকে চারপাশে মোটা দাগে তিন রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা দেখে আসছি। বাংলা মিডিয়াম, ইংরেজি মিডিয়াম এবং মাদ্রাসা। এছাড়া কারিগরি শিক্ষা নামের কিছু একটা শুনতাম ভাসাভাসা। যে শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে ভারী হওয়ার দরকার ছিল, সেটাই ছিল নিভুনিভু !
বাংলা মিডিয়ামে বর্ণবৈষম্য ছিল।

এলাকা ও স্কুলের আভিজাত্য ভেদে সেখানে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র ছিল। ক্যাডেট কলেজগুলো , গভঃ ল্যাব, ধানমণ্ডি বয়েজ, হলিক্রস, ভিকারুন্নেসাসহ ঢাকার কিছু উঁচু সারির স্কুলকে ব্রাহ্মণ ধরলে প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলগুলো ছিল শূদ্র। অধুনা জাতীয় শিক্ষাবোর্ডের পুচ্ছে আরেক পালক সংযুক্ত হয়েছে ইংরেজি ভার্সন। অভিজ্ঞ শিক্ষক ও অবকাঠামোর অভাবে কয়েকটি ব্রাহ্মণ স্কুল ব্যতীত বেশির ভাগ স্কুলের ভার্সনের শিক্ষাদান তথৈবচ।

ইংরেজি মাধ্যমেও এই শ্রেণিবৈষম্য আছে।
ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের প্রথম থেকেই যে অভিযোগ ছিল আমাদের সময়ে , সেটা হচ্ছে এরা নিজভূমে পরবাসী। এরা গুচ্ছের অর্থনাশ করে বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো তৈরি হওয়া স্কুলগুলোতে যা শেখে আর যা শেখে না, সে আরেক বিশাল আলোচনা। তবে মূলত: এদের সিলেবাস পশ্চিমের তাই দেশের ব্যাপারে অনেকখানি উদাসীন, নিজের সমাজ ও পরিপার্শ্ব নিয়ে উদাসীন। নিজেদেরকে কুলীন ভাবে । সমাজের সবচেয়ে সম্পদশালী বাবা-মায়ের সন্তান হিসাবে এদের পরিপার্শ্ব থেকে এদের উদ্দেশ্যই থাকে কবে ভালোভাবে পড়া শেষ করে বিদেশে পাড়ি জমাবে।

মাদ্রাসায় আছে প্রধান দুইভাগ, কওমি, ফোরকানিয়া আর আলিয়া। আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাসে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান আছে। কওমি, ইবতেদায়ি, হাফিজিয়া মাদ্রাসাগুলোতে কিছুই নাই। আমার নানা লেখায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজের ব্যাপারে তিক্ততা আছে। আমি যে সমাজে বড় হয়েছি, সেখানে বড় একটা হাফিজিয়া মাদ্রাসা ছিল। ছোটবেলা থেকেই এদের ভিক্ষাবৃত্তি আমার মনে সহানুভূতির পাশাপাশি ক্ষোভের কারণ হয়েছে। প্রথম থেকেই মনে হয়েছে, দেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠীকে অনুৎপাদনশীল করে রাখার এই শিক্ষাব্যবস্থার কোন মানে হয় না।

মাদ্রাসা শিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা আমার কাছে মনে হয়েছে অর্থনৈতিক পরগাছা হয়ে বেঁচে থাকার পাশাপাশি এরা , জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সবকিছুর ব্যাপারে এরা একটা অমূলক বিদ্বেষ নিয়ে বেড়ে ওঠে। এর মূল কারণ স্বল্প শিক্ষিত ধর্মীয় গোঁড়ামি নিয়ে বেড়ে ওঠা এদের শিক্ষকরা। সমাজের সবধরনের প্রগতিশীলতা আর আধুনিকতাকে এরা তীব্র ঘৃণার সঙ্গে দেখে। এভাবেই সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় বেড়ে ওঠা একজনের সঙ্গে এদের মৌলিক মানসিক পার্থক্য গড়ে ওঠে। যথারীতি সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদেরও মাদ্রাসা-শিক্ষিতদের ব্যাপারে স্পষ্ট তাচ্ছিল্য থাকে।

বেশ কয়েকবছর আগে আমার কাছের এক বড়ভাইয়ের সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে প্রায় সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। প্র্যাকটিসিং মুসলমান হিসাবে তিনি তাঁর এলাকায় একটি মাদ্রাসা চালান। তর্কে তো আর কেউ জেতে না। তাই , নানা তর্কের পরে ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা, প্রতিক্রিয়াশীলতার বাইরে গিয়ে যে কথা উনি আমাকে বোঝাতে চাইলেন যে, তিনি কষ্ট করে হলেও গরীব ঘরের বাচ্চাগুলোকে দুইবেলা খাওয়ার ও নৈতিকতার ছায়াতলে আনতে পেরেছেন। মাদ্রাসার বাইরে থাকলে ঐ বাচ্চাগুলো সমাজের অধিকতর ক্ষতির কারণ হতো। ধর্মান্ধতা তো থাকতই, বরং ক্ষুধা ও অভাবে ছিনতাইকারী বা রাজনৈতিক দুষ্কৃতিকারী হয়ে উঠতো। যেমনটা হচ্ছে গ্রামের প্রান্তিক সমাজে ও ঢাকার বস্তির শিশুদের। আমাকে তর্কে ক্ষান্তি দিতে হয়েছিল সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে। হয়তো আমার ঐ বড়ভাই গভীর মমত্ব থেকেই মাদ্রাসার শিশুদের ব্যাপারে কথাগুলো বলেছিলেন এবং তিনি সেটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে মাদ্রাসাটি চালাতেন।

পরবর্তীতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখেছি সাধারণ শিক্ষার ছাত্ররা , হোক সে উপজেলা-জেলা শহরের অথবা ঢাকার ব্রাহ্মণ সমাজের, তারা খুব সহজেই নিজেরা কাছাকাছি হয়েছে, বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ইংরেজি মিডিয়ামরাও কোন না কোনভাবে মূলধারায় মিশে গেছে । সামাজিক সমতা অথবা প্রায় কাছাকাছি শিক্ষাব্যবস্থা এই কয়েকটা শ্রেণির মিলেমিশে কাজ করাতে তেমন বড় বাঁধার সৃষ্টি করে নাই।
সমস্যা হচ্ছে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মাদ্রাসার। মূলত: কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের। আমার বেড়ে ওঠা ঢাকার শহরতলী মিরপুরে। গ্রামের ব্যাপকতা আমার চোখে ধরা পড়েনি। তবুও একটা ব্যাপারে গ্রাম ও শহরতলীর মিল আছে। বাবা-মা , তাদের কয়েকটা সন্তানের ভিতর থেকে যে কোন একজনকে মাদ্রাসা বা ধর্মশিক্ষায় পাঠানোর দ্বিবিধ কারণ থাকত। প্রথমত: আখিরাতের সুরাহা করা, হাফেজের পিতামাতা কোনভাবেই দোজখে যাবে না, ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত: ও প্রধানত: অর্থনৈতিক কারণ। অসহনীয় দারিদ্র্যের কারণেই মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীর ঢল কমেনি কখনোই।

আশির দশকে সাধারণ শিক্ষার প্রভাব বেশি ছিল। জাতীয় শিক্ষা বোর্ডের ইংরেজি মাধ্যম একটা ছিল ; সেটা টের পেতাম এসএসসি ও এইচএসসির প্রশ্নপত্র ঘাঁটতে গিয়ে। শুনতাম কাতারে, কুয়েতে বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশে থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাসে ইংরেজিতে পরীক্ষা দিচ্ছে এসএসসি বা এইচএসসি। মিরপুরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মহল্লায় কাউকেই দেখিনি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়তে। কোন কোন বন্ধুর বড়লোক আত্মীয় যারা গুলশান, বনানী বা ধানমণ্ডি থাকে তাদের কেউ কেউ পড়তো। অবাক ব্যাপার আমাদের বাংলা মিডিয়ামের ছেলেমেয়েদের ওদের ব্যাপারে একটা ঈর্ষামিশ্রিত তাচ্ছিল্য বা উন্নাসিকতা থাকত। কাউকে সামনে পেলে ‘ কী হে আলালের ঘরের দুলাল’ টাইপের একটা চাহনি দিতাম। মেডিক্যালে , বুয়েটে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন বন্ধু জুটে গেল ইংলিশ মিডিয়ামের। আশ্চর্য ! ওদের ব্যাপারে যে উন্নাসিক ধারণা ছিল, চলে গেল। এদের অনেকে বাসায় রবীন্দ্রসংগীত শেখে, সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা চেনে।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পাশ করা , মেধাতালিকায় জায়গা পাওয়া তুখোড় একজন এসে আমাদের সম্মিলিত মেধাতালিকায় বরাবর দ্বিতীয় স্থান দখল করে বসে রইল। আরো কয়েকজন আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে আমার। তেমন কোন মানসিক দূরত্ব অনুভব করিনি।

কয়েকমাস আগে বাম রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এক বড়ভাইয়ের বাসায় দাওয়াতে গিয়ে কথা হচ্ছিল। ভাবী আর ভাই দুজনেই তাদের সন্তানদেরকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িয়েছেন।আমি যখন মনে করিয়ে দিলাম, সারাজীবন সাম্যবাদী রাজনীতি করে বাচ্চাগুলোকে তো পশ্চিমের জন্য তৈরি করছেন। তখন তাঁদের কণ্ঠে বিষাদ। নানা বাদানুবাদের পরে আমাকে ইন্টারেস্টিং যে ব্যাপারটা উনি মনে করিয়ে দিলেন বা যেই ব্যাপারটা আলোচিত হল, সেটা হচ্ছে ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থীরা কোনভাবেই দেশে থাকছে না কেন। ও-লেভেল , এ-লেভেল পাশ করে সাধারণ উচ্চশিক্ষায় এদের জায়গা কোথায় ?

দেশ চালাচ্ছে যারা, সেই প্রশাসন , কাস্টমস সবাইতো সেই কৃষকের ছেলেই। গত কয়েক দশক ধরে ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেপেলে গুলো কেন সরকার ও প্রশাসন ও পুলিশ সেনাবাহিনীতে নেই। থাকলেও সেটার পারসেন্টেজ এতো কম কেন?

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এক আলোচনায় বলেছিলেন উনিশ-শতকী প্রজন্মের কথা। প্রথম প্রজন্মের মানুষ শুধু সম্পদ কিনে চলে। পায়ের তলার মাটির জন্য জন্তুসুলভ বর্বর রাক্ষসের মতো গোটা পৃথিবীকে দখল করতে চায়। এদেরকে বলা হয় ‘কেনারাম’। দ্বিতীয় প্রজন্ম বিনাশ্রমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে বসে। নতুন করে রাষ্ট্রীয় লুণ্ঠন আর দস্যুবৃত্তিতে না জড়িয়ে শুরু হয় তাদের বাবুগিরি। এই প্রজন্মকে বলে ‘বাবুরাম’। এদের চালচলন কিছুটা রাজকীয় হয়। এরা সবাই বাবার জন্তু প্রকৃতি পেলেও দশভাগ পায় দেবতা-প্রকৃতি। শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি ও সামাজিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে কাজ করে বলে এদের আত্মোৎসর্গ হয় প্রথম প্রজন্মের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
তৃতীয় প্রজন্মের নাম ‘বেচারাম’। এরা বৈষয়িক ব্যাপারে আগ্রহহীন কিন্তু উচ্চতর ও সূক্ষ্মতর চেতনার মানুষ।পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া ধনসম্পদ বিক্রি করে , শ্রেয়তর কাজে চায় আত্মার চরিতার্থতা। যদিও সবাই এটা করেনা, মানুষের একদিকের দশভাগ যেমন দুরারোগ্য দেবতা তেমনি অন্যদিকের দশভাগ দুরারোগ্য জন্তু। স্যারের ধারণা ছিল, আমাদের স্বাধীনতার পরের কয়েক দশক যাবে কেনারামদের। বিংশ শতাব্দীর প্রথমে বাবুরামদের প্রজন্ম চলে আসবে। যাঁদের ততটা আর্থিক কষ্ট করতে হচ্ছে না, তাদের হাতে থাকছে পৃথিবীকে ভালোবাসার সময় , চারপাশের দুঃখে ব্যথিত হওয়ার অবসর। স্যার তাঁর ছাত্রদের সঙ্গে রসিকতা করে বলতেন বাবুরামের বাবারা ঘুষ খেয়ে, খুন করে রাষ্ট্রীয় দস্যুবৃত্তি করে করে আরো একবার তাদের উত্তর প্রজন্মকে সেই ঘৃণ্য কাজগুলো করার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে গেছেন। স্যারের আশা নদীর প্রথম বর্ষার উন্মত্ত হিংস্রতার পরে জলধারা সুস্থির হয়। সবসময়ই দ্বিতীয় প্রজন্ম প্রথম প্রজন্মের তুলনায় তুলনামূলক ভাবে আর্থিক কষ্ট সম্পর্কহীন নির্লোভ উদার মূল্যবোধ নিয়ে দেখা দেয়। এছাড়া দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেকে বিদেশে থাকে সেখান থেকে পাওয়া উচ্চতর মূল্যবোধগুলোকে জাতিতে যুক্ত করে । হা হতোস্মি !

সত্যি কথা বলতে কী, সচ্ছল মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া সন্তানেরা ‘বাবুরাম’ শ্রেণির। উচ্চবিত্ত বাবাদের সম্পদের উপরে বসে সমাজের সবচেয়ে ভালো শিক্ষাটা পায় । সম্পদ তৈরি করার সেই পাশবিক পরিশ্রম করতে হয় না তাদের। অমানুষিক দারিদ্র্য থাকে না বলে একটা সুস্থির নৈতিকতা তৈরি হয় তাদের মাঝে। অথচ এই সুবিধাভোগী যত্নআত্তি করে তৈরি করা প্রজন্মটাকে কোনভাবেই সমাজের মেইন স্ট্রিমে রাখা যায় না।

কেন সচ্ছল ‘কেনারাম’ পিতাদের ‘বাবুরাম’ সন্তান শ্রেণীকে কোনভাবেই দেশের মেইনস্ট্রিমে রাখা যাচ্ছে না। রাখার কোন ব্যবস্থা আমলাতন্ত্র ও রাষ্ট্র আদৌ চায় কীনা সে ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত সন্দেহ আছে।

দুই-যুগ আগে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ভর্তি হওয়ার জন্য এদের সিলেবাস যথোপযুক্ত ছিল না। এদের ‘ও’লেভেল, ‘এ’ লেভেল শেষ হওয়ার আগে ইউরোপ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাগজপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যেত। অধুনা প্রাইভেট হাসপাতালের মতো যথেচ্ছ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় একশ্রেণীর উচ্চবিত্তদের সন্তানেরা দেশে থেকে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। পড়া শেষে এরা বাবার তৈরি ব্যবসায় লেগে পড়ছেন অথবা অগতির গতি বড়ো বড়ো মাল্টিপারপাস কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেরানিগিরি করতে ঢুকে পড়ছেন।

আমাদের সরকারি ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোডাক্টগুলো করুণ অবস্থা দেখলে মনে হয়, চীন যেমন চায়না রেভুলশনের সময় উচ্চশিক্ষা বন্ধ করে কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দিয়েছিল, আমাদেরও তাই করা উচিৎ । নানা তর্ক-বিতর্ক থাকলেও আমার মনে হয়, শত শত বিশ্ববিদ্যালয় আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২টা প্রশ্ন পড়ে ৮টা কমন পড়ে নানাধরনের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে আমাদের আখেরে লাভ হয়নি কিছুই ; প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ প্রস্তুতি-হীন বেকার তৈরি করা ছাড়া। আর শহর হোক আর গ্রাম হোক, কোনভাবে কেউ গ্রাজুয়েশন করে ফেললে সে আর কোনরকমের কায়িক পরিশ্রমের, কারিগরি, কৃষি, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কোন কিছুতেই আগ্রহ প্রকাশ করে না। সামাজিক ও পারিবারিক চাপে সেই সদ্য গ্রাজুয়েটের একমাত্র মোক্ষ থাকে একটা চাকরির ! একটা ‘বসার চেয়ার’ পেলেই সে বর্তে যায়। ব্রিটিশদের প্রচলিত এই কেরানী তৈরি শিক্ষাব্যবস্থার চক্করে পড়ে না হল আমাদের সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়; না হলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি।

ফিরে আসি ‘বাবুরাম’প্রজন্মের কাছে । উচ্চমাধ্যমিক/এ-লেভেল পাশ করে এদের গুটিকয়েক সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হলেও এদের লক্ষ্য কিন্তু বিসিএস বা সরকারী চাকরি থাকে না । তাই যুগের পর যুগ সেই মফঃস্বল আর গ্রামের কৃষকের ছেলেরাই এসে শোষক রাষ্ট্রের লোভনীয় চেয়ারগুলোতে বসা শুরু করেন। প্রাথমিক স্বপ্নপূরনের আর স্বপ্নভঙ্গের পরে শুরু করেন নতুন করে পশুসুলভ রাক্ষুসে খাওয়া। রাষ্ট্রীয় প্রতারণার বঞ্চনার মূল ভুক্তভোগী মূলত: নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীনরা। রাজনীতির কূটচাল আর সরকারি নেতাদের ও প্রশাসনের দুর্নীতির মোচ্ছব কাছাকাছি থেকে সবচেয়ে বেশি চাক্ষুষ করে উপজেলা ও জেলা শহরের সেই পরিবারের ছেলেগুলোই। অথচ সেই প্রতারিত সন্তানেরা বড় স্বপ্ন নিয়ে দেশের শাসনযন্ত্রে বসছে এবং দুর্নীতি করছে পুর্নোদ্যমে। দুর্নীতি থামছে না কোনভাবেই। প্রতিনিয়ত কেন সেটা হচ্ছে ,তা গবেষণার দাবী রাখে।

সমবয়সী বন্ধুদের মাঝে প্রশাসনে আছে এমন কয়েকজনের সঙ্গে নৈর্ব্যক্তিকভাবে কথা হয়েছে। কেউ কেউ পরিবারের উচ্চাভিলাষিতার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা সরকারের দলীয় নেতাদের অবৈধ ক্ষমতাচর্চা ও সিস্টেমের দোষ দিয়ে নিজেরা দায়মুক্ত হতে চেয়েছেন। কেউ কেউ আবার মজা করে সরল স্বীকারোক্তি করেছেন যে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব যতোখানি না জনগণকে সাহায্য করা তাঁর চেয়েও বেশি হচ্ছে কোন কিছু সহজে করতে না দেওয়া। এক বন্ধুতো বলেই বসল, ‘আমরা না থাকলেই বরং দেশ ভালোভাবে চলবে। আমরা তো কাজের কাজ তেমন কিছু করি না, আমাদের ধান্ধাই থাকে– কে রে, কী হলো রে, কে যায় রে, কেন রে তুই ওইভাবে করলি, আমাকে জানালি না কেন রে! — এইসব করে। মোদ্দাকথা প্রতি পদক্ষেপে কোনকাজ সহজ না করে সেটাতে বাগড়া দেওয়াই মুখ্য। ওদের কথা শুনে কষ্টের হাসি হেসেছি। আসলেই তো যে কাজ পাঁচ মিনিটে হয়ে যায়, সেটা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কয়েক বছরে কীভাবে লালফিতায় বেঁধে রাখা হয় সে আমাদের সবার কমবেশি দেখা হয়েছে।

শৈশব থেকেই কয়েকরকম শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের জনগোষ্ঠীর মানসিক বিভেদ স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরিবারের একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মানসিকতা দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে বাকী সদস্যরা । দেশের যে কোন ইস্যুতে প্রত্যেকে যার যার মতো কেউ মধ্যযুগীয় চিন্তা আর কেউ প্রগতিশীল চিন্তার প্রকাশ করছে। মানসিকতার সংঘর্ষ যেখানে অনিবার্য ; মানবিকতার অপমৃত্যু তো সেখানে খুব স্বাভাবিক,প্রাত্যহিক।

একই আলোবাতাসে বেড়ে উঠছে ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থার মানুষ। বাংলাদেশ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার চেতনা, ইসলামী শাসনাকাংখা, মদিনা সনদ, পুঁজিবাদ, মুক্তবাজার অর্থনীতি, গণতন্ত্র, সাম্যবাদ , কুসংস্কার , অনিশ্চয়তা, প্রগতিশীল শিক্ষা, অনাধুনিক শিক্ষা, পশ্চিমা শিক্ষা, ধর্মীয় নৈতিকতা, আপোষকামিতা, হিংস্রতা, স্বার্থপরতা—সবকিছুর বাইরে এই তিন শ্রেণির মানুষের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে এক অনতিক্রম্য দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।

এতো বিভেদ আর বিদ্বেষ নিয়ে আমাদের দেশের টেকসই উন্নয়ন কবে হবে, কীভাবে হবে ?

প্রকাশকালঃ ৬ই মে,২০২০

আমার শৈশবের যৌন শিক্ষা, আমাদের বেড়ে ওঠা ও আধুনিক বিকৃত প্রজন্ম

(পুরনো ও প্রিয় একটি লেখা, যা এই অস্বস্তিকর বাংলাদেশের জন্য সবসময় প্রাসঙ্গিক।)

আজ সকালে কন্যাকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে ভাঙ্গাগাড়ীতে পুরনো সিডি খুঁজছিলাম, কিশোর কুমারের একটা বাংলা সিডিও পেলাম, চালু করতেই সেই ঐশ্বরিক দরাজ গলা বেজে উঠলো।
“তারে আমি চোখে দেখিনি , তার অনেক গল্প শুনেছি,
গল্প শুনে তারে আমি অল্প অল্প ভালোবেসেছি।।
আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন,
বইতে পারে না তারও বিবশ মন ;
ভালোবাসার ভালো কথা শুনে নাকি শিহরিয়া যায় শুনেছি।।
চোখেতে তার স্বপ্ন শুনি ভীড় করে থাকে,
মরণ শুনেছি হাতছানি দিয়া ডাকে,
বিষের আবার ভালোমন্দ কীরে যখন আমি মরতে বসেছি !!! ”

কিশোর কুমার , মান্না দে আমাদের দুই প্রজন্ম আগের হলেও এঁদের গান আমাদেরকেও মাতিয়ে রেখেছিল। বাংলাব্যান্ডের উত্থানের সমসাময়িক সময়ে ফিতা ক্যাসেটের যুগে এঁরাই ছিলেন আমাদের সবচেয়ে কাছের।

গানের লাইনটি আবার খেয়াল করুন , ‘আসতে যেতে ছলকিয়া যায়রে যৌবন, বইতে পারে না তারও বিবশ মন !’
দৃশ্যকল্পটি কেমন? যৌবন ছল্‌কে পড়ছে, উদ্ভিন্ন বাঁকগুলো আপনাকে মুগ্ধ করছে।
যদিও আমি আমার কন্যাকে স্কুলের গেটে নামিয়ে অপেক্ষারত , তারপরেও ভণ্ডামি না করে বলতে পারি, আমার ‘পুরুষ-চোখ’ কিন্তু ঠিক ঠিকই অতিক্রম কারিণী সকলের , যাঁদের যৌবন ছল্‌কে যাচ্ছিল তাদের দেখছিল।

বর্তমানের একাধারে নারীদের উপর নিরবচ্ছিন্ন যৌন নিপীড়নের হেডলাইন দেখতে দেখতে আমি বিপর্যস্ত ও ক্লান্ত। পুরুষ হিসাবে আমি লজ্জিত। মনোবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নানা কুইক রেন্টাল টোটকা দিয়ে এই ভয়াবহ অসুস্থতা থেকে উঠে আসার পথ , উত্তরণের বাৎলাচ্ছেন।
কিন্তু আমার মনে হয়, পুরোপুরি উৎপাটন করা সম্ভব না হলেও এই অসুস্থতার সার্বিক নিরাময় সম্ভব। এবং সেটা শুধুমাত্র শৈশবে সঠিক যৌন শিক্ষার মাধ্যমে।

বালককে বুঝতে হবে, সে শিশ্ন-ধারী মানুষ ঠিক আছে, কিন্তু বালিকা শিশ্ন-হীন দ্বিতীয় লিঙ্গের দুর্বল কেউ না। বালককে নারীর মাহাত্ম্য বোঝাতে, নারীর মর্যাদা শেখাতে খুব বেশী সময় লাগারতো কথা না। বালকের মা আছে, বোন আছে, অন্য শ্রদ্ধেয়া আত্মীয়ারা আছেন। তাঁদের উদাহরণ দিয়ে তাকে নারীর মর্যাদা শেখাতে হবে।
রহস্যময় দৈহিক বাঁক নিয়ে যে নারী সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, সে একজন মানুষ এবং তোমার চেয়েও অধিকতম মানুষ। বংশগতির ধারা বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুনরুৎপাদনের বিশাল শারীরিক যন্ত্রণার দায়িত্ব প্রকৃতি তাঁকে দিয়েছে। বালককে বুঝতে হবে , বোঝাতে হবে নারী শুধুমাত্র স্তন ও যোনীর সমষ্টি একটা ভোগের বস্তু নয় !

পরিবারের কাছ থেকে শিক্ষাটা পেলে ভাল। নইলে শিক্ষায়াতনে। পরিবারের একজন পুরুষকে দেখলে প্রথমেই আমরাতো তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করি না !
পোশাক, জুতা, আর্থিক-সামাজিক অবস্থা হেন তেনর পরে তার বিশাল বপু বা স্থূলত্ব নিয়ে কথা হয়।

কিন্তু একজন নারীকে দেখলে কেন প্রথমেই তাঁর স্তন ও নিতম্বের দিকে জুলজুলে নজর যাচ্ছে ? সমস্যাটা কোথায় ? তাঁর অন্যসব বৈশিষ্ট্য কেন আলোচিত হয় না ? একজন কিশোরী , তরুণী আমার সামনে এসে প্রথমেই কেন তাঁর বুক আঁচল বা ওড়না দিয়ে ঢাকাঢাকি করা শুরু করে দেয়। কী তাঁকে ভীত করে তোলে, যে সামনের পুরুষটির ( হোক সে কিশোর, তরুণ , মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ) সামনে সে ঠিক নিরাপদ বোধ করে না ! কে তাঁর মনে এই অ-নিরাপত্তা ঢুকিয়ে দিয়েছে?

বাদ দিই, তাত্ত্বিক আলোচনা। সাহস বা দুঃসাহস করে যদি আমার প্রজন্মের যৌন শিক্ষার ইতিহাস আলোচনা করি , তাহলেও কী কিছুটা ধারনা পাওয়া যাবে না !

অন্য সকলের মতোই আমারও কৈশোরের অসহনীয় বয়ঃসন্ধির একাকীত্ব, দেহের অনাকাঙ্ক্ষিত বেড়ে ওঠা ছিল। ছিল মন খারাপ করা বিকেলবেলা। নিজেকে অপাঙতেয় , তুচ্ছ , অবহেলিত ভাবার দুঃসহ দিনরাত্রি। আমি মোটামুটি নজরে পড়ার মতো ভালো ছাত্র ছিলাম। পরিবারের ও শিক্ষকদের আলাদা একটা এক্সপেকটেশনের ভার আমাকে বইতে হতো। কিন্তু আমিও তো একটা কিশোর। আমার যে ছেলে বন্ধুটি , মেয়েদের স্কুলের সামনে যেয়ে সদ্য কিশোরীদের উদ্ভাসিত চাহনি, রহস্যময় বাঁক দেখে আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে গল্প করতো ,তাতে আমার মনটাও তো হু হু করে উঠতো।

সে ছিল এক কল্পনার রাজ্য। যদিও আমার শারীরিক মানসিক বৃদ্ধির সমানুপাত বৃদ্ধির পরিমাপ নিয়ে আমার পরিবারে দ্বিধা আছে।আমার মানসিক বৃদ্ধি শরীরের তুলনায় শ্লথ। আমি স্তন্যপায়ী ছিলাম ৬ বছর বয়স পর্যন্ত। এবং কেন জানিনা , আম্মাও আমার অত্যাচারকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন অতোগুলো বছর। বছর পাঁচেক পর্যন্ত আমার বেড়ে ওঠা নানাবাড়ি কুষ্টিয়াতে। অস্পষ্ট আবছা মনে আছে, হয়তো স্মৃতিতেই পুনঃ-নির্মিত হয়ে আছে। গ্রামের বাচ্চারা ছিল যৌনতার ব্যাপারে অকালপক্ব । সহচর-সহচরী খেলার সাথীদের হঠাৎ বাল্যবিবাহ, তাঁদের যৌনতার অভিজ্ঞতার নিষিদ্ধ আলোচনা তাদেরকে পাকিয়ে দেয়। কোনটা শিশ্ন, যোনি, স্তন, কোনটার কী কাজ, সেটা আমাদের সময়ে আমাদের গ্রামের খেলার সাথীরা ভালোই বুঝতো। পুরোপুরি নাগরিক হতে হতে ৭৯ সাল। প্রতি ঈদে পার্বণে নানাবাড়ি যেতে হোত, যৌন জ্ঞানের পার্থক্যটা তখন চোখে পড়ার মতো ছিল । মোরগ-মুরগী বা কুকুরের সংগমে আমার বিন্দুমাত্র উৎসাহ না থাকলেও গ্রামের শিশুদের জন্য সেটা ছিল নিষিদ্ধ আনন্দ।

বছর সাতেক থেকে তেরো চৌদ্দ পর্যন্ত সেই অর্থে আমার যৌন চেতনা ছিলনা। অন্তত: আমার কিছুই মনে নেই।ক্লাস ফাইভে আমার সহপাঠিনী মিতু প্রেম করা শুরু করলো বা অধুনা যেটাকে বলে ক্রাশ খেল অপু নামের জনৈক নবম শ্রেণীর উদীয়মান গায়কের সঙ্গে। ওইটা আমার মনে আছে।

ক্লাস সিক্সে স্কুলের পরিবর্তন। স্কুল পরিবর্তনের পরে , নতুন স্কুলের পোলাপানের সঙ্গে এলোমেলো সখ্যতা গড়ে উঠল। ফার্স্ট বয় থেকে লাস্ট বয় সবাই আমার বন্ধু ছিল। সবাই আমাকে আপন করে নিল।

বাসায় মামা চাচা ও গ্রামের আত্মীয়স্বজন অপর্যাপ্ত। দুই বেডরুম,ডাইনিং বাসাতে মাসের বেশীরভাগ দিন আমাকে নিজের বিছানা ছেড়ে দিয়ে ফ্লোরিং করতে হোত। দেশের বাড়ির কেউ না কেউ, হয় চিকিৎসা নয় এয়ারপোর্ট বা চিড়িয়াখানা দেখতে বাড়িতে জিইয়ে থাকত।

বাসায় মামা , চাচা কেউ না কেউ যাওয়া আসার মধ্যে থাকতোই। তাদের ফিসফিসে নারীদেহ নিয়ে কথাবার্তা কানে বাজতো। হ্যাঁ, নারীর নগ্নদেহের ছবি একটা শিরশিরে অনুভূতি এনে দিত। মামা-চাচাদের কারো না কারো অসাবধানে বিছানার তোষকের তলায় ফেলে রাখা নিউজপ্রিন্ট ছাপার পর্ণ পত্রিকা হাতে পড়লো। বেশ কয়েকদিন লুকিয়ে লুকিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলাম। সম্ভবত: অর্ধ-নগ্ন ছবির একসেট প্লেয়িং কার্ডও লুকিয়ে লুকিয়ে কিছুদিন দেখেছিলাম। তো, প নামের এক নতুন স্কুল-বন্ধু স্বমেহনের ব্যাপারটা কেমন করে যেন মাথায় ঢুকিয়ে দিল। আমি জানি না, আমার সব বন্ধুদের সবাই, হয়তো নিজে নিজেই স্বমেহনের আনন্দ পেতে শুরু করেছিল। কিন্তু, এটা কেই আমরা একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করতাম না। এর মাঝে কেউ কেউ স্বমেহন যে খারাপ তা বলে তীব্র অপরাধ-বোধ ঢুকিয়ে দিল। এটা খুব খারাপ, পাপ হবে, শরীর শুকিয়ে খারাপ হয়ে যাবে, স্মৃতিশক্তি নষ্ট হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্লাস সেভেন বা ক্লাস এইট পর্যন্ত যৌনমিলনের ব্যাপারে আমার জ্ঞানের পরিধি ছিল এই যে, শারীরিক মিলনে পুরুষাঙ্গ ও নারীর পায়ুপথ ব্যবহৃত হয়। অবশ্য এইটের শেষের দিকে ক্লাসের অভিজ্ঞ ডেঁপো ছেলেদের জ্ঞান বিতরণে মানব-মানবীর শারীরিক মিলনের সব কিছু সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেল !

কিন্তু পড়াশোনার চাপে চিঁড়েচ্যাপটা , কৈশোরের একাকীত্ব স্বমেহনের দিকেই ঠেলে দিয়েছিল আমাকে ও আমাদেরকে।
এসএসসি পরীক্ষার পরপরই আমরা ঘোষণা দিয়ে বড়ো হয়ে গেলাম। এখন আমরা সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফিরতে পারব। আমরা কলেজ ছাত্র। এবং ‘জ’ নামের এক বন্ধুর বাড়িতে আমাদের প্রথম দলবেঁধে পর্ণ-ছবি দেখা। ঢাকা কলেজে ভয়ঙ্কর মেধাবী মেধাতালিকার বন্ধুদের ছড়াছড়ি। আমরা মিরপুরের ছেলেপেলে ছিলাম নিতান্ত মফস্বলী মফু । গভর্নমেন্ট ল্যাব: বা ধানমণ্ডি বয়েজের পেন্টিয়াম ভার্সনের পোলাপানের কাছে আমরা ছিলাম ডজ মুডের কম্পিউটার। একদিন কেউ একজন আমাদের মিরপুরবাসীকে জিজ্ঞাস করলো আমরা বাংলা পর্ণ বা চটি পড়েছি কীনা। নেতিবাচক উত্তর পেয়ে সে বললো , তোরা তো এখনও শিক্ষিতই হস্ নাই, আয় তোদের শিক্ষিত করি। তো ওই চটি পড়ে আমরা অদ্ভুতুড়ে কিছু পশ্চিমবঙ্গীয় যৌনাঙ্গের ও মিলন পদ্ধতির নাম শিখলাম। বেশীরভাগ পুস্তিকা বটতলায় ছাপানো, নীলক্ষেত উত্তম ভাঁড়ারঘর ছিল সকল কলেজ-গামী ছাত্রদের কাছে।

আমার ধারনা, আমাদের মানসিক গঠনে, ওই সামান্য তথ্য বিকৃতি তেমন দীর্ঘমেয়াদী ছাপ ফেলতে পারে নাই। সমাজ ও পরিবারের এক্সপেকটেশনের চাপ আমাদেরকে অনেকটা একমুখী করে রেখেছিল( স্বমেহনের ব্যাপারটা ছাড়া। পরবর্তীতে আমি পড়াশোনা করে কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারি, স্বমেহন অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। পাপ আর স্বাস্থ্যভঙ্গের ভুল বিকৃত তথ্য যদিও আমার কৈশোরের একটা অংশ বিষময় করে দিয়েছিল। )

বয়েজ স্কুলে পড়লেও নানা কারণে কোচিং ও মহল্লার ভালো ছাত্র হওয়ার বদৌলতে সতীর্থ সমবয়সী বান্ধবী ছিল। কিন্তু ওদের মানসিক পরিপক্বতা ছিল আমার বা আমদের চেয়ে বছর দশেক এগিয়ে। সম্পর্কটা ছিল নিতান্তই বড়বোন-ছোটভাই টাইপের। বিকৃতিহীন স্বাস্থ্যকর।

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির জীবনে নতুন করে কোন তাত্ত্বিক বা ব্যবহারিক জ্ঞানের সম্ভাবনা ছিল না।
যথারীতি কয়েকজন প্লেবয় বন্ধু ছিল, যাদের ব্যবহারিক জ্ঞান ওই পর্ণ-পত্রিকার গল্পের চেয়েও উত্তেজক ছিল। তারা তাদের যৌন অভিজ্ঞতার কথা বলত। আমরা অবদমিত মন নিয়ে তাদের রোমাঞ্চের ও মৈথুনের শীৎকার শুনতাম ও দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম। তারপরে তো বিবাহিত জীবন, ‘দারা পুত্র পরিবার , তুমি কার কে তোমার !’

স্কুলকলেজের ডেঁপো বন্ধুদের কেউ কেউ, ভিড়ের বাসে আরেকজনের সাথে ধাক্কা খেয়েছে বা ধাক্কা না খেয়েই কল্প গল্প বানিয়ে বলেছে এটা বোঝা মুশকিল ছিল । যৌনতার ব্যাপারে ওই বয়সটা ছিল, সবকিছু বিশ্বাস করার, হা করে শোনার।

আমাদের প্রজন্মের মধ্যবিত্ত পরিবারের বেড়ে ওঠা অ্যাভারেজ একটা ছেলের যৌন-জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেকটা আমার মতোই। ছোটখাটো ভুল তথ্য ,স্বমেহন বা পর্ণ ছাড়া আমি কোন বিকৃতি দেখিনা।

কিন্তু এর মাঝে মধ্যবর্তী নতুন একটা বিকৃত প্রজন্ম এসেছে ; যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের শ্লীলতাহানি করছে, বা মাইক্রোবাসে তরুণীকে অপহরণ করে ধর্ষণ করছে, তাদেরকে আমি চিনি না। দুর্ভাগ্য, এই বিকৃতদের সাথেই প্রতিমুহূর্ত বসবাস করতে হচ্ছে আমাকে আমাদেরকে !

[ প্রকাশকালঃ ১৪ই জুন,২০১৫ ]