শিল্প প্রসঙ্গে।।লিয়েফ্ তলেস্তায়। লেভ টলস্টয়

মানুষ চায় তার সৃষ্টিকে ভবিষ্যৎ বংশধরদের মধ্যে সম্প্রসারিত করে দিতে। এই জন্যই শিক্ষাদানের রীতি প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু পরিচিত জ্ঞানকে হস্তান্তর করার, বা শিক্ষাদান ব্যাপারটির, কোনো বিশেষ স্বয়ংসম্পূর্ণ তাৎপর্য নেই; এর তাৎপর্য সম্পূর্ণরূপেই নির্ভর করে নিজের সৃষ্টিকে মানুষ ভবিষ্যৎ বংশধরদের নিকট কতটা গুরুত্বের সঙ্গে পৌঁছে দিতে চায় তার ওপর। ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে কী হস্তান্তর করতে হবে, তা নির্ধারিত হয় সৃষ্টির মূল্যের দ্বারাই, অর্থাৎ যে-সৃষ্টি যথার্থই মূল্যবান তাই মানুষ পৌঁছে দিতে চায় ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে। শিক্ষকতার কাজটি সাধারণত শৈল্পিক কাজ বলে গণ্য হয় না। শৈল্পিক কাজের গুরুত্ব যথার্থভাবেই আরোপিত হয় সৃষ্টির ওপর—যাকে বলা হয় শিল্পসৃষ্টি।

শৈল্পিক (এবং বৈজ্ঞানিক) সৃষ্টি তাহলে কী?

শৈল্পিক (এবং বৈজ্ঞানিকও) সৃষ্টি হচ্ছে এমন একটি মানসিক ক্রিয়া যা অস্পষ্টভাবে উপলব্ধ অনুভূতিকে (বা চিন্তাকে) এমন স্পষ্টতার মধ্যে নিয়ে আসে যে, সেই অনুভূতি বা চিন্তা অন্য মানুষের মনের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে।
সৃষ্টির প্রক্রিয়া যেহেতু মানুষের মধ্যেই বর্তমান, সুতরাং আমরা প্রত্যেকেই অন্তরের অভিজ্ঞতা দ্বারা তা উপলব্ধি করতে পারি; তার সংঘটন বর্ণনা করা যায় এ-ভাবে: কোনো ব্যক্তি হঠাৎ হয়তো এমন কিছু কল্পনা বা অস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে বসেন যা তাঁর কাছে সম্পূর্ণ নতুন, অপরিচিত ও অশ্রুত বলে মনে হয়। এই নতুন বিষয়টি তাঁর মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তিনি সেই উপলব্ধিকে সাধারণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অন্যের নিকট তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এই প্রয়াসের এক পর্যায়ে বিস্ময়ের সঙ্গে তিনি দেখতে পান, যা তাঁর কাছে স্পষ্ট তা তাঁর শ্রোতাদের কাছে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও নতুন। তিনি তাঁদের কাছে যে-বিষয়ের কথা বলেন তা তাঁরা সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেন না। অন্যদের থেকে এই বিচ্ছিন্নতা বৈসাদৃশ্য, বা যাকে বলা যায় অমিল—তা প্রথমে তাঁকে পীড়া দেয় এবং নিজের উপলব্ধির সত্যতা আরও গভীরভাবে যাচাই করে ঐ ব্যক্তি পুনরায় চেষ্টা করেন, তিনি যা দেখেছেন, অনুভব করছেন কিংবা উপলব্ধি করছেন তা অন্য কোনো উপায়ে অন্য মানুষদের কাছে প্রকাশ করতে। কিন্তু দেখতে পান, এই লোকেরাও তাঁর ঈপ্সিত বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে পারছেন না, কিংবা তিনি তা যে-ভাবে উপলব্ধি বা অনুভব করেছেন সে-ভাবে তাঁরা তা উপলব্ধি করতে পারছেন না, কিংবা তিনি তা যে-ভাবে উপলব্ধি বা অনুভব করেছেন সে-ভাবে তাঁরা তা উপলব্ধি বা অনুভব করেন না। তখন ঐ ব্যক্তি এমন ধরনের একটি আত্মসন্দেহের দ্বারা পীড়িত হন যে, হয় তিনি যা কল্পনা করছেন বা অস্পষ্টভাবে অনুভব করছেন তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই, নতুবা বাস্তব অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও অন্যেরা তা দেখতে কিংবা অনুভব করতে পারছেন না। এই সন্দেহের অবসানকল্পে তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা করেন তাঁর আবিষ্কারকে এমন স্পষ্টতা দান করতে যেন তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা করেন তাঁর আবিষ্কারকে এমন স্পষ্টতা দান করতে যেন তাঁর উপলব্ধ বিষয়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর নিজের কিংবা অন্য কারও কোনো সন্দেহ না থাকে। যখন এই স্পষ্টতাদান সমাপ্ত হয় এবং ঐ ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে, তিনি যা দেখেছেন, উপলব্ধি করেছেন, বা অনুভব করেছেন, তার অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণভাবে নিঃসন্দেহ, তখনই দেখা যায় অন্যেরা তা তাঁরই মতো করে উপলব্ধি এবং অনুভব করতে পারছেন। তাঁর কাছে ও অন্যদের কাছে যা অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ছিল তাকে নিজের ও অন্যদের কাছে স্পষ্ট ও সন্দেহাতীত করার এই প্রয়াসই হলো মানুষের আত্মিক সৃষ্টিপ্রবাহের সাধারণ উৎস। আমরা শিল্পকর্ম বলে যাকে অভিহিত করি—যা মানুষের মনের দিগন্তকে সম্প্রসারিত করে এবং ইতিপূর্বে অনুভূত ও অগোচর বিষয়কে মানুষের অনুভূতি ও গোচরের মধ্যে নিয়ে আসে—তারও উৎস এই প্রয়াস। (অংশ)

আবুল কাসেম ফজলুল হক অনূদিত
সূত্র: লিয়েফ্ তলেস্তায় প্রয়াণ-শতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ/ সংকলন ও সম্পাদনা: হায়াত্ মামুদ (বাংলা একাডেমি, ২০১৩)

মানুষের বুঝি অনেক জমির দরকার।How Much Land Does a Man Need

আমার বৈষয়িক সম্পদের ও সম্পত্তির পরিমাণ স্বল্প ! কিছু টাকা জমলেই , একটা না একটা বড়ো বিপদ বা ঝামেলা এসে হাজির হয়। নিজের কাছে টাকা আছে অথচ পরিবারের কারো বিপদে আমি সেটা খরচ করছি না, এটা আমাকে দিয়ে হয় না। আমার খুব কাছের বন্ধু-বান্ধবরা এগুলো জানে। সংসারের সম্পত্তি বৃদ্ধিতে আমি অ-বৈষয়িকই থেকে গেলাম।

যাক ! চল্লিশের পরে উপভোগ্য জীবন আর কতদিনের যে , উঞ্ছবৃত্তি করে জমিজমা ফ্ল্যাট করে যেতেই হবে। নইলে জীবনটা বার্থ! আমার মনে হয়, আমি এমন কিছু মূল্যবোধের বা ভ্যালুজের মধ্যে মানুষ হয়েছি, যে ওই মূল্যবোধ বজায় রাখতে গিয়ে আমাকে সারাক্ষণ একটা আর্থিক টানাটানির ভিতরে থাকতে হয়। এটা নিয়া আমার সহধর্মিণীর আফসোস আছে। এখন আবার দুই কন্যার নিরাপত্তার কথা বলে ভয় দেখায় আমাকে। গতস্যশোচনা নাস্তি। তেমন লাভ হচ্ছে না ! দীর্ঘ কর্মজীবনে অফিস থেকে ইনসেন্টিভ বা ওইরকম গালভরা নামের কিছু পেয়েছি মাত্র দু একবার । তাই দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছোট্ট একটা ‘পূর্বাচল চান্দের দেশ’ টাইপ এক জায়গার শেয়ারে আছি। এটাও করছি বউয়ের চাপে, আর আমার দুই কন্যা যাতে পরবর্তী জীবনে আমারে গালিগালাজ না করে। বাকীটা সময়ই বলে দেবে !

সম্পত্তির নিদারুণ অভাবে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার কৌশল কীভাবে যেন বের করে ফেলেছি। সম্পত্তির কথা উঠিয়ে আমার আফসোস জাগানো লোকজনকে লিয়েফ্‌ তল্‌স্তোয় বা লেভ টলস্টয়-এর একটা গল্পের কথা মনে করিয়ে দিই। মানে আমাকে যখনই কেউ জমি কিনতে বলে, আমি এই গল্প নিজেকে নিজে শোনাই তাকেও শোনাই! আপনারা শুনতে চাইলে বলি ।

ওই যে, ‘How Much Land Does a Man Need’ বঙ্গানুবাদ ‘কতটুকু জমি দরকার?’ বা ‘ মানুষের বুঝি অনেক জমির দরকার’- নামের গল্পটা।

গাঁয়ের ভূমিহীন কৃষক পাখোম স্বপ্ন দেখত কিছু নিজের জমির । দশ বিঘা , বিশ বিঘা করে শ’ দেড়েক বিঘা। সস্তার জমির কথা শুনে দূরদেশে দশগুণ সম্পত্তি পেয়েও তা সামান্য ঠেকতে লাগলো। লোকমুখে সে শুনতে পেল বাশ্‌কির বা উরাল পার্বত্য এলাকায় সর্দারদের সামান্য উপহারের বিনিময়ে এখনকার চেয়ে হাজারগুণ সম্পত্তি উর্বর জমি পাওয়া যাবে।

ক্রমাগত সম্পত্তির লোভে সে এসে পৌঁছে সর্দারদের কাছে। সামান্য উপহারের বিনিময়ে সর্দাররা রাজী হয় দিগন্ত বিস্তৃত উর্বর জমি দিতে। জমির দাম দিনে একহাজার মুদ্রা । শর্ত একটাই। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গোত্রপ্রধান একটা লাঠি পুঁতে দেবেন মাটিতে। এইবার জমির দাবীদারকে হাঁটা শুরু করতে হবে। সামনে আদিগন্ত ভূমি। কিন্তু সূর্যাস্তের আগেই পুঁতে দেওয়া লাঠির কাছে ফিরে আসতে হবে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতখানি জায়গা ঘুরে আসতে পারবে, সব জমি তাঁর নামে লিখে দেবেন ওই গোত্র প্রধানরা। সূর্য ডোবার আগে আগের জায়গায় ফিরে আসতে না পারলে টাকা ও জমি কিছুই পাবে না সে !

পাখোম হাঁটা শুরু করলেন, যত এগোয় ততোই ভালো সরেস জমি। আরেকটু আরেকটু করতে করতে দুপুর। তাঁর মনে পড়লো ফিরে যেতে হবে, দূরে পাহাড়ের ধারে গোত্রপ্রধানদের দেখা যাচ্ছে। জোরে হাঁটা শুরু করলো । বেলা ঢলে আসছে, আরো জোরে। সূর্যাস্ত হয় হয়। স্বপ্নজাল বুনতে বুনতে লোকটা দৌড়ানো শুরু করলো। আগের রাত্রে উত্তেজক নির্ঘুম রাত আর অনেক শ্রান্তির লোকটি প্রাণপণে দৌড়োতে লাগলো, সর্দাররা উৎসাহ দিচ্ছে এইতো আরেকটু । যখন সে পুঁতে রাখা লাঠিটার কাছে পৌঁছালো , পড়ে গিয়ে নিথর মৃত।
সবাই মিলে ওই জায়গাতেই কবর খুঁড়ল, মাথা থেকে পা পর্যন্ত ছ’ ফিট জমি।
সেইখানে তাকে শুইয়ে দেয়া হলো।
ওইটুকু জমিই তার প্রয়োজন ছিল !
অনেক আগে পড়া গল্পটা মাথায় এমনভাবে গেঁথে আছে। মনে হয় কী লাভ জমির পিছনে ছুটে ! আমি জানি আমার এই অ-বৈষয়িক উন্নাসিকতার চরম দাম আমার পরবর্তী প্রজন্মকে দিতে হতেও পারে। নাও পারে ! তাঁরা আমাকে গালিগালাজ করতেও পারে , নাও পারে!

যাই হোক জমির নেশা থেকে আমি মুক্ত !

প্রকাশকালঃ এপ্রিল, ২০১৩